ফিচারের দুনিয়ায়…
||গন্তব্য গম্ভীরা||
সংহিতা রায়
রাজপথ নয়। আবার এ পথ গলিপথও নয়। তার চেয়ে খানিকটা চওড়া। দুটো অটো পাশাপাশি চললে পথচারীদের চলা দায়। তবু এ পথ বড় রঙিন। রাস্তার দুপাশে মেলা দোকান। সারি সারি জগন্নাথ। বলভদ্র আর সুভদ্রা দেবীও আছেন হাসিমুখে। এদিক ওদিক ভিড় জমেছে ছানাপোড়ার সন্ধানে। খাজার সঙ্গে শুকনো কালোজাম আর সরেস রসগোল্লা। এ পাড়ার ‘গেরস্থ’ ভাবখানার সঙ্গে বিশেষ মিল নেই ‘পুরীর সিটিলাইফ’র। হেঁটে খানিকটা এগোলেই দেখা মিলবে চৈতন্যর ঠাঁই। কাশী মিশ্রর নিবাস-গম্ভীরা। অন্য নামে ‘রাধাকান্ত মঠ’। শ্রী চৈতন্যদেবের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় কেটেছিল এখানেই। এখান থেকেই পাড়ি দিয়েছিলেন অজানায়।
দু’ গলি ঘুরে থামতে হয় এক সিংহ দরজার সামনে। ঢোকার মুখেই লেখা ‘ছবি তোলা কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ’। ভবনের ভিতরে ঢুকলে ছড়ানো চত্বর। উঠোনের মাঝখানে মহাপ্রভুর মূর্তি। আর এক পাশের মন্দিরে রাধাকান্ত জিউয়ের অধিষ্ঠান। তাঁর সঙ্গে রাধারানী ও ললিতা।কাশী মিশ্রর বাসায় তাঁর আগমন কাহিনিটি বেশ চমকপ্রদ।
কথিত, পুরীর রাজা প্রতাপরুদ্রকে একবার স্বপ্নে দর্শন দেন প্রভু জগন্নাথ। তিনি বলেন তাঁর ভোগের সমস্ত লোভনীয় পদ একাই খেয়ে নিচ্ছেন রাধাকান্তজিউ।
রাধাকান্ত জিউকে শ্রী মন্দিরে এনেছিলেন রাজা প্রতাপরুদ্রর পিতা পুরুষোত্তম। কাঞ্চিপুরম আক্রমণ করেছিলেন তিনি। বিজয়প্রাপ্ত হওয়ার পর সেখান থেকে তিনটি বিগ্রহ নিয়ে আসেন। রাধাকান্ত জিউ, সাক্ষী গোপাল এবং বড় গণেশ মানে কাঞ্চি গণেশ। তিনটি মূর্তিই ছিল জগন্নাথ মন্দিরে। কিন্তু এমন স্বপ্নের কারণে রাজা প্রতাপরুদ্র কাশী মিশ্রকে তাঁর গৃহে রাধাকান্ত জিউকে সেবার ভার দেন। তিনি ছিলেন রাজার কূল গুরু এবং জগন্নাথ মন্দিরের অন্যতম প্রশাসনিক কর্তা।
আদিতে রাধাকান্ত একাই পূজিত হতেন গম্ভীরায়। পরে বক্রেশ্বর পন্ডিতের শিষ্য গোপাল গুরু দায়িত্ব গ্রহণের পর রাধাকান্তের পাশে রাধারানী আর ললিতা দেবীকে স্থাপন করা হয়।
কীভাবে কাশী মিশ্রর গৃহে এলেন শ্রী চৈতন্য?
অদ্যপিই সেই লীলা করে গোরা রায়
কোনো কোনো ভাগ্যবানে দেখিবারে পায়।
কাশী মিশ্রর গৃহ কীভাবে মহাপ্রভুর লীলাক্ষেত্র হয়ে উঠল তার বিস্তারিত বিবরণ মেলে চৈতন্য চরিতামৃততে। সন্ন্যাস গ্রহণের পর বাংলা থেকে নীলাচলে আসেন নিমাই। মা শচী দেবীকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘কোথায় হবে তাঁর ঠাঁই? বৃন্দাবন নাকি নীলাচল?’
ঘরছাড়া পুত্রের কিছু খবর অন্তত পাওয়া যাবে, সেই ভেবে তিনি বলেন, ‘নীলাচল’। তাই মাতৃ আদেশেই মহাপ্রভুর জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছিল নীলমাধবের পুরী।
১৫১০ খ্রিস্টাব্দে শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভু শ্রীক্ষেত্রে আসেন। প্রথমে তিনি রাজা প্রতাপ রুদ্রের দরবারী পণ্ডিত সার্বভৌম ভট্টাচার্যর আবাসে অবস্থান করেছিলেন। সার্বভৌম ভট্টাচার্য রাজাকে অনুরোধ করেন মহাপ্রভুর জন্য একটি নিভৃত আলয়ের বন্দোবস্ত করে দিতে। তখন কাশী মিশ্রর গৃহকেই নিমাই সন্ন্যাসীর আদৰ্শ স্থান হিসাবে তিনি চিহ্নিত করেন।
দক্ষিণ ভারত থেকে ফিরে আসার পর মহাপ্রভু আসেন কাশী মিশ্রর গৃহে।
১৫৩৩ খ্রিস্টাব্দে তাঁর অন্তর্ধান ঘটে। তাঁর জীবনের মূল্যবান ১৮ বছর তিনি এই গৃহেই কাটিয়েছিলেন।
তাঁর সন্ন্যাসলীলার নিত্য পীঠস্থল গম্ভীরা তথা গৌর রাধাকান্ত মঠ।
পর্যটকরা খালি চোখে যে গম্ভীরা দেখেন, সেই গম্ভীরাই কিন্তু যথেষ্ট নয়। রাধাকান্ত মঠের সূত্রে জানা যায়, গম্ভীরায় পাঁচটি ছোট ছোট প্রকোষ্ঠ রয়েছে। এই প্রকোষ্ঠগুলিতে কোনও দরজা-জানলা ছিল না। আলো-বাতাস প্রবেশের পথও বন্ধ। পঞ্চম প্রকোষ্ঠর মাটির নিচে রয়েছে ৬/৪-এর একটি প্রকোষ্ঠ। এটি সুড়ঙ্গের মাধ্যমে জগন্নাথ মন্দিরের গর্ভগৃহ এবং সমুদ্রের সঙ্গে যুক্ত ছিল। মুঘল আক্রমণের হাত থেকে জগন্নাথ মন্দিরের ধন সম্পদ ও অলংকার রক্ষা করার জন্য এমন গুপ্ত কুঠুরীর বন্দোবস্ত। যেহেতু এই গোপন কুঠুরি মাটির অত্যন্ত গভীরে তাই তার নাম হয় ‘গম্ভীরা’।
জঙ্গলের মধ্যে তমাল গাছের তলায় এক কুটিরে সাধনভজন করতেন কাশী মিশ্র। সেই কুটিরে পদার্পণ করেন শ্রী চৈতন্যদেব। সাধনার জন্য বেছে নেন মাটির তলার গুপ্ত ঘর ‘গম্ভীরা’। সেখানেই দীর্ঘ সময় ধরে বিপ্রলম্ভ সেবার শিক্ষা দিয়েছিলেন।
বিপ্রলম্ভ কী?
বিপ্রলম্ভ শব্দের অর্থ বিচ্ছেদ বা বিরহের যন্ত্রণা।
শ্রীকৃষ্ণের মথুরা গমনের পর তাঁর বিরহে রাধা ও সখীদের যে অসহনীয় বেদনা তাকেই বলা হয় বিপ্রলম্ভ দশা। গম্ভীরা তাই অতি প্রাকৃত চিন্ময় স্থান বলে মনে করা হয়। সেই স্থান সাধারণের অগম্য। সে কারণেই মাটির উপরে গড়ে তোলা হয়েছে আজকের গৌর গম্ভীরা।
মঠ কুঠুরিতে ১৮ বছর ছিলেন মহাপ্রভু। তিনি মৌন থাকতেন। হাঁটু মুড়ে একাসনেই জেগে থাকতেন সারা দিনরাত। জোরে জোরে কৃষ্ণনাম করতেন। দিব্যোন্মাদ অবস্থায় নানা রকম পরিবর্তন দেখা যেত শরীরে। বাহ্যজ্ঞান থাকত না। সেই অবস্থায় তাঁর চিত্তকে সুস্থতায় ফিরিয়ে আনতেন তাঁর দুই প্রধান সহচর রামানন্দ রায় এবং স্বরূপ দামোদর।
একদিন তাঁর কুঠুরি থেকে আর কোনও নাম ধ্বনি শোনা যাচ্ছিল না। চরম নৈঃশব্দ্য নেমেছে কুঠুরিতে। স্বরূপ দামোদর কুঠুরিতে প্রবেশ করে দেখেন মহাপ্রভু নেই! তিন-তিনটি তালাবন্ধ দরজা ভেদ করে নিষ্ক্রমণ করেছেন তিনি। শেষে শ্রী মন্দিরের উত্তরের সিংহ দ্বারে মেলে তাঁর সন্ধান।
গম্ভীরাতেই কেটেছে তাঁর জীবনের শেষ পর্ব। এখান থেকে বেরিয়েই তিনি হারিয়ে যান। তাঁর অন্তর্ধান রহস্যের আজও মীমাংসা হয়নি। তাঁর অনুচর স্বরূপ দামোদরের জীবনও এমন অন্তর্ধান রহস্যে মোড়া। নিখোঁজ হয়েছিল এই চৈতন্য অনুগামীর পুঁথি-কড়চা।
কাশী মিশ্র স্থাপিত এবং মহাপ্রভুর একান্ত অনুচর গোপাল গুরু গোস্বামী পূজিত শ্রী রাধাকান্ত শ্রী গম্ভীরা সংলগ্ন পৃথক মন্দিরে বিরাজ করেন।
গম্ভীরা তথা গৌর রাধাকান্ত মঠে সংরক্ষিত রয়েছে মহাপ্রভুর পাদুকা, সন্ন্যাস কমন্ডুল এবং তাঁর কাঁথার খন্ড। পুত্রের জন্য তৈরি করেছিলেন মা শচীদেবী। পাদুকা দিয়েছিলেন বিষ্ণুপ্রিয়া।
পুরীর স্বর্গদ্বার থেকে ১০-১৫ মিনিটের পথ গম্ভীরা। জগন্নাথ মন্দিরের দক্ষিণ পূর্বে বালিসাহীতে অবস্থিত।
গম্ভীরাতে আজও রাখা রয়েছে অখণ্ড জ্যোতি দীপ। নাঃ, কোনও অলৌকিক শক্তির জোরে নয়, চৈতন্য ভক্তদের ভক্তি আর ভালবাসায় এই দীপ কখনও নেভে না। গম্ভীরা দর্শন করে অখণ্ড জ্যোতির জন্য তেল দান করার প্রথা রয়েছে।
গম্ভীরার কাহিনি চৈতন্যদেব এবং তাঁর অন্তিম পর্বের সম্পর্কে কৌতূহল জাগায় সাধারণ পর্যটককেও। এই দেশে চৈতন্য প্রভাবকে ম্লান করতে পারেনি তাঁর আকস্মিক অন্তর্ধান। মহাপ্রভুর পুরীকে জানতে চাইলে আসতেই হবে তাঁর ‘গম্ভীরা’য়।
জন্ম তার রানাঘাটে, রসগোল্লার জগৎজয়ী সফরের সূচনা ঘটেছিল পালচৌধুরী বাড়িতে
সৌভিক রায়
কালীর প্রতি অনুযোগ ঝরে পড়েছিল রামপ্রসাদের কলম থেকে। তিনি লিখেছিলেন, ‘প্যাদার রাজা কৃষ্ণচন্দ্র, তার নামেতে নিলাম জারি।/ঐ যে পান বেচে খায় কৃষ্ণপান্তি– তারে দিলি জমদারি।।’ কে এই কৃষ্ণপান্তি? যে জমিদারি পেতে, এত অভিমান জমল রামপ্রসাদের মনে।
১০৬৯ বঙ্গাব্দ। হুগলির খানাকুল থেকে নদিয়ার রানাঘাটে চলে আসেন মহেশচন্দ্র পাল। পানের কারবার শুরু করায় পালের বদলে তাঁদের নাম হয়ে যায় ‘পান্তি’। মহেশচন্দ্রর পান-ব্যবসায়ী বড় নাতি কৃষ্ণকান্ত ও তাঁর ভাই শম্ভুকে লোকজন পান্তি বলে ডাকত। প্রথম জীবনে কৃষ্ণকান্ত পান্তি খুব কষ্ট করেন। হঠাৎ করে তাঁর কপাল খুলে যায়। বিপুল সম্পত্তি হয়। মহারাজ শিবচন্দ্র রায় তাঁকে চৌধুরী উপাধি দেন। রানাঘাট গ্রাম নিলামে কিনে নিয়েছিলেন কৃষ্ণপান্তি ও শম্ভুপান্তি।
আজ রসগোল্লা দিবস। আজকের দিনে রসগোল্লার ভৌগোলিক স্বত্ত্ব পেয়েছিল কলকাতা। বাঙালির সেরা আবিষ্কারের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছেন এই পান্তিরা। বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের ১৩১৩ সনের কার্যবিবরণীর ১১১ নম্বর পাতাটি অন্তত তাই বলে। ১৮৪৬-৪৭ সাল নাগাদ নদিয়ার ফুলিয়ার হারাধন ময়রা প্রথম রসগোল্লা তৈরি করেন। হারাধন ময়রা রানাঘাটের জমিদার পালচৌধুরীদের বাড়িতে অর্থাৎ এই পান্তি বাড়িতে মিষ্টি বানাত। সে বাড়ির বাচ্চা মেয়ের কান্না থামানোর জন্যে হারাধন নয়া এক মিষ্টির জন্ম দেন, সেটিই ছিল রসগোল্লা। তবে এই সব মিষ্টিকে ঠিক রসগোল্লা বলা যায় না। আবার কেউ কেউ বলেন পান্তি বাড়িতে মিঠাই বানানতে যাওয়ার সময় হারাধন নিজের কন্যাকে সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিলেন। সেই মেয়ের কান্না থামাতে ফুটন্ত রসে একদলা ছানা ফেলে তৈরি করেন গোলাকৃতি এক মিষ্টি, যা রসগোল্লার আদিপিতা। হারাধন ময়রার সে রসগোল্লা ছিল ডেলা রসগোল্লা, তা নরম নয় শক্ত। যদিও নদিয়ার এই প্রাচীন জনপদে চিনি কল ছিল না।
ডেলা রসগোল্লাকে কৌলীন্য দেয় শান্তিপুর। শান্তিপুরের চিনি ব্যবসায়ী রামকৃষ্ণ ইন্দ্রের ব্যবসা ছিল কলকাতায়, মিষ্টির দোকান ছিল তাঁর। তাঁর সন্তান কালীদাস ব্যবসার হাল ধরেন তাঁর অবর্তমানে। কালীদাসের হাত ধরে শান্তিপুরের রসগোল্লা বাগবাজারে আসে। ১৮৬০ সালে কালীদাসের দোকানে নবীনচন্দ্র দাস কাজ শিখতে গিয়েছিলেন। সেই শিক্ষানবিশ নবীন আজকের আধুনিক রসগোল্লা অর্থাৎ স্পঞ্জ রসগোল্লার জনক নবীনচন্দ্র দাস, কমলকুমার মজুমদারের কথায় ‘নবীনচন্দ্র দাস/ রসগোল্লার কলম্বাস’। তাঁর উত্তরপুরুষেরা রসগোল্লাকে দিলেন ‘পোর্টেবিলিটি’। কৃষ্ণচন্দ্র দাস আর সারদাচরণ দাসের নেতৃত্ব রসগোল্লা জগৎজয় করল।
বাংলার ইতিহাসের সঙ্গে পান্তি বাড়ি নানাভাবে জড়িয়ে আছে। আজ যেখানে বিদ্যাসাগর কলেজের হোস্টেল দাঁড়িয়ে রয়েছে, সেখানে ছিল এক পেল্লায় মাঠ। সেই মাঠে পুতুলনাচের আসর বসত। যাত্রাপালা হত, লাঠিখেলা, শারীরিক কসরত করতে ছেলেপুলেরা আসত। বঙ্গভঙ্গ-স্বদেশী আন্দোলনের সময় এই মাঠে সভা-সমিতিও হত। শিবাজি উৎসব উপলক্ষ্যে স্বদেশি মেলা বসত। এখন সে মাঠ আর খুঁজে পাওয়া যাবে। মাঠটি পান্তির মাঠ নামে পরিচিত ছিল।
মাঠটির মালিক ছিলেন রানাঘাটের জমিদার কৃষ্ণকান্তি পালচৌধুরীরা। পান্তিদের রানাঘাটের বাড়ির রথযাত্রাও খুব বিখ্যাত। এ বাড়িতে জগন্নাথ রথে চড়েন না, নারায়ণের রথ বেরোয় তাঁদের। এখানেই বাংলা অনন্য! বর্ধিষ্ণু বাঙালি পরিবারগুলি রথে কূলদেবতাদের চাপাতে আরম্ভ করেছিলেন, পরবর্তী তা-ই রীতি হয়ে গিয়েছে। ব্যতিক্রমী রথযাত্রার পরিচিতি পায় এই সব পরিবারের রথগুলি। বাংলার খাদ্য ইতিহাসে পান্তিরা অমর হয়ে গিয়েছে, কারণ ১৮৪৬ থেকে ১৮৫৬ সালের মধ্যে এ বাড়ির ভিয়েনেই রসগোল্লার আদিপুরুষের জন্ম হয়েছিল।







