পঞ্চম বর্ষ প্রথম সংখ্যা গদ্য
রানার
সংহিতা রায়
ঘটনা ১
পিঠে বিরাট মাপের বোঝা। এমন ভার, যে সিঁড়ি ভাঙতে পা টলছে। যে কোনও মুহূর্তে ঘটতে পারে বড় বিপদ! সাততলা এভাবেই। আবাসনে লিফট থাকলেও ব্যবহারের সুযোগ নেই ডেলিভারি বয়দের । ২০২৬-এর জানুয়ারিতে এমন এক ঘটনা নজর কেড়েছিল সোশ্যাল মিডিয়ায়। দাবী উঠেছিল ডেলিভারি বয়দের লিফট ব্যবহারের নির্দেশ দিক প্রশাসন। কারণ বেশিরভাগ আবাসনেই সেলসম্যান আর ডেলিভারি বয়দের লিফট ব্যবহারের অনুমতি নেই।
ঘটনা ২
একটি বাড়িতে খাবার ডেলিভারি দিতে এসেছিলেন সুইগির গিগ কর্মী। ক্লান্ত বিধ্বস্ত মানুষটিকে দেখে গৃহকর্তা বসিয়ে খাওয়ান। খেতে খেতে কেঁদে ফেলেন ডেলিভারি বয়। বলেন, সকাল থেকে এক কাপ চা ছাড়া পেটে আর কিছু পড়েনি’। খিদে চেপে চেপে ক্ষুধার বোধটাই আর তাঁর নেই।
গিগ কর্মীদের জীবন নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ার এমন খবর মনে করিয়ে দেয় একটা বিখ্যাত গান। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠ, সলিল চৌধুরীর সুর, আর লিখেছিলেন কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য। কবিতার নাম ‘রানার’।
১৯৪৭ সালে তাঁর মৃত্যুর আগে লিখেছিলেন। ‘ছাড়পত্র’ কাব্যগ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত।
রানার মানে ডাকহরকরা। সেই পেশা আজ প্রায় হারিয়ে গিয়েছে। তার বদলে এসেছে ‘ডেলিভারি বয়’। এঁরাই এখন গিগ কর্মী। গিগ’ শব্দটির অর্থ— এমন চাকরি যা অস্থায়ী এবং কোনও মালিকের অধীনে না থেকে নিজের জন্য কাজ করা।
খাবার, বাজার ডেলিভারি, অ্যাপ-ক্যাবের ড্রাইভার, যে কোনও এপ ডেলিভারি কাজের যুক্ত মানুষ, আংশিক সময়ের অনলাইন লেখক, অধ্যাপকরাও গিগ ইকনমির অঙ্গ।
এই পেশার সঙ্গে যুক্ত মানুষদের সারাদিনের সঙ্গী গতি। কুইক কমার্স প্ল্যাটফর্মের ১০ মিনিটে ডেলিভারির টার্গেট পূরণ করতে গিয়ে সময়ের মধ্যে ডেলিভারি দিতে গিয়ে দুর্ঘটনায় মারা যাওয়ার বা পঙ্গু হয়ে যাওয়ার একাধিক ঘটনাও সামনে এসেছে। সংসদেও ঝড় উঠেছে, তবু বদলায়নি ‘ডেলিভারি বয়’দের জীবন।
2017 Ernst and Young study on the “Future of Jobs in India” সমীক্ষায় জানা গিয়েছে ২০১৭ সালেই গোটা পৃথিবীর গিগকর্মীদের ২৪ শতাংশ ভারতের গিগকর্মী।
ঝড়, জল, যে কোনও প্রাকৃতিক দুর্যোগ, উৎসব অনুষ্ঠানে এঁদের কোনও ছুটি নেই। দিনে প্রায় ১৫ ঘণ্টার বেশি কাজ করতে হয় কিন্তু হাতে যে অর্থ আসে তাতে সংসার চলে না।
নো ওয়ার্ক নো পে নিয়মে যে দিন কাজ করতে পারবেন na সেদিন বেতন বন্ধ। যে কোনও পরিস্থিতিতেই খাবার পৌঁছে দিতে হবে।
আবার সংস্থার আদেশ না মানলে দিতে হবে জরিমানা। সপ্তাহে পাঁচটা অর্ডার রিজেক্ট হলে সেই ডেলিভারি বয়কেই নিজের পকেট থেকে ৫০০ টাকা দিতে হয় তাঁর সংস্থাকে। সংস্থার বলে দেওয়া পোশাক না থাকলে আরও ৫০০ টাকা জরিমানা। এই রিস্ক ফ্যাক্টর মেনেই প্রত্যেকদিন কাজ করতে হয় ডেলিভারি বয়দের।
দ্রুত ডেলিভারি দিতে গিয়ে ট্রাফিক ভেঙে জরিমানার মুখেও পড়তে হয়। এই চাকরির কোনও নিরাপত্তা। বেশিরভাগ সংস্থাই তাঁদের ডেলিভারি বয়দের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ করে। সংস্থার অ্যালগরিদম বাড়াতে না পারলে চাকরি থেকে বসিয়ে দেওয়া হয়।
রানার’র জীবন দূর থেকে দেখতে থাকি আমরা। খানিক আহা করি তারপর আবার ভুলে যায়। ডেলিভারি লেট হলে দরজায় আসা মানুষটিকে দু’কথা শুনিয়ে দিতে ছাড়ি না।
একশো বছর বয়স হল সুকান্ত ভট্টাচার্যর। এই প্রজন্ম তাঁকে চেনে না। আবার বদলে যাওয়া সময়ে সুকান্তর কবিতা কি আদৌ প্রাসঙ্গিক- এমন প্রশ্নও ওঠে।
এ প্রসঙ্গে মনে পড়ে যায়, ওয়াশিংটন পোস্টে ২০১৮-র ৮ মে প্রকাশিত একটি নিবন্ধের কথা। ‘হোয়াই স্পেক্টর অব মার্কস স্টিল হান্টস দি ওয়ার্ল্ড’ শিরোনামের এই লেখা বলে, ‘ হোয়াটএভার ইউ থিঙ্ক অব হিম, মার্কস স্টিল ম্যাটার্স’।
মার্কস সম্পর্কে আপনি যাই ভাবুন মার্কস এখনও একটা ব্যাপার। একথা খাটে কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য-এর ব্যাপারেও। আপনি যে সময়েরই মানুষ হোন না কেন শ্রমের লড়াই, মর্যাদা আর অধিকার বুঝে নেওয়ার প্রশ্নে ‘দেশলাই কাঠি’র কবির কথা কখনও পুরনো হবে না।

