গ্রাস – শ্রেয়া ঠাকুর
(১)
সেবন্তী বলেছিল, ব্রিটিশ আমলের ছোট বাংলো। গড়নটা শক্তপোক্ত বলে এখনও দাঁড়িয়ে আছে। আর বলেছিল, ‘‘কয়েকটা দিন কাটিয়ে আয়, নিজেকে সময় দে। দেখবি ব্লক কেটে যাবে।’’
আমি একজন লেখক, সাধারণ মধ্যবিত্ত লেখক। অফুরান আইডিয়ার ভান্ডার আমার নেই। যেটুকু আছে, সেটুকুই কুড়িয়ে-বাড়িয়ে এত দিনে খান তিনেক উপন্যাস লিখেছি। কিন্তু তারপর আর হচ্ছে না।
সেবন্তী আমার প্রকাশক। তার ইচ্ছে ছিল, এ বারের পুজোয় আমার একটা নতুন উপন্যাস বের করবে। সেই মতো গত মার্চ থেকে তাগাদা দিয়ে গিয়েছে। আমি পারিনি। গত ছ’মাস ধরে ল্যাপটপের স্ক্রিনে সাদা পাতার দিকে তাকিয়ে থেকেছি ঘণ্টার পর ঘণ্টা। কখনও বা গোটা দুই পাতা লেখার পরেই বাতিল করে দিয়েছি। এ যে কী ভয়ানক যন্ত্রণা, তা বলে বোঝানো অসম্ভব। অনিশ্চয়তা আর সেলফ-ডাউটের কথা তো ছেড়েই দিলাম।
সেবন্তী ধৈর্যশীল প্রকাশক। তাড়া দেয়নি আর, বোঝার চেষ্টা করেছে এই রাইটার্স ব্লকের কারণ। আর দুর্দান্ত ভালো দার্জিলিং চা খাইয়েছে। সে রকমই এক চা-সেশনে হঠাৎ তার এই প্রস্তাব। বাংলোটা তার ঠাকুমার বাবার। আর তাতেই রাজি হয়ে আজ আমি উত্তরবঙ্গের এই কুয়াশাঘেরা রাস্তায় পায়চারি করছি।
বাংলোটা সেবন্তীর ঠাকুমার বাবা সম্ভবত স্বাধীনতার পর পরিত্যক্ত ব্রিটিশ সম্পত্তির সরকারি নিলামে কিনেছিলেন। তবে পাকাপাকি বসবাস করেননি। ছুটিছাটায় আসার জন্য রেখে দিয়েছিলেন। সেবন্তীর ঠাকুর্দা-ঠাকুমা, বাবা-মাও এটাকে সেই ভাবেই ব্যবহার করেছেন। তবে সেবন্তী এখন এটাকে হেরিটেজ স্টে হিসেবে চালু করতে চায়।
ফেরার সময় দেখা হল নবীনের সঙ্গে। কাছেই সুখিয়াপোখরি থেকে আসে ও, এই বাংলোর কেয়ারটেকার। বছর তিরিশের রোগাটে যুবকটি হাত জোড় করে নমস্কার জানাল। বাজার-হাট, ঘর পরিষ্কারের জন্য ওর উপরেই নির্ভর করি আমি। ওর কাছে একটা চাবি আছে। রান্নাটা অবশ্য নিজেই করব ঠিক করেছি। মাথা কাজ করা বন্ধ করে দিলে রান্নার মতো ভালো বিষয় আর হয় না। নবীনকে বলেই দিয়েছি, রাতে থাকতে হবে না। নিজের মতো এসে কাজ করে দিয়ে যাক। একা থাকতে চাই আমি। রাইটার্স ব্লকের যন্ত্রণার সঙ্গে একা লড়াই করে লিখতে চাই একটা মাস্টারপিস। সেবন্তীকে অবাক করে দিতে চাই।
বাংলোয় গোটা তিনেক ঘর, একটা টানা বারান্দা। প্রতিটা ঘরেই জানলা রয়েছে। বসার ঘরে পুরনো আমলের সোফা, টি-টেবিল। শোয়ার ঘরে বিছানা, ড্রেসিং টেবিল, ওয়ার্ডরোব। তবে বেডরুমে ঢুকতেই প্রথম যেটা চোখে পড়ে, সেটা হল জানলার সামনে রাখা লেখার টেবিলটা। তার পরে তার পাশের দেওয়ালের বিরাট ল্যান্ডস্কেপ পেন্টিং। বাংলোর পিছনের যে রাস্তাটা আঁকেবাঁকে জঙ্গলের মধ্যে মিলিয়ে গিয়েছে, ঠিক সেই রাস্তাটার ছবি। ঘন সবুজ জঙ্গলের মাঝে একটা পাহাড়ি রাস্তা৷ ছবিটা এত প্রাচীন যে ক্যানভাস ফুটোফুটো হয়ে গিয়েছে। রং জ্বলে গিয়েছে। ধুলোর মিহি প্রলেপ পড়েছে। পুরো ছবিটাই কেমন যেন ধূসর। কৌতূহল হল, কে এঁকেছিল? সে কি এই বাড়ির প্রথম মালিক? নাকি সেবন্তীর বাড়ির কেউ? এই ক্রিয়েটিভ ব্লকের সঙ্গে কি লড়তে হত তাকেও?
ফ্লাস্কে কফি বানিয়ে লেখার টেবিলে বসলাম। তিন দিন হল এখানে এসেছি। সকালে উঠে কিছুক্ষণ চেষ্টা করি। তারপর রান্না করে খেয়ে বেরিয়ে পড়ি। এলোমেলো হাঁটতে থাকি। কোথায় যেন পড়েছিলাম, হালকা এক্সারসাইজ ব্লক কাটাতে সাহায্য করে। বিকেল পড়তে পড়তে ফিরে আসি। নবীন তখন বাড়ি যায়। ডিম-টোস্ট বা ম্যাগি বানিয়ে খাই। তার পর কফি নিয়ে লিখতে বসি। খুব যে লাভ হচ্ছে তা নয়। তিন দিনে মাত্র আধ পাতা লিখতে পেরেছি।
তবে কলকাতার থেকে এখানে মনখারাপটা কম থাকছে। বিশেষ করে সন্ধ্যার সময়, ঘরের কোণের অন্ধকার ঘন হয়ে ওঠে, তখন যেন মনে হয় আমি আমার নিজের জায়গা খুঁজে পেয়েছি। এমন জায়গা, যেখানে কোনও কিছু প্রমাণ করার দায় নেই। যেখানে নির্দ্বিধায় হারিয়ে যাওয়া যায়। আবার এটা বেশিক্ষণ ভাবলেই কেমন একটা অস্বস্তিও শুরু হয়। মনে হয় আমার গ্রিপটা আলগা হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু কোথা থেকে, সেটা এখনও ধরতে পারিনি।
ল্যাপটপ অন করে লেখা শুরু করলাম। ভেবেছি, এই বাংলোটাকেই চরিত্র বানিয়ে একটা উপন্যাস লিখব। যদি সত্যিই অতীত কথা বলতে পারত, যদি সত্যিই এই বাংলোটা একটা মানুষ হত। কত কিছু বলার ছিল তার… খেয়াল করলাম, বাক্যগুলো সহজে আঙুলের ডগায় চলে আসছে। আনন্দে নেচে উঠল মনটা। কাটছে, রাইটার্স ব্লক কাটছে।
হঠাৎ নৈঃশব্দ্যে টোল ফেলে ফোনটা ভাইব্রেট করে উঠল। সেবন্তী ফোন করেছে। শান্ত ভাবে ধরলাম ফোনটা। সামনের ওয়ার্ড ফাইলে তখন দেখাচ্ছে, ৩০০০ ওয়ার্ড।
‘‘কী খবর? কেমন আছিস? দিনে অন্তত একটা মেসেজ করবি তো।’’
‘‘৩০০০ শব্দ এই শেষ করলাম।’’
‘‘বলিস কী! আই অ্যাম সো হ্যাপি, মৃত্তিকা।’’
‘‘মনে হচ্ছে পেরে যাব, জানিস তো। পুজোয় হবে না, বইমেলায় হবে।’’
‘‘আলবাত পারবি। না হলে তোকে ওখানে পাঠিয়েছি কেন? ইগারলি ওয়েটিং।’’
কথা বলতে বলতে ছবিটার দিকে চোখ পড়ল আমার। একটু অন্যরকম লাগছে না? এক ঝলকের জন্য মনে হল রাস্তাটায় কাউকে যেন হাঁটতে দেখলাম।
চমকে উঠে চেয়ার ছেড়ে দাঁড়ালাম। ফোনে সেবন্তী তখন লেখা নিয়ে আরও অনেক কথা বলে যাচ্ছে। ওকে থামিয়ে প্রশ্ন করলাম,
‘‘শোন না, তোদের বাড়িতে একটা ল্যান্ডস্কেপ আছে না, ওটা কার আঁকা রে?’’
‘‘কোন ল্যান্ডস্কেপ?’’
ভিডিও কলে সুইচ করে ওকে দেখালাম। সেবন্তী ঠোঁট ওল্টাল।
‘‘জানি না ভাই। ওই ছবি জন্ম থেকে দেখছি। ঠাকুমা বলত, তার বাবা নাকি ছবি আর কিছু ফার্নিচার সমেতই এই বাংলো কিনেছিলেন। কেন রে?’’
‘‘কোনও কারণ নেই, নিছক কৌতূহল। ছবিটা সুন্দর। এই বাংলোর পিছনের রাস্তাটারই ছবি।’’
‘‘তাই নাকি! এটা খেয়াল করিনি কখনও। এই জন্যই তুই লেখক, আমি প্রকাশক।’’
বলে ফিচেল হাসি দিল সেবন্তী। তারপর বলল, ‘‘চেহারাটা ভূতের মতো করে রেখেছিস কেন? চুলটাও আঁচড়াসনি। এসব করিস না, লোকে ভাববে আমি সাহিত্যের সোয়েটশপ চালাচ্ছি।’’
‘‘হ্যাঁ, করব করব। চল, রাখছি। লিখতে যাই।’’
‘‘যা। আর শোন, আমি দিন দুয়েক পরেই আসছি ওখানে। পড়তে চাই কী লিখলি।’’
ফোনটা ছাড়ার পরে আয়নার কাছে দাঁড়িয়ে দেখলাম, সেবন্তী সত্যি কথাই বলেছে। একটু উস্কোখুস্কো লাগছে আমায়, একটু যেন ধুলোমাখাও। ঝটপট চিরুনি বোলালাম চুলে। মুখে ময়শ্চারাইজার লাগিয়ে ঠোঁটে লিপবাম ঘষে নিলাম। তারপর হালকা একটা ডিও স্প্রে করে লেখার টেবিলে বসলাম ফের। শব্দগুলো আমার আঙুলের স্পর্শে জীবন্ত হয়ে উঠল। কেন জানি না, মনে হচ্ছিল কারও সঙ্গে দেখা হবে খুব শিগগিরই। তারপর কিছু মনে নেই।
(২)ঘুম ভাঙল দরজায় নক করার শব্দে…
দরজা খুলে দেখি নবীন দাঁড়িয়ে আছে, মুখে একটু উদ্বেগের ছাপ। হালকা বিরক্ত লাগল, কেন জানি না।
‘‘কী ব্যাপার, নবীন?’’
‘‘ম্যাম, আপনার শরীর ঠিক আছে?’’
‘‘আমি ঠিক আছি। কেন বলুন তো?’’
‘‘আপনি অনেকক্ষণ দরজা খুলছিলেন না। প্রথমে ভেবেছিলাম হাঁটতে গেছেন। তারপর দেখি, দরজা ভিতর থেকে বন্ধ। আমি ফোনও করলাম, নট রিচেবল বলছিল।’’
নবীনের কথায় অবাক হয়ে ঘড়ির দিকে তাকালাম। দুপুর ১টা বাজে। এত বেলা পর্যন্ত তো আমি ঘুমোই না। এখানে এসে আমার ঠিক সকাল সাতটায় ঘুম ভেঙে গিয়েছে। নবীনকে প্রবোধ দিয়ে বললাম, ‘‘হ্যাঁ, মাথাটা একটু ধরেছে। আপনি আমাকে এক কাপ কফি করে দেবেন প্লিজ?’’
তা সে শুধু কফি করে দিল তা নয়। ডিমের ঝোল-ভাত বানিয়ে খাওয়াল। ওর সামনে একটা প্যারাসিটামল খেতে হল আমায়। রাতে থাকার কথাও বলছিল, কিন্তু কে যেন সর্বশক্তি দিয়ে আমার মাথার ভিতর বলতে লাগল, ‘‘ওকে চলে যেতে বলো। ওকে থাকতে দিও না।’’ আমি নবীনকে চলে যেতে বললাম।
চলে তো যেতে বললাম, কিন্তু চাপা অস্বস্তিটা গেল না। ঘুম থেকে উঠে কেন জানি না লেখার টেবিলের দিকে যেতে ইচ্ছে করছিল না। বিছানাটা প্রচণ্ড মায়া নিয়ে টেনে ধরছিল বারবার। মনে হচ্ছিল, চুপ করে লেপ জড়িয়ে শুয়ে ছবিটার দিকে তাকিয়ে থাকি। নবীন যাওয়ার পরেই ফোনটা সুইচ অফ করে দিয়েছি। বন্ধ করে দিয়েছি বাড়ির ওয়াই-ফাই কানেকশনও।
কী মনে করে ল্যাপটপটা বিছানায় নিয়ে বসলাম। কোমর পর্যন্ত লেপ জড়িয়ে লেখা শুরু করলাম আবার। শব্দ দিয়ে এই বাংলোর একটা চরিত্র ফুটিয়ে তুলতে চাইছি। এই বাংলো যেন এক প্রবল পুরুষ। ইতিহাসের মার প্রতিহত করে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু সে একা, সে ভীষণ একা…
হঠাৎ ঘাড়টা কেমন শিরশির করে উঠল। চমকে মুখ তুলে দেখি, ঘরের কোণে কোণে অন্ধকার জমেছে। কিন্তু অন্য দিনের তুলনায় সে যেন আরও কালো, আরও কোমল। যেন হালকা হাওয়ায় ভেসে সেই অন্ধকার আঁকড়ে ধরতে চাইছে আমায়। ধড়ফড় করে উঠে পড়লাম বিছানা ছেড়ে। বাড়ির সমস্ত আলো একে একে জ্বালাতে লাগলাম। আলোর আঘাতে কোমল অন্ধকার ছত্রখান হয়ে গেল। ঝলমলে বাংলোর মাঝখানে দাঁড়িয়ে টের পেলাম, বুকের ভিতরটা কাঁপছে। কী হচ্ছে এটা আমার সঙ্গে?
পরের দিন নিজে থেকেই ঘুম ভাঙল। ঘড়িতে দেখি সকাল সাতটা। কফি বানিয়ে লিখতে বসলাম। গতকালের সন্ধ্যাটাকে নিজের উত্তপ্ত মস্তিষ্কের কল্পনা বলে নিজেকে সান্ত্বনা দিয়েছি। নবীন আজও রান্না করে দেবে বলেছে। আমার আর বেরোতেও ইচ্ছে করছে না। লেখাটা একটু এগোতে চাই, যাতে সেবন্তী আসলে কিছুটা কাঠামো ওকে দেখাতে পারি।
আজ খানিক রোদ উঠেছে। লেখার টেবিলে লুটিয়ে রয়েছে সেই রোদ। ঠিক যেন এক রোগা হলুদ বেড়াল, দীর্ঘদিন একা থেকে যে বোবা হয়ে গিয়েছে। অজান্তেই রোদের উপর হাত বোলালাম আমি। কেন জানি না, মায়ায় মনটা ভরে উঠল।
নবীন আজ বানিয়েছিল রুটি আর আলুর দম। দুপুরে খেয়ে আর এক কাপ কফি নিয়ে শাল জড়িয়ে বারান্দায় বসেছিলাম কিছুক্ষণ। সামনের পাহাড়গুলোর স্তরে স্তরে ধোঁয়ার মতো মেঘ জমছে আবার। নীলচে ধূসর মেঘ আর দুর্বল হলুদ রোদের লড়াই চলছে। মনে হচ্ছিল, আমার খুব জ্বর হবে আজ। চোখ জ্বালা করছিল।
মনে হচ্ছিল, এই মেঘে-রোদে-পাহাড়ে-বনে মিশে থেকে যাই। কী হবে ফিরে গিয়ে? কী হবে লিখে? এই যে অসীম নিবিড় স্থবিরতা, এর থেকে শান্তির আর কী আছে? এই স্থবিরতা প্রবল। এর বাহুপাশে নিজেকে বিলিয়ে দিই।
হঠাৎ কী একটা পাখির তীব্র ডাকে বাস্তবে ফিরে এলাম। সামনের কফি জুড়িয়ে জল, আর আমার চোখ বেয়ে অঝোরে জল পড়ছে। প্রচণ্ড একটা আতঙ্কে চোখ মুছে ফেললাম। হ্যাভ আই লস্ট ইট কমপ্লিটলি?
জোর করে চেয়ার ছেড়ে উঠে ঘরে গেলাম। সামনের পাহাড়ের দুর্বল রোদ ততক্ষণে হেরে গিয়েছে নীলচে ধূসর মেঘের কাছে। ক্রমশ ঘন হচ্ছে সেই মেঘ, ডেকে আনছে অন্ধকারকে।
নবীন বাড়ি যেতে চাইছিল না কিছুতেই। আমার মনের এক দিক বলছিল, ওকে থেকে যেতে বলতে। কিন্তু মনের আর এক দিক যেন কিছুতেই কোনও মানুষের অস্তিত্ব সহ্য করতে পারছে না। চলে যেতে বললাম নবীনকে। সে চলে যেতেই ফোন, ওয়াই-ফাই সব বন্ধ করে দিলাম। বাংলোর সব আলো জ্বালিয়ে লেখার টেবিলে বসে ল্যাপটপ খুললাম। আজ অন্তত ২০০০ শব্দ শেষ করতেই হবে।
কতক্ষণ লিখেছি জানি না। হঠাৎ মনে হল, আমাকে ঘিরে একটা ছায়া ঘনিয়ে উঠছে। আলো জ্বলছে ঘরে, কিন্তু তা যেন ক্রমশ ম্লান হয়ে যাচ্ছে। ছাদের কড়িকাঠ থেকে সরু সরু ধুলোর রেখা নেমে এসে বাতাসে ভাসছে অলসভাবে।
সবচেয়ে বড় ব্যাপার, ছবিটার দিকে তাকিয়ে মনে হল কেউ যেন আকুতি-ভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে আমার দিকে। চট করে চেয়ার থেকে উঠে দরজা খুলতে গিয়ে ছিটকে সরে গেলাম। হাতলটা গরম, যেন এইমাত্র কেউ চেপে ধরে রেখেছিল তাকে।
ভয়ে বুক কাঁপছিল। পায়ে পায়ে বিছানার দিকে এগিয়ে গেলাম। লেপটা মাথা পর্যন্ত মুড়ে শুতেই কান্না পেয়ে গেল। এতটা ওয়ার্থলেস আমি? একটা উপন্যাস শেষ করতে পারি না। আর এখন আমি আস্তে আস্তে বিকারগ্রস্ত হয়ে উঠছি।
মনে হচ্ছিল, আমার মাথার ভিতরটায় আঁচড়ে-কামড়ে গুমরে গুমরে উঠছে একটা মহাশোক, মহাভয় আর শত বছরের একাকিত্ব। ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে দিতে চাইছে আমায়। দমবন্ধ লাগতে শুরু করতেই লেপটা সরিয়ে দিলাম এক ঝটকায়।
এখনই বেরিয়ে যেতে হবে এই বাড়ি থেকে। লেখা চুলোয় যাক।
পাগলের মতো বিছানা থেকে উঠে আমি ট্রলি গোছাতে শুরু করলাম। আর তখনই চোখ পড়ল ছবিটার দিকে। একটা মুখ, একটা মুখ যেন ধীরে ধীরে ফুটে উঠছে ছবিটায়। ফ্যাকাশে, নীলচে একটা মুখ।
গলা চিরে একটা আর্তনাদ বেরিয়ে এল আমার৷(৩)
গেটের সামনেই সেবন্তীর সঙ্গে দেখা হয়ে গেল নবীনের। সেবন্তীর মুখে টেনশন, নবীনের মুখ ফ্যাকাশে।
‘‘কী ব্যাপার, নবীন? মৃত্তিকা কোথায়?’’
‘‘জানি না, দিদি। ম্যামকে কোথাও পাচ্ছি না। বাড়িতে নেই। ফোন নট রিচেবল।’’
‘‘জানি। আমি এনজেপিতে নামার পর থেকেই চেষ্টা করে যাচ্ছি।’’
‘‘অথচ কাল সন্ধ্যাতেও দেখে গিয়েছি,’’ বিড়বিড় করে বলল নবীন।
নবীনকে নিয়ে বাংলোতে ঢুকল সে। বেডরুমটা অসম্ভব এলোমেলো। বালিশ, চাদর মাটিতে লুটোচ্ছে। ড্রেসিং টেবিলের জিনিসপত্রও ছড়িয়ে রয়েছে মেঝেতে। শুধু লেখার টেবিলে ল্যাপটপটা অন করা।
তড়িৎ গতিতে ল্যাপটপের দিকে এগিয়ে গেল সেবন্তী। মৃত্তিকা পাসওয়ার্ড মনে রাখতে পারে না বলে নিজের ফোন নম্বরই পাসওয়ার্ড হিসেবে ব্যবহার করে। এক মুহূর্ত থমকে নম্বরগুলো টাইপ করল সে।
খুলে গেল ল্যাপটপ।
সেবন্তী দেখল, সারা ওয়ার্ড ডকুমেন্ট জুড়ে বিক্ষিপ্ত ভাবে শুধু লেখা,
‘‘আমি পারব না। আমার ভয় করছে। আমি খুব একা। আমি আসলে কিছুতেই লিখতে পারব না। এই বাড়িটা আমায় গ্রাস করে নেবে। কিন্তু লিখতে তো আমায় হবেই। সেবন্তীকে আমি খুব ভালোবাসি।’’
একই কথা বারবার।
স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল প্রকাশক, তার প্রিয় লেখকের অসংলগ্ন লেখার সামনে। তারপরই চোখ গেল টেবিলের পাশের ছবিটার দিকে।
আঁকাবাঁকা রাস্তাটা যেখানে ঘন জঙ্গলের মধ্যে গিয়ে মিশেছে, সেখানে একটি মানুষের ছবি। ট্রলি হাতে যেন ঘন জঙ্গলের দিকে হেঁটে যাচ্ছে মানুষটি।
ল্যান্ডস্কেপে ওই ফিগারটা আগে ছিল কি না, মনে করতে পারল না সেবন্তী।
