আমি বনফুল – শঙ্করলাল ভট্টাচার্য
মঞ্চের পিছনে রুপোলী পর্দা । মঞ্চের একপাশে নাট্যের ভাষ্যকার । মঞ্চের মাঝখানে একটি হেলান কুরসিতে কানন দেবীর ভুমিকার শিল্পী ।তাঁর আর একপাশে , কিছুটা কাছাকাছি , নাট্যের রবীন্দ্র সঙ্গীত শিল্পী । তাঁদের পিছনে সেইদিকে ডায়াসে সঙ্গীত সহায়করা ।
অনুষ্ঠান যখন শুরু হচ্ছে মঞ্চ একেবারেই অন্ধকার । শুধু একটা সুর বাজবে মিউজিকের স্পিকারে ঢিমে লয়ে। তারপর আস্তে আস্তে বড় স্ক্রিনে ছবি ফুতবে কানন দেবীর তাঁর যৌবনকালের ।ছবির নীচে লেখা থাকবে
কানন দেবী
১৯১৬- ১৯৯২
আমি বনফুল
এই সময় ট্রাকে ভেসে আসবে আমি বনফুল গো গানের সুরটা । সেই সুর এবং টাইটেল কার্ড মিলিয়ে যেতে কমলা রঙের amber স্পট লাইট ধরবে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসা কানন দেবীকে ।খানিক পরেই আর একটি স্পট লাইট আসবে ভাষ্যকারের উপর। যার সামনে একটি ছোট্ট টি পয় তাতে বসানো একটি টেবিল ল্যাম্প।
ভাষ্য এ বছরটা ধরা হচ্ছে ভারতীয় চল চিত্রের প্রথম মহাতারকা কানন দেবীর শতবর্ষ । জন্মের একটি তারিখও প্রস্তাব করা হচ্ছে ২২শে এপ্রিল, ১৯১৬ । যদিও মতান্তরে তা ১৯১২ হতে পারে।
কারণ? কানন দেবীর কোনও জন্মের প্রমানপত্র পাওয়া যায়নি। এমন কোনও আত্মীয় স্বজন ও পাওয়া সম্ভব হয়নি জাদের মতকে গ্রহন করা যায়। অর্থাৎ সাদা বাংলায় জাকে বলে যাবে প্রমান পত্র তা নেই।
এমনকি কোনও প্রমানের অভাবেই একটা সময়ে মেনে নেওয়া হয়েছিল এই মহানায়িকার জন্ম কলকাতার কাছেই হাওড়ায়।
একটি মত তো এরকম ছিল হাওড়ায় একটি কনভেন্ট ইস্কুলেও তিনি কিছুদিন পড়াশোনা করেছেন । তারপর এক্ সময় ইস্কুলের মাইনে জোগানো যাচ্ছিল না। অতএব সেখানেও ইতি ।
মতান্তর এ নিয়েও আছে
ভাষ্যকারের উপর থেকে আলো নিভে গিয়ে স্পট ধরবে কানন দেবীকে কানন বলছে
কানন কে আমার মা, কে বাবা এসব ভেবে বুকের জ্বালা বাড়াতে চাইনা আর । আপানারা মেনে নিন না আমি শুধুই কানন ।
আলো সরে গিয়ে ভাষ্যকারকে ধরে
ভাষ্য তবে যে তথ্যটা নিয়ে বিবাদ হবেনা তা হল কানন সেই বাল্যে বেরে উঠেছিল এক দম্পতির পরিচর্যায়। জাদের কানন দেবী তাঁর বাবা মা বলে স্বীকার করেছেন ।
কানন তাঁরা রতন চন্দ্র দাস এবং রাজবালা দাস। আমার একটি দিদিও ছিল। নাম অমিয়া। তবে তাঁর স্মৃতি আমার খুব একটা বেশি নেইও। আর যেটুকু আছে… হায়, ভুলে গেলেই বা দোষ কী …
ভাষ্য বৃত্তান্তের কি শেষ আছে? কেউ কেউ রটালেন কানন এক দর্জির মেয়ে । কোনও বৃত্তান্ত আরও সরেস। তাঁর মা ছিলেন বাইজি।
কানন কেন, এমনও তো কাহিনি চলে গেছে আমাকে নিয়ে যে আমাকে দূর ভাগলপুর থেকে পাঁচ কি ছবছর বয়সে এনে ফেলা হল কলকাতায় গাইবার জন্যে নাকি ফিল্মে কাজ করার জন্য। কিন্তু পেট চালাতে হচ্ছিল বাড়ি বাড়ি ঝিয়ের কাজ করে। সেই আয়ে গানও চলছে, নাচও । সত্যি বলতে কী , আমার ছবির একটা গানই আমাকে খুব সুন্দর বর্ণনা করে ।
স্টেজ অন্ধকার হয়ে যাবে শুধু কাননের উপরে আলো এবং পেছনে সহায়ক যন্ত্রীদের উপরে । কানন স্ক্রিনে গাইছে
ক্লিপ ১ আমি বনফুল গো
একটা সময় স্ক্রিনের সাউন্ড বন্ধ হয়ে গিয়ে স্টেজ থেকে সেই গানটা ধরে নেবে স্টেজের কানন
গান ১ মঞ্চ আমি বনফুল গো
ভাষ্য কাননের মনে পড়ে রতন চন্দ্র ওঁকে খুব ভালবাসতেন এবং আগলে রাখতেন । গোটা বাড়ি রতন চন্দ্রের গলায় গম গম করত।একটা মার্চেন্ট অফিসে কাজ করতেন রতনচন্দ্র , পাশাপাশি একটা সোনার দোকানও চালাতেন। একটু রইস মেজাজের লোকই ছিলেন বটে , ফিটন গাড়ি হেঁকে চলতেন।
এই সময় টগবগ করে গাড়ির আওয়াজ আসবে ট্রাকে।
ভাষ্য তবে রতনবাবুর আর একটা বিপদ জনক বাবুয়ানিও ছিল রেস খেলা
কানন মা রাজবালার দুশ্চিন্তার শেষ ছিল না বাবা রতনচন্দ্রের এই রেস খেলা আর মদ খাওয়া নিয়ে। তবে ভদ্রলোক আমাকে একটি অপূর্ব দান দিয়ে গেছেন। বই আর গান নিয়ে পড়ে থাকা। আমি তখনও পড়তে শিখিনি । কিন্তু বাবা আমাকে ছবির বই দিয়ে বইয়ের নেশা ধরিয়েছিলেন। বাংলা হরফ চিনিয়েছিলেন । তাতে আমি একটু অন্যরকম হয়ে গিয়েছিলাম । বইয়ের ছবি দেখে টেখে আর অক্ষর পড়ে পড়ে কত যে সময় কাটিয়ে ফেলতাম। তাই যখন পড়তে শিখে গেলাম তখন আমার সময় কাটানো কোনও সমস্যাই হয়নি। আর সত্যি বলতে কি , আমার গান তো ছিলই।
আর বলি? সেই শিশুবয়স থেকেই আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে যা কিছু একটা অভিনয় করে যাওয়া। কখনও নায়ক কখনও নায়িকা কখনও প্রেমিক কখনও প্রেমিকা আবার কখনও একেবারে খলনায়ক।
এইসময় এই দৃশ্য গুলো কানন উঠে গিয়ে অভিনয় করে দেখাবে। আর পাশ থেকে অন্য শিল্পীর কণ্ঠে ভেসে আসবে
গান ২ সেই ভালো সেই ভালো আমারে নাহয় না জানো
এই স্পট লাইটে ধরা থাকবেন শিল্পী আর অভিনয় মগ্ন কানন
ভাষ্য এই নিজেকে নিয়ে খেলতে খেলতেই কাননের স্বপ্ন দেখার জীবনের শুরু । কিন্তু এই সুখও বেচারির কপালে বেশিদিন টেঁকে নি । রতন চন্দ্র দাস একদিন অসুখে পড়লেন । রাজবালা ডাক্তার বৈদ্য কবিরাজ থেকে স্থানীয় পুরোহিত ও দূরান্তের সাধু সন্তদের শরণাপন্ন হলেন ।
কিন্তু রতন ছন্দ্রকে বাঁচানো গেল না । জুয়ো খেলায় নেশা গ্রস্ত রতন চন্দ্র বিশাল ধার বাকি রেখে গেলেন। যেহেতু রাজবালা তাঁর বিবাহিতা স্ত্রী নন তাই তাঁর পড়ে থাকা সম্পত্তির কানাকড়িও পেলেন না। আত্মীয় স্বজনেই কেড়ে নিল সব ।রাজবালাকে শুধতে হল তাঁর ফেলে রাখা সব ধার । তাঁর শেষ গয়না টিও বিক্রি হল দেনা মেটাতে। আর হঠাৎ একদিন পাঁচ বছরের শিশু কাননকে নিয়ে তিনি দাঁড়ালেন রাস্তায় ।
কাননকে ইস্কুল থেকে বের করে আনা হল। আর গ্রাসাচ্ছাদনের জন্যে বড়লোকের বাড়িতে কাজ ধরলেন মা ও মেয়ে ।
কানন বাবার সঙ্গে মা র বিয়ে হয়েছিল কিনা জানিনা । তবে কোন শাঁখা সিঁদুর পরা বিবাহিতা স্ত্রীর চেয়ে মা র ভালবাসা আর আনুগত্য কিছু কম ছিল না ।
আর আমার প্রতি মা-র টান? আত্মীয়ের বারিতেও ঝি গিরি করতে বাঁধেনি মা-র শুধু আমাকে মানুষ করবেন বলে। চন্দন নগরে এরকমই একটি বাড়িতে মা কাজ নিলেন। যেদিন আমরা বহাল হলাম সেদিনই অন্য কাজের লোক ছাড়িয়ে দেয়া হল। আমরাই রান্না বাড়ি করি , ঘরকন্নার যাবতীয় কাজ। ছেঁড়া কাপড়ের বেশি কিছু জোটেনা পরার জন্য। তাতেও মন পাওয়া যায়না । জীবনটা প্রায় পশুর স্তরে ।
অনেক পরে , আমি যখন কানন দেবী , গানে অভিনয়ের শিখরে , তখন একটা রঙিন সুরের গান গাইতে হয়েছিল। খুব রোম্যান্টিক গান , কিন্তু আমাকে মনে পড়াত জীবনের এই ছায়াঘন দিনগুলো । একটু গাই?
কানন গেয়ে ওঠেন
গান ৩ যদি ভালো না লাগে দিও না মন তাল দাদরা
এই গানটা মঞ্চ থেকে পরে স্ক্রিনে চলে যাচ্ছে । আমরা দেখতে পাচ্ছি স্ক্রিনের গায়িকা গাইছে ঠিক এই গানটা
ক্লিপ ২ যদি ভালো না লাগে তো দিও না মন
কানন আমি সেই অন্ধকারে সমস্ত তারার মধ্যে নিজের মুখ দেখছি তখন
ভাষ্য এটা এখন নিশ্চিত করে বলা যায়না যে মা কে নিয়ে মেয়ে ঠিক কোথায় উঠতে পারল। কানন দেবীর মেয়েবেলার স্মৃতিতে ধরা আছে বেশ কিছু দূরে ঘরে ঘেরা একটা উঠোন। সে বাড়ির যা বর্ণনা তা একটি বণিতালয়ের। হালকা চালে সে সময় বলা হত লালবাতির পল্লি। কিন্তু তেমন বাড়ির ভাড়া জোগাতেও নাভিশ্বাস উঠত রাজ বালার ।
হাওড়ার ঘোলা ডাঙ্গার এই পল্লিতে কিছু কিছু বাড়ির দরজায় টাঙানো থাকত নোটিস ‘ এটি গৃহস্থের বাড়ি”
কানন চারপাশের পরিবেশে শ্বাস নিতে অসুবিধে হত ।
এইখানে ট্রাকে প্রচুর মহিলার কণ্ঠ এবং হাসাহাসি মত্ত মানুষের চিৎকার এবং এক আধকলি রঙ্গরসের গান
কানন এইখানেই এক মধ্যবয়সী মানুষকে পেয়ে আমার জীবনের রাস্তা খুলে গেল। পাশেই থাকতেন ভোলা দা । মিশুকে হাশিখুশি মুখ সর্বক্ষণ , রোগা সোগা চেহারা আর মুখের মধ্যে কোথায় যেন একটা গভীর ব্যথা লুকিয়ে। আমার জীবন একটা নতুন রস পেত যখন সন্ধেকালে ভোলা দা আমায় হারমোনিয়াম বাজিয়ে শেখাতে বসতেন ভাবের গীত , পদাবলী কীর্তন , মীরাবাঈ কি সুরদাসের ভজন , কর্তাভজা গান , সংস্কৃত কিংবা অতুলপ্রসাদি
এভাবে বেশ চলছিল ।তারপর হঠাৎ একদিন ভোলা দা হারিয়ে গেলেন । তিনি যে গান ধরিয়ে দিয়ে গেলেন আমাকে সেই গানই তখন আমার সম্বল।
স্পট লাইট ধরবে কাননের পাশে বসা শিল্পীকে
গান ৪ কাছে যবে ছিলে পাশে হলনা যাওয়া
ভাষ্য দশ বছর বয়সী বালিকা কানন যখন মাথা খুঁড়ছে কিভাবে একটু রোজগারের মুখ দেখা যায় তখন একদিন হঠাৎ দেখা সেকালের এক ছোটখাটো থিয়েটারি চরিত্রে অভিনয় করতা তুলসী বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে ।
কাননের চোখ কাড়া সৌন্দর্য তুলসী বন্দ্যোপাধ্যায়কে একটা আইডিয়া জোগালো। বললেন “ওই থিয়েটার তিয়েটার নয় তুই চিনেমায় নামার চেষ্টা কর। তোর যা চেহারা তাতে একবার লেগে গেলে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হবে না ।
কাননের তখন একটা কাজ হলেই হয়। সে তুলসী বাবুর হাত ধরে চলে গেল ফিল্ম স্টুডিওতে অডিশন দিতে। ম্যাডান থিয়েটারে সেই অডিশনের কথা কানন কোনোদিনই ভোলেনি, সারাদিন অবশ্য বসে থাকতে হয়েছিল ডাক পাওয়ার জন্য।বসে বসে চোখে জলও আসছিল। কিন্তু শেষ অবধি পরিচালক জ্যোতিষ বন্দ্যোপাধ্যায় ওঁকে বেছেও নিলেন নির্বাক জয়দেব টাইটেলের বায়োস্কোপের জন্যে। যেখানে রাধা ও কৃষ্ণ দুই চরিত্রেই অভিনয় করতে হল কাননকে। অর্থাৎ একই দেহে নারী ও পুরুষ চরিত্র।
খুব প্রশংসা হল ওঁর অভিনয়ের । দক্ষিণা জুটল ২৫ টাকা – যা হাত ঘুরে ঘুরে ওঁর হাতে এসে পড়ল ৫ টাকা
তবে সেকেলে ৫ টাকারও তো মুল্য অনেক ।
এরপরে আরও দুটো ছবিতে কাননকে নারী ও পুরুষ চরিত্রে কাজ করতে হয়েছে।জ্যোতিষ বাবু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেছিলেন আমি কোথায় তোর মত একজনকে পাব যে শুধু ছেলে আর মেয়েই হবে না , গাইতেও পারবে?
কাননের প্রশ্ন ছিল তাহলে কি বলবেন ছেলে আর মেয়ে হওয়ার ব্যাপারে আমিই প্রথম?
জ্যোতিষ বাবু সেদিন যা বলেছিলেন তা সফল ভবিষ্যৎবাণী হয়েছিল কালে কালে অবশ্যই আমি চাই তুই চিরকাল প্রথমই থাকিস।
নির্বাক ছবি ততদিনে টকি হয়ে গেছে। চরিত্ররা কথা বলছে, গানও গাইছে। এবং হু হু করে কদর বাড়ছে জনৈকা কানন বালার । তারমধ্যে শ্রী গৌরাঙ্গ, চার দরবেশ ,মা হরিভক্তি , কণ্ঠহার ,এবং বাসবদত্তা । একই সঙ্গে বাংলা ও হিন্দিতে। চার দরবেশ তো সারা ভারত জুড়ে হিট। আর ১৯৩৫ এ মানময়ী গার্লস স্কুল ছবি করা হয়ে যেতে গায়িকা নায়িকা হিসেবে কানন হয়ে গেলেন সুপারস্টার । রাধা ফিল্ম কোম্পানি ওঁকে মাস মাইনে দিয়ে ওদের বাঁধা শিল্পী করে নিল ।
এইসময় এইসব কিছু কিছু স্তিল ফেলা হবে পর্দায়
কানন এইসময়েই আমার জীবনের সেরা একটা অফার এল। প্রিয় লেখক শরত চন্দ্রের দেবদাস উপন্যাস অবলম্বনে সেকালের প্রায় জীবন্ত প্রমথেশ বড়ুয়া সাহেবের ছবিতে অভিনয়ের।
নিউ থিয়েটার্স ব্যানারে সেই ছবিতে কাজের ব্যাপারে বড়ুয়াসাহেব একদিন আমাকে বললেন , “কানন , তুমি যদি চাও তো আমার ছবিতে পার্বতীর রোলটা করতে পারো। তবে হ্যাঁ, যদি পারো”।
পারবো না কি! বড়ুয়া সাহেবের দেবদাস -এ পারো করতে চাইবো না?
কিন্তু বিধি বাম। রাধা ফিল্ম কোম্পানি আমাকে অনুমতি দিল না । ওদের ভয় আমি হাতছাড়া হয়ে যাব।
জগৎ জানে বড়ুয়া সাহেবের দেবদাস নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করল ভারতবর্ষে। শরৎচন্দ্র বড়ুয়া সাহেবকে বলেছিলেন , “দেবদাস লেখার জন্যই আমার জন্ম , আর দেবদাস করার জন্য তোমার “।
হায়! সেই ছবি আমাকে হলে সিটে বসে-বসে দেখতে হল।
এই সময় স্ক্রিনে বড়ুয়া সাহেবের দেবদাস থেকে একটা অংশ দেখান হল ।
ভাষ্য এই সময়েই ঘোলাডাঙা থেকে বউবাজার পল্লির কাপালীতলা লেনে উঠে এলেন কাননবালা ।এক আকস্মিক যোগাযোগে পরিচয় ও পরিণয় হল অশোক মৈত্রের সঙ্গে। কিন্তু সেখানেও বিধি বাম। অশকের বাবা অধ্যাপক হেরম্বচন্দ্র মৈত্র ছিলেন গোঁড়া ব্রাহ্মণ। বাড়ির বউ ফিল্ম করবে এটা স্বপ্নেরও বাইরে। কিন্তু একে অন্যকে এতটাই পছন্দ যে প্রেম চলতেই লাগল। ইতিমধ্যে রাধা ফিল্ম কোম্পানি ছেড়ে কানন তাঁর বরাবরের শখ নিউ থিয়েটার্স এ এসে কাজ শুরু করলেন। এবং ১৯৩৭ এ সুযোগ হল
প্রমথেশচন্দ্র বড়ুয়ার সাড়া-জাগানো ছবি মুক্তি-তে অভিনয়ের। কাননকে বড়ুয়াসাহেব ছবিতে দেবদাস এ পাননি, কিন্তু মুক্তি-তে প্রায় এক নবজীবন দান করলেন কাননকে। সে ছবিতে প্রথম রবীন্দ্রসঙ্গীতকে ব্যবহার করা গেল ভারতীয় চলচ্চিত্রে। রবীন্দ্রসঙ্গীতের একটি ছিল , “আজ সবার রঙে রঙ মেশাতে হবে”
স্টেজের কানন এবং পাশে বসা শিল্পী দ্বৈত কণ্ঠে গেয়ে ওঠেন গানটা
গান ৫ দ্বৈতকণ্ঠে আজ সবার রঙে রঙ মেশাতে হবে কাননদেবী
সে গান শেষ হতে স্ক্রিনে কাননের গান এসে যাবে – সেই , সেই দৃশ্যের
Clip 4 আজ সবার রঙে রঙ মেশাতে হবে
ভাষ্য বলা বাহুল্য , মুক্তি সুপার- ডুপার হিট। এর কিছুদিন পর হিন্দুস্তান রেকর্ডসে রবীন্দ্রনাথকে প্রথম দেখা কাননের।
প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশ আলাপ করাতে গিয়ে বলেছিলেন
প্রশান্ত off voice এ হল কানন, তারকা অভিনেত্রী
ভাষ্য কানন প্রণাম করতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ ওঁর ঠোঁট ছুঁয়ে বলেছিলেন , “ কি সুন্দর মুখ তোমার ! গান করো?”
কবির মনে ছিলনা এই মেয়েটিই মুক্তি-তে ওঁর গান গেয়েছে। প্রশান্ত যোগ করলেন ঃ
প্রশান্ত off voice ও তো আপনার গান গেয়েই বিখ্যাত।
ভাষ্য রবীন্দ্রনাথ তখন বলেছিলেন, “ তাই? তাহলে একবার শান্তিনিকেতনে এসে গান শুনিও আমাকে”
কানন সেই সৌভাগ্য আমার আর হয়নি।
প্রণাম তোমায় ঘনশ্যাম B Flat
ভাষ্য এরপর ১৯৪২ এ প্রমথেশ বড়ুয়ার সঙ্গে ফের এক অপূর্ব ছবিতে কাজ করার সুযোগ হল কানন দেবীর। হ্যাঁ কাননবালা ততদিনে কানন দেবী- ভারতীয় চলচ্চিত্রের একছত্র সম্রাজ্ঞী।
এখানে শেষ উত্তর এর একটা ক্লিপ দেখানো হবে
Clip 5 শেষ উত্তর
কানন এখানে একটা খুব ব্যক্তিগত কথা বলি। আমার কিন্তু বিয়ে হয়েছিল অশোক মৈত্রের সঙ্গে , শেষপর্যন্ত। ততদিনে ওঁর পিতৃদেব প্রয়াত হয়েছেন। কিন্তু সিনেমার কারণে সেই প্রবল প্রেম ও বিবাহের সম্পর্কও একদিন ছিন্ন হল।
এই সময় ইন্দ্রাণী গাইবেন প্রথম দুটি কলি
গান ৬ তাঁর বিদায়বেলার মালাখানি
কানন আবার একটা কথা বলি এই শেষ উত্তর ছবির প্রসঙ্গে ।আমি তো অনেক গুরুর কাছে গানের প্রসাদ পেয়েছি। তাঁদেরই একজন বিশিষ্ট একজন কাজী নজরুল ইসলাম। তাঁরই একটি গান ব্যবহার করা হয়েছিল এই ছবিতে। কি অপূর্ব গান! নিজেরই গাওয়া, কিন্তু এখনও কানে ভেসে আসে।
কানন স্ক্রিনে গাইছেন
Clip 6 যদি আপনার মনে মাধুরী মিশায়ে
কানন এই ছবিরই হিন্দি ভার্সন ছিল জওয়াব। সেখানেও সুরকার কাজী সাহেবের বন্ধু ও অনুগত কমল দাশগুপ্ত। আর সেই ছবির চিরকালের সাড়া জাগানো গান “ দুনিয়া ইয়ে তুফান মেল”
এই সময় কানন দেবীর গাওয়া গানটা ভেসে উঠবে পিছনের স্ক্রিনে
Clip 7 দুনিয়া ইয়ে দুনিয়া তুফান মেল
গানটা শেষ হওয়ার পর স্টেজের কানন ধরে নেবে তাঁর বাংলা ভার্সন
গান ৭ তুফান মেল
ভাষ্য কানন দেবীর গান ব্যবহার হয়েছে প্লে ব্যাকেও। আর লিপ দিয়েছেন কে? মধুবালা !
মধুবালা ও দিলীপকুমারের অভিনয়ে সেই দৃশ্য এখন পর্দায়।
“এই চাঁদ ছুপনা যানা “ গাইছেন মধুবালা
Clip 8 এই চাঁদ ছুপনা যানা (জওয়াব )
ভাষ্য ঃ কানন দেবীর দ্বিতীয় বিবাহ পরবর্তীকালের বিখ্যাত চিত্রপরিচালক হরিদাস ভট্টাচার্যের সঙ্গে। খুবই সুখী জীবন ছিল ওঁদের। সুদর্শন , উচ্চশিক্ষিত এবং জীবনবিলাসী হরিদাস বাবু ও কানন দেবী খুব সফলভাবে তাঁদের চিত্রপ্রযোজনা সংস্থা চালিয়েছেন দীর্ঘকাল। তাঁদের প্রযোজনায় রাজলক্ষ্মী ও শ্রীকান্ত , ইন্দ্রনাথ , শ্রীকান্ত ও অন্নদাদি , অভয়া ও শ্রীকান্ত কিংবা আঁধারে আলো বাংলা সিনেমায় পথফলক হয়ে আছে।
কানন সম্মান অনেক পেয়েছি , বহু মানুষের সঙ্গ পেয়েছি সিনেমার কাজে – কাজে । পেয়েছি দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার।একসময় হারিয়েওছি স্বামি হরিদাসকে। বিচ্ছেদের সেই কাহিনি আর নতুন করে শোনাবো না। বরং “সবারে আমি নমি” । আজ এই পর্যন্ত ।
এই সময় দ্বৈতকণ্ঠে গাওয়া হবে
গান ৮ দ্বৈতকণ্ঠে । ফুল বলে ধন্য আমি, ধন্য আমি মাটির উপরে ।
(এই সময় কানন দেবীর জীবনের নানান দৃশ্য একের পর এক দেখানো হবে স্ক্রিনে। এবং তা শেষ হলে আস্তে শুরু করবে টাইটেল কার্ড।)
