‘আমার পুজো’
একেবারে ছোটবেলার কথা খুব একটা মনে নেই। পুজোর গন্ধ ঠিক কবে থেকে পেতে শুরু করলাম সেটা বলাও মুশকিল। তবে পুজো আসছে চিনতে শুরু করেছিলাম শিউলি ফুলের গন্ধ দিয়ে।
বাজে শিবপুরে আমাদের বাড়ির পাশেই ক্লাবের মাঠ। সেখানে একটা শিউলি ফুলের গাছ ছিল। বর্ষার পর হঠাৎ মনে হত বদলে যাচ্ছে হাওয়ার গন্ধ। বুঝতাম শরৎ এসেছে।
বছরের এই সময়টা ঘুম থেকে ডাকত হত না, ফুলের গন্ধে এমনি উঠে পড়তাম। ঘুম চোখে ফুল কুড়তে যেতাম। হাতের পাতায় শিউলি ফুলের বাসন্তী রঙ মেখে, ফুল নিয়ে বাড়ি ফিরতাম।
আমার পুজোটা বাড়ির পাশে ‘ফ্রেন্ডস ক্লাব’- এ কেটে যেত।ওটাই ছিল আমার কাছে ‘আমার পুজো’। বড়মা পুজোর জোগাড় করত, আমি সঙ্গে থাকতাম। খুব একটা কিছু করতে পারতাম না, চুপ করে বসে থাকতাম, দেখতাম সেটাই ছিল আনন্দ। মাঝে মাঝে অবশ্য ঠাকুরের নৈবেদ্য, ফল সাজানোর ‘চান্স’ পেতাম। নারকেল আর গুড় দিয়ে নাড়ু তৈরি হত, সেগুলো পাকাতাম। বাচ্চা মানুষ যতটুকু পারে আর কি!
ভোগ রান্না হত ঠাকুরের, সেখানে সামনে যাওয়া মানা। দূর থেকেই দেখতাম আর ভাবতাম ‘কখন যে পাব!’ একেবারে অন্যরকম একটা অনুভূতি!
ক্যাপ ফাটাতাম খুব। নতুন জামা হোক, না হোক ক্যাপ ফাটানো বন্দুকটা চাই-ই-চাই। বন্দুকটা প্রতিবছর নতুন চাই। রিল ক্যাপ, টিপ ক্যাপ সেসব নিয়ে কম্পিটিশন চলত। কার কত ক্যাপ জমেছে। পুজোয় পাওয়া টাকা বাঁচিয়ে রাখতাম তার জন্য।
শেষের দিনে যখন ফুরিয়ে আসত তখন হাজার বায়না করলেও আর মিলত না। তাই বাঁচিয়ে রাখতে হত দশমী পর্যন্ত। ফটাফট করে ফাটানো যেত না।
ঠাকুর দেখা, বেলুন কেনা, লাল-নীল রঙের প্ল্যাস্টিকের সানগ্লাস, ঘড়ি কিনতাম। খুব ডিজাইনার জামার বাহার ছিল না। কিন্তু হেয়ারব্যান্ড, কানের দুল, নতুন জুতো সেসবের মজাই আলাদা।
পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে ঠাকুর দেখতাম। ‘কলকাতায়’ ঠাকুর দেখতে যাওয়াটা খুব স্পেশাল। বাবা নিয়ে যেত। পুরনো পুজো দেখতাম। বড়দের সঙ্গে ‘হোলনাইট ঠাকুর দেখা’ তো বিশাল ব্যাপার!
একটু বড় হতে পাড়ার বিজয়া সম্মেলনীতে কালচারাল প্রোগ্রামে হত। তার রিহার্শাল চলত পুজোর চারদিন। সেটাও একটা আলাদা মজা। হইহই ব্যাপার।
এখন তো সব অন্যরকম। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে পুজঅর অভিজ্ঞতাগুলো বদলে গিয়েছে। থিম পুজো, সাবেকি পুজো সবটাই ভালো লাগে। শুধু প্রতিযোগিতা আর জৌলুসের বাড়াবাড়িতে মনে হয় পুজোর স্নিগ্ধতাটা কোথাও যেন টাল খেয়ে যায়।
পুজোর এই ছোট-ছোট আনন্দগুলো হারিয়ে গিয়েছে এখনকার প্রজন্মের মধ্যে থেকে। সেই জিনিসটা আর দেখতে পাই না কোনও পুজোর প্যান্ডেলে।
তবে এখনও ঠাকুর দেখি ঘুরে ঘুরে। নতুন জামা পরে। মেয়েকে নিয়ে। উত্তর থেকে দক্ষিণ। ভাই-বোনরা থাকে। এটাই পুজোর আনন্দ। পুরনো হওয়ার নয়।
দেবলীনা মুখোপাধ্যায়, শিবপুর, হাওড়া / অধ্যাপিকা, লালবাবা কলেজ
অনুলিখন: রোয়াক ডেস্ক
রোয়াক- এর ‘ঘরোয়া’ তে আপনারাও আপনাদের অভিজ্ঞতার কথা লিখে পাঠান। লেখা পাঠাবেন রোয়াক এর ইমেলে। যে কোনও ভাষায় আপনি আপনার অভিজ্ঞতা লিখে পাঠাতে পারেন। সঙ্গে অবশ্যই নিজের একটি ছবি, এবং আপনার নিজের নাম এবং বর্তমানে যে শহরে, রাজ্যে রয়েছেন উল্লেখ করবেন।
রোয়াক ইমেইল ঠিকানা: roakmagazine@gmail.com



