লক্ষ্মী মেয়ে দস্যি ভারী….. জাগরী
শিরোনাম শুনতে সুকুমারীয় হলেও এই ব্যাপারে লিখতে গেলেই সব কেমন গুলিয়ে যায়। আদতে ছেলেরা “দস্যি” হবে, মেয়েরা “লক্ষ্মী” এটাই তো দস্তুর। তবে বদলান সময়ে দস্যি-লক্ষ্মীর সংজ্ঞাও বদলেছে বৈকি।
আগেকার দিনে মেয়েদের পৃথিবী ছিল চার দেওয়ালে বাঁধা। তাই মেয়েদের বলা হতো “ঘরের লক্ষ্মী”, শ্বশুরগৃহে নববধূর ভাগ্য নির্ধারণ হতো তার “লক্ষ্মীত্বের” ওপর। অবশ্য এখন আর সেসবের গল্প নেই। বরং মেয়েরা এখন দশভুজা রূপে বিস্তার করছেন তাঁদের পৃথিবী। মেয়েদের ‘লক্ষ্মী’ থেকে ‘দস্যি’ হয়ে ওঠা ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হচ্ছে।
ভাবুন তো, “দঙ্গল” সিনেমাটার গল্প। মহাবীর সিং ফোগাট যদি ওঁর মেয়েদের কুস্তিগীর বানানোর স্বপ্ন না দেখতেন তবে আমরা থোড়াই “ফোগট সিস্টার্স” দের পেতাম?
হয়তো ‘লক্ষ্মী মেয়ে’ হিসাবে সমাজের সুনাম কুড়তেন ওঁরা, কিন্তু দস্যি হতে পেরেছিলেন বলেই তো আজ বিশ্বখ্যাত। আবার ধরুন, এভারেস্ট জয়ী পিয়ালী বসাক। তিনি দস্যি না হলে পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গজয় করতে পারতেন ? সাংঘাতিক প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে যে দস্যিপনা দেখিয়েছেন তার জন্য পিয়ালীদেবী প্রণম্য।
তবে দস্যি মেয়েরাই কি শেষমেশ বিশ্বজয়ী? লক্ষ্মী মেয়েরা কি একেবারেই ফেলনা? মোটেই না। ইতিহাস সাক্ষী আছে এরকম অনেক লক্ষ্মী মেয়েদের যাঁরা অন্তঃপুরবাসিনী থেকেও এনেছেন এমন এক দৃষ্টান্ত যা আজও আমাদের অবাক করেন। শুরুতেই মনে আসে সেই সব অনাম্নী লক্ষ্মীদের যাঁরা স্বাধীনতা সংগ্রামে নিয়েছিলেন পরোক্ষ ভূমিকা। বিপ্লবীদের আশ্রয় দেওয়া, গুরুত্বপূর্ণ খবর সরবরাহ, অস্ত্র পরিবহনে এই মা লক্ষ্মীদের ভূমিকা কিছু কম ছিল না। অথবা লেডি অবলা বসু, আচার্য জগদীশচন্দ্র বসুর সুযোগ্য সহধর্মিণী, যাঁর অনুপ্রেরণা না থাকলে এই মহান বিজ্ঞানসাধককে হয়তো আমরা পেতাম না। বক্সার মেরি কম, যিনি স্বামী-সন্তান-সংসার সামলেও ছিনিয়ে এনেছেন অলিম্পিকের পদক। এঁদের দেখে যেন দস্যি-লক্ষ্মীর মধ্যে সীমারেখা মিলেমিশে যায়।
অনেক বাইরের দুনিয়ার কথা বলে ফেললাম। এবার ঘরের কথা বলি। আমার মাতৃদেবী। বাড়ির ছোট মেয়ে, সবার আদরের। ছোট থেকেই শান্ত স্বভাব ছিল। জীবিকার তাড়নায় শেষমেশ নিলেন কলকাতা পুলিশের চাকরি। বাড়ির গুরুজনদের মাথায় বজ্রাঘাত। সেই শান্তশিষ্ট মেয়ে প্রায় পঁয়ত্রিশ বছর সুনামের সঙ্গে চাকরি করলেন, সংসার সামলালেন, আমায় বড় করলেন। ঘরের বাইরেও একটা বড় পরিবার গড়লেন l, যেখানে তিনি কারও “দিদি” কারও “ম্যাডাম”, কারও আবার মেন্টর। লক্ষ্মী মেয়ে যে দরকার পড়লে কত দস্যি হতে পারে তার উদাহরণ খুঁজতে দুনিয়া দেখার দরকার আছে কি?
জাগরী মানি / পিএইচডি স্কলার, জেভিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়, ওড়িশা |
বরানগরে বাড়ি। বেসরকারী সংস্থায় কর্মরত। নেশা একটু লেখালিখি, পাখিদের ছবি তোলা। প্রবল বইপোকা এবং কলকাতাপ্রেমী।


