পঞ্চম বর্ষ প্রথম সংখ্যা গদ্য
সুকান্ত এবং AI
অলোক বিশ্বাস
ছোটবেলায় সুকান্ত ভট্টাচার্যকে চিনেছি কবিতা পড়ে।
পড়ার যে খুব ইচ্ছা ছিল, এমনটা নয়;
সিলেবাসে ছিল, তাই পড়তে হতো।
না পড়লে তো আর নম্বর পাওয়া যাবে না। আমার মা বলেছিলেন, খুব কম বয়সে মারা গেছেন উনি,
নাহলে তাঁর কবিতার সম্ভাবনা আরও অনেক ছিল।
কথাটা শুনে তখন বেশ কষ্ট পেয়েছিলাম। মনে হতো, রবীন্দ্রনাথ যদি এক নম্বর কবি হন, তাহলে সুকান্ত হয়তো পাঁচ নম্বর বা ওইরকম কিছু একটা হবেন।
আসলে, কবিতাগুলো মুখস্থ করলে পরীক্ষায় নম্বর পাওয়া যাবে এবং লাইনগুলোর ভাবসম্প্রসারণ করতে হবে—এর বাইরে তাঁর কবিতা যে কতটা গভীর, তা তো কেউ বুঝতে শেখায়নি।
এরপর একদিন ছবি আঁকার প্রতিযোগিতায় পুরস্কার হিসেবে পেলাম ‘ছাড়পত্র’ বইটা।
বই উপহার পেলে আমি এতই খুশি হতাম যে, কবিতা পড়তে ভালোবাসলেও না বাসলেও,
শুধু বই পাওয়ার আনন্দেই সেটা পড়ে ফেললাম। মানুষের মেমোরি নাকি টেম্পোরারি হয়,
তবে আমার সেই টেম্পোরারি মেমোরিতে একটা জিনিস পার্মানেন্টভাবে ছেপে গেছে।
যতদিন বেঁচে আছি, হয়তো এই দুটো লাইন ভুলতে পারব না
“ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়ঃ
পূর্ণিমা-চাঁদ যেন ঝল্সানো রুটি॥”
আজকের এই AI-এর যুগে লাইনগুলো যেন আরও অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক।
এই যুদ্ধের পৃথিবীতে আমেরিকা আর চীনের মধ্যে এখন AI-এর দখল নেওয়ার যুদ্ধ চলছে। বলা হচ্ছে, প্রযুক্তির এই লড়াইয়ে যে জিতবে,
সে-ই হবে পরবর্তী সুপারপাওয়ার।
কিন্তু এখানেও সেই যাদের পেটে ক্ষুধা, তারা বঞ্চিত।
তাদের হাতে না আছে ইন্টারনেট, না আছে AI।
আজ আমরা শহরে বসে ভাবছি, দৈনিক ১ জিবি ডেটা কত সস্তা!
কিন্তু এই এক জিবি ডেটার জন্য যে মাসিক খরচ,
সেটা কি তারা দিতে পারবে যাদের পেটে ভাত নেই?
তারা পূর্ণিমার চাঁদকে রুটি ভাবত, হয়তো এরপর Open AI-এর গোল লোগোটাকেও ওরা রুটিই ভাববে।
ছোটবেলায় মনে হতো সুকান্ত বোধহয় কবিতা দিয়ে বিদ্রোহ করেন।
কিন্তু যত বড় হয়েছি, তত বুঝেছি ওই কথাগুলোই স্বাভাবিক। সবারই এগুলো বলা উচিত,
কিন্তু কেউ বলে না বলেই ওগুলোকে বিদ্রোহ বলে মনে হয়। ছোটবেলায় কবিতাগুলো পড়লে রক্ত গরম হতো,
এখনও হয়; তবে তার সঙ্গে মাথাটাও গরম হয়।
কারণ, সুকান্ত কত বছর আগে লাইনগুলো লিখে গেছেন, অথচ আজ সেগুলো শুধুই ফেসবুকের কিছু পোস্টে সীমাবদ্ধ হয়ে আছে।
কিংবা কিছু মানুষ নিজের লেখার ধার বাড়াতে এই কবিতার দুটো লাইন কোট (quote) করে দেন।
তবে রাগ শুধু এই কারণেই নয়। আমার আগের লেখার কিছুটা দেখলেই বুঝবেন, আমি AI-এর ওপরও রেগে আছি। কারণ, ক্ষমতাবান মানুষেরা AI-কে যতটা শক্তিশালী মনে করেন,
আসলে তা ততটা নয়! আমি প্রমাণ করে দেখাতে পারি। উদাহরণ হিসেবে, বাজারের সবচেয়ে প্রচলিত দুটো চ্যাটবটকে আমি বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে সুকান্তর স্টাইলে কবিতা লিখতে বলেছিলাম।
একটা Open AI (ChatGPT), আর অন্যটা Google (Gemini)। আমি জানতাম রেজাল্ট কী হবে,
তবুও পরীক্ষাটা আপনাদেরও দেখাই। তাহলেই বোঝাতে পারব, আজকের AI সুকান্তর তুলনায় ঠিক কোথায় দাঁড়িয়ে আছে।
Google Gemini:
আবার আকাশে বারুদের ধোঁয়া, কাঁপে আজ তেহরান,
শকুনের দল ডানা ঝাপটায়, খোঁজে মানুষের প্রাণ।
আটলান্টিকের ওপার থেকে যে দাম্ভিক আসে ধেয়ে,
রক্তের নেশায় মত্ত তারা যে, বিশ্বকে যায় খেয়ে।
পারস্য আজ জ্বলছে আগুনে, বোমারু বিমান ওড়ে,
সাম্রাজ্যবাদ নখ দাঁত শানায়, মৃত্যু-ফাঁদ গড়ে।
কিন্তু এ মাটি কেবলই ছাই নয়, স্ফুলিঙ্গ আছে ঢাকা,
প্রতিরোধের আগুনে পুড়বে রক্তিম এই চাকা।
হে আমেরিকা, থামাও তোমার মারণাস্ত্রের খেলা,
জনতার ক্রোধে ভেঙে গুঁড়িয়ে যাবে দম্ভের এই ভেলা।
ChatGPT:
‘তুই যদি সুকান্ত ভট্টাচার্য হয়ে আজকের যুদ্ধটা দেখতিস, তাহলে হয়তো এমন কিছু লিখতিস’ (ইচ্ছাকৃত রাখা হল)
রক্তে রাঙা মানচিত্র, দূরে জ্বলছে মরুর আগুন,
মানুষ আজও শিখলো না, যুদ্ধ মানেই শূন্যতা গুণ।
আকাশভরা ড্রোন উড়ে, শিশুর চোখে ভয়ের ছায়া,
সভ্যতার নামে কেন, বর্বরতা এত নির্লজ্জ মায়া?
তেল আর শক্তির লোভে, আগুনে পুড়ে যায় পৃথিবী,
মানুষ খুঁজে শান্তি, কিন্তু শাসক খোঁজে যুদ্ধই।
বন্দুকের নলেই কি তবে ভবিষ্যতের সব উত্তর?
না কি ভাঙা ঘরের কান্নাই সত্যির সবচেয়ে বড় অস্ত্র?
হে পৃথিবী, তুই কবে শিখবি মানুষ হয়ে বাঁচতে—
যুদ্ধ নয়, ভালোবাসাই শেষ কথা হোক আঁকতে।
কোটি কোটি লেখকের বই এবং বাংলা কবিতা গিলে খাওয়ার পর AI এই জিনিস লিখল!
জেমিনি লাইনের ছন্দ মেলাতে গিয়ে কবিতার নির্যাসটাই যেন নষ্ট করে দিয়েছে।
অন্যদিকে, চ্যাটজিপিটি ঠিক যতটা কম্পিউটিং পাওয়ার ব্যবহার করল সুকান্ত ভট্টাচার্যকে ‘তুই’ বলে সম্বোধন করতে, ততটা বুদ্ধি যদি কবিতা লেখায় লাগাত,
তাহলে কি এমন নিম্নমানের লেখা বেরোত?
এখানে এই এক্সপেরিমেন্ট করে আমি এটা প্রমাণ করতে চাই না যে AI পিছিয়ে আছে আর সুকান্ত এগিয়ে আছেন;
এ নিয়ে আমি আগেই বলেছি যে আমি জানতাম এটাই রেজাল্ট হবে। তবে আমার এই লেখাটার পরেও,
পুঁজিপতিরা AI-এর পেছনে যে পরিমাণ টাকা ঢালবে,
তার দশমিক শতাংশও সুকান্তকে বোঝার জন্য দেবে না। এটাও ততটাই সত্যি।
আর এর কারণ হয়তো আমার লেখার ব্যর্থতা, তাদের অবধি পৌঁছাবেই না আমার এই কথাগুলো। যেখানে স্বয়ং কবি সুকান্তই তাদের মনে ঢুকতে পারেননি,
সেখানে আমি কী করে আশা করি যে আমার লেখা পৌঁছাবে!

