পঞ্চম বর্ষ – প্রথম সংখ্যা – সম্পাদকীয়
সম্পাদকের কলমে…
বিশ্বব্যবস্থা এক গভীর অস্থিরতার ভিতরে দাঁড়িয়ে আছে। পশ্চিমী শক্তির কৌশলগত সংঘাত, মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘস্থায়ী অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি, এবং তার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ অভিঘাত দক্ষিণ এশিয়ায়—এই সবকিছু মিলিয়ে আমরা এক বহুমাত্রিক সংকটের সময় পার করছি। এই সংকট কেবল অর্থনীতি বা ভূরাজনীতির নয়; এটি ভাষা, সংস্কৃতি, পরিচয় এবং নাগরিকতারও সংকট।
ভারতবর্ষ এবং তার অঙ্গরাজ্যগুলির বাস্তবতা এই বৃহত্তর প্রেক্ষাপট থেকে আলাদা নয়। বরং, রাজনৈতিক বয়ান ও ক্ষমতার দ্বন্দ্ব অনেক সময় মূল সমস্যাগুলিকে আড়াল করে দেয়। নির্বাচনের আবহে নীতিগত প্রশ্নগুলি প্রায়শই রূপ নেয় প্রতীকী লড়াইয়ে। ফলে শিক্ষা, কর্মসংস্থান, ভাষার মর্যাদা কিংবা সাংস্কৃতিক পরিসরের সংকোচন—এই মৌলিক বিষয়গুলি পর্যাপ্ত গুরুত্ব পায় না। এই প্রেক্ষাপটে সুকান্ত ভট্টাচার্য-এর শতবর্ষ আমাদের কাছে কেবলমাত্র এক ভার্চুয়াল স্মরণসভা নয়; বরং রাজনৈতিক ও সামাজিক পুনর্পাঠের মুহূর্ত। সুকান্তের কবিতায় যে ক্ষুধার্ত পৃথিবীর ছবি, যে বঞ্চিত মানুষের কণ্ঠস্বর, তা আজও সমান প্রাসঙ্গিক। তিনি লিখেছিলেন এমন এক পৃথিবীর স্বপ্ন, যেখানে “প্রত্যেকটি শিশুর বাসযোগ্য হয়ে উঠবে বসুন্ধরা”—
সুকান্তের ভাবনায় রাষ্ট্র, সমাজ এবং অর্থনৈতিক কাঠামোর প্রতি এক তীব্র প্রশ্নচিহ্নের উপস্থিতি আমাদের শেখায়— খিদে, বৈষম্য এবং শোষণ কোনো বিমূর্ত ধারণা নয়; এগুলি প্রতিদিনের বাস্তবতা। তিনি যে ”সর্বহারার” কথা বলেছিলেন, আজকের পৃথিবীতে সেই সমস্যা আরও গভীরে প্রবেশ করেছে। চাকরি হারানো যুবক, বাস্তুচ্যুত মানুষ ,কিংবা রিফিউজি বা অভিভাষণের ঢেউ এখন বৈশ্বিক পরিচয়। আজ যখন অর্থনৈতিক বৈষম্য বাড়ছে, শ্রমের মূল্য কমছে, এবং মানবসম্পদ একটি পরিসংখ্যান মাত্র, তখন সুকান্তের কণ্ঠস্বর আরও বেশি করে প্রতিধ্বনিত হওয়া দরকার।
ভাষা বর্তমানে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। বিশেষত, বাংলা ভাষায় কথা বলা বা ভাব প্রকাশের মধ্যেই যদি সন্দেহের দৃষ্টি জন্ম নেয়, তবে তা কেবল ভাষাগত নয়, সামাজিক আস্থা ও অবক্ষয়কে নির্দেশ করে। উপভাষা, উচ্চারণ, কিংবা সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে না বুঝে একরৈখিক ধারণা চাপিয়ে দেওয়া—এই প্রবণতা গণতান্ত্রিক চেতনার পরিপন্থী। দেশভাগের ইতিহাস আমাদের শেখায়, পরিচয়ের সংকট কতটা গভীর এবং দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। সেই ইতিহাসের অভিঘাত আজও প্রজন্মান্তরে বহমান।
অন্যদিকে, শিক্ষা ও সামাজিক পরিকাঠামোর অবক্ষয় উদ্বেগজনক। বিপুল সংখ্যক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়া কেবল প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়; ভবিষ্যৎ নির্মাণের ভিত্তিকেই দুর্বল করে। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করছে, যেখানে নাগরিক জীবনের মৌলিক নিরাপত্তাও প্রশ্নের মুখে। ‘ভাতা’ যখন ‘ভাত’-এর বিকল্প হয়ে ওঠে, তখন তা উন্নয়নের ধারণাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।
বাংলা ভাষার আরও একটি নতুন বছরে আশার আলো কিঞ্চিৎ কমই। কারণ ‘বাংলাটা ঠিক আসে না’ – এখন আর শোকবাক্য নেই ; বহুল প্রচলিত লোক-বিশ্বাস হয়ে গেছে।
এই প্রেক্ষাপটে প্রযুক্তি, বিশেষত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তথ্য বা ডেটা এখন ক্ষমতার কেন্দ্রে। কিন্তু সেই ডেটা যদি একপাক্ষিক, অসম্পূর্ণ বা বিকৃত হয়, তবে তা সত্যের পরিবর্তে একটি নির্মিত মিথ্যা থুড়ি, বাস্তবতা প্রতিষ্ঠা করতে পারে। ফলে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা যাদের হাতে, তারাই নির্ধারণ করে দিচ্ছে জীবনের কার্যপ্রণালী— গড়ে উঠছে এক প্রকার অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা।
তবুও, এই অন্ধকারের মধ্যেও আলোর উপস্থিতি অস্বীকার করা যায় না। ক্রীড়া, বিজ্ঞান, এবং শিল্পকলায় সাফল্য আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে সৃজনশীলতা ও প্রতিভা এখনও জীবিত। এই সাফল্যগুলি কেবল ব্যক্তিগত নয়; এগুলি আমাদের সম্মিলিত সম্ভাবনার প্রতীক।
একইসঙ্গে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং নাগরিক অধিকারের প্রশ্ন আজ অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। যে কোনও সমালোচনামূলক কণ্ঠস্বরকে দমন করার প্রবণতা গণতন্ত্রের ভিত্তিকে দুর্বল করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দ্রুতগতির ‘রিল’ সংস্কৃতি বাস্তব অভিজ্ঞতাকে প্রতিস্থাপন করছে, যেখানে আবেগ, প্রতিবাদ এবং সম্পর্ক সবই ক্রমশ ভার্চুয়াল হয়ে উঠছে।
এই জটিল সময়েই রোয়াক ওয়েবজিন-এর মতো একটি প্ল্যাটফর্মের গুরুত্ব বেড়ে যায়। একটি সাহিত্য বা সাংস্কৃতিক মাধ্যম হিসেবে নয়; বরং সময়ের দলিল হিসেবে মূলধারার বাইরে থেকেও যে একটি বিকল্প চিন্তার পরিসর তৈরি করা সম্ভব—রোয়াক সেই সম্ভাবনারই প্রতিফলন। এখানে আড্ডা আছে, মতবিনিময় আছে, দ্বন্দ্ব আছে— আর আছে প্রশ্ন করার সাহস।
পরিবেশগত অবক্ষয়, নগরায়ণের চাপ, এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতা আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ। তবুও, মানুষের মধ্যে সংযোগের আকাঙ্ক্ষা হারিয়ে যায়নি। সেই সংযোগের জায়গা হিসেবেই রোয়াক নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়—এক মুক্ত, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং চিন্তাশীল পরিসর হিসেবে। অর্থনৈতিক-সামাজিক-রাজনৈতিক ভাবে ঘেটে থাকা সময়ে রোয়াকের আড্ডা হয়ে উঠুক মন ভালো রাখার চাবিকাঠি। এই দুর্দিনের সালতামামী হয়ে উঠুক রোয়াক ওয়েবজিন।
অস্থিরতার এই সময়ে, যেখানে ইতিহাস ও প্রোপাগান্ডার সীমানা ক্রমশ অস্পষ্ট হয়ে উঠছে, সেখানে প্রয়োজন সমালোচনামূলক বোধ, মানবিক সংবেদনশীলতা এবং যুক্তিনির্ভর আলোচনার।
রোয়াক ওয়েবজিনের পঞ্চম বর্ষ-প্রথম সংখ্যা সেই আলোচনার একটি ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ পরিসর হয়ে উঠুক—এই প্রত্যাশাই রইল।
দেবার্ঘ্য দাস , ডা.গৌরব রায়

