পঞ্চম বর্ষ – প্রথম সংখ্যা – ভ্রমণ
অচেনা থর
ভাস্বতী গোস্বামী
তখন যেতেছে অস্তে মলিন তপন
আকাশ সোনার বর্ণ
সমুদ্র গলিত স্বর্ণ
পশ্চিম দিগ্বধূ দেখে সোনার স্বপন
সত্যিই গলা সোনার এক ভূমণ্ডলে ঢুকে পড়ছি। তার ছিটে লেগে হাত, মুখ, চুল এমনকি পোশাকও অরুণ-রাঙা। ৩৬০ ডিগ্রি খোলা বিরান বালির রাজ্য। রেগিস্তান বলে একে।মাঝেমাঝে তাতে শুক্ল একাদশীর চাঁদের মতো বালিয়াড়ি।এখন লাল রঙে ডুবে যাচ্ছে সে-ও। আমাদের গাড়ি ছাড়া পথে আর কোন যান চলাচল নেই। জয়সলমের ছাড়ার পর থেকেই কমতে কমতে এখানে শূন্যতে ঠেকেছে। পা ডুবে যায় বালিতে। দূরে দূরে উটের পিঠে স্থানীয় মানুষ। ইয়া পাগড়ি, ইয়া গোঁফে সুগঠিত দীর্ঘদেহী—মুখে অনাবিল হাসি। ঘাঘরা-চোলি আর ওড়নিতে মুখ ঢাকা জেনানা। কী-ই বা অলংকারের নকশা আর পোশাকের বাহার তাদের। ধীরে ধীরে সন্ধ্যার ছায়া ঢেকে দিচ্ছে সেই গাঢ় লাল-কমলার ভূমণ্ডলকে। ছবি মিলিয়ে যাচ্ছে আর রাত নামছে রহস্যময় থরের বুকে। ভারতের এই পশ্চিম-প্রান্তে রাত দেরীতে আসে কিন্তু দ্রুত এগিয়ে যায়। টের পাচ্ছি পায়ের তলায় ঠাণ্ডা হয়ে আসছে বালি। সময়টা ডিসেম্বরের শেষ। কাজেই তীক্ষ্ণ মরুশীতের রাত কাটাতে আপাতত একটা আশ্রয় চাই। গাড়ি এসে থামলো নিঃসীম মরুরাজ্যে। সূর্যাস্ত হয়েছে ঘণ্টাখানেক হবে। কিন্তু দুরন্ত হাওয়া আর হাড়কাঁপানো ঠাণ্ডায় একটু উষ্ণতার জন্য ব্যাকুল হয়ে আছে মন। যেখানে থামলাম, সেখানে চরাচর জুড়ে তাঁবু ঘেরা ডেসার্ট রিসর্ট। আধুনিক এল-ই-ডি লাইট আর লেজারের এক মায়ারাজ্য। এ হলো থরের বুকে অত্যাধুনিক বিনোদনের ডেসার্ট সাফারি অঞ্চল। বিখ্যাত ‘স্যাম স্যাণ্ডডিউন’ বা বালিয়াড়ি ঘিরে অস্থায়ী ট্যুরিস্ট ডেস্টিনেশন । গ্রীষ্মকালে বন্ধ থাকে। অস্থায়ী হলেও সু-বন্দোবস্ত সেখানে। প্রতিটি রিসর্টেই সুবিশাল অঞ্চল নিয়ে সারি সারি বিলাসবহুল তাঁবু, হিটার ও এসি। রয়েছে আধুনিক ডাইনিং এরিয়া। উন্মুক্ত গোলাকৃতি সুবিশাল মঞ্চ ঘিরে অত্যাধুনিক লাইট ও সাউণ্ড সিস্টেম। মঞ্চ ঘিরে জমিতে মোটা ফরাস-তাকিয়া আর গ্যালারির চেয়ারে বসার ব্যবস্থা। মঞ্চে, রাজস্থানের লোকশিল্পীরা। তাঁদের ঝলমলে পোশাক। আমরাও শামিল হলাম এই আসরে।
তান ধরেছে শানাই মিঠাস সুরে
সারেঙ্গিটা বাজছে দ্রুত তালে —
মঞ্চের জলসায় তখন সুরের আকুল নিবেদন, ‘মনড্ রে রি বাৎ কর লিয়া, পিয়া আও তো/ ও জী আও তো—‘ আর আমি যেন শুনলাম, ‘কুঞ্জ কুঞ্জ ফেরনু সখি, শ্যামচন্দ্র নাহি রে…’ ওলো ললিতে, এ মরুদেশে কে গায় এমন করে? মরুবাসিনী হে, তোমার সুরের মরমিয়া, চোখ ভাসালো শ্যাম বাংলার। রাত বাড়ছে। পা-য়ে পা-য়ে ঘাঘরা উড়ছে নাচের তালে। অলঙ্কারের দ্যুতিতে ঝলসে উঠছে নাচের আসর। মাঝরাত পেরিয়ে নৃত্যশিল্পী যখন আগুনের থালা হাতে, পা মেলাচ্ছেন দ্রুত তালে, তখন দর্শকাসন শূন্য করে প্রায় সকলেই নৃত্যে মশগুল বা সুরে ভাসছেন—
‘ঢোলাওয়ালে ঠাট ঘুমর, ঘুমে রে
ঘুমর-ঘুমর, ঘুমর-ঘুম্র, ঘুমে রে
আও জী ঘুমর্দি খেলবা নি…’
ওপরে ঝকঝকে আকাশ আর এদিকে দুরন্ত শীত কামড় বসাচ্ছে শরীরে।
নৈশাহারের ডাক এলো। খাবারের গন্ধে ভরে আছে ডাইনিং-হলের চারপাশ। রাজস্থানী নিরামিষ ব্যুফে। এই প্রদেশে অধিকাংশ মানুষই শাকাহারী। প্লেটে তুলে নিলাম গরম গরম ডাল-বাটি-চুরমা। উৎকৃষ্ট দেশী ঘিয়ের মিঠি খুশবুতে ভুরভুর করছে। সঙ্গে সামান্য কড়ি-চাওল। ততোক্ষণে আমার পোশাক-আশাক ও ভাষায় পরদেশী ছাপটুকু ধরে ফেলেছেন ভূমিপুত্ররা। তো, মেহমান নিয়ে এবার শুরু হলো তাঁদের খাতিরদারি। স্থানীয় ফল শুকিয়ে শীতকালীন ডেলিকেসি, কের-সাংগরী নিয়ে এলেন এক রাজস্থানী ভাইয়া।। পরম স্নেহে এগিয়ে দিয়ে অনুরোধ করলেন, একটু অন্তত মুখে দাও। আর, মেহমান কি কলকাত্তাওয়ালি না-কি? তাহলে তাঁদের মিঠাইয়ের প্রকৃত কদর তো আমরাই করবো, তাই না? ভারতবর্ষের যে প্রান্তেই যাই না কেন, বাঙালীর মিষ্টিপ্রীতি সর্বজনবিদিত। তো এবার বাংলার ননদ-নন্দোইকে খাতির করতে থালা ভরে ভাবীরা নিয়ে এলেন সুস্বাদু দুধিয়া-খীঁচ, চুরমা-লাড্ডূ, দিলখুশার আর বালুশাহী। স্থানীয় মানুষের হৃদয়ের উষ্ণতায় এলাহী নৈশভোজ সারা হলো।
ডাইনিং থেকে বেরিয়ে দেখলাম একটি একটি করে আলো নিভে গ্যাছে কখন। আজ অ্যাতো তারা আকাশে? রিসর্ট থেকে বেরিয়ে এক অতন্দ্র বালিয়াড়ির দিকে পা বাড়ালাম। তার ঢেউ চারদিক থেকে যেন ঘিরে রেখেছে আমাদের। অন্ধকারে, কাছে-দূরে খসখস আওয়াজ। স্পষ্ট দেখছি চোখ জ্বলছে। বন্য উটের দল মানুষহীন এই প্রান্তরে হেঁটে বেড়াচ্ছে। দিনের সাতাশ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তখন দু’ ডিগ্রিতে নেমেছে। কাঁপিয়ে দিচ্ছে হাওয়া। এবার রিসর্টের তাঁবু, হিটার আর উষ্ণ কম্বলের ডাক উপেক্ষা করা যাচ্ছে না।
পরদিন সকাল সাতটায় তাঁবু ছেড়ে বেরোলাম। সারারাত দুরন্ত হাওয়ার সঙ্গে যুদ্ধ করেছে তাঁবু। পশ্চিম দিগন্ত এখনো গভীর ঘুমে। সার-সার ঘুমিয়ে আছে তাঁবুগুলোও—শীতে ,শিশিরে,আলো-আঁধারিতে। অপেক্ষমান গাড়িতে এবার আমাদের গন্তব্য স্যামের বুকে।
তিনভাবে স্যামকে পরিদর্শন করা যায়। জীপ, উট এবং হেলিকপ্টার জয়-রাইডে। অ্যাতো সকালে ট্যুরিস্টরা তখনো ঘুমের বিছানায়।উট আর জীপ নিয়ে চালকরা কম্বলমুড়ে আংগিঠীর আশেপাশে আগুন সেঁকছেন। আমরা যথাসম্ভব কয়েক লেয়ার গরম পোশাকে আবৃত হয়ে আছি। তবু কমবখত নাকের ডগাটুকুকে বাগে আনা যায় নি। ফুলে লাল হয়ে যাচ্ছে ঠাণ্ডায়। হেলিকপ্টার উড়ান তখনও শুরু হয় নি। জীপ আর উট নিয়েই আমাদের মরু-অভিযান শুরু হলো।
উটের পিঠে মরুভূমি বিচরণ এক আলাদা অভিজ্ঞতা। সুদূর বিস্তৃত বালিয়াড়ির গা-য়ে সোনার সূর্য গড়িয়ে পড়ছে। অন্ধকার ভ্যানিশ। কোথাও কোন সবুজ-নীল-খয়েরির চিহ্ন নেই। জীপে আবার অন্যরকম। হু হু করে বালির ঢেউ ভাঙো। অবিরাম চড়াই-উৎরাই। এ অনন্ত মরুর যেন সীমানা নেই। আর, ডাইনে-বাঁয়ে–সামনে-পিছনে-পায়ের নীচে শুধু স্বর্ণাভ রেতের থর। সৃষ্টির নিঃসীমে ডুবতে থাকি ধীরে ধীরে।
জয়সলমের থেকে স্যামের পথে আসতে আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইণ্ডিয়ার একটি বোর্ড চোখে পড়েছিল যে, বাঁদিকে বাঁক নিলেই কুলধারার পথ। আনুমানিক ২০০ বছর আগে এই বর্ধিষ্ণু অঞ্চল না-কি রাতারাতি জনশূন্য হয়ে গ্যাছিল। তখনই স্থির করি, সেই ভগ্নাবশেষের অবশিষ্ট কুলধারা গ্রামটি ছুঁয়ে আসবো। ত্রয়োদশ শতকে জয়সলমের থেকে ১৮ কিলোমটার দক্ষিণ-পশ্চিমে গড়ে উঠেছিল পালিওয়াল ব্রাহ্মণদের এক বর্ধিষ্ণু অঞ্চল। যোধপুরের কাছে ‘পালি’ জনপদ থেকে আসা এই ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়ের বুদ্ধি এবং কর্মকুশলতায় মুগ্ধ হয়ে জয়সলমেরের মহারাওয়াল, সানন্দে এখানে পালিওয়ালদের নিষ্কর বসতি স্থাপনে অনুমতি দিয়েছিলেন।ক্রমে, বিচক্ষণ পণ্ডিত কড়হনের নেতৃত্বে এখানে এক সমৃদ্ধশালী পালিওয়াল জনপদ গড়ে ওঠে। এঁরা কৃষি ও বণিজ্যে তুখোড় ছিলেন। থরের কোলে প্রকৃতির সামান্য জলসম্পদ সংরক্ষণ করে এঁরা গম আর বাজরার চাষ করতেন। গুজরাটের মাণ্ডবী থেকে বাণিজ্যের পশরা সাজিয়ে স্থলপথে পারস্য, আরব এবং পশ্চিম এশিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল তাঁদের বাণিজ্যিক এলাকাটি। ৮৪টি গ্রামে পাঁচহাজার মানুষের বসতি ছিল। আজ একমাত্র কুলধারা দাঁড়িয়ে আছে ছয় শতাধিক বাড়ির জীর্ণ কঙ্কাল, অশ্রু,বিষাদ আর অভিশাপের ছায়া নিয়ে।উত্তর থেকে দক্ষিণে বিস্তৃত কুলধারা গ্রামটি। গ্রামের দক্ষিণ অংশে যেন শহরাঞ্চলের ছোঁওয়া। কুলধারার প্রাণকেন্দ্র মন্দির।৮৪টি গ্রামের একটিই মন্দির ছিল।
সে অনেকদিন আগের কাহানি। সেদিন গোটা গ্রামটিই সুসজ্জিত। প্রশস্ত পথের দুপাশে নিশান উড়ছে। রঙিন কাগজ আর কাপড়ের শিকলি ঝোলানো হয়েছে পথের দুপাশের গৃহগুলি থেকে। অন্যান্য গ্রাম থেকে অবিরাম মানুষের আসা-যাওয়া চলছে। সেদিন শ্রাবণের শুক্ল একাদশী তিথি, সাল ১৮২৫। মন্দির চাতালের কাছেই গ্রাম প্রধান নাথমল পালিওয়ালের দ্বিতল ভবন। নাথমলজী এই অঞ্চলে একজন শ্রদ্ধেয় মানুষ। আজ তাঁর হাতেই ঝুলন উৎসবের শুরুয়াত হতে চলেছে। তাঁর হাতেই টান পড়বে রাধে ও কানহাইয়ার ফুল-ঝুলনার। মন্দির দ্বারে তাঁকে রেখে আমরা একবার তাঁর হাভেলির ছাদের দিকে দৃষ্টিপাত করি। বিকেলের রাঙারোদে ছাদে এসেছে মিরগী। তার হাতে, রোদে শুকোনো জোয়ারের বীজ কিন্তু খর দৃষ্টি পথের ওপর। ভানমতী, ভাগ্যশ্রী, অম্বারা অন্য গাঁও থেকে এসে পড়লো বলে! তারপর তাদের প্রাণ খুলে ঝুলনখেলা চলবে আজ। ‘মিরগী… মিরগী… মিরগীইইই…’— মাই ডাকছে। সিঁড়ি দিয়ে দুড়দাড় ছুট নীচে। চুল বাঁধতে হবে, কাজল পরতে হবে, আর নতুন নকশার নীলি ওড়নি ঘুরিয়ে সাজবে মৃগনয়নী। নাথমল প্রধানের, বিটিয়া-রানি যে দশ-বিশটা গাঁয়ের লোকের নয়নমণি।
গাঢ় সন্ধে ভিজিয়ে দিল কুলধারার পথঘাট। লাল-হলুদ-সবুজ ঘাঘরায় উড়ছে গৌরী-অম্বা-ভাগ্যশ্রীরা। ওদিকে রঙ-বেরঙের পাগড়িতে, পথের ভিড় সামলাচ্ছে ভরত-ভূদেব-বিরজু-ঘনশ্যামরা। তারই মধ্যে মৃগনয়নী-ভরতের কি একবার ঝটিতি চোখাচোখি হলো? মুচকি হাসি আর গালের লালিমা, শুধুই সূরয কী অন্তিম কিরণ না-কি? তবে আমরা বরং চোখ ঘুরিয়ে নিই পথসজ্জায়। আমরা বরং আকাশে চোখ মেলে খুঁজি শুক্ল একাদশীর নিদ্রাহারা শশীকে। এমন সময়ে চতুর্দিক কাঁপিয়ে বেজে উঠলো গগনভেদী ভেরি। সচকিত হয়ে পথের মানুষ দেখলেন সারি সারি উট, শিবিকা নিয়ে কুলধারার মন্দির চাতালে এসে দাঁড়ালেন জয়সলমের মহারাওয়ালের দিওয়ান সালিম সিং। চওড়া কাঁধ আর ছাতির এক দীর্ঘদেহী সুপুরুষ। পুরনারীরা তাঁকে বরণ করে নিলেন পুষ্পে, মাল্যে, তিলকে। গ্রামপ্রধান নাথমলজী তাঁকে খাতির করে নিয়ে গেলেন মন্দির অভ্যন্তরে। অনেক উপঢৌকন নিয়ে সালিম সিং ফিরেও গেলেন জয়সলমের। কুলধারা আবার ঝুলনে মাতলো ক’দিন। বাঁশি, শানাই, রাবণহাট্টা বেজে উঠলো সুরে। কাঁকনি নদীর পাড়ে,কুয়োর ধারে সকাল-বিকেল জল আনতেও গেল মেয়েরা।
কোথাও কোন মেঘ জমে নি তবুও কী এক অশুভ সংকেত, বালির ঝড়ের মতো আছড়ে পড়লো কুলধারার বুকে। কুলধারা শুধু নয়, মুখ কঠিন হয়ে আসছে প্রভা, ওলা, ভাওয়া, খাবা ইত্যাদি গ্রাম প্রধানদেরও। ঝুলন উৎসব যেন ম্লান এখন। অঙ্গারচোখ গ্রামের নবীন যুবাপুরুষদেরও। গ্রামপ্রধান নাথমল উদভ্রান্ত। ঝুলন উৎসব থেকে ফিরে গিয়ে সালিম সিং দূত পাঠিয়েছে কুলধারায়। মৃগনয়নীর ওপর তার চোখ পড়েছে। সালিম সিং সুপুরুষ, বীর কিন্তু সে আদ্যন্ত লোভী আর দুশ্চরিত্র। স্তব্ধ হয়ে গ্যাছে পালিওয়াল সমাজ। এ হতে পারে না— হতে দেওয়া যায় না। মন্দির চাতালে গোপন সভা বসলো। মাতব্বরেরা একমত হলেন। পালিওয়াল ব্রাহ্মণদের জাত্যাভিমান তীব্র।এ সমাজের বুনিয়াদ ঐক্য। কাজেই আর দ্বিমত নেই। পরদিন সালিম সিংয়ের কাছে কুলধারায় আসার আমন্ত্রণ লিপি পাঠালেন তাঁরা। আর সেই শ্রাবণী পূর্ণিমার রাতেই সঙ্ঘবদ্ধ হয়ে পথে নামলেন ৮৪টি গ্রামের মানুষ। সেই ত্রয়োদশ শতকে কড়হনের নেতৃত্বে যে সমৃদ্ধ জনপদ গড়েছিলেন তাঁরা, আজ আত্মসম্মানরক্ষার্থে তিলে তিলে গড়া সেই ভূমিখণ্ড ছেড়ে আবার নিরুদ্দেশের যাত্রায় পা বাড়ালেন। চলে গেলেন কোন অজানা পথের দিশায়।
ওপরে পূর্ণিমার চাঁদ। আকাশে মেঘের আসা-যাওয়া। সেই আলো-আঁধারিতে যেন মিশে গেল পাঁচহাজার মানুষ। জনপদের বাইরে বিরান প্রান্তরে এস দাঁড়ালেন নাথমল। মাথায় মন্দিরের বিগ্রহ। ওই তো মন্দির, ওই যে শীর্ণ কাঁকনি নদী বয়ে যায়, পাশে সমাধিক্ষেত্র। আকাশের দিকে হাত তুলে নীরব প্রার্থনা করলেন তাঁরা। হা ঈশ্বর, কুলধারা তলিয়ে যাক সময়ের অন্ধকারে। সেখানে যেন কোনদিন আর প্রদীপ না জ্বলে, গৃহস্থ আঙিনার সমস্ত তুলসীর চারা যেন শুকিয়ে যায় চিরকালের মতো।
এই বিস্ময়কর ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে প্রত্নতাত্ত্বিকদের বিভিন্ন মতামত পাওয়া যায়। কখনো জলের অভাব, কখনো ক্রুর সালিম সিংয়ের অমানবিক অত্যাচার ও রাজস্ব ব্যবস্থাকে দায়ী করেছেন গবেষকরা। আজও রাতে জনহীন পড়ে থাকে কুলধারা। কান পাতলে শোনা যায় কিশোরীর কান্না, মন্দিরের ক্ষীণ শঙ্খধ্বনি, মানুষের ফিসফাস।
অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিলাম। পা-য়ে হেঁটে চলে এসেছি অনেকটা। এখানে প্রায় ছ’শো বাড়ির খণ্ডহর পাওয়া গ্যাছে। সন্ধে নামছে। এবার ফিরতে হবে। আমার চুন্নিতে যেন টান পড়লো। কারা গান গাইছে? ওদিকেই কাঁকনির খাঁড়ি ছিল বুঝি? গানের কথাও যেন স্পষ্ট হচ্ছে ধীরে ধীরে,
‘কেসরিয়া বালম্ আও নি
পধারো মহারে দেশ…’
হঠাৎ কর্পূরের মতো মিলিয়ে যায় অশরীরি গায়ক গায়িকারা। আমরা জয়সলমেরের পথ ধরি।







