ব্রেখট আর শেক্সপিয়ারে করমর্দন – মৃত্তিকা রাই
সাতের দশকের গোড়ায় যখন উৎপল দত্ত পিপলস লিটল থিয়েটার গ্রুপ বা পিএলটি গড়লেন, তখন একটা প্রশ্ন নাট্যমহলে উঠেছিল যে এই নতুন দল কি আর একটা ‘অঙ্গার’, ‘ফেরারী ফৌজ’, ‘কল্লোল’ বা ‘তীর’ করতে পারবে? থাকবে সেই তেজ? জেল ফেরত, আর্থিকভাবে ঋণগ্রস্ত, ভাঙা দলের উৎপল দত্তের? এরপরই জন্ম নিল ‘টিনের তলোয়ার’। যাকে সত্যজিৎ রায় বলবেন, ‘হাইট অফ ইন্ডিয়ান থিয়েটার’। তার কিছু আগে ‘ঠিকানা’ আর ‘সূর্যশিকার’। এই নতুন দলেই। আবার সূর্যের সেই তেজ ফিরে এল।
এবার প্রশ্ন উঠল, সেই পুরোনো রাজনৈতিক দাপটে আর সাহসে কি ফিরতে পারবেন উৎপল দত্ত? বিশেষত সাতের দশকের গোড়ায় এই বাংলায় কমিউনিস্ট পার্টি যেখানে তিনটে বড় টুকরোতে ভাঙা আর উৎপল দত্ত তাদের ভেতর দুটো টুকরোর মধ্যে তখন অমীমাংসিত।
এরপর এর উত্তর উৎপল নামক অগ্নি দিয়ে চলল সাতের দশকের মধ্যভাগ পর্যন্ত তাঁর বিখ্যাত রাজনৈতিক ট্রিলজি দিয়ে। শুরু ১৯৭২এ হেমন্ত বসু হত্যাকান্ড নিয়ে মঞ্চস্থ করা ‘ব্যারিকেড’ দিয়ে। তার পিছু পিছুই এল ‘দুঃস্বপ্নের নগরী’, যা গভীরভাবে সে সময় প্রভাবিত করেছিল সত্যজিৎ রায়কে। অনেক পরে যখন ‘হীরক রাজার দেশে’ করবেন তখন এর ছড়ায় ছন্দ মেলানো সংলাপকে নেবেন চিত্রনাট্যে হীরক রাজার সপারিষদ সংলাপে, যেমনটা ছিল উৎপলের নাটকেও। আর এর পরে এল ‘এবার রাজার পালা’। ১৯৭৭এর জানুয়ারি মাসে কলামন্দিরে প্রথম শো হল। তার আগে অবশ্য উৎপল দত্তের নির্দেশনায় ১৯৭৫ সালে পিএলটি মঞ্চস্থ করেছে শেক্সপিয়ারের ‘ম্যাকবেথ’। দেশে আভ্যন্তরীণ জরুরী অবস্থা জারির বিরুদ্ধে সেও ছিল এক সোচ্চার রাজনৈতিক প্রতিবাদ। ক্ষমতালীপ্সু শাসককে আমলাদের দুষ্ট পরামর্শের প্রতিরূপ হয়ে উঠত মঞ্চে তিন ডাইনির পরামর্শ। ১৬০৬ সালের ব্রিটিশ নাটক হয়ে উঠেছিল কলকাতা ১৯৭৫এর নাটক।
এই পথ বেয়েই পিএলটি নিয়ে এসেছিল তার এর পরের নাটক ‘এবার রাজার পালা’।
‘এবার রাজার পালা’ উৎপল দত্ত লিখেছিলেন বের্টোল্ট ব্রেখটের ১৯৪১ সালে লেখা নাটক ‘দ্য রেজিস্টেবল রাইজ অফ আর্টুরো উই’ অবলম্বনে। ঐ জার্মান নাটকে স্বৈরতন্ত্রী শাসক আর্টুরো উইয়ের ভেতর ছিল স্বয়ং অ্যাডলফ হিটলারের ছায়া। ব্রেখটের আর্টুরো উই তৈরি হয়েছিল কৃষ্ণ কৌতুক বা ড্রাই হিউমারের আদলে যার কেন্দ্রবিন্দু আর্টুরো উই। উৎপলের বঙ্গীকরনে এই চরিত্রের নাম বঙ্কু। যে প্রথম জীবনে গ্রামীন যাত্রাদলের হাস্যকর এক অভিনেতা আর পরের জীবনে কাকার সম্পত্তি পেয়ে এক হঠাৎ-বনে-যাওয়া-শাসক। নাটকের দুটি পর্বে সে দু’রকম। এক আদ্যোপান্ত উচ্চাকাঙ্ক্ষী শয়তান। কিন্তু একইসঙ্গে যেন এক ভাঁড়। ঠিক যেভাবে ‘দ্য গ্রেট ডিক্টেটর’এ হিটলারকে চিত্রায়িত করেছিলেন চার্লি চ্যাপলিন। এই উৎপলনাট্যে সেই সিনেমার ছায়া আছে আর্টুরো উই চরিত্রের গড়নে। বিশেষত দ্বিতীয় পর্বে। আবার অনেকে মনে করেন আছে উইলিয়াম শেক্সপিয়ারের ‘ম্যাকবেথ’ নাটকের ছায়া। ম্যাকবেথ চরিত্রের অনৈতিক উচ্চাভিলাষ ও স্বৈরতন্ত্রের পথে তার পদক্ষেপ যেমন তার অন্তিম নিয়তিকে ডেকে আনে, এখানে একই ঘটনা ঘটে আর্টুরো উইয়ের জীবনে। ‘ম্যাকবেথ’ করতে করতেই কি উৎপল দত্তের মাথায় এসেছিল ব্রেখটের এই নাটক করার কথা?
‘আর্টুরো উই’ নাটকের শিরোনামটি বিশেষভাবে লক্ষনীয়। মূল চরিত্রের নামে ব্রেখট এই নাটকের নাম ‘আর্টুরো উই’ রেখেই সমাধা করেন নি। তিনি নাম রেখেছেন ‘দ্য রেজিস্টেবল রাইজ অফ আর্টুরো উই’। অর্থাৎ আর্টুরো উইয়ের এমন এক উত্থানের গল্প, যা ‘রেজিস্টেবল’ ছিল অর্থাৎ যাকে চাইলে ঠেকানোই যেত। সমকালীন জার্মান ‘ওয়ার্কিং ক্লাস’এর প্রতি এ’ছিল ব্রেখটের সরাসরি সমালোচনা। সেই একই সমালোচনা ছিল উৎপলেরও। সমকালের সহনাগরিকদের প্রতি।
নাটকের প্রথম দৃশ্যে বঙ্কুকে দেখা যায় এক কমিকাল চরিত্র হিসেবে। তার পেছনে যাত্রা দলের সবার লাগার নানা সিকোয়েন্স দেখলে তার প্রতি সহানুভূতিই জাগবে। এখানে ব্রেখট ও উৎপলের সেই বারবার সচেতন করা ধ্বনি আর একবার সূচিত হয়, ফ্যাসিস্টরা তার নিজস্ব বাহিনীর বর্হিভাগে এক সুরক্ষা বলয়ের মতো ব্যবহার করে লুম্পেন প্রলেতারিয়েতদের। ফলে প্রকৃত প্রলেতারিয়েত আর লুম্পেন প্রলেতারিয়েতদের মধ্যে ফারাকটুকু যেন বোঝে গণতন্ত্রীরা। সচেতন থাকে।
এই নাটক এই কথাকে দাগিয়ে দেওয়ার নাটক।
আচমকা এক পট পরিবর্তন ঘটে প্রথম অঙ্কের শেষে। ক্রমশ দেখা যায় মেচগি নামক স্টেটের শাসক হিসেবে উত্তরাধিকার পায় বঙ্কু। এখান থেকেই শুরু হয় তার স্বৈরশাসনের পালা। দ্বিতীয়ার্ধের একেবারে সূচনা থেকেই সে যেন ‘হিটলার’এর প্রতিরূপ। চেহারায়, পোশাকে, আদবকায়দায়, চরিত্রে, বাচনভঙ্গীতে। আর গোঁফ তো একেবারেই হিটলারের ‘সম্পত্তি’ চুরি করা, সেই চ্যাপলিনের করা মজার বক্রোক্তির মতো। এই অংশটিতে এই চরিত্রকে দারুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন বিশ্বজিৎ সরকার। এই শহর কয়েক দশক আগে এই চরিত্রে খোদ মার্টিন ভুটকের মতো অভিনেতাকে দেখে ফেলেছে, যখন স্বয়ং ব্রেখটের স্থাপিত নাট্যদল ‘বার্লিনের অঁনসম্বল’ রবীন্দ্র সদনে এই প্রযোজনা মঞ্চস্থ করতে এসেছিল। এই চরিত্র উৎপল দত্তের আমলে করতেন সমীর মজুমদার, তৎকালীন পিএলটি’র সবচেয়ে দাপুটে নট। তবু এসবের স্মৃতি সামলেও বিশ্বজিৎ সরকার অমলিন থাকবেন। বস্তুত তিনি এবং গোটা অভিনয়দল এখানে ব্রেখটিয় নৈরাত্ম্যরীতির অভিনয়ের চুড়ান্ত নিদর্শন। বঙ্কুর কাকার চরিত্রে কমলেশ চক্রবর্তী আর চামারিয়ার চরিত্রে প্রতাপ সি ঘোষ, এই দুই অভিজ্ঞ দক্ষ নট দেখান উৎপলীয় অভিনয়-রীতি আজও আঙ্গিক হিসেবে কতটা শক্তিশালী। প্রসঙ্গত এই চামারিয়া চরিত্রটিই পূর্ববর্তী প্রযোজনায় করতেন স্বয়ং উৎপল দত্ত।
মঞ্চসজ্জায় কোনও আধিক্য নেই। পেছনে কেবল একটি অনড় বড় প্ল্যাটফর্ম যাত্রার রস্ট্রামের মতো। কখনও সখনও সেখানে চেয়ার-টেবিল-পোডিয়াম বা কাঁচের দেওয়ালের সংক্ষিপ্ত সাজেশন। আর একটি ডিম্বাকৃতি আয়না, যা এক বড় নাট্যমুহুর্ত গড়ে দেয়। ‘লার্জার দ্যান লাইফ’ প্রাণবন্ত অভিনয় আর চরম গতিশীল কম্পোজিশন এই নাটককে ছুটিয়ে নিয়ে চলে। মজার কথা হল প্রথম অঙ্ক যেমন একটি দৃশ্যেই ধরা, দ্বিতীয় অঙ্ক ঠিক এর উল্টো। একাধিক ছোট ছোট দ্রুত ধাবমান দৃশ্যের সমষ্টি। সেখানে বঙ্কুর ‘রাইজ’ ও ‘ফল’ ক্রমান্বয়ে বিধৃত। যখন সে অপ্রতিহত, তখনই এক আয়না রূপকথার মতো গ্রাস করে তাকে। এই সব চিরকালীন রূপকথা-লোকগাথা-ছড়াগানকে ব্যবহারে ব্রেখট তো অপ্রতিদ্বন্দ্বী। তবে শেষে এই নাটকের একেবারে শেষ সংলাপ হিসেবে যে উৎপল বেছে নেন চামারিয়া নামক একচেটিয়া ব্যবসাদারকে, এর থেকে এই নাটক যেন একেবারে শেষে পৌঁছে এক নতুন দৃষ্টিকোণ পায়। আধুনিক যুগে সব পুরাণ-মহাকাব্য যেন লেখা হবে বুর্জোয়াদের প্রয়োজনে। দুটি মহাযুদ্ধের ইতিহাস তো তাই বলছে।
এই নাটক জন্মকালে পরিচালনা করেছিলেন স্বয়ং নাটককার উৎপল দত্ত। এই নাটক আবার যখন বছর দশেক আগে ফিরিয়ে আনা হল তখন এটিকে প্রস্তুত করেছিলেন দীপ্তেশ বন্দ্যোপাধ্যায়, একদা উৎপলবাবুর সহ-নির্দেশক। এখন তিনিও প্রয়াত। বিশ্বজিৎ সরকার এটি চালনার দায়িত্বে। পিএলটি আজও এই অর্ধশতবর্ষী নাটককে এগিয়ে নিয়ে চলেছে। কারন এই নাটকের মৃত্যু নেই। চলমান রাজনীতিতে বারবার ফ্যাসিস্ট শক্তির উত্থান এই নাট্যকে প্রাসঙ্গিকতা দান করে চলেছে।
শেক্সপিয়ারের উদ্ধৃতি উল্টো করে বললে, অল দ্য স্টেজ ইজ দ্য ওয়ার্ল্ড!


