পঞ্চম বর্ষ – প্রথম সংখ্যা – সমালোচনা
“আমার শীত করে আর জ্বর আসে গায়ে”, Hamnet…
সোহম দত্তগুপ্ত
শো শেষ হতে রাত হয়ে গেছে অনেক। অটো পাবো কিনা চিন্তা করতে পারছিলাম না। তবু লাইনে দাঁড়ালাম। লাইন কই। মানুষ নেই। চোখের সামনে আনোয়ার শাহ রোডের সবকটা বিল্ডিং অদৃশ্য হয়ে গেলেও চমকে উঠবো না। একটা বট গাছের কোলে বাকি রাতটুকু কাটিয়ে দিতে পারলে Agnes -এর প্রসব যন্ত্রণা গায়ে এসে লাগবে। কী আদিম সেই চ্যাটচ্যাটে আঠা! আলতামিরার গুহায় সেই কবে মা হয়েছিলো কেউ। সন্তানের কান্না শোনার আগেই তিনি মারা গেছিলেন? ঈশ্বর লিখেছিলেন ‘প্রথম মায়ের মৃত্যু’। সে লেখা পড়িনি আমরা কেউ। Orpheus বুকে ধরে নিয়ে বেড়িয়েছেন সেই মৃত্যুশোক। সারাটা জীবন, ছড়িয়ে দিয়েছেন সুর। সেই সুর আমরা শুনেছি কখনও বয়াতির সারিন্দায়, কখনও Heer-এর কথায় কিংবা Van Gogh-এর ছবিতে। শোক এবং যন্ত্রণা মৃত্যুর মতোই আদিম। আমরা যারা ভাগ্যবান, তাদের প্রাধিকার হয় সময়ের সাথে সাথে উত্তরাধিকারসুত্রে তা বয়ে বেড়ানোর। ধূসর, পাথুরে, বাঁজা হয়ে যাওয়া প্যালেস্টাইনে যেই বাবা তার সন্তানের মাংসপিণ্ড হয়ে যাওয়া দেহ কবর দিতে পারেনি, তিনি মারা যাবেন সেই শোক বুকে রেখে। কেউ কেউ লিখে রাখবে সেই শোক। অনেক বছর পর, নতুন সভ্যতার নতুন সভ্যরা ইতিহাস খুঁড়ে বার করে আনলে সেই শোক ছড়িয়ে পড়বে ফের। রয়ে যাবে, যেভাবে শেক্সপিয়ার থেকে গেছেন প্রায় ৪৫০ বছর। থেকে গেছে ওথেলো, ম্যাকবেথ এবং হ্যামলেট।
এসবই ভাবতে ভাবতে অটো এসে দাঁড়ালো। কিছু না জিজ্ঞেস করেই উঠে বসলাম। শেষ দৃশ্যে Agnes যখন হ্যামলেটকে ধরার জন্য হাত বাড়িয়ে দেয়, আমি ঘুমের মধ্যে বারবার সেই হাত ছুঁতে চাইবো ভেবে ভয় লাগছে। আমার কিছু করার নেই। গোটা ছবিতে ক্যামেরা একটি নির্দিষ্ট দুরত্বে দাঁড়িয়ে থাকে। আমরা দুটো মানুষকে দেখতে পাই। তাদের মধ্যে একজনকে গোটা পৃথিবী ‘আইকন’ বানাবে শতক পরে। আরেকজন হয়ে থাকবে উপেক্ষিত। রিসার্চ পেপারে তাদের প্রেম লেখা থাকবে না। ‘Hamnet’ সেই প্রেমকে দেখায়। প্রকৃতির কাছে খুব ছোট সে ভালোবাসা, তাদের সঙ্গম। তবু প্রেম তো। স্বপ্নের মধ্যে সেই হাত আমাকে ছুঁতে হবে। Agnes-এর আঙুল আমাকে মায়ের কাছে নিয়ে যাবে। এক জীবনের আক্ষেপ অবচেতনে মিটিয়ে নেবো। মাঝরাস্তায় হঠাৎ ব্রেক কষে দাঁড়িয়ে গেলো অটোটা। হাসি, নকল লজ্জা মেশানো মুখ নিয়ে চালকদাদা বললো সামনের চাকায় কিছু একটা হয়েছে। একটু দাঁড়াতে হবে। কী হয়েছে আমায় বলেছিলো যন্ত্রের অত কিছু আমি বুঝিনা। প্রয়োজন হয় তাই ব্যবহার করি। ঝড় শেষ হওয়া রাতের এই উপলব্ধি Will-এর প্রথম দৃশ্য টেনে আনলো মাথার ভিতর। শুধুমাত্র পরিবারের প্রয়োজনে মাস্টারি করতে গিয়েই সে Agnesকে দেখে। হাতে বাজপাখি নিয়ে ফটকের গেট পেড়িয়ে হেঁটে আসছে পুরাণ। তারপরেই তাদের দেখি জঙ্গলে। এক বিরাট বৃক্ষের নীচে দাঁড়িয়ে থাকবো। তার পাতা চুঁইয়ে বৃষ্টির জল গালে এসে পড়বে। সদ্যজাত Susanna-কে কোলে নিয়ে গুহার মুখে দাঁড়িয়ে থাকে Will। তাকে লিখতে হবে। লেখকের শূন্যতা ছাপিয়ে যায় পিতার আনন্দ। মনের চোরাকুঠুরিতে প্রায় হারিয়ে যেতে থাকা অনুভুতিগুলোকে চিনতে গেলে প্রকৃতির কাছে যেতে হয়। এতটা প্রাধিকার আমার নেই। অটোওয়ালা উঠে বসতে বলে। আমি বড়জোর ম্যানহোলের সামনে দাঁড়াতে পারি।
গলির কাছে এসে অটো থামলো। ভাড়া মিটিয়ে ঘরের দিকে হাঁটতে থাকলাম। মোড়ের মাথার দোকানটা বন্ধ হয়ে গেছে। বোধহয় বৃষ্টির জন্যই তাড়াতাড়ি বন্ধ করে দিয়েছে। বাড়ি যেতে হবে। Will কেও লন্ডন থেকে ফিরতে হয়। আকাশে মৃত বাজপাখিটাকে উড়তে দেখে বেশি দেরী করে না সে। শহরে মড়ক লেগেছে। “Am I too late?”। আদিমতম সত্য কারুর জন্য অপেক্ষা করেনা Will। তুমি তো সামান্য লেখক। মৃত পুত্রকে সমাধিস্ত করার আগেই তোমাকে ফিরে যেতে হবে লন্ডনে। নাহলে দেরী হয়ে যাবে। তোমার জন্য অপেক্ষা করে থাকবে থিয়েটার দল। ইদানীং তোমার নাম হয়েছে। Stratford-এ বাড়ি কিনবে তুমি। কাকে নিয়ে থাকবে সেখানে? তোমার স্ত্রী Agnes? তোমার দুই কন্যা Susanna আর Judith? ওরা তাদের ভাইয়ের মৃত্যু দেখেছে। Judith দেখেছে কীভাবে ১১ বছরের Hamnet মৃত্যুকে ফাঁকি দিতে পারে। মৃত্যু এসেছিলো Judith-এর জন্য। Hamnet ফাঁকি দিয়েছে। Susanna তার মাকে শেষ অব্দি মৃত্যুর জামা টেনে ধরে রাখতে দেখেছে। তুমি শুধু শাদা কাপড় জড়ানো নিথর Hamnet-কে দেখেছো। Agnes-এর পাশে তুমি ছিলে না। তোমার এই আক্ষেপ উত্তরাধিকারসূত্রে দান করে দিও, তোমার সন্তানদের। তুমি তো একজন লেখক Will, তোমার লেখা নাটকগুলো কি তোমারই ঔরসজাত নয়?
খাওয়া শেষ করে ছাদে এলাম। মেঘ করে আছে এখনও। আরও বৃষ্টি হবে বোধহয়। বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। ঠান্ডা হাওয়া দিচ্ছে। ঝড় শুরু হবে। এমনই ঝড়ের রাতে Hamlet-এর মৃত বাবার ভূত Hamlet-এর সামনে এসে দাঁড়ায়। দর্শকদের মধ্যে থেকে Agnes সেই দৃশ্য দেখে। অভিনেতা Hamlet-এর সোনালী চুল তার ছেলেরই মতো। বৃদ্ধ ভূতের সংলাপের প্রতিটা শব্দ Will-এর পুত্রশোকের বয়ান। Agnes-এর প্রেয়সী মন বুঝতে পারে। একটি মায়ের হৃদয়ের ক্ষতে প্রলেপ লাগিয়ে দিচ্ছে Will। তার লেখা দিয়ে। সে তো আর কিছু পারেনা। সে শুধু লিখতেই পারে। শুধু লিখবে বলেই লন্ডন চলে আসা। পরিবার ছেড়ে , সন্তান ছেড়ে, তার প্রেমকে ছেড়ে। স্টেজের পিছন থেকে সে শুধুই Agnes-কে দেখে। শেষ দৃশ্যে Agnes হাত বাড়িয়ে ছুঁতে চায় Hamlet-কে। Will হাসে। সে সফল হয়েছে। লেখক নয়। প্রেমিক Will সফল। একজন বাবা সফল। আমাদের জীবনে হারিয়ে ফেলার দুঃখ আসে। মৃত্যুপথযাত্রীর এই জীবনে শোক বয়ে বেড়াতে হয় আমাদের। যুগের পর যুগ এই দায় নিয়েই বেঁচে থাকা। তবু যারা ভালোবাসে তাদের ছুঁয়ে থাকতে হয়। যেভাবে Orpheus শেষ অব্দি Eurydice-এর হাত ধরে ছিলো। পায়ের শব্দ ক্ষীণ হয়ে আসে। শ্বাস-প্রশ্বাস শুনতে পাওয়া যায়না। তবু সে আছে, এই ভরসাটুকু নিয়ে নরক পার করা যায়। ভালোবাসা চলে গেলে সেই চলে যাওয়াটুকু নিয়ে বেঁচে থাকা। Grief & Agony। আমাদেরও চলে যেতে হবে। তবু চেষ্টা করবো পিছনে ফিরে না দেখার। ঘুমঘোরে মনে পড়ে যাবে গতজন্মের প্রেয়সীর মুখ। একটা জঙ্গল। মৃত বাজপাখিটিকে সমাধিস্ত করার আগে প্রার্থনা করছে কয়েকজন। তাদের প্রার্থনা নিয়ে পাখিটা চলে যাবে, এই বিশ্বাস। এই বিশ্বাস কখনও ভাঙতে দিতে নেই। একে রক্ষা করার দায় নিজের। উত্তরাধিকারে পাওয়া। আলতামিরার গুহায় প্রথম বাবা হয়েছিলো যে আদীম মানব, তার থেকে পাওয়া।
Film: Hamnet
Dir: Chole Zhao
কৃতজ্ঞতাঃ- গানের লাইন বোধাদিত্য ব্যানার্জির লেখা।

