পঞ্চম বর্ষ প্রথম সংখ্যা প্রবন্ধ
তবুও সুকান্ত
স্বপন রায়
২০২৬,পঃবাংলার সাহিত্য আবহে,বিশেষত কবিতার আবহে,কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য উধাও প্রায়।এমন কি মাধ্যমিকের পাঠ্য বই থেকেও তাঁকে বাদ দিয়ে দেওয়া হয়েছে।এটা আমাদের দুর্ভাগ্য যে রাজনীতির চতুর লোকজন ঠিক করে দেয় সিলেবাসে কে বা কারা থাকবে বা থাকবে না।সুকান্ত ঘোষিত বামপন্থী ছিলেন,সভ্য ছিলেন কমিউনিস্ট পার্টির।ত্রিপুরা এবং পঃবাংলা থেকে বামপন্থীরা অবসৃত,অতএব কবি সুকান্তও।কবিতার গুণ আর বিবেচ্য নয় আজকের ভারতে।
কবি সুকান্তকে তাঁর সময়কে এড়িয়ে গিয়ে বিচার করাটা ঠিক হবে না।তিনি সচেতনভাবেই সময়ের কবিতা লখেছেন।১৯৪০-এর দশকের কলকাতা ছিল রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতার এক উত্তপ্ত কেন্দ্র।ভারত ছাড়ো আন্দোলন,১৯৪৩-এ সঙ্ঘটিত বাংলার ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ ,কলকাতায় সাফাই কর্মী সহ বিভিন্ন শ্রমিকদের হরতাল এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রভাব,কবি সুকান্ত’র কবিতার ভাবনাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল।তাঁর কবিতা বিছিন্ন হতে আরম্ভ করল কাল্পনিক চেতনার অসীম-সীমার পরিসর থেকে।বাংলা-কবিতায় এল সামাজিক বাস্তবতার নির্মোহ উচ্চারণ।এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল মার্ক্সবাদী চিন্তাধারার উত্থান,যা বাংলার কবিদের সংবেদনশীল মননে গভীর প্রভাব ফেলেছিল।
২০২৬। সারা দুনিয়া জুড়েই যুদ্ধের দামামা শুধু বাজছে না,বাজার দখলের তীব্র লড়াই শুরু হয়ে গেছে।সুকান্ত’র কবিতা আবার প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে।কবি সুকান্ত এই আর্থ-সামাজিক বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে আরেকবার উল্লেখ্য হয়ে উঠছেনঃ
‘পরের জন্যে যুদ্ধ করেছি অনেক,
এবার যুদ্ধ তোমার আর আমার জন্যে।
প্রশ্ন করো যদি এত যুদ্ধ ক’রে পেলাম কী? উত্তর তার—
তিউনিসিয়ায় পেয়েছি জয়,
ইতালীতে জনগণের বন্ধুত্ব,
ফ্রান্সে পেয়েছি মুক্তির মন্ত্র;
আর নিষ্কণ্টক বার্মায় পেলাম ঘরে ফেরার তাগাদা।
আমি যেন সেই বাতিওয়ালা,
যে সন্ধ্যায় রাজপথে-পথে বাতি জ্বালিয়ে ফেবে
অথচ নিজের ঘরে নেই যার বাতি জ্বালার সামর্থ্য,
নিজের ঘরেই জমে থাকে দুঃসহ অন্ধকার। (প্রিয়তমাসু)
স্থান,কাল,পাত্র বদলে গেছে।তথাকথিত ‘ইউনিপোলার’ পৃথীবিও আজ বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত।যুদ্ধের ধরণ পাল্টেছে কিন্তু সাধারণ মানুষের বাস্তবতা তেমন একটা পাল্টায়নিঃ’অথচ নিজের ঘরে নেই যার বাতি জ্বালার সামর্থ্য,/নিজের ঘরেই জমে থাকে দুঃসহ অন্ধকার’। আজকের দুনিয়ায় এই ‘অন্ধকার’ আরও গভীর হয়ে উঠছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের যন্ত্রণা ও ট্রমা তো ছিলই,সঙ্গে ছিল পরাধীন ভারতে স্বাধীনতার লড়াই।কমিউনিষ্টরা এই লড়াইতে যোগ দিলেন শ্রমিক,কৃষক সহ সাধারণ মানুষের এজেন্ডা নিয়ে।ভুলে গেলে চলবে না যে সুকান্ত একুশে পা রেখেই শেষ নিশ্বাস ফেলেছিলেন।একুশ,এক রোমাঞ্চকর যৌবনের প্রবেশ দ্বার আর কবি মাত্রই রোমান্টিক।সুকান্তও ব্যতিক্রম ছিলেন না।‘উপক্রমণিকা’কে উল্লেখ করে লেখা চিঠিগুলোয় প্রেমিক সুকান্ত আলগোছে ধরা দেন।আবার ওই সময়ের আর্থ-সামাজিক এবং রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিদ্ধ কমিউনিস্ট হয়ে ওঠা চেতনাদৃপ্ত সুকান্ত নিজেকে দ্রুত মুছে দিচ্ছিলেন সমষ্টির দাবীর কাছেঃ
‘কুয়াশা কাটছে, কাটবে আজ কি কাল,
ধুয়ে ধুয়ে যাবে কুৎসার জঞ্জাল,
ততদিন প্রাণ দেব শক্রর হাতে,
মুক্তির ফুল ফুটবে সে সংঘাতে।
ইতিহাস! নেই অমরত্বের লোভ,
আজ রেখে যাই আজকের বিক্ষোভ।’ (বিক্ষোভ)
সুকান্ত’র পরিপক্ক ছান্দসিকতা অবাক করে দেয়।সুকান্ত যখন কবিতা লিখতে শুরু করেছেন তার আগেই ১৯২৪ সালে সুররিয়াল মেনিফেস্টো ফ্রান্সে বেরিয়ে গেছে।এদের মধ্যে দুটি গ্রুপ ছিল।ইভান গল এবং আন্দ্রেঁ ব্রেতো দুটি গ্রুপের নেতৃত্বে ছিলেন।আন্দ্রেঁ ব্রেতোঁ আর একটি মেনিফেস্টো প্রকাশ করেন ১৯২৯ সালে এবং শেষেরটি ১৯৪২ সালে যেখানে ‘সুররিয়াল’ আন্দোলনকে যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে ‘আপডেট’ করা হয় এবং এর ফলেই লুই আরাগঁ,পল এলুয়ের সহ অনেক কবিই সমাজতন্ত্রের ভিতে দাঁড়িয়ে চেতনাকে চালিত করে গদ্য,কবিতা লিখতে থাকেন।এই সাহিত্য ভাবনাকেই বলা হল সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতার ধারা,যা সারা পৃথিবী জুড়েই আলোড়ন ফেলেছিল।সুকান্ত এই ধারারই এক উজ্জ্বল কবি,অকালে চলে গেলেও যে কবিতাগুলি রেখে গেছেন,তার আবেদন ফুরিয়ে যাওয়ার নয়। প্রতিটি সামাজিক ও আর্থিক সঙ্কটে,সেই সঙ্কটে বিপর্যস্ত মানুষের হাহাকার,প্রতিরোধ ও আন্দোলনে সুকান্ত বারংবার বেঁচে ওঠেন।সরকার পাঠ্য বই থেকে বাদ দিলেও,হৃদয়ে তো বারবার অনুরণন তুলবে তাঁর এমন সব কবিতা এবং কবিতাংশগুলিঃ
১.
আকাশে আকাশে ধ্রুবতারায়
কারা বিদ্রোহে পথ মাড়ায়
ভরে দিগন্ত দ্রুত সাড়ায়,
জানে না কেউ।
উদ্যমহীন মূঢ় কারায়
পুরনো বুলির মাছি তাড়ায়
যারা, তারা নিয়ে ঘোরে পাড়ায়
স্মৃতির ফেউ॥ (কবিতার খসড়া)
২.
ভারতবর্ষ, তন্দ্রা ক্রমশ ক্ষয়
অহল্যা। আজ শাপমোচনের দিন;
তুষার-জনতা বুঝি জাগ্রত হয়—
গা-ঝাড়া দেবার প্রস্তাব দ্বিধাহীন।
অহল্যা, আজ কাঁপে কী পাষাণকায়!
রোমাঞ্চ লাগে পাথরের প্রত্যঙ্গে;
রামের পদম্পর্শ কি লাগে গায়?
অহল্যা, জেনো আমরা তোমার সঙ্গে॥ (সূচনা/অংশ)
৩.
সামনে ধূম-উদ্গীরণরত কামান,
পেছনে খাদ্যশস্য আঁকড়ে-ধরা জনতা—
কামানের ধোঁয়ার আড়ালে আড়ালে দেখলাম,
মানুষ।
আর দেখলাম ফসলের প্রতি তাদের পুরুষানুক্রমিক
মমতা।
অনেক যুগ, অনেক অরণ্য, পাহাড়, সমুদ্র পেরিয়ে
তারা এগিয়ে আসছে: ঝল্সানো কঠোর মুখে।(কনভয়)
তিনটে কবিতার প্রকরণ,বক্তব্য কত আলাদা,তাই না? ওই অল্প বয়সে কবিতাকে এমন দক্ষ হাতে লিপিত করা ,বিচিত্র পথে চালিত করা,অসামান্য প্রতিভা ছাড়া হয় না।সুকান্ত রবীন্দ্রকালীন সময়ে কবিতা লিখেছেন।এটা খুবই অবাক করার মত একটা দিক যে সুকান্ত’র কবিতায় রবীন্দ্র-আবহ প্রায় নেই।এমন কি রবীন্দ্রনাথের কবিতাধারা থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য স্বয়ং জীবনানন্দ দাশেরও সময় লেগেছিল।সুকান্ত কিন্তু প্রথম থেকেই অন্য ধারা এবং উচ্চারণে প্রয়াসী।ওই সময়ে সারা দুনিয়া জুড়েই সাম্যবাদী চিন্তাধারা বিস্তারিত হচ্ছিল।আগেই বলেছি সুররিয়াল কবিতাধারার লুই আরাগঁ বা পল এলুয়ের,পোলিশ কবি সিস্তভ কামিল বাজিনিস্কি,ব্রিটেনের সিসিল ডে লিউইস,সোভিয়েত কবি,কন্সতানতিন সিনোনোভ,নিকোলাই আসায়েভ,উর্দুতে ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ, আলি সর্দার জাফরি,জোশ মাহিলাবাদী এবং বাংলায় সুভাষ মুখোপাধ্যায়,বিষ্ণু দে,রাম বসু,সমর সেন এবং সর্বোপরি কাজী নজরুল ইসলাম সহ সারা দুনিয়া জুড়েই সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতা কবিদের উদ্দীপিত করছিল,সুকান্তও ব্যতিক্রম ছিলেন না।ব্যতিক্রমী ছিল ওই স্বল্প আয়ুতেই লিখে ফেলা তাঁর বিভিন্ন আঙ্গিকের কবিতাগুলি,যা এখনও তাঁকে আলাদা করে দেয় অন্য কবিদের সঙ্গে।
সুকান্ত লিখলেন,‘বিপ্লব স্পন্দিত বুকে মনে হয় আমিই লেনিন’,লেখার পরে কয়েকটা দশক জুড়ে এই উচ্চারণ বৈপ্লবিক উদ্দীপনার সঙ্গে জড়িয়ে গেল।অন্যদিকে রূপকধর্মী কবিতাগুলি যেমন,দেশলাই কাঠি,সিঁড়ি,কলম,একটি মোরগের কাহিনী তখনকার বাংলা কবিতার আবহে ছিল একেবারেই ভিন্ন উচ্চারণ।আবার ‘রানার’ বা ‘ঠিকানা’র মত কবিতা যা সলিল চৌধুরী আর হেমন্ত মুখোপাধ্যায় বাংলার জনপ্রিয়তম গানে রূপান্তরিত করেছিলেন,হয়ত ওই দুটি কবিতার ভেতরে তাঁরা খুঁজে পেয়েছিলেন বাংলাভাষায় গান ও অভিনয়ের যথাযথ মিশ্রণ,যেমন ‘অপেরা’য় হয়ে থাকে।সুকান্ত এখানেও অনন্য।
কবি সুকান্ত কিশোরাবস্থায় চলে গেছেন,আর রেখে গেছেন তাঁর কালজয়ী কবিতাগুলি।তিনি কমিউনিস্ট ছিলেন।তখনকার গণ-আন্দোলনের সামনের সারিতে থাকতেন।অথচ ব্যক্তিগত পর্যায়ে এই সুকান্তই ছিলেন এক রোমান্টিক কিশোর,তাঁর একটি চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন, ‘বাস্তবিক, আমি কোথাও চলে যেতে চাই, নিরুদ্দেশ হয়ে মিলিয়ে যেতে চাই…কোনো গহন অরণ্যে কিংবা অন্য যে কোনো নিভৃততম প্রদেশে, যেখানে মানুষ নেই, আছে কেবল সূর্যের আলোর মতো স্পষ্টমনা হিংস্র আর নিরীহ জীবেরা আর অফুরন্ত প্রাকৃতিক সম্পদ।’
এই কবিই তো লিখবেন, ‘আর মনে ক’রো আকাশে আছে এক ধ্রুব নক্ষত্র/ নদীর ধারায় আছে গতির নির্দেশ,/অরণ্যের মর্মরধ্বনিতে আছে আন্দোলনের ভাষা, আর আছে পৃথিবীর চিরকালের আবর্তন’ (ঐতিহাসিক)।
সুকান্ত’র কবিতা ওই বয়সেই মানুষের বাইরের আবরণ ভেদ করে পৌঁছে যাচ্ছিল ভেতরের সুক্ষ্ম থেকে সুক্ষ্মতর অনুভবে। এটা বাংলা কবিতার দুর্ভাগ্য যে তিনি দীর্ঘজীবি হননি।কিন্তু তাঁর অনেক কবিতাই তাঁর বয়স,তাঁর সময় পেরিয়ে এখনো উজ্জ্বল হয়ে আছে।তেমনই একটি কবিতা দিয়ে লেখাটি শেষ করলাম।
‘হে মহাজীবন, আর এ কাব্য নয়
এবার কঠিন, কঠোর গদ্যে আনো,
পদ-লালিত্য ঝঙ্কার মুছে যাক
গদ্যের কড়া হাতুড়িকে আজ হানো!
প্রয়োজন নেই কবিতার স্নিগ্ধতা—
কবিতা তোমায় দিলাম আজকে ছুটি,
ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়:
পূর্ণিমা-চাঁদ যেন ঝল্সানো রুটি।’ ( হে মহাজীবন)
শেষ করার আগে একটি কথা, ‘পূর্ণিমা চাঁদ যে ঝলসানো রুটি’ এই উপমাটি বাংলা কবিতা থেকে কেউ কোনদিনও মুছে ফেলতে পারবে না। যতদিন বাংলাভাষা থাকবে এই পংক্তিটি বাংলা কবিতার অন্তর্গত রক্তবাহী ধমনীতে চিরকাল বইতে থাকবে।থাকবেই।

