নিয়নের নিচে এক মৃত রাষ্ট্রের স্বপ্ন ‘কেনেডি’ চলচ্চিত্রে ক্ষমতা, স্মৃতি ও বিলুপ্তির রাজনীতি – দেবার্ঘ্য দাস
একজন মানুষ জীবিত, অথচ রাষ্ট্রের নথিতে তিনি মৃত! তাঁর শরীর আছে, স্মৃতি আছে, অপরাধবোধ আছে; নেই কেবল নিজের অস্তিত্বের ওপর অধিকার। তিনি শহরের রাস্তায় হাঁটেন। মানুষের সঙ্গে কথা বলেন। হত্যাও করেন, আবার ফিরে যেতে চান নিজের অতীতের কাছে। কিন্তু যে রাষ্ট্র তাঁকে মৃত ঘোষণা করেছে, সেই রাষ্ট্রেরই অন্ধকার ব্যবস্থায় তিনি এখনও প্রয়োজনীয়। অনুরাগ কাশ্যপের ‘কেনেডি’ (২০২৩) এই রাজনৈতিক স্ববিরোধিতার ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এক নিও-নোয়ার চলচ্চিত্র। এর কেন্দ্রে অপরাধের রহস্য যতটা, তার চেয়ে বেশি রয়েছে ক্ষমতার প্রকৃতি, স্মৃতির অনিবার্যতা এবং মানুষের প্রশাসনিক বিলুপ্তির প্রশ্ন।
তবে ‘কেনেডি’র রাজনৈতিক ও নান্দনিক তাৎপর্য বুঝতে হলে অনুরাগ কাশ্যপের পূর্ববর্তী চলচ্চিত্রগুলির দিকে ফিরে তাকানো জরুরি। কারণ কাশ্যপের সিনেমা বিচ্ছিন্ন কয়েকটি আখ্যানের সমষ্টি নয়। বরং তাঁর নির্মাণজুড়ে ভারতীয় সমাজের অপরাধ, রাষ্ট্র, শ্রেণি, ক্ষমতা এবং ব্যক্তিসত্তার সম্পর্ক নিয়ে একটি ধারাবাহিক অনুসন্ধান লক্ষ করা যায়।
মুম্বাইয়ের চলচ্চিত্রজগতে কাশ্যপ এমন এক সময়ে কাজ শুরু করেছিলেন, যখন হিন্দি মূলধারার সিনেমার বড় অংশ জুড়ে ছিল প্রেম, পরিবার, তারকাকেন্দ্রিক আখ্যান এবং সামাজিক বাস্তবতার অপেক্ষাকৃত নিরাপদ উপস্থাপনা। অথচ মুম্বাইয়ের অন্য এক বাস্তবতা তখনও জনপ্রিয় চলচ্চিত্রের পর্দায় যথেষ্ট জায়গা পায়নি। সেই শহরে অপরাধ ছিল জীবিকার সঙ্গে যুক্ত, রাজনীতি ছিল সংগঠিত হিংসার সঙ্গে সম্পর্কিত, আর মানুষের সামাজিক অবস্থান নির্ধারিত হতো অর্থনৈতিক ক্ষমতা ও প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগের ভিত্তিতে। রামগোপাল বর্মার ‘সত্যা’ (১৯৯৮)-র সহ-চিত্রনাট্যকার হিসেবে কাশ্যপ এই দ্বিতীয় মুম্বাইয়ের চলচ্চিত্রভাষা নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন। ‘সত্যা’র গ্যাংস্টাররা প্রচলিত হিন্দি সিনেমার স্টাইলাইজড অপরাধী নন। তাঁদের মধ্যে ভয়, ক্ষুধা, দুর্বলতা এবং সামাজিক অনিশ্চয়তা রয়েছে। অপরাধ এখানে ব্যক্তিগত বিকৃতির চেয়ে অনেক বেশি একটি নির্দিষ্ট নগর-অর্থনীতির অংশ। এই বাস্তববাদী প্রবণতা পরবর্তী সময়ে কাশ্যপের নিজস্ব চলচ্চিত্রভাষার ভিত্তি তৈরি করে।
‘পাঁচ’-এ সেই বাস্তবতা আরও অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে। হিংসা, মাদক, নৈতিক অবক্ষয় এবং তরুণ প্রজন্মের আত্মবিনাশী প্রবণতা নিয়ে নির্মিত ছবিটি সেন্সরশিপ ও মুক্তিসংক্রান্ত জটিলতায় আটকে যায়। এই অভিজ্ঞতাকে কাশ্যপের প্রতিষ্ঠানবিরোধী চলচ্চিত্রচেতনার একমাত্র উৎস বলা যায় না, তবে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ ও শিল্পীর স্বাধীনতার সংঘাত তাঁর নির্মাণজীবনে যে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল, তা অস্বীকার করা কঠিন। এরপর ‘ব্ল্যাক ফ্রাইডে’ (২০০৪)-তে কাশ্যপ প্রায় অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার পদ্ধতিতে ১৯৯৩ সালের মুম্বাই বিস্ফোরণের ইতিহাস পুনর্গঠন করেন। ক্যামেরা সেখানে কেবল ঘটনা দেখায় না; তথ্য, সাক্ষ্য, তদন্ত এবং রাষ্ট্রীয় বয়ানের মধ্যবর্তী দূরত্বও অনুসন্ধান করে। ‘দেব.ডি’ (২০০৯)-তে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘দেবদাস’ প্রবেশ করে ভোগবাদ, মাদক, যৌনতা ও ডিজিটাল সংস্কৃতির সমকালীন জগতে। ছবিটির সংগীত, রং ও সম্পাদনা প্রচলিত আখ্যানের কাঠামো ভেঙে এক নতুন চলচ্চিত্র-অভিজ্ঞতা নির্মাণ করে। অন্যদিকে ‘গুলাল’ (২০০৯)-এ ছাত্ররাজনীতি, রাজপুত পরিচয়ের রাজনীতি, ক্ষমতার উত্তরাধিকার এবং আদর্শের অবক্ষয় মিলিয়ে তৈরি হয় আধুনিক ভারতের রাজনৈতিক সহিংসতার এক তীক্ষ্ণ প্রতিচিত্র। এই অনুসন্ধান সবচেয়ে বিস্তৃত সামাজিক মাত্রা পায় ‘গ্যাংস অফ ওয়াসিপুর’ (২০১২)-এ। ছবিটিকে প্রায়ই ভারতীয় ‘গডফাদার’ বলা হয়। কিন্তু এই তুলনা তার নিজস্ব ঐতিহাসিক চরিত্রকে অনেকটাই আড়াল করে। কয়লাশিল্প, জাতপাত, শ্রম, স্থানীয় রাজনীতি, পুঁজির বিস্তার এবং প্রজন্মান্তরের প্রতিশোধকে একত্র করে কাশ্যপ এখানে স্বাধীনোত্তর ভারতের এক বিকল্প সামাজিক ইতিহাস নির্মাণ করেন। অপরাধ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং ক্ষমতার উত্তরাধিকার রক্ষার একটি পদ্ধতি। ‘কেনেডি’তে এসে এই অনুসন্ধান পৌঁছোয় আরও অস্বস্তিকর একটি সিদ্ধান্তে—রাষ্ট্র এবং অপরাধের সীমারেখা এমনভাবে মুছে যেতে পারে যে, একজন মানুষ একই সঙ্গে ক্ষমতার হাতিয়ার এবং তার শিকার হয়ে ওঠেন।
‘কেনেডি’র কেন্দ্রীয় চরিত্র উদয় শেট্টি, যাঁর বর্তমান পরিচয় কেনেডি। একসময় তিনি পুলিশবাহিনীর সদস্য ছিলেন। এখন সরকারি নথিতে মৃত, অথচ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত এক গোপন অপরাধব্যবস্থায় সক্রিয়। এই পরিচয় ছবিটির নিছক plot device নয়; বরং তার রাজনৈতিক ও দার্শনিক ভিত্তি। আধুনিক রাষ্ট্র নাগরিকের পরিচয় নির্ধারণ করে নথি, আইন, প্রতিষ্ঠান এবং প্রশাসনিক স্বীকৃতির মাধ্যমে। ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকোর ক্ষমতাতত্ত্ব অনুসারে, আধুনিক ক্ষমতা কেবল শাস্তি বা দমনপীড়নের মাধ্যমে কার্যকর হয় না; মানুষকে পর্যবেক্ষণ, শ্রেণিবদ্ধ এবং নথিভুক্ত করার মধ্য দিয়েও তার বিস্তার ঘটে। এই তাত্ত্বিক পরিসরে ‘কেনেডি’কে পড়লে দেখা যায়, উদয় শেট্টির মৃত্যু আসলে জৈবিক নয়, প্রশাসনিক। রাষ্ট্র তাঁকে মুছে দিয়েছে, কিন্তু তাঁর প্রয়োজনীয়তা শেষ করেনি। বরং সেই অদৃশ্য পরিচয়ই তাঁকে এমন এক ব্যবস্থার কার্যকর অংশ করে তুলেছে, যেখানে সহিংসতার দায় ও কর্তৃত্বের উৎসকে আড়াল করা সম্ভব। এখানে জর্জিও আগামবেনের bare life ধারণার সঙ্গেও একটি তুলনামূলক সম্পর্ক তৈরি হয়। রাজনৈতিক ও আইনি সুরক্ষার বাইরে অবস্থান করা মানুষের জীবন কীভাবে ক্ষমতার অধীন হয়ে পড়ে, আগামবেনের আলোচনায় সেই প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ। কেনেডি অবশ্য এই ধারণার সরল প্রতিরূপ নন। তিনি শুধু ক্ষমতাহীন মানুষ নন; নিজেও সহিংসতা প্রয়োগ করেন। ফলে তাঁর অস্তিত্বে নিপীড়িত এবং নিপীড়কের পরিচয় এক অস্বস্তিকর দ্বৈততা তৈরি করে। রাষ্ট্র তাঁকে অদৃশ্য করেছে, কিন্তু সেই অদৃশ্যতাই তাঁকে রাষ্ট্রীয় সহিংসতার একটি ব্যবহারযোগ্য অস্ত্রে পরিণত করেছে।
এই রাজনৈতিক অবস্থানই ছবিটির দৃশ্যভাষা নির্ধারণ করে। ‘ব্ল্যাক ফ্রাইডে’র মুম্বাই ছিল অনুসন্ধানের শহর; ‘কেনেডি’র মুম্বাই হয়ে ওঠে বিভ্রমের শহর। সেখানে রাস্তা, বহুতল, করিডর, গাড়ির কাচ এবং কৃত্রিম আলো মিলে এক সংকুচিত নগর-অভিজ্ঞতা তৈরি করে। শহরটি বিস্তৃত, অথচ তার মধ্যে ব্যক্তির স্বাধীন চলাচলের অনুভূতি অনুপস্থিত। চিত্রগ্রাহক সিলভেস্টার ফনসেকার-এর ক্যামেরায় এই সংকট বিশেষভাবে দৃশ্যমান। বিভিন্ন দৃশ্যে দূরবর্তী পর্যবেক্ষণ, ফ্রেমের মধ্যে একাধিক স্থানিক স্তর, প্রতিফলন এবং আংশিক আড়াল চরিত্র ও দর্শকের মধ্যে একটি সচেতন দূরত্ব তৈরি করে। দীর্ঘ ফোকাল দৈর্ঘ্যের লেন্সের ব্যবহার বলে মনে হয় এমন কিছু দৃশ্যে পটভূমি ও সম্মুখভাগের দূরত্ব সংকুচিত হয়ে আসে। রাস্তা, স্থাপত্য এবং মানুষের শরীর যেন একে অপরের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। এটি শুধু দৃশ্যগত সৌন্দর্য নয়; ধরা দেয় চরিত্রের রাজনৈতিক ও মানসিক বন্দিত্বের একটি সম্ভাব্য রূপক হিসেবে।
চলচ্চিত্রতত্ত্বে mise-en-scène বলতে দৃশ্যের মধ্যে আলো, স্থান, বস্তু, অভিনয় এবং বিন্যাসের সংগঠনকে বোঝায়। ‘কেনেডি’র মিজ-আঁ-সেনের বিশেষত্ব হলো, এখানে দৃশ্যমানতার মধ্যেই অদৃশ্যতার অনুভূতি তৈরি হয়। করিডর, দরজা, আয়না কিংবা কাচের আড়াল থেকে চরিত্রকে দেখার ফলে দর্শক কেনেডির উপস্থিতি অনুভব করেন, কিন্তু তাঁর সম্পূর্ণ সত্তাকে ধরতে পারেন না। এই অসম্পূর্ণ দৃশ্যমানতা তাঁর রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের সঙ্গেও মিলে যায়। সরকারি নথিতে যাঁর অস্তিত্ব নেই, ক্যামেরাও যেন তাঁকে সম্পূর্ণভাবে অধিকার করতে পারে না!
প্রচলিত থ্রিলারে ক্যামেরা সাধারণত দর্শককে তথ্য সংগ্রহে সাহায্য করে। এখানে ক্যামেরা প্রায়ই তথ্যের বদলে অনিশ্চয়তা তৈরি করে। দেখা এবং জানা—এই দুইয়ের মধ্যে যে দূরত্ব, সেটিই ‘কেনেডি’র দৃশ্যগত রাজনীতি। এই দৃশ্যগত অনিশ্চয়তার সঙ্গে রাহুল ভাটের অভিনয় গভীরভাবে যুক্ত। কেনেডি চরিত্রটিকে তিনি সংলাপের চেয়ে শরীরের ভাষায় নির্মাণ করেছেন। তাঁর হাঁটার ভঙ্গি, ক্লান্ত চোখ, মুখের পেশির সংযম, সিগারেট ধরানোর অভ্যাস কিংবা দীর্ঘ নীরবতা—সব মিলিয়ে এমন একজন মানুষের উপস্থিতি তৈরি হয়, যিনি নিজের অতীতকে বহন করছেন এক ‘অনিবার্য-বোঝার’ মতো। এই অভিনয়ে অপরাধবোধের সরাসরি ঘোষণা নেই। দর্শককে চরিত্রটির প্রতি সহানুভূতিশীল করে তোলার সচেতন আবেগপ্রবণতাও নেই। বরং তাঁর আচরণের মধ্যে এক ধরনের অনুভূতিগত অবসাদ কাজ করে। কেনেডি যেন বহুদিন ধরে সহিংসতার মধ্যে থাকতে থাকতে স্বাভাবিক মানবিক প্রতিক্রিয়ার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছেন। তিনি প্রচলিত অর্থে অ্যান্টি-হিরো হলেও তাঁর মধ্যে বিদ্রোহী স্বাধীনতার কোনো গৌরব নেই। তিনি শক্তিশালী, অথচ মুক্ত নন; অপরাধী, অথচ নিজের জীবনের ওপর সম্পূর্ণ কর্তৃত্ব নেই।
এই মানবিক শূন্যতার বিপরীতে সানি লিওনের চার্লি চরিত্রটি বেশ গুরুত্বপূর্ণ। ভারতীয় জনপ্রিয় সংস্কৃতি দীর্ঘদিন সানি লিওনকে একটি নির্দিষ্ট তারকা-ইমেজের মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখেছে। কাশ্যপ সেই পরিচিত দর্শক-প্রত্যাশাকে ব্যবহার করেও চরিত্রটিকে অন্য মাত্রা দিয়েছেন। চার্লির হাসি, কথাবার্তা এবং বহির্মুখী আচরণের মধ্যে এক ধরনের ভঙ্গুরতা রয়েছে। তাঁর উপস্থিতি কেনেডির অন্ধকার জগতে সাময়িক মানবিক যোগাযোগের সম্ভাবনা তৈরি করে, যদিও সেই সম্ভাবনাও নিরাপদ নয়। রাহুল ভাটের সংযত, প্রায় নিষ্প্রাণ শরীরী অভিনয়ের পাশে সানি লিওনের এই অস্থির জীবন্ত উপস্থিতি ছবিটির আবেগগত বৈপরীত্যকে আরও তীক্ষ্ণ করে।
চরিত্রের এই বিচ্ছিন্নতাকে কাশ্যপ রঙের মাধ্যমেও নির্মাণ করেছেন। ‘কেনেডি’কে neon noir বলা হলেও নিয়নের ব্যবহারকে কেবল নোয়ার ঘরানার প্রচলিত নান্দনিকতা হিসেবে দেখা যথেষ্ট নয়। ক্লাসিক্যাল ফিল্ম নোয়ারে আলো-ছায়ার তীব্র বৈপরীত্য নৈতিক অনিশ্চয়তা এবং চরিত্রের মানসিক সংকটকে দৃশ্যমান করত। নিও-নোয়ারে সেই ভাষা রং, আধুনিক নগরায়ণ এবং কৃত্রিম আলোর উৎসের মাধ্যমে নতুন মাত্রা পেয়েছে। ‘কেনেডি’র নিয়ন আলো সেই ঐতিহ্যেরই সমকালীন ভারতীয় রূপান্তর। এখানে কৃত্রিম আলো সূর্যালোকের বিকল্প হয়ে ওঠে। মানুষ প্রকৃত আলোর বদলে বিজ্ঞাপন, ব্যবসা এবং রাতের অর্থনীতির আলোয় বেঁচে থাকে। সবুজাভ আলোর মধ্যে এক ধরনের পচনশীল পরিবেশের অনুভূতি, আর নীলের মধ্যে শীতল বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়। রঙের অর্থ অবশ্য সর্বত্র এক নয়; দৃশ্যের বিন্যাস ও প্রেক্ষাপটেই তার তাৎপর্য নির্ধারিত হয়। তবু ছবিটির সামগ্রিক রংবিন্যাস একটি ক্লান্ত, অস্বাস্থ্যকর নগরজীবনের অনুভূতি নির্মাণ করে।
রিডলি স্কটের ‘ব্লেড রানার’ কিংবা ওয়ং কার-ওয়াইয়ের ‘ফলেন অ্যাঞ্জেলস’-এর কথা এই জায়গায় মনে পড়তে পারে। কৃত্রিম আলো, নগর-নিঃসঙ্গতা এবং বিচ্ছিন্ন মানুষের সম্পর্ক নিয়ে এই চলচ্চিত্রগুলির নিজস্ব অনুসন্ধান রয়েছে। তবে কাশ্যপের বিশেষত্ব হলো, তিনি সেই আন্তর্জাতিক নোয়ার ভাষাকে মুম্বাইয়ের অপরাধ-রাজনীতি এবং প্রশাসনিক ক্ষমতার বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত করেছেন। ফলে নিয়ন এখানে কেবল স্টাইল নয়; একটি সমাজের বহিরঙ্গ উজ্জ্বলতার আড়ালে লুকিয়ে থাকা নৈতিক অন্ধকারের দৃশ্যগত ভাষা।
এই আলোকবিন্যাসের সঙ্গে ছবিটির সম্পাদনার ছন্দও সম্পর্কিত। সমসাময়িক বহু ভারতীয় থ্রিলারে দ্রুত কাট, ঘন ঘন দৃশ্যান্তর এবং উত্তেজনাপূর্ণ আবহসংগীতের মাধ্যমে আখ্যানকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। ‘কেনেডি’ অনেক ক্ষেত্রে সেই প্রত্যাশা ভেঙে দেয়। কিছু দৃশ্য দীর্ঘায়িত হয়, কোথাও সময়ের স্বাভাবিক ধারাবাহিকতা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, আবার কোথাও ঘটনার তুলনায় অপেক্ষা বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। চলচ্চিত্রতত্ত্বের subjective temporality বা ব্যক্তিনির্ভর সময়ের ধারণায় এই সময়বোধকে ব্যাখ্যা করা যায়। মানুষের মানসিক অভিজ্ঞতায় সময় সবসময় রৈখিক নয়। বিশেষত ট্রমা, অপরাধবোধ এবং স্মৃতির পুনরাবৃত্তি বর্তমানের অভিজ্ঞতাকে বদলে দিতে পারে। কেনেডির বিচ্ছিন্ন সময়বোধকে সেই মানসিক অবস্থার চলচ্চিত্রিক প্রকাশ হিসেবে পড়া সম্ভব। যদিও একে সরাসরি PTSD-র ক্লিনিক্যাল উপস্থাপনা বলা ঠিক হবে না।
কাশ্যপের সম্পাদনায় এই ভাঙাচোরা সময় দর্শককে চরিত্রের মানসিক অবস্থার কাছে নিয়ে যায়। আমরা শুধু ঘটনা অনুসরণ করি না; তাঁর অপেক্ষা, ক্লান্তি এবং অনিশ্চয়তার মধ্যেও অবস্থান করি। কিছু দৃশ্যের দীর্ঘতা অবশ্য আখ্যানের গতি দুর্বল করে বলেও মনে হতে পারে। কিন্তু সেই সীমাবদ্ধতার মধ্যেও —দ্রুত উত্তেজনার বদলে অস্তিত্বগত অবসাদকে অনুভব করানো সচেতন নানন্দিনিক সিদ্ধান্তের অভিপ্রায়।
শব্দ ও সংগীতের ব্যবহার এই অভিজ্ঞতাকে আরও গভীর করে। কাশ্যপের পূর্ববর্তী চলচ্চিত্রগুলিতে সংগীত প্রায়ই আখ্যানের সমান্তরালে স্বাধীন সাংস্কৃতিক ভাষা তৈরি করেছে। ‘কেনেডি’র শ্রবণ-অভিজ্ঞতা তুলনায় অনেক বেশি সংযত ও অস্বস্তিকর। এখানে পরিবেশের শব্দ, দূরবর্তী সাইরেন, অস্পষ্ট কথোপকথন এবং হঠাৎ নেমে আসা নীরবতা বিশেষ গুরুত্ব পায়। প্রচলিত থ্রিলারে আবহসংগীত দর্শককে প্রায়ই নির্দেশ করে কখন ভয় বা উত্তেজনা অনুভব করতে হবে। ‘কেনেডি’তে শব্দ ও দৃশ্যের সম্পর্ক অনেক সময় সেই প্রত্যাশাকে অস্বীকার করে।
চলচ্চিত্রতাত্ত্বিক মিশেল শিয়োঁর audio-vision ধারণা অনুসারে, শব্দ কেবল ছবির সহায়ক নয়; দৃশ্যের অর্থ নির্মাণেও সক্রিয়। ‘কেনেডি’তে একটি ফাঁকা রাস্তা দূরের সাইরেনের কারণে অদৃশ্য বিপদের সম্ভাবনা বহন করে, আবার একটি নিঃশব্দ ঘর চরিত্রের মানসিক শূন্যতাকে স্পষ্ট করে তোলে। এখানে নীরবতা শব্দের অনুপস্থিতি নয়, বরং অর্থ নির্মাণের একটি স্বতন্ত্র উপাদান। ফলে ‘কেনেডি’র সংগীত ও শব্দজগৎ চরিত্রকে নায়কোচিত মর্যাদা দেয় না। বরং তাঁর নিঃসঙ্গতাকে আরও প্রকট করে। ‘দেব.ডি’ যদি বিদ্রোহের, ‘গুলাল’ রাজনৈতিক ক্রোধের এবং ‘গ্যাংস অফ ওয়াসিপুর’ সামাজিক ইতিহাসের সাউন্ডস্কেপ হয়, তাহলে ‘কেনেডি’কে বলা যায় অস্তিত্বগত ক্লান্তির সাউন্ডস্কেপ।
এখানেই ছবিটির নোয়ার পরিচয় আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। ফিল্ম নোয়ারের মূল শক্তি শুধু অপরাধ, অন্ধকার কিংবা রহস্যে নয়; তার নৈতিক অনিশ্চয়তায়। প্রচলিত অপরাধকাহিনিতে আইন ও অপরাধের মধ্যে একটি স্পষ্ট বিভাজন থাকে। নোয়ার সেই বিভাজনকে প্রশ্ন করে। আইনরক্ষক নিজেই অপরাধী হতে পারেন, অপরাধী সহানুভূতির যোগ্য হয়ে উঠতে পারেন, আবার আইনগত বৈধতা নৈতিক ন্যায়বিচারের সমার্থক নাও হতে পারে।
‘কেনেডি’ এই নৈতিক অনিশ্চয়তাকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার প্রশ্নে নিয়ে যায়। একজন প্রাক্তন পুলিশকর্মী, যিনি সরকারি নথিতে মৃত, তিনিই আবার ক্ষমতার অন্ধকার পরিসরে সক্রিয়। ফলে প্রশ্ন ওঠে—আইন প্রয়োগকারী ব্যবস্থাই যখন অপরাধের পদ্ধতি গ্রহণ করে, তখন অপরাধের সংজ্ঞা কে নির্ধারণ করে? আর রাষ্ট্রের প্রয়োজনে যদি একজন মানুষের পরিচয় মুছে ফেলা যায়, তাহলে সেই মানুষের ওপর সংঘটিত অন্যায়ের বিচার কোন আইনি বা নৈতিক পরিসরে সম্ভব?
কাশ্যপ এই প্রশ্নগুলির সহজ উত্তর দেন না। কেনেডির প্রতি দর্শকের সহানুভূতি তৈরি হলেও তাঁর সহিংসতার দায় মুছে যায় না। তিনি একই সঙ্গে ভুক্তভোগী এবং অপরাধী। এই দ্বৈত অবস্থান দর্শককে একটি অস্বস্তিকর নৈতিক জায়গায় দাঁড় করায়, যেখানে কোনো চরিত্রকে সম্পূর্ণ নির্দোষ কিংবা সম্পূর্ণ দোষী বলে চিহ্নিত করা কঠিন।
তবে ‘কেনেডি’র রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে স্বীকার করার অর্থ তার সমস্ত শিল্পগত সিদ্ধান্তকে প্রশ্নাতীত বলে মেনে নেওয়া নয়। ছবিটির আখ্যানগত অস্পষ্টতা সর্বত্র সমানভাবে কার্যকর হয়নি। কিছু দৃশ্যের দীর্ঘতা মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা তৈরির বদলে পুনরাবৃত্তির অনুভূতি দেয়। কখনো রাজনৈতিক বক্তব্যের তুলনায় তার নাটকীয় বিকাশ সীমিত মনে হয়। এই সীমাবদ্ধতাগুলি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ একটি চলচ্চিত্রের তাত্ত্বিক সম্ভাবনা এবং তার শিল্পগত সাফল্য সর্বদা সমার্থক নয়।
তবু ‘কেনেডি’ কাশ্যপের চলচ্চিত্রজীবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক। এটিকে তাঁর পুরনো রূপে প্রত্যাবর্তন বলা যায়, কিন্তু আরও যথাযথভাবে বলা উচিত, এটি তাঁর পরিচিত চলচ্চিত্রভাষার পুনর্বিন্যাস। ‘ব্ল্যাক ফ্রাইডে’র ইতিহাস অনুসন্ধান, ‘দেব.ডি’র সাংস্কৃতিক বিদ্রোহ, ‘গুলাল’-এর রাজনৈতিক ক্রোধ এবং ‘গ্যাংস অফ ওয়াসিপুর’-এর ক্ষমতার উত্তরাধিকার—এই সমস্ত অভিজ্ঞতা ‘কেনেডি’তে এসে যেন এক গভীর ক্লান্তির মধ্যে স্থির হয়।
এই কারণেই ‘কেনেডি’কে নিছক একটি রাজনৈতিক থ্রিলার হিসেবে সীমাবদ্ধ রাখা যায় না। এটি আধুনিক রাষ্ট্রের ক্ষমতা, মানুষের স্মৃতি এবং অস্তিত্বের স্বীকৃতি নিয়ে নির্মিত এক অস্বস্তিকর চলচ্চিত্র-পাঠ। স্মৃতিও এখানে মুক্তির নিশ্চয়তা দেয় না। বরং তা হয়ে ওঠে এক ধরনের শাস্তি। কেনেডি তাঁর অতীত ভুলতে পারেন না, আবার সেই অতীতে ফিরে যাওয়ার অধিকারও তাঁর নেই। তিনি নিজের জীবনের সাক্ষী, কিন্তু সেই জীবনের বৈধ অধিকারী নন। এইখানেই ‘কেনেডি’র সবচেয়ে তীক্ষ্ণ রাজনৈতিক পর্যবেক্ষণ—আধুনিক ক্ষমতার ভয়াবহতা শুধু মানুষকে হত্যা করার সামর্থ্যে নয়; একজন জীবিত মানুষকে সামাজিক ও প্রশাসনিকভাবে অদৃশ্য করে দেওয়ার ক্ষমতাতেও।
একজন মানুষকে রাষ্ট্র যখন ইতিহাস থেকে মুছে দিতে চায়, তখন তাঁর স্মৃতিই কি হয়ে ওঠে সেই রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে শেষ অবশিষ্ট সাক্ষ্য?
আরও এক ধাপ এগিয়ে প্রশ্ন করা যায়—যে ব্যবস্থা একজন জীবিত মানুষকে মৃত ঘোষণা করেও নিজের প্রয়োজনে ব্যবহার করতে পারে, সেই ব্যবস্থার নৈতিক অস্তিত্বই বা কতটা জীবিত?
অনুরাগ কাশ্যপ এই স্ববিরোধিতার কোনো সহজ সমাধান দেন না। বরং দর্শককে এমন এক প্রশ্নের সামনে রেখে যান, যা চলচ্চিত্রের পরিসর ছাড়িয়ে আধুনিক রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্ককেও স্পর্শ করে।
