পঞ্চম বর্ষ – প্রথম সংখ্যা – গল্প
দৌড়
সুপর্ণা ভট্টাচার্য
রিমির আজকাল ক্লান্ত লাগে। টিভিটা চলেই যাচ্ছে। আওয়াজটা মাথার মধ্যে হাতুড়ি মারে। বিনয় বুঝতে চায় না। সন্ধ্যা থেকে বিভিন্ন খবরের চ্যানেল ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে আলোচনা শোনে। আলোচনার নামে আসলে কাদা ছোঁড়াছুঁড়ির প্রতিযোগিতা।চীৎকারের রিলে রেস। বেশিক্ষণ একটানা আওয়াজ নিতে পারেনা রিমি। নিজস্ব ঘরটুকুতেও একদম একা হতে পারেনা। আরো ঘর আছে তাদের। রিমি উঠে চলে যেতেই পারে। কিন্তু জেদ করে যায় না। জোর করে মনটা অন্য দিকে ঘুরিয়ে রাখতে চায়। শোওয়ার ঘরে টিভি রাখাই ঠিক হয় নি। বিনয় বই পড়ে না। রিমির বই পড়ার প্রবল নেশা। বইয়ের সুন্দর প্রচ্ছদ কেমন যেন টানে তাকে। নতুন বই হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ চুপ করে তাকিয়ে থাকে। তারপর পড়তে শুরু করে।সন্ধ্যাতেই তার পড়ার অবসর। টিভি বন্ধ থাকলে মাঝেমধ্যে বর্তমান রাজনীতি নিয়ে টুকটাক কথা বলে বিনয়ের সঙ্গে। কিন্তু দুজনেই জানে,এসব আলোচনার এখন কোনো অর্থ নেই। রিমি ভিতর থেকে তীব্র ভাবে অনুভব করে,এভাবে আর চলবে না। কিছুতেই না। সব ভেঙে পড়বে। বিনয় কেন যে তবু,শুনতেই থাকে,শুনতেই থাকে,,
আজ ডিবেট হচ্ছিল একটি চ্যানেলে। তিলোত্তমা মজুমদার আজকাল এসব বিতর্কে অংশগ্রহণ করেন। তিলোত্তমাকে দেখলেই রিমির রাজপাট আর বসুধারা উপন্যাস দুটি মনে পড়ে। কী যে ভালো লেগেছিল!
হঠাৎ ঝুম অন্ধকার। লোডশেডিং! না কী কেবল ফল্ট?এখনও তেমন গরম পড়ে নি। ঠাণ্ডা আমেজ আছে। কিন্তু মশার উপদ্রব তো আছে। সব জানলায় নেট লাগানো,তবু পিনপিন করে মশার আওয়াজ।
রিমি হাউসকোটটা চাপিয়ে বিনয়কে বলে,’রাস্তায় হেঁটে আসি’
‘এই ঘুটঘুটে অন্ধকারে?’
‘সঙ্গে চলো তাহলে’
‘রক্ষে করো’
‘তাহলে বসে থাকো। একবার বরং সিএসসি কে ফোন করে জানো,লোডশেডিং কী না’
‘কেউ না কেউ তো ফোন করবে ‘
‘ তোমরা অন্য কারুর আশাতেই বসে থাক ‘
‘ তাহলে তুমিই করো ।যে কোন ইলেকট্রিক বিল নাও,ওপরের কনসিউমার নম্বরে ফোন করো ‘
রিমি এমার্জেন্সি আলোটা নিয়ে ফ্রিজের মাথা থেকে বিল নেয়।কারেন্ট বিল গুলো এখানেই থাকে ।
ফোন করে যান্ত্রিক গলা শোনার পর নিজেদের পাড়ার নম্বরটা ডকেট করে ।স্লিপারটা গলিয়ে রাস্তায় নামে।কেমন ভুতুড়ে লাগছে পাড়াটা।জানলাগুলো খোলা বলে মৃদু আলো আসছে রাস্তার ওপর।
হঠাৎ একটি হিলহিলে শরীরকে সামনে থেকে ছুটে আসতে দেখে ।সরে যেতে গিয়েও পারেনা।সরাসরি ধাক্কা লেগে হাত থেকে ফোনটা ছিটকে পড়ে।বুকের মধ্যে সজোরে আঘাত লাগে।মুখ থেকে ‘ আহ ‘ শব্দ আপনা থেকে ছিটকে বের হয়।
স্থির হয়ে যায় ছুটে আসা শরীরটা।জিন্স আর টি শার্ট পরা একটি মেয়ে।পাশের বাড়ির পাঁচিল ধরে দাঁড়িয়ে মেয়েটি হাঁপাতে থাকে। মুখটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছেনা। এখানটাতে শুধু আলোর আভাস।
‘ এরকম ছুটছ কেন! অন্ধকারে?আমি তো আর একটু হলেই মুখ থুবড়ে পড়ে যেতাম!তুমিও তো পড়ে যেতে পারতে ।’
‘ বাড়ি থেকে পালাচ্ছি।’
‘ মানে? কোন বাড়িটা তোমাদের?আই মিন,তোমার বাবার নাম কি? পালাচ্ছ কেন? ‘
মেয়েটি উত্তর না দিয়ে আবার ঘুরে দৌড়তে শুরু করে ।
রিমি খানিক হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে ফোনটা তোলে।ঝুপ করে আলো এসে যায় ।রাস্তার আলোয় দেখে ফোনের স্ক্রিন গার্ডটা চিড় খেয়েছে।মাথায় চিন্তা নিয়ে বাড়ির দিকে ফিরতে থাক,শ্লথ পায়ে।একটু বুকে চাপ লাগছে।দরজাটাও দেয়নি বিনয়!আশ্চর্য লোক! এতো নির্বিকার হয় কী করে মানুষ! যথারীতি জোরে টিভি চলছে ।
‘ তুমি ডকেট করলে বলে কি তাড়াতাড়ি এলো?’
‘ চা খাবে কি?’ রিমি খুব ক্লান্ত স্বরে জিজ্ঞাসা করে ।
বিনয় টিভি থেকে চোখ না সরিয়ে বলে,’ দাও ‘
রিমির চোখে সারারাত মেয়েটির অন্ধকার জড়িয়ে থাকা আবছা মুখটা মনে পড়েছে ।বয়েস তো ষোল,সতেরোর বেশি মনে হল না।কার বাড়ির মেয়ে? বাড়ি থেকে চলে যেতে এভাবে দৌড়ে পালাতে হচ্ছে কেন? ভোরবেলা ঘুমিয়ে পড়েছিল।তীব্র কলিংবেলের আওয়াজে ঘুম ভাঙল।রুম্পা এলো।আটটা বেজে গেল!
বিনয় কখনও নটার আগে ওঠেনা ।এতক্ষণে রিমির চা খাওয়া হয়ে যায় ।
দরজা খুলতেই প্রায় যেন ঝাঁপিয়ে ঢুকল।রুম্পার ফর্সা মুখটা লাল হয়ে তপতপ করছে ।
‘ কি হল রে?’
‘ ও,বৌদি,পাপিয়া বৌদিদের পাশে যে তমাল বাবু থাকে না,কে যেন মাথার পিছনে মেরে মাথা ফাটিয়ে দিয়েছে ‘
‘ মানে? কোথায়?রাস্তায়? বেঁচে আছেন তো?’
‘ না,না বাড়িতে ।কাল থেকেই মনে হয় পড়ে ছিল গো বাইরের ঘরে। দরজা বাইরে থেক টেনে দেওয়া ছিল শুধু।আজ দুধ দিতে আসে যে ছেলেটা,সে প্রথম দেখেছে। আমি তখন পাপিয়া বৌদির বাড়ি বাসন মাজছি’
‘ কী সাংঘাতিক,কারা করল এরকম রে,আমাদের পাড়া তো বরাবর শান্ত ‘
‘ তমালবাবুর বউ আগের বছর মারা গেছে,মনে নেই?বলেছিলাম তো তোমাকে।কি যে খারাপ লোকটা, জানোই তো।কি খারাপ চোখে তাকায় কী বলব তোমাকে,ঘেন্না করে ।পাপিয়া বৌদি তো সবসময় এড়িয়ে চলে।আমাকেও বলে দিয়েছে,রুম্পা,একেবারেই কথা বলিস না লোকটার সঙ্গে।লোকটার কোন বাছ বিচার নেই রে,সব বয়সের মেয়েকে এক নজরে দেখে ‘
‘ বেঁচে আছেন তো?’
‘ হ্যাঁ,হ্যাঁ,সবাই অ্যাম্বুলেন্স ডাকল,হাসপাতালে নিয়ে গেছে ,ভাই,টাই কারা সব এসেওছে।থানাতে খবর দিয়েছে মনে হয় ‘
‘ ঠিক আছে,চা বসা ।মাথা ধরে আছে ‘
হঠাৎ চকিতে কী মনে হতে রিমি ধীর গলায় বলল,’ ‘তমাল বাবুর মেয়ে আছে না ? সে কোথায় ছিল’
‘ হ্যাঁ,ঝিনুক।,বৌদি,ঝিনুক বাড়িতে নেই,ঝিনুকের ফোন বাড়িতে ,কেউ বলতেই পারছে না,ঝিনুককে কে লাস্ট দেখেছে । কতটুকু মেয়ে,কোথায় গেল বলত?’
রিমির পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যাচ্ছে।কোনরকমে বলে,’ চা করে,বারান্দায় দে ।আমি মুখ ধুয়ে আসি ‘
বারান্দায় রোদ ঝলমল করছে ।টবে গন্ধরাজ ফুটেছে অজস্র ।
রিমি পরম আদরে গন্ধরাজের পাপড়িতে হাত বুলিয়ে প্রাণপণে ঝিনুকের মুখ মনে করার চেষ্টা করে । পারে না। চোখে শুধু দৌড়ে চলে যাওয়া একটা শরীর ভেসে থাকে,,,

