ইমোজি বনাম এসপেরেন্তো – সংহিতা বন্দ্যোপাধ্যায়
একটা ছোট্ট ইহুদি ছেলে — বছর দশেক বয়স। সে এখন যন্ত্রণাবিদ্ধ এবং অস্থির। বাড়িতে তার মা তাকে যে ঈশ্বরের কথা শোনায়, মানুষে মানুষে যে ভালোবাসার কথা শেখায়, তার সঙ্গে একেবারেই মিলছে না তার রাস্তার শিক্ষা, রাস্তার অভিজ্ঞতা। রাস্তায় আর স্কুলে সে দেখছে ইহুদি ছেলেদের ঢিল মারছে অন্যেরা, ঘৃণা দেখাচ্ছে, থুতু ফেলছে রাস্তায়। এমনকি সেনা পুলিশও গালাগাল দিচ্ছে, শাসাচ্ছে পোলিশদের আর ইহুদিদের। নানান মিথ্যে রটনা শোনা যাচ্ছে ইহুদিদের নামে।
উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি। লুদোভিক লাজারো জামেনহফ একজন সংখ্যালঘু, আজন্ম স্বপ্নচারী ইহুদি — যিনি তাঁর শৈশবের এই বিপন্নতার মধ্যে ভেবেছিলেন এক যুগান্তকারী ভাবনা, একটি আন্তর্জাতিক ভাষা তৈরি করার। এ ভাষা যেকোনো সাধারণ ভাষার মতো শুধুমাত্র ব্যবহারিক প্রয়োজন মেটাবে না। এ ভাষার পিছনে থাকবে এক গভীর দার্শনিকতা।
‘এসপেরেন্তো’র নাম আমরা সকলেই জানি একটি আন্তর্জাতিক ভাষা হিসেবে। কিন্তু জানি না এর পিছনের গভীর জীবনদর্শনের কথা। এ ভাষার জন্মের ঐতিহাসিক সংকটের কথাও আমরা ভুলে গেছি। অথচ একবিংশ শতাব্দীর এই বাংলায় বসেও সেই পুরোনো সংকট আজও রয়ে গেছে। কোনো উন্নয়ন, কোনো আধুনিকতাই এখনও খুঁজে পায়নি মানুষের সঙ্গে মানুষের এক সত্যিকারের প্রীতি সংযোগের পথ।
সম্প্রতি একটি বই হাতে আসার পর থেকেই এ নিয়ে ভাবনাচিন্তা আরও সুস্পষ্ট রূপ পেল। ‘নি এসপেরেন্তো’ নামের বইটির রচয়িতা বাদল সরকার। এটি একটি জীবনী। লুদোভিক লাজারো জামেনহফের জীবনী। এক বিস্মৃত স্বপ্নদ্রষ্টার জীবনী। যিনি আমাদের সভ্যতার ক্রমবর্ধমান জাতি-ধর্ম-বর্ণ বিদ্বেষের অনিবার্য ফল হিসেবে মানুষের সঙ্গে মানুষের রক্তক্ষয়ী সম্পর্ককে ঘৃণার সঙ্গে দেখেছেন। এ ইতিহাসের জটিলতায়, অর্থনীতির জটিলতায় মানুষে মানুষে এই বিভেদ লুদোভিককে যন্ত্রণাকাতর করে তুলেছিল। তিনি স্বপ্ন দেখেছিলেন এমন একটি ভাষার, যাতে মানুষ এক সমানাধিকারের ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে অনুভব করতে পারে, তারা আসলে একই পরিবারের সদস্য। একই জাতির সদস্য। ঊনবিংশ শতকের ইউরোপে দাঁড়িয়ে এক স্বপ্নদ্রষ্টা দার্শনিক তার ছোটবেলার মার খাওয়ার যন্ত্রণা থেকে জীবনের প্রান্তদেশে এসে সৃষ্টি করছেন সেই নতুন ভাষা। ক্ষমতালোভী, অন্ধ রাজনৈতিক ক্ষমতার উল্টোদিকে দাঁড়িয়ে যে ভাষা মানুষে মানুষে গড়ে তুলতে চায় এক আত্মিক সম্পর্ক। তাই ‘নি এসপেরু’ অর্থাৎ চলো আশা করি একটি সময়ের দলিল। স্বপ্ন অনেকেই দেখেন, আশাও করেন অনেকে। কিন্তু স্বপ্নসাধকের কাজ প্রকৃতপক্ষে আরও অনেক বড়ো। নানান আক্রমণ, দারিদ্র্য, নিঃসঙ্গতা, মৃত্যুশোক পার হয়ে হয়ে অবিচল থাকা স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করার লক্ষ্যে নিশ্চিতভাবেই এক ব্যতিক্রমী কাজ। পৃথিবীর ইতিহাসে এরকম উদাহরণ কমই পাওয়া যায়।
কিন্তু আজ কেন ভাববো এই ‘এসপেরেন্তো’র কথা?
একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে যখন AI দিয়ে ঘটানো যাচ্ছে মানুষের যাবতীয় কর্মকাণ্ড। বিজ্ঞান প্রযুক্তি তার পথ ধরে ঝড়ের গতিতে এগিয়ে চলেছে। কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যে একদিন মানুষের বিকল্প হিসেবে আশংকার কারণ হয়েও দাঁড়াতে পারে সে কথাও তো ভাবতে হচ্ছে আমাদের। আজ ধর্ম-বর্ণ-জাতি-শ্রেণিতে বহুধা বিভক্ত পৃথিবী অবিরত যুদ্ধ দখল আর মৃত্যুর সাক্ষী হচ্ছে। এত মৃত্যু, এত শোষণ, এত জীবনহানি কিন্তু আমাদের শেখাচ্ছে না কিছুই। ক্ষমতার দম্ভ এবং প্রযুক্তির কাছে সাধারণ জনজীবন অসহায়ের মতো লাঞ্ছিত হচ্ছে। আজ আমাদের কথ্যভাষা পরিণত হয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার ইমোজিতে। আমরা জন্ম কিংবা মৃত্যুর সংবাদে একে অপরকে ইমোজি পাঠিয়েই কর্তব্য সারি। কিন্তু এ কোন অমানবিকতা? যেখানে পাশের মানুষটির সঙ্গে কোনোরকম আত্মিক সম্পর্কই গড়ে ওঠে না, অথচ ভার্চুয়ালি আমরা নাকি বন্ধু! ‘এসপেরেন্তো’ প্রাচীর ভাঙার কথা বলেছিল। মানুষে মানুষে বিদ্বেষ ঘোচানোর কথা ভেবেছিল। মানুষের ওপর মানুষের জুলুম বন্ধ করার কথা বলেছিল। তাই সে এক ‘নিরপেক্ষ’ ভাষা। কোনো দেশের নয়, কোনো জাতির নয়, কোনো ধর্মের নয়। মাতৃভাষাকে সম্মান করেও এই আন্তর্জাতিক ভাষা এক বৃহত্তর মানবধর্মের আহ্বান জানায়। খুব সহজ পথ ছিল না এই ভাষাটির মান্যতার পথ। অনেক বিরোধিতা সত্ত্বেও অবশ্য শেষপর্যন্ত এটি বিশ্বব্যাপী মর্যাদা পায়। কিন্তু একবিংশের ইমোজি চলেছে তার পথ ধরে। পুঁজিবাদের লোভ-লালসা-পণ্যায়নের রাজনীতি ও অর্থনীতি ঠিক করে দিচ্ছে মানুষের পছন্দতা-অপছন্দতাও। মাপকাঠি ঠিক করে দিচ্ছে। তার স্বপক্ষে নৈতিকতা তৈরি করে দিচ্ছে। এক শ্রেণির উপর অন্য শ্রেণির শোষণ, ক্ষমতার একচেটিয়া আস্ফালনকে স্বাভাবিক করে তুলছে ক্রমশ ক্রমশ। প্রতিবাদীর স্থান হচ্ছে, জেল। আজ আমরা একা একা যে যার
স্বার্থ, কেরিয়ার, জীবনচর্যার খোপে ঢুকে গেছি। বৃহত্তর সমাজসংসার নিয়ে ভাবাটাকেই আজ অপ্রয়োজনীয় বলে দাগিয়ে দিচ্ছে বুর্জোয়া সংস্কৃতি। পৃথিবীর অনেক শতাংশ লোক আজ অন্য মানুষের সঙ্গে কথাই বলতে চায় না। যে যার জীবনের ছোট্ট ঘরে সেঁধিয়ে যাচ্ছি। অথচ যে মানবজমিনে আবাদ করলে সোনা ফলত, সেখানে নিত্যনতুন গজিয়ে উঠছে পারমাণবিক মারণাস্ত্র। একটা সুইচে আঙুল ছোঁয়ালেই সারা পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। কিন্তু এ কার বিরুদ্ধে কার জয়? মানুষের বিরুদ্ধে মানুষ যুযুধান, সে কথা নতুন নয়। ইহুদি আর পোলিশদের উপর রুশ জার বাহিনীর শোষণ ও অত্যাচার দেখতে দেখতেই লুদোভিক এক স্বপ্নের ভাষার কথা ভেবেছিলেন যার মধ্যে দিয়ে জুলুম নয়, মানুষের মধ্যে সঞ্চারিত হবে ভালোবাসার বার্তা, সহাবস্থানের পরম্পরা। আজ ইমোজি বনাম এসপেরেস্তো দাঁড়িয়ে আছে মুখোমুখি। এক যন্ত্রশোভিত ব্যক্তিগত মুক ছবির মুখোমুখি বিশ্বমানবতার ভাবনায় উজ্জীবিত এক স্বপ্নদর্শি ভাষা!
সাম্রাজ্যবাদের এই নীতি, জাতে জাতে, ধর্মে ধর্মে বিভেদ সৃষ্টি করো আর দখলদারি করো নিশ্চিন্তে, তার জন্মলগ্ন থেকেই আছে। কিন্তু স্বপ্নচারীরাও রয়েছে পৃথিবীর জন্মলগ্ন থেকে। প্রতিবাদীরাও আছে। যারা ঘটমান বর্তমানকে প্রশ্ন করে। তারা সংখ্যায় কম। হয়তো শক্তিতেও কম। কিন্তু বইটি পড়তে পড়তে দেখি অমোঘ সেই লাইনটি ‘একজন এসপেরেন্তো মরে, অন্য এসপেরেন্তো বেঁচে থাকে, আশা করে চলে, কাজ করে চলে।’ এস্পেরান্তোবাদ বিচ্ছিন্নতার শত্রু, শোষণের শত্রু, বিশ্ব মানবতার ঐতিহ্যবহনকারী।
আজকের একবিংশেও মানুষের স্বপ্ন দেখা অপরাধ, মুক্তচিন্তা করা অপরাধ, স্বাধীনতা চাওয়া অপরাধ। অনুমতি আছে কেবল ক্রমাগত চিন্তাচেতনার চর্চায় তালা বন্ধ করার। অনুমতি আছে জাতিতে-ধর্মে-বর্ণে ভাগাভাগি হয়ে থেকে পারস্পরিক খেয়োখেয়িতে। বিদ্বেষে। হিংস্রতায়। এমনকি বিজ্ঞানের যুক্তিবাদেও সমর্থন নেই এই অন্ধ ক্ষমতালোভী সংস্কৃতির। আমাদের বাংলা ভাষাও, বাংলার সম্প্রীতির উত্তরাধিকারও আজ আক্রান্ত। মুক্তচিন্তা যেখানে বাধাপ্রাপ্ত হয়, সংখ্যালঘু স্বপ্নসাধকের কাজ তখন হয়ে ওঠে দ্বিগুণ। আমাদের যাবতীয় সৃজনশীলতা, কবিতা, গল্প, নাটক, পত্রিকা করার ইচ্ছেও আসলে এক ধরনের এস্পেরেন্তোবাদ। মানবতাবিরোধী সমস্ত রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে কথা বলা। স্বপ্নচারী প্রতিবাদীরা বরাবরই সংখ্যালঘু, ‘কিন্তু তাদের ওপরই নির্ভর করছে মানবসমাজ যূথবদ্ধ থাকবে, নাকি আত্মীয়হননে ক্রমশ বিলুপ্ত হয়ে যাবে।’
আজ এসপেরেন্তো হেরে যাচ্ছে ইমোজির কাছে। দক্ষ প্রযুক্তির কৌশলে ভাবপ্রকাশের ভাষা হয়ে উঠছে ছবি। হয়ত আরও কোনো উন্নত টেকনোলজি আরও কোনো উপায় উদ্ভাবন করবে। আমরা সারা দিনের নানান মুডের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নানান সচিত্র অনুভূতি প্রকাশ করতে থাকবো।কিন্তু আমাদের ভিন্ন ভিন্ন সত্তা একে অপরের কাছে শ্রদ্ধা পাবেনা। ধর্ম জাতি বর্ণের ভিন্নতার কারণে আমাদের মধ্যে ক্ষমতার চক্রান্তপ্রসূত হিংসা ও বিদ্বেষ অব্যাহত থেকে যাবে। মানুষের ওপর মানুষের অত্যাচার চলতেই থাকবে। আমাদের বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যের সংস্কৃতি পরাজিত হবে। সুতরাং কোথায় আমাদের মুক্তির পথ? প্রযুক্তির চাকা থামানো যাবেনা এটা ঠিক। হয়ত নতুনভাবে কিছু ভাবতে হবে।
শেষ করি বাদল সরকারেরই একটি নাটকের (‘এবং ইন্দ্রজিৎ’) অংশ দিয়ে। কারণ হাঁটা ছাড়া, কাজ করে যাওয়া ছাড়া আমাদের গতি নেই।
ইন্দ্রজিৎ: আমরা তবে কী নিয়ে থাকব?
লেখক: পথ। আমাদের শুধু পথ আছে। আমরা হাঁটব। আমার লেখবার কিছু নেই। তবু লিখব। তোমার বলবার কিছু নেই। তবু বলবো। মানসীর বাঁচবার কিছু নেই, তবু বাঁচবে। আমাদের পথ আছে, আমরা হাঁটব।
ইন্দ্রজিৎ: দেবরাজ জুপিটারের অভিশাপে সিসিফাসের প্রেতাত্মা প্রকাণ্ড ভারী পাথরের চাঁই ঠেলে পাহাড়ের চূড়োয় তোলে, সেই চুড়োয় পৌঁছয় আবার গড়িয়ে নীচে পড়ে যায় পাথরটা। আবার ঠেলে ঠেলে তোলে। আবার পড়ে যায় আবার তোলে।
লেখক: আমরাও অভিশপ্ত সিসিফাসের প্রেতাত্মা। আমরাও জানি ও পাথর পড়ে যাবে। যখন ঠেলে ঠেলে তুলছি তখনই জানি এ ঠেলার কোনো মানে নেই। পাহাড়ের ওই চুড়োর কোনো মানে নেই।
ইন্দ্রজিৎ: তবু ঠেলতে হবে…
