পঞ্চম বর্ষ-প্রথম সংখ্যা – গদ্য
ওলট পথ
তন্ময় রজক
পেটকাটি চাঁদিয়াল মোমবাতি বগ্গা
আকাশে ঘুড়ির ঝাঁক কাটতে কাটতে দিন কাটে বছর কাটে, ইস্কুল থেকে কলেজে যেমন পথ বদলায়, তেমনি পাল্টে যায় শহর। কাঁচাগলি পালা হয় সরকারি বদান্যতায়, কাঁচা মন পাকে বিষণ্ণতায়, বিচ্ছেদে। সরল মনের অভিব্যাক্তি ধরা পড়ে যায় গুনগুন করতে থাকা চলতি হিন্দি গানে, কিশোর থেকে অরিজিত অবধি এই ট্র্যাডিশন সঙ্গে নিয়েই আমরা জেন-জি অথবা মিলেনিয়াল অথবা বুমার। কলকাতা থেকে রেলপথে তিনশ তেইশ কিলোমিটার দূরে আমি জন্মসূত্রে, ইস্কুলে পঠনপাঠন সুত্রে এবং এখন কর্মসূত্রে থাকি। যে পথে ইস্কুল থেকে ফিরেছি ক্রিকেট খেলতে যাওয়ার উদ্যম আর উত্তেজনা নিয়ে, অফিস ফিরতি সেই পথে ধুলোর গায়েও ক্লান্তি দেখি এখন।
বড় অবুঝ
এই মন ক্রমশ চওড়া হতে থাকা রাস্তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সংকীর্ণ হচ্ছে। এ আমার সকালের আক্ষেপ, বিকেলের শোক। ঠিক কোন এক মধ্যরাতে ফুটপাথের মতো সাইকেল-রিক্সার পা বদল হয় ই-রিক্সায়। এ দৃশ্যে শহর মফস্বল এক সূত্রে গাঁথা, চমক বিহীন এই দৃশ্যের অংশ হতে হয়, না চাইতেই; কখনও যাত্রী, কখনও “এক জনে যাবনাআআআআআআ!!!!!!!” চিৎকারে নিরব দর্শক হিসেবে। বাড়ি শব্দের যে অর্থে আমাদের মনে ভিটে কথাটা আসে, এখন তা কমই দেখি। একতলা-দোতলা এবং দেওয়াল ঘেরা ছোট বাগান এই ছবি আঁকতে বসলে আধারের গায়ে কালির ছিঁটে জন্মসাল প্রায় উননব্বইএর ওপারে চলে যায়। রঙিন আবাসনে ব্যালকনি অথবা টেরিস গার্ডেন দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়, অভিমানও হয় খানিক; লিলিপুটের দেশ বুঝি ছেয়ে গেছে মানুষে মানুষে।
বেলা যে যায়
সাঁঝ বেলাতে সপ্তাহে দু দিন ফিজিক্সের টিউশানি, সারা বাজার ঘুরে জীবনানন্দ সরণি, দেশ বন্ধু রোড। পাড়ার উল্টোদিকে ছিল জলা জমি আর শোলার জঙ্গল। মশা আর কাদাজল তবুও নরম, তবুও চালের হাঁড়িতে পাকতে দেওয়া মাদারের মতো মিষ্টি। ন’টার পরে এই চত্বরে ঝিঁঝিদের কন্সার্টে সুর খুঁজেছে যে, তার আর প্রেম হয় নি। এখন সে জলাজমি চোখ বুজেছে। কবরে দেখি বিরাট মল। ঝলমলে আলো, রাস্তায় গাড়ি চলে সারারাত। লোক লস্কর আলো বাতি সব বেড়েছে নখের দ্রুততায়।
ছোট্ট ছোট্ট পায়ে
চলতে চলতে মণি বাইজী লেন থেকে ডানদিকে চক বাজার হরিমন্দিরের রাস্তা, তাতে দু পা এগোলেই আমার প্রিয় ধোসার দোকান। স্বাদ পাল্টে সুস্বাদ হয় নি, পাল্টায় নি পরিবেশ। একচালা প্রতিমার মতো এক ঠেলা, অপার ভক্ত সমাগম। এই পরিবার যেদিন চেন্নাই থেকে আসেন, তারা ভাবেননি এ শহরের অংশ হয়ে উঠবেন। আজ যে রাজা কাল সে ফকির, এই মন্ত্র হয়ত শিখে এসেছিলেন! তাই আজ যিনি রান্না করেন কাল তিনি খাবার পৌঁছে দেন ক্রেতার হাতে, আজ যিনি পেঁয়াজ কাটেন কাল তিনি করবেন রান্না। এই এক রোল বদল দেখছি ছোট থেকে। এদের কোন সিইও নেই, কোন রিলেশনশিপ ম্যানেজার নেই, শেফ নেই সার্ভার নেই। সবাই সব । সবাই কেউ না। কর্তৃত্বের বদলে শ্রমের ছাপ সর্বত্র। টিউশানি থেকে ফেরার হইহই ভুলিয়ে দিত ইস্কুলের মার আর বাবার বকুনি, প্রতি মোড়ে কমে আসত সাইকেলের সংখ্যা। শেষ মেশ কাছাকাছি পাড়ার তিনটে সাইকেল মিলে আমরা থামতাম সেই ধোসার দোকানে একজনের পকেটে সাতটাকা, মশলা ধোসার দামের ছেয়ে তিন কম। দিয়ে দিত বাকিরা বা আরও অবস্থাপন্ন কেউ। এখন গিয়ে দাঁড়ালে তাদের কিচিরমিচির শুনতে পাই। এখন দৈর্ঘ্য ও প্রস্থে ছোট হয়ে যাওয়া ধোসা পঁয়তাল্লিশ।
হারিয়ে যাওয়ার নেই মানা
মনে মনে যে তর্কটা প্রায় রোজ করি, প্রাচুর্যের কাছে কি অভাব বিশ্বাসযোগ্য ! তবে আমি কেন বিশ্বাস করতে পারি না যে রেলগাড়ি দেখে অপু- দুর্গার আনন্দ হতে পারে। রেললাইন ঘেঁষা পাড়ায় পান থেকে চুন খসলেই নির্বিঘ্নে আত্মহননের সরলতম পথ বেছে সবাই ফিরে আসতেন বাড়ি, বসে থাকতেন কেউ কেউ ঠিক “একবার ডাকলেই খাব”। আবার কত জন হেসে বাজার করতে বেরিয়ে আর লাইনের এপারে পারে নি ফিরতে। ব্রেকিং এর কিচকিচ অথবা ট্রেনের “যাবি – তো -চল “ শব্দে কখনও ঘুম ভাঙ্গেনি আমার। যতবার ভেঙেছে, ততবারই পড়শিদের চিৎকার ,পরিচিত একটা নাম আর বাক্যের শেষে “গেল মনে হয়।“
বাসস্টপে একা
আলোর পথিক অন্ধকারের নিকশ কালো ঘেরাটোপে বন্দি সাদা পায়রার খোঁজ রাখে, এত অলিগলি আর জাতীয় সড়কের সংযোগস্থলে হাঁটতে হাঁটতে আমারই কি কিছু পাল্টায়নি! জামাকাপড়ের মাপ আর কোমরের পরিধি ছাড়া আর কিছুই কি ছাপ ফেলেনি আমার ওপর ? পাশের বাড়ির ফোন নম্বর থেকে এক টাকার কয়েন বুথ হয়ে এই যে কেতা দুরস্ত স্মার্টফোন হাতে মুহূর্তে মিটিয়ে নিচ্ছি জিজ্ঞাসা থেকে যোগাযোগের প্রয়োজন , এর ফাঁকে কখনও কি খুঁজে দেখিনি ভাঙা দেওয়ালের গায়ে ছোট্ট ফার্ন ! অবসাদ আর অবকাশ মিলে জীবন ছড়িয়ে রাখে মার্বেল গুটি। বিছিয়ে রাখে শিমুল, পলাশ আর মহুল ফুল। এ নেশা রঙের, এ নেশা বাঁচার, এ নেশা নিরিবিলির দিকে নিঃশব্দে তাকিয়ে থাকার। নিস্তব্ধতা, যার কাছে গোপনেরগোপনীয়তা খুলে সাজিয়ে দেওয়া যায় হৃদকমল।

