‘যদ্দিন বাঁচি, তদ্দিন শিখি’ – সুপ্রিয় মিত্র
শেষ কবে আপনার ব্যাঙ্গমা-ব্যাঙ্গমীর সঙ্গে কথা হয়েছে? শেষ কবে ঘুম আসছে না বলে রাত্রি ও তার অন্ধকারকে আমরা সন্দেহ করেছি, আর ছুটে গেছি ছাদে বা রাস্তায়, চাঁদ-তারার কাছে ঘুমপাড়ানি গানের খোঁজে? শেষ কবে মানুষের প্রতি বিরক্ত বীতশ্রদ্ধ হয়ে আমরা ফিরে গিয়েছি নিজের খোলসে নয়, মানুষেরই কাছে?
অথচ, এদের নিয়েই তো আমরা দুনিয়াদারি শিখতে শুরু করলাম। কোনও শিক্ষক তো নয়ই, আমাদের প্রথম শেখাগুলো ছুঁয়ে আছে আদপে এক অরণ্য পশু, পাখি, গাছ, আবার অবাস্তব আষাঢ়ে প্রাণীরাও, এমনকী জড়বস্তুও— আমাদের রূপকথালোক। আমাদের মা-ঠাকুমাদের কাহিনি-আখ্যান, ঘুমপাড়ানি গান, আর গুঁড়িবয়সের ছবিভরা গল্পবইয়ের কাছে গিয়ে স্মৃতি ওল্টালে দেখতে পাব, সেখানে মানুষ প্রায় নেই। যদি বা থাকেও, তার ছোট রোল। কচ্ছপ হাই তুলে কথা বলছে, খরগোশ কান খুঁচিয়ে দেখাচ্ছে মস্তানি, হরিণের পিড়িং লাফ আর ছটফটানির ভাষা, জিরাফের উঁচুগলা কিন্তু জ্ঞান দিচ্ছেন গম্ভীর স্বরে পাতা চিবুতে চিবুতে। পিঁপড়ের দল গাইছে কোরাস, সবে মিলে করি কাজ। ভেবে দেখলে মনে হবে, আমাদের নৈতিকতার প্রাথমিক পাঠ যেন বা বনেরই সন্তান।
এখন আপনি একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলবেন, মানুষ তো প্রকৃতিটাকে, এই বন-জঙ্গল-পাহাড়-নদী সব নষ্টই করে দিল, শেষ করে দিল সব, আগামী প্রজন্মকে আর দেওয়ার কী আছে? এই প্রশ্ন এখন বারবার উচ্চারিত হয়। এই প্রশ্ন আরও প্রগাঢ় ভয়ংকর বিভীষিকাময় হয়ে ওঠার ক্ষমতা রাখে, যদি এক মুহূর্তও আমরা প্যালেস্তাইনের লক্ষ লক্ষ নিথর কচি দেহর পাশে নিজেকে হাঁটু গেড়ে বসাই। কিন্তু এই রূঢ়তার প্রতি সহমর্মিতায় অনেকেই দেশদ্রোহিতার তরজা তুলে বলবে— উচিত শিক্ষা হয়েছে! আবার অনেকে পা ডিঙিয়ে চলে যাবে— ‘সিরিয়া তো আর আমার পাড়া নয়’, অনেকেই মনে মনে কষ্ট পাবে খানিক, এবং সেসব ভুলে যেতে কাছে গিয়ে চুমো খাবে প্রিয় চেনা শিশুমুখে, মনে মনে ভাববে— মানুষ শিখবে কবে, বুঝবে কবে? আগামী প্রজন্মকে আর দেওয়ার কী আছে? প্রশ্ন পারমুটেশন-কম্বিনেশনে ঘুরেফিরে আসে, তবু পুরনো হয় না। যেভাবে মানবসভ্যতায় পুরনো হবে না শিশু।
আর ঠিক এখানেই ঘাই মারে উত্তরকল্প। সত্যি কি প্রকৃতি থেকে দূরে সরে গিয়ে গোলমালটা বাধল? মানুষ কি প্রকৃতির অংশ নয়? তার ক্রিয়াকলাপ কেন প্রকৃতিবিরুদ্ধ বলা হচ্ছে তবে? প্রশ্নের আকারে আস্তে আস্তে আমি যেখানে পৌঁছই, দেখি, এই জঙ্গল, এই প্রকৃতিমগ্নতা আদপে মানুষ কখনওই তো চায়নি। তার জটিল বুদ্ধির কাছে সে সবার আগে চেয়েছে, পেটকে যেন খিদে না সইতে হয়। প্রকৃতির অনিশ্চয়তাকে সে সেদিনই তো তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিতে চেয়েছে। কৃষিবিপ্লবের হাত ধরেই কি যা ঘটার ঘটল না?
তাহলে কেন এখনও, এত এত বছর পেরিয়েও শিশুর কাছে অধিক পরিচিত হয়ে ওঠে সেই জঙ্গল, সেই কথা বলা মাছ, কচ্ছপ, খরগোশেরা? আদপে, ঠাকুমা-ঠাকুর্দার মুখে, জন্ম-জন্মান্তর ধরে এই আখ্যান বাহিত হয়ে হয়ে যা স্বপ্নের ছলে গল্পের আকার নিয়েছে, তা হয়তো ছিল একদিন কাতর স্মৃতিচারণ। স্মৃতি, যেখানে একইসঙ্গে ভয়ংকরভাবে নৈতিক হয়েও নৈর্ব্যক্তিক থাকা যায়।
আর শিশু, তার আধোচেতন বোধে নৈতিকতার পাঠ পায়, শেখে সেই সাজানো চিড়িখানার হৃদয়ে। একইসঙ্গে, এই নৈর্ব্যক্তিক, এই আপন হতে কিছু দূরে দাঁড়িয়ে নীতিবিদ্যার পাঠ-কে দেখা যায় এভাবেও— গলার কাঁটা বের করে দেওয়ার অনুনয় করে ধূর্ত শৃগাল বকের মাথা চিবিয়ে খাওয়ার মধ্যে দিয়ে যে বিশ্বাসঘাতকতার ণত্ব-ষত্ব শেখে শিশুটি, তাকে তার পরিবার, পরিচিতজনের আচরণ কীর্তির গল্প শুনিয়ে কি সেই পাঠ দেওয়া সম্ভব আদৌ? গল্পের ভিতরে যে মজা রয়েছে, রস রয়েছে, বাস্তবেও সেই একই ঘটনাবেত্তা তুলে ধরলে কেন আর গল্প থাকছে না? কেন ‘কানে বিষ ঢালা’-র উপমা উঠে আসছে? নৈর্ব্যক্তিকতা। প্রকৃতি সেটাই, যা নৈর্ব্যক্তিক, যা আমার হতে দূরে, যার মধ্যে আমি থেকেও নেই, কিংবা যা আমি-কে পরিহার করে আমাকে মনে করিয়ে দেয়। ‘আমি’ তখন আর একা থাকে না, স্মৃতি-স্তোত্র-স্রোতে ভরাট হয়ে ওঠে, তার বয়স চিরপ্রাচীন নূতন হয়ে ওঠে।
অনুরূপে, হাজার হাজার বছর ধরে মানবসভ্যতার জন্মলগ্ন থেকে শিশু ঠিক যেভাবে নতুন, শৈশব তার চেয়েও পুরনো। সে রহস্যময়, কারণ, সে আমি-কে চেনে না। সে না জানার মুগ্ধতায় কৌতূহলকে সে পায়, আর শেখে।
যারা কথা বলতে পারে না বলে বড়রা জেনে গিয়েছে বা মেনে নিয়েছে, শিশু তাদের মধ্যেও স্বর খুঁজে পায়, শেখার অবিচ্ছিন্ন আনন্দে। স্বজাতীয় বাপ-মায়ের এই রাগ তো ওই হাসি, এই আদর তো ওই মার, এই স্নেহ তো ওই শাসন-এর বহুস্তরীয় ব্যক্তিত্বময় আবেগচক্রে সে না জড়িয়ে ‘জংলি’ প্রাণীদের একমুখী চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যে সে পায় শেখার নির্মল আস্তানা। কাহিনি বা গল্প তাকে স্বাধীনতা দেয়, যাকে দিয়ে খুশি সে কথা বলাতে পারে, আর এই বিনিময় স্বতঃস্ফূর্ত হওয়ার আলগোছে হয়ে ওঠে আনন্দের।
ঠিক এই নৈর্ব্যক্তিকতা, এই স্বতঃস্ফূর্ত আস্তানা আরও অনুরিত হয়ে ওঠে সুনির্মল বসুর কবিতা ‘সবার আমি ছাত্র’ কবিতায়। ‘বিশ্বজোড়া পাঠশালা মোর সবার আমি ছাত্র/ নানা ভাবের নতুন জিনিস শিখছি দিবারাত্র।’ সেখানে আকাশ বাতাস পাহাড় গাছ সকলের থেকেই শেখার এক-একটা নতুন নতুন উপকরণ তুলে ধরছেন কবি। সেই উপকরণ আসছে তাদের চরিত্র, তাদেএ বৈশিষ্ট্য থেকে। তারা একরৈখিক, সুতোর মতো। আর সেই সুতো দিয়ে নিজের মতো ‘আমি’-র আবরণ বানিয়ে নেওয়ার পরিসর মিলছে নির্ভেজাল। তার অন্তরে আছে আদপে কাহিনি, কল্পনা। সেই কাহিনির সূচ দিয়ে সে আমি-কে শেখে, কৌতূহলকে গাঁথে, দুনিয়াকে পায়।
কিন্তু, যেই বাড়ে বয়সের ভার, তাদের পায়নাকো আর। শেখার আদলে অভিজ্ঞতা ঢুকে পড়ে, কাহিনি-র দিন ফুরিয়ে আসে। অভিজ্ঞতার চাহিদা প্রচুর, কিন্তু একটাই তার খামতি, সে কেবল ‘আমি’-র প্রতিধ্বনি করে। অতঃপর স্বতঃস্ফূর্তির ক্ষয় বাড়ে। শেখা-র শিখা নিবে আসে। অভিজ্ঞতা-র আদলে ঢুকে পড়ে অন্য কিছু, যা দিয়ে জীবনকে চালানোর একমাত্র রসদ বলে ধরে নিয়েছে বড়রা। বাংলা ভাষার মজা এখানেই, সেই তফাত-কে চেনার উপায় হয়ে গিয়েছে সমার্থক অথচ নিগূঢ় ব্যবহার তারতম্যে— আর তার পরিচয় ‘শিক্ষা’।
‘শেখা’ শব্দের মধ্যে নতুন কিছু জানার যে আনন্দ আছে, আলো আছে; ‘শিক্ষা’ শব্দটি আমাদের কথ্যে নেমে আসে ততোধিক ভয়ের অত্যাচারের অন্ধকার হয়ে। মূলত অভিজ্ঞতার আদলে। উপর্যুপরি, ‘শিক্ষা’-র আগে যদি ‘উচিত’ বসে যায়, তাহলে তো আর কথাই নেই।
বলা বাহুল্য, বেশিরভাগ মানুষই আরেকজন মানুষ শেখাতে যত না পারে, যত না চেষ্টা করে, তার চেয়ে ‘উচিত শিক্ষা’ দিতে ব্যস্ত থাকে বেশি। যার যার মতো কাম্য পরিস্থিতির নড়চড় ঘটলেই ‘উচিত শিক্ষা’ দেওয়ার রগড় তৈরি হয়। দেখা যায়— যার বয়স যত বেশি, তার শিক্ষা দেওয়ার প্রবণতা ততোধিক। আবার, কোনও খারাপ অভাবনীয় অনভিপ্রেত বেহিসেবি ভুলের পরিণতি-কেও আমরা নিজেদের ‘উচিত শিক্ষা হল’ বলে দুষে দিই। এভাবে, ‘শিক্ষা’ শব্দটি একইসঙ্গে ‘শাস্তি’-র সমার্থক হয়ে ওঠে, উচ্চতা পায়।
প্রসঙ্গত, বুঝতে অসুবিধে হয় না, কেন ‘উচিত শিক্ষা’ দিতে তারাই বেশি উদ্যত, যাদের আদপে নিজেদের শেখার ইচ্ছে কম। কিংবা, নিজেরা নিজেদের নৈতিক দাঁড়িপাল্লায় বুঝে গিয়েছে, তারা যা শিখেছে, তা-ই শেষ, সঠিক, খুঁতহীন।
ফেরা যাক ওই কবিতার কাছে। শেখার জন্য যে ‘বিশ্বজোড়া পাঠশালা’-র ঠিকানানির্দেশ পাই আমরা, সেখানে একরাশ হাওয়া, যদ্দুর চোখ যায় তদ্দুর এক আকাশের আভাস পাওয়া যায়, দেখা যায় পাহাড় নির্লিপ্ত সাধক হয়ে ঠাম হয়ে আছে। যেখানেই দাঁড়াও কেন, কাঁধে হাত রাখবে তারা। ভরসা জোগাবে। শেখার জন্য মনটাকে নরম করে রাখবে। ভয় দেখাবে না।
আর ঠিক এর উল্টোদিকে একরোখা দাঁড়িয়ে থাকে, যে কোনও প্রতিষ্ঠান। বদ্ধ, ধূসর কংক্রিট ঘেরা, দেওয়ালচর্চিত— চারদিক থেকে পিঠ কামড়ে ধরার জন্য যেন ধেয়ে আসছে। ‘উচিত শিক্ষা’ দেওয়ার হদ্দমুদ্দ। এবং এ ব্যাপারে রাষ্ট্রযন্ত্রের তুলনা হয় না।
যে কোনও রাষ্ট্রযন্ত্র, শাসক গোষ্ঠী, মনে করে, ‘উচিত শিক্ষা’ দেওয়াই তাদের কাজ, তাদের কোনও ভুল হয় না, হতে পারে না। কারণ, ভুল তো শিখতে গিয়ে হয়। কিংবা ভুল হলেও, তা স্বীকার করার ক্ষমতা আসে তখনই, শেখার মন যখন জ্যান্ত হয়ে ওঠে। কিন্তু প্রতিষ্ঠানের তা নেই। ফলে, উচিত শিক্ষা হয়ে ওঠে একাধারে অত্যাচার, একরোখামি এবং তাকে পোড়া কপাল ঠাওরে মানিয়ে নেওয়ার, শমিত করার, নরমালাইজ করার চেষ্টায় আমরা নিজেদেরও দুষি। কিন্তু, সবকিছুকে কেবলই অর্জনের তালিকায় ঢুকিয়ে ফেললে কি চলবে? শেখা কি কেবলই অর্জন?
বর্জনও শেখায়। যা দুঃখ দিতে পারে, যা শান্তির বিপ্রতীপে, তা যদি ঘটে কারও সঙ্গে, সেই অভিজ্ঞতাকে সে মনে রেখে অন্যের জন্য রপ্ত করবে না— এই পরিহার বোধও তো শিক্ষা। এই বর্জনের প্র্যাকটিসে মন না দিলেই শোষিত একদিন কালের নিয়মে শাসনভার পায় বটে, কিন্তু সেও শাসক হয়ে ওঠে, শিক্ষাদানের মোচ্ছবে গা ভাসায়। দুঃখ পাওয়ার অভিজ্ঞতাকে রপ্ত করে ফেলে। শিশুর অন্তরে ঘুমিয়ে থাকা পিতা একদিন জেগে ওঠে, তার পাওয়া যন্ত্রণা-বেদনাকে সে ‘উচিত শিক্ষা’দানের উপায় হিসেবে ফের সন্তানের উপর প্রয়োগ করে ফেলে। ফলে, ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি অবশ্যম্ভাবী না হয়ে উপায় থাকে না। হালে মনস্তাত্ত্বিক তরজমায় ‘ট্রমা লুপ’ নামে ইহা অধিক খ্যাত।
সম্প্রতি ভেনিস ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে অরিজন্তি (অর্থ, দিগন্ত, যে-সিনেমা নতুন দিগন্তের আভাস দেয়) বিভাগে, ‘দ্য সং অফ দ্য ফরগটেন ট্রিজ’ সিনেমার জন্য সেরা পরিচালক হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পর অনুপূর্ণা রায় যেভাবে আবেগঘন হয়ে নিজের সাফল্যে মুখরিত না হয়ে তাঁর সাফল্যের দান হিসেবে ওই মঞ্চকে বেছে নিলেন গাজার শিশুদের হয়ে কথা বলার জন্য— এ কি সততই বিস্মৃত গাছেদের গানের সঞ্চারী নয়? যাদের আমরা ভুলতে বসেছি, যে সারল্যগুলির হত্যাকে আমরা এড়িয়ে যাচ্ছি, সেই বিস্মৃতিকে জাগিয়ে তোলাও সেই সুপ্রাচীন শৈশবের শেখা-কে জাগিয়ে দেওয়া বই আর কিছু তো নয়। একইসঙ্গে, তাঁর দেশকে ক্ষুণ্ণ করার চিন্তা চাগাড় দেওয়ার উল্লেখ বিপরীতে প্রতিষ্ঠানের ‘শিক্ষা’ প্রদানের ইতিহাসকে প্রকট করে তোলে। উমর খালিদ, শারজিল ইমাম, সোমা সেন-দের ভুলি কী করে! কিন্তু, রাষ্ট্রর মতো কঠিন জায়গা দরকার নেই। এই দৃশ্যর জন্ম আদপে আপন প্রতিষ্ঠান, আপন ঘর থেকেই। বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, স্কুলের শিক্ষার্থীরা যখন প্রশ্ন তোলে, প্রতিবাদ করে, তখন তাদের সঙ্গে তর্কে যোগদান, কর্তৃপক্ষের ভুল থাকলে তা ভুল সংশোধন তো দূর, কমিটি লেগে পড়ে সেই স্বরকে রুদ্ধ করতে। সাসপেন্ড দিয়ে শুরু, লাঠিচার্জ, এফআইআর এমনকী দেশদ্রোহিতার অভিযোগে অনির্দিষ্টকাল কারাবন্দি, মায় অস্বাভাবিক মৃত্যু— যা কিছু ঘটে যেতে পারে। যেন শেখানো নয়, শাসানোই শিক্ষা। আর পারিবারিক স্তরে তো এ ঘটনা আকছার, বাবা-মায়ের শাসনই সেখানে ভালবাসা। সেই চির-শমিত টক্সিসিটি ‘ভালবাসে তাই বকে’। উচিত শিক্ষা-র এই প্রবণতা, এই বহুমুখী ভাবমূর্তি অনায়াসে ছোটবেলার সিঁদ কেটে ঢুকে পড়ে এভাবে যে, ভবিষ্যতে বৈবাহিক বা প্রেমের সম্পর্কেও গায়ে হাত তোলা, নিয়ন্ত্রণ করা, শাসিয়ে রাখা হয়ে ওঠে, ‘ভালবাসে তো, তাই মারে।’ যে নারীটি মার খেল, সে তার স্বামীর কাছে চুপ রইল, কিন্তু সেই ক্ষোভ তো যাবে না সহজে। হাতে কাছে সন্তানকে পেয়ে, একটু যেই না পান থেকে চুন খসেছে— আচ্ছা করে হাতের সুখ সেই মা মিটিয়ে নিল তার সন্তানের পিঠে। এটাই কি মব লিঞ্চিংয়ের বীজ নয়?
কিংবা পাহাড় বেমক্কা কেটে খুঁড়ে রাস্তা ব্রীজ তৈরির যে তীব্র আস্ফালন দেখা যায় প্রকৃতির বিরুদ্ধে, তা কি আদপে শেখা পেরিয়ে আমি-র অতিরেক নয়?
আখেরে, ক্ষমতার বকলমে ‘শেখা’ ও ‘শিক্ষা’-র খাদ্য-খাদক শৃঙ্খল এভাবেই মুখর হয়ে আছে। যদি এই অত্যাচারকে বাদ দিয়ে উচিত শিক্ষাদানের দিকে বস্তুত জোর করেই সহানুভূতির চোখে তাকাই, আমি দেখতে পাই, ভুল-কে মুছে ফেলার তীব্র প্রচেষ্টাও একপ্রকার হিংস্রতা, তা সেই ‘ভুল’ একাংশের মতানুযায়ী হোক বা সর্বজনগ্রাহ্য।
কারণ, যা ঠিক হল না, যা দুঃখ দিল, তাকে আলিঙ্গন করে তাকে পালটা আনন্দ শিখিয়ে আখ্যান বদলে ফেলা বড় কঠিন। তা শিক্ষা-য় মজে না। মজে একমাত্র শেখার পেলবতায়। আর তার জন্য আমি-কে পরিহার করতে হয়। কাহিনির মধ্যে দিয়ে আমাদের শেখা, শেখার মধ্যে দিয়ে অভিজ্ঞতার সঞ্চার— এত অবধি আমরা নিখুঁত বুঝে ফেলি। কিন্তু এরপরও যে পথ বাকি, ভুলে যাই। আর, তা হল— অভিজ্ঞতাকে আশ্রয় করেই আপন হতে বাহির হওয়া। আমি-র থেকে দূরে গিয়ে দাঁড়ানো। নৈর্ব্যক্তিক হওয়া।
বর্তমানে, এত যে ধরে কষে আচ্ছা করে বেঁধে, মেরে কেটে বোমা ফেলে ‘শিক্ষা’ দেওয়ার আয়োজন চলছে, যাকে হিংস্রতা ঠাওরাতে একটুও অসুবিধে হয় না— এসব কি ব্যক্তির আস্ফালন ছাড়া আর কিছু?
তবু, এত কথার পরেও ধন্দ যেন মেটে না। পুনরায় যখন সুনির্মল বসুর কবিতার ছত্রে ছত্রে তাকাই, মনে হয়, তিনি আসলে প্রকৃতিঠাকুরের পাঠশালায় শেখার কথা আদৌ বলছেন না। হেঁয়ালিই করছেন! ফন্দি-ফিকির দিচ্ছেন এই শেখা থেকে শিক্ষা-য় ঠেলে দেওয়ার অভিসন্ধিকে তছনছ করার। ফন্দিটি এই— শেখার পরিসর যেহেতু বিশ্বজোড়া, শেখানোর লোকেরও তো অভাব নেই। কিংবা আরও ভাল করে বললে, ‘জ্ঞান দেওয়ার লোকের অভাব নেই’। জ্ঞানপাপীদের থেকে বাঁচতে কবি তাই উপায় বাতলে দিচ্ছেন। জ্ঞানপাপী যখনই জ্ঞান ঝাড়বে, তখন আকাশের দিকে তাকাও, বাতাসকে মুঠোবন্দি করে মশা মারার ভান করো। খোলা মাঠের মতো দিলখোলা হও, আসলে কানখোলাও হও। এককান দিয়ে জ্ঞান নাও, আর অন্য কান দিয়ে বের করে দাও। বলছে বলুক। একসঙ্গে অর্জন-বর্জন সিলসিলা জারি রাখো, ভাই রে!
এ প্রসঙ্গে একটা ঘটনা বলার লোভ সামলাতে পারছি না। জ্ঞানপাপের বোঝা না বাড়াব না কথা দিচ্ছি। বাজারে একদিন। মাছ নিয়েছি অনেকখানি। দু’-তিনরকমের, বিভিন্ন ওজনে দর করে। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে মহৎ মাছওয়ালা হিসেবের অঙ্ক যা হওয়ার কথা, তার থেকে বেশ ভালরকম বাড়িয়ে দাম হেঁকেছেন। শেষমেশ বিস্তর তামঝাম বচসা, ‘আপনি শিক্ষিত হতে পারেন, কিন্তু আমিও বহুদিন এই ব্যবসায় আছি, কারও পকেট মেরে এই জায়গায় আসিনি’ তাবৎ নৈতিকতা দলনের পর যখন হিসেবের গোলমালে সত্যিই ধরা খেয়ে গেলেন, পলকের মধ্যে মাছওয়ালার স্বীকারোক্তি ছিল, ‘বাপ্রে বাপ, যদ্দিন বাঁচি, তদ্দিন শিখি’। এরপর তো আর কিছু বলার থাকে না, গুস্তাখি মুয়াফ!
আদপে, স্বীকারোক্তিতে একদিন না একদিন ফিরতেই হয়। ‘শেখা’-র নরম আবর্তে বসতেই হয় হাঁটু গেড়ে। তা সে সর্বজনমাঝে না হোক, নিজের কাছে তো বটেই। আমি-র থেকে একটু দূরে সেই ছোট্ট মেদিনী।
