“মাই নেম ইজ গওহর জান” – সলিল হোড়
ঝাড়লণ্ঠনের নরম আলোয় বেলজিয়াম কাচের আয়নায় প্রতিবিম্বিত মায়াবী এক রঙমহল। ভেলভেটের লাল গালিচায় ঝমঝমিয়ে উঠছে ঘুঙুর, জরিদার পেশোয়াজ আর কামদানি দোপাট্টার ঘূর্ণিতে ছড়িয়ে পড়ছে কত্থকের ছন্দ। আসরে রূপের বিভায় জাদুমুগ্ধ হয়ে বসে আছেন রসিকজনেরা। ঠিক এই ছবির সমান্তরালে ফুটে ওঠে অন্য এক দৃশ্য—হাতে জোড়া তানপুরা, নিখুঁত আলাপ ও ধামার-ধ্রুপদে গমগম করছে মেহফিল, কিংবা মৃদু শামাদানের সামনে বসে হৃদয় নিংড়ানো কাজরি, চৈতী আর ঠুংরির মূর্ছনায় ভেসে যাচ্ছেন শ্রোতারা। এই সুর ও মোহময়তার সন্ধিক্ষণেই জন্ম নিয়েছিল অবিভক্ত ভারতের বাঈজী ও তওয়ায়েফ সংস্কৃতি, যার এক প্রান্তে ছিল কলকাতার খামখেয়ালী বাবুয়ানি বিলাসিতা, আর অন্য প্রান্তে গওহর জানের মতো এক অবিশ্বাস্য সুরপ্রতিভা।
‘তওয়ায়েফ’ শব্দটির শেকড় সংস্কৃত ও আরবি উভয় ভাষার মধ্যেই লক্ষ্য করা যায়। এর অন্তর্নিহিত অর্থ এমন এক শিল্পীগোষ্ঠী, যাঁরা মন্দিরপ্রাঙ্গণে বা রাজসভায় নৃত্যগীতে পারঙ্গম ছিলেন এবং দেবতাদের উদ্দেশ্যে শিল্পনিবেদন করতেন। তাঁদের সাধারণ বারবনিতা বা দেহপসারিনী হিসেবে দাগিয়ে দেওয়া ইতিহাসের এক বিরাট অপব্যাখ্যা। তাঁদের জীবনযাপন, শিষ্টাচার (তেহজীব), বৈঠকী আদবকায়দা (নিশস্ত–বরখাস্ৎ) এবং কাব্য-সঙ্গীতের শৈলী (তরয–কলাম) সাধারণের থেকে ছিল যোজন দূরে। এই শিল্পীদের নিজস্ব সমাজব্যবস্থা ছিল একটি পিরামিড বা ত্রিভুজের মতো, যার একেবারে নিচে ছিল মিরাসাঁস বা সাধারণ রূপোপজীবীদের অবস্থান। ধাপে ধাপে কাঞ্জি, খানগী, ডোমনি, ডোলি, কাশ্মীরা, কাঞ্চণী ও দেরেদার পেরিয়ে একেবারে শীর্ষে আসন পেতেন ‘বাঈজী’রা। এখানে প্রবেশাধিকার ছিল অত্যন্ত কঠোর। বংশপরম্পরায় বাঈ-কন্যা হওয়া ছাড়াও প্রয়োজন হতো অতুলনীয় রূপ, তীব্র রসবোধ এবং চৌষট্টি কলায় দীর্ঘ তালিম। এমনকি তাঁদের নামের মধ্যেও ছিল সূক্ষ্ম ভেদাভেদ—যাঁরা নৃত্য ও গীত উভয় মাধ্যমেই পারদর্শী ছিলেন, তাঁদের নামের শেষে থাকত ‘জান’ পদবি; আর যাঁরা মূলত শুধুমাত্র ধ্রুপদী সঙ্গীতের চূড়ায় অধিষ্ঠান করতেন, তাঁদের পরিচয় হতো ‘বাঈ’।
এই সুরসাধিকাদের বাসস্থানকে বলা হতো ‘কোঠা’। একজন প্রবীণ চৌধরীয়াঁর শাসনে পরিচালিত এই কোঠার বড় মেহফিল-কক্ষে দেয়ালজুড়ে টাঙানো থাকত প্রমাণ সাইজের বেলজিয়াম কাচের আয়না এবং খাঁচায় বন্দি থাকত তোতাপাখি। কোঠার এই বৈশিষ্ট্যই প্রমাণ করত এটি কোনো নিষিদ্ধ পল্লী নয়, বরং সুরচর্চা ও সংস্কৃতির কেন্দ্র। লাহোর, করাচি, লখনউ, ভূপাল, পুণে বা ঢাকার মতো কলকাতাতেও গড়ে উঠেছিল এমন কোঠার আবহ।
কলকাতায় বাঈজী সংস্কৃতির ভিত গড়ে দিয়েছিলেন পাথুরিয়াঘাটার শৌরীন্দ্রমোহন ঠাকুর ও শোভাবাজারের মহারাজা নবকৃষ্ণ দেব। তবে এই সংস্কৃতি চরম রূপ ধারণ করে অযোধ্যার শেষ নবাব ওয়াজেদ আলি শাহ মেটিয়াবুরুজে নির্বাসিত হওয়ার পর। তাঁর হাত ধরেই লখনউয়ের চালওয়ালী ও পরচাওয়ালী গলি থেকে আল্লাহ্ বাঁদি, হায়দার জান, হাসান বাঁদি, আম্মান জান, মুনসরিমওয়ালী গাহর, জোহর বাঈ কিংবা মুশতারি বাঈদের মতো গুণী শিল্পীরা কলকাতায় পা রাখেন।
তৎকালীন কলকাতার বাবু সমাজের কাছে বাঈ নাচের আয়োজন কেবল বিনোদন নয়, বরং বংশের কৌলীন্য ও ঐশ্বর্য প্রদর্শনের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছিল। দোল, দুর্গাপূজা, বিবাহ এমনকি অন্নপ্রাশনেও শুরু হতো বাঈ নাচানোর রেষারেষি। এক বাবু বার্মিজ নর্তকী আনলে অন্য বাবু নিয়ে আসতেন আফগান রূপসীকে। বাবু বৈদ্যনাথ রায়ের আসর জিনাত বাঈ মাতাতেন তো রামচন্দ্র রায়ের মেহফিল ভাসত আশরুন বাঈয়ের নাচে। অন্যদিকে জগৎ মল্লিকের বাড়িতে বেনারসের মিছরি বাঈয়ের মুজরো বসলে মতিলাল মল্লিকের আসর গরম করতেন বেগমজান আর হিঙ্গুল বাঈ।
এই বাঈ-বিলাসকে কেন্দ্র করে বহু সামাজিক নাটক ও সংঘাতের জন্ম হয়েছে। লখনউয়ের বাঈজী আনারোর প্রেমে অন্ধ হয়ে চূড়ামণি দত্তের পুত্র কালীপ্রসাদ দত্ত পিতার শ্রাদ্ধে সমাজচ্যুত হওয়ার উপক্রম হলে আসরে নামতে হয়েছিল সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবারকে। এমনকি কলুটোলার কোটিপতি মুৎসুদ্দি নগেন সরকার ও তাঁর পুত্র খগেন সরকার সুপনজান ও নান্নিজানকে নিয়ে প্রকাশ্য কলহে জড়িয়ে নিজেদের হাস্যাস্পদ করেছিলেন।
ইতিহাসের পাতায় অমর হয়ে আছেন বউবাজারের বুন্নুজানও। রতনবাঈয়ের এই রূপসী কন্যার এক রাতের মুজরোর দর পঁচিশ হাজার টাকায় উঠেছিল। ১৮১৯ সালে দুর্গাপূজায় রূপচাঁদ রায় যখন কাশ্মীরী বাঈ না পেয়ে ভুলু মল্লিকের ষড়যন্ত্রে বুন্নুকেই কাশ্মীরী নর্তকী সাজিয়ে আসরে নামিয়ে দেন, তখন সংবাদপত্রগুলো তাঁকে নিকী বাঈয়ের চেয়েও সেরা বলে ভূয়সী প্রশংসা করেছিল। কেউ ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি যে তিনি বউবাজারের সাধারণ কোঠার মেয়ে। অন্যদিকে, রোশনি বাঈয়ের তেরো বছরের মেয়ে মুনিয়াজানের চটুল ভঙ্গিমার মোহে নবকৃষ্ণ দেবের আসরে স্বয়ং লর্ড ক্লাইভ টাল সামলাতে না পেরে মেঝেতে আছাড় খেয়ে পড়েছিলেন।
উনিশ শতকের অন্যতম সেরা নর্তকী ছিলেন নিকী বাঈ। ১৮২৩ সালে রাজা রামমোহন রায়ের মানিকতলার বাগানবাড়িতে নাচ পরিবেশন করে প্রশংসা কুড়োনো নিকীর প্রেমে পড়ে ব্রিটিশ সেনা অফিসার ফ্রেডরিক উইন লিখেছিলেন যে, নিকীর মুখ ও শরীর যেন স্বয়ং রতিদেবীর হাতে গড়া। তবে নিকী, হীরাবুলবুল বা শ্রীজানের পাশাপাশি নূরবক্স, হাসি বাঈ, আমিরুল বাঈ কিংবা ইলাহিজানের মতো বহু শিল্পী ধূমকেতুর মতো এসে সময়ের অন্ধকারে মিলিয়ে গিয়েছেন।
এই মেহফিলি সংস্কৃতির চূড়ায় যাঁর আগমন সমস্ত সমীকরণ ওলটপালট করে দিয়েছিল, তিনি আর কেউ নন—হিন্দুস্তানের প্রথম মহিলা সুপারস্টার গওহর জান। ১৮৭৩ সালের ২৬ জুন বর্তমান উত্তরপ্রদেশের আজমগড়ে তাঁর জন্ম। পারিবারিক সূত্রে তাঁর রক্তে ছিল নানা সংস্কৃতির মেলবন্ধন। দাদু ছিলেন ব্রিটিশ ও দিদিমা ভারতীয়। তাঁদের কন্যা ভিক্টোরিয়া কত্থক ও ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে অত্যন্ত দক্ষ ছিলেন। ভিক্টোরিয়া বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন শুষ্ক বরফের কারখানায় কর্মরত আর্মোনিয়ান ইহুদি উইলিয়াম ইওয়ার্ডের সাথে। এই দম্পতির কোল আলো করে জন্ম নেয় এক কন্যাসন্তান, যাঁর নাম রাখা হয় অ্যাঞ্জেলিনা ইওয়ার্ড। নানা টানাপোড়েনের পর ভিক্টোরিয়া ও তাঁর কন্যা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন এবং অ্যাঞ্জেলিনার নতুন নাম হয় ‘গওহর জান’।
১৮৮৭ সালে মাত্র চোদ্দো বছর বয়সে দ্বারভাঙার মহারাজের আমন্ত্রণে প্রথম প্রকাশ্য আসরে গান পরিবেশন করেন কিশোরী গওহর। তাঁর প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে মহারাজ তাঁকে সভাশিল্পী নিযুক্ত করেন। কয়েক বছর পর, ১৮৯৬ সাল থেকে তিনি স্বাধীনভাবে বিভিন্ন শহরে মেহফিল করতে শুরু করেন এবং দেশজুড়ে তাঁর নাম ছড়িয়ে পড়ে। জীবনের এক সংকটময় পর্বে মায়ের শোক ভুলতে তিনি আশ্রয় খুঁজেছিলেন প্রখ্যাত পার্সি অভিনেতা অমৃত কেশব নায়কের ভালোবাসায়। তবে ১৯০৭ সালে মাত্র দু-তিন বছরের সম্পর্কের মাথায় অমৃতের অকালপ্রয়াণ গওহরকে গভীর একাকীত্বের মুখে ঠেলে দেয়।
গওহর জান কেবল আসরের তবায়েফ ছিলেন না, ছিলেন আপাদমস্তক এক জাত শিল্পী। ১৯১১ সালে দিল্লির ঐতিহাসিক দরবারে ব্রিটিশ সম্রাট পঞ্চম জর্জের উপস্থিতিতে তিনি এবং এলাহাবাদের জানকীবাঈ সঙ্গীত পরিবেশন করেন। সম্রাট মুগ্ধ হয়ে তাঁদের প্রত্যেককে এক হাজার গিনি নজরানা উপহার দেন। উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতে বেগম আখতারের মতো কিংবদন্তি শিল্পীও তালিম নেওয়ার অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন গওহর জান ও তাঁর মা মালকার গান শুনেই।
১৯০২ সালে ভারতে কলের গানের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়। গ্রামোফোন কোম্পানির প্রতিনিধি ফ্রেড গেইসবার্গের হাত ধরে প্রথম কোনো ভারতীয় শিল্পীর কণ্ঠ রেকর্ড করা হয় এবং সেই ঐতিহাসিক রেকর্ডে খেয়াল গেয়েছিলেন গওহর জান। ১৯০২ থেকে ১৯২০ সাল পর্যন্ত বাংলা, হিন্দি, গুজরাটি, তামিল, মারাঠি, আরবি, ফারসি, পশতু, ফরাসি এবং ইংরেজি—প্রায় দশটি ভাষায় তিনি অজস্র গান রেকর্ড করেন। প্রতি রেকর্ডের শেষে ঘোষণা করতেন তাঁর ঐতিহাসিক সেই স্বাক্ষরবাক্য—“মাই নেম ইজ গওহর জান”।
সঙ্গীতের মাধ্যমে অঢেল অর্থ উপার্জন করেছিলেন তিনি এবং তাঁর বিলাসবহুল জীবনযাপন রূপকথাকেও হার মানাত। পোষা বিড়ালের বিয়েতে তিনি খরচ করেছিলেন বারোশো টাকা এবং সেই বিড়াল যখন বাচ্চার জন্ম দেয়, তখন উৎসব করে উড়িয়েছিলেন দু’হাজার টাকা। চার ঘোড়ায় টানা বুগি গাড়িতে ভ্রমণের জেদে ভাইসরয়কে প্রতিদিন এক হাজার টাকা করে জরিমানা দিতেন। মেহফিল ও রেকর্ডিং পিছু তাঁর নজরানা ছিল এক থেকে তিন হাজার টাকা। রেসের মাঠে নিয়মিত বাজি ধরা এই শিল্পী একবার এক অনুষ্ঠানে যাওয়ার জন্য আস্ত একখানা ট্রেন ভাড়া করেছিলেন, যেখানে বাজনদার ছাড়াও সফর করেছিল তাঁর খাস চাকর, রাঁধুনি, সহকারী, হাকিম, ধোপা ও নাপিতের দল।
অগাধ ধনসম্পদ ও অপ্রতিদ্বন্দ্বী খ্যাতির পাশাপাশি গওহরের চরিত্রের এক বড় দিক ছিল তাঁর শিল্পের তীব্র অহঙ্কার। মুখের ওপর নির্মম সত্যি শুনিয়ে দেওয়া ছিল তাঁর স্বভাব। একবার কলকাতায় দ্বারভাঙার মহারাজের আশ্রিতা বেনজির বাঈ নামে এক অপূর্ব সুন্দরী কিন্তু সাধারণ মানের তওয়ায়েফের ধ্রুপদ-ধামার শুনে গওহর সরাসরি অপমান করে বলেছিলেন—পালঙ্কে তাঁকে দারুণ মানালেও এমন উচ্চাঙ্গের আসরে বসার মতো যোগ্যতা তাঁর নেই।
এই অপমানে চরম আঘাত পেয়ে বেনজির সোজা দ্বারভাঙা ফিরে যান। পরদিন সকালে হাড়কাঁপানো শীতে তিনি দ্বারভাঙার মহারাজার প্রবীণ গুরু ওস্তাদ আজিম বক্শের দরজায় গিয়ে নিজের সমস্ত গয়না রেখে অনুরোধ জানান এমন শিক্ষা দিতে, যাতে কলকাতার রইসদের সামনে গওহরকে টেক্কা দেওয়া যায়। ওস্তাদের অধীনে টানা পাঁচ বছরের কঠোর রেওয়াজ ও সাধনায় নিজেকে আমূল বদলে ফেলেন বেনজির।
পাঁচ বছর পর কলকাতার এক ধনীর আসরে গওহরের আগেই গান গাওয়ার সুযোগ পান বেনজির বাঈ। গওহর অবশ্য তাঁকে মনেও রাখেননি। মঞ্চে জোড়া তানপুরা নিয়ে বেনজির শুদ্ধ কল্যাণের আলাপ ও ধ্রুপদ শুরু করতেই আসরের রসিকজনেরা স্তম্ভিত হয়ে যান। তাঁর সুরের কারুকাজ, সূক্ষ্ম শ্রুতির প্রয়োগ ও নিখুঁত মীড় উপস্থিত সকলকে মুগ্ধ করে। এরপর তিনি বেহাগে ধামার ধরেন। আসরসুদ্ধ শ্রোতার সাথে স্বয়ং গওহর জানও গানের ছন্দে মুগ্ধ হয়ে মাথা নাড়তে বাধ্য হন।
গান শেষে আত্মবিশ্বাসী বেনজির সরাসরি গওহরকে দ্বৈরথের আহ্বান জানিয়ে বলেন, সাহস থাকলে তিনি যেন তাঁর সাথে বসে গান। গওহরের কাছে ধ্রুপদ-ধামারের নির্দিষ্ট ব্যাকরণগত পালটা জবাবের চেয়েও বড় হাতিয়ার ছিল তাঁর প্রখর উপস্থিত বুদ্ধি। তিনি শান্তভাবে বেনজিরের অহঙ্কারকে ভোঁতা করে দিয়ে বলেছিলেন—সমগ্র হিন্দুস্তানে এমন কোনো নারী নেই যে বেনজিরের সাথে ধ্রুপদ-ধামার গাইতে পারে। তাঁরা সাধারণ মানুষ, তাই ঠুংরি, দাদরা আর গজল গান; যা অন্তরে চোট না পেলে বা হৃদয় না পুড়লে সৃষ্টি হয় না, আর তা কেবল তালিমের মুখস্থ বিদ্যার দ্বারা গাওয়া সম্ভব নয়। এভাবে নিজের ঘাটতি বুদ্ধি দিয়ে এড়িয়েও প্রতিপক্ষকে বিদ্ধ করার বিরল মেধা গওহরের ছিল।
যে পুরুষদের বশ করে তিনি রাজত্ব করেছেন, শেষ বয়সে সেই পুরুষদের চক্রান্তেই গওহর জানের জীবনে নেমে আসে চরম অন্ধকার। বহু পুরুষের আনাগোনার মাঝে জমিদারের মতো বাবুদের ছাড়িয়ে তাঁর জীবনে মনের মানুষ হয়েছিলেন তাঁর চেয়ে বয়সে অনেকটাই ছোট তবলচি সৈয়দ আব্বাস। ভালোবেসে আব্বাসকে বিয়ে করলেও গওহর দ্রুতই বুঝতে পারেন যে তাঁর সমস্ত সম্পদ তছরুপ হচ্ছে। বিবাহবিচ্ছেদের পর আব্বাস তাঁর ওপর একের পর এক মামলা চাপিয়ে দেন। দীর্ঘদিন ধরে চলা এই মামলার খরচ ও নামী উকিলদের পারিশ্রমিক মেটাতে গিয়ে গওহরের সমস্ত অর্থ নিঃশেষ হয়ে যায়। আদালতে মামলা জিতলেও আর্থিকভাবে তিনি সম্পূর্ণ ফতুর হয়ে পড়েন।
মুজরো করার শারীরিক সামর্থ্য তখন আর অবশিষ্ট ছিল না, তবে পরমুখাপেক্ষী হয়ে বেঁচে থাকাও ছিল তাঁর আত্মসম্মানের পরিপন্থী। জীবনের অন্তিম দেড় বছর তিনি মহীশূরের মহারাজের আশ্রয়ে কাটান। অবশেষে ১৯৩০ সালের ১৭ জানুয়ারি চিরতরে স্তব্ধ হয়ে যায় এই সুরসম্রাজ্ঞীর কণ্ঠ।
কলকাতার কোঠার ঝাড়লণ্ঠনগুলো নিভে গেছে বহু আগে, হারিয়ে গেছে বাবুদের সেই মাতাল বৈভবও। কিন্তু কোনো এক রেকর্ডের শেষ প্রান্তে আজও যখন বেজে ওঠে আত্মবিশ্বাসী সেই কণ্ঠস্বর—“মাই নেম ইজ গওহর জান”—তখন যেন স্পষ্ট হয়ে ওঠে সেই চিরন্তন সত্য: তুলসীতলার প্রদীপ হয়ে নয়, তাঁরা জ্বলতে এসেছিলেন ঝাড়লণ্ঠনের তীব্র অগ্নিশিখা হয়ে। সেই আগুন নিভে গেলেও ইতিহাসের পাতায় তাঁদের শিল্প ও অহঙ্কার আজও অম্লান।
