‘অ্যালবাম’- অনন্যা বন্দ্যোপাধ্যায়
আমার বাবার কাছে কতগুলো ছবির অ্যালবাম আছে। এখনকার স্মার্ট ফোনের গ্যালারির মত ডিজিটাল নয়, গোলাপী নক্সাদার বা সবুজ রেক্সিনে মোড়ানো। আগের প্রজন্মের সব মানুষের কাছেই বোধহয় থাকত। ওগুলো বাবার খুব প্রিয় এবং আমারও। বাবা মাঝে মাঝে ওগুলো আলমারি থেকে বের করে ধুলো ঝেড়ে, সযত্নে মুছেটুছে, কয়েকটা ছবি আমাকে দেখিয়ে, আবার ন্যাপথালিন দিয়ে তুলে রেখে দিত, পাছে বেশি নাড়াচাড়া করলে এদিক ওদিক হয়ে যায় বা খারাপ হয়ে যায় ছবিগুলো। অতএব বোঝাই যাচ্ছে অ্যালবামগুলো বাবার বেশ কাছের। তাই বাবা অফিস চলে গেলে চুপিসাড়ে আমি ওগুলো খুলে বসতাম। খুব মজা হত। সবার ছবি তাতে। সবার ছোটবেলায়, মাঝবেলা, বুড়োবেলা। বিয়ে, পৈতে, অন্নপ্রাশন, পিকনিক বা টাইগার হিলে সানরাইজ! এখনকার মতো দামি ক্যামেরার বাহুল্য ছিলনা বললেই চলে। আমার বাবার কাছে ছিল কোডাকের একটা ছোট্ট ক্যামেরা। সে ছিল আমাদের বেড়াতে যাবার আরেক সদস্য।তাতে রিল ভরতে হত। কোথাও যাবার আগে পড়িমরি করে বাবাকে দৌড়তে দেখতাম সেই ক্যামেরায় রিল ভরিয়ে আনতে। আবার ছবি তোলা হয়ে গেলে তাকে যত্ন করে দোকানে দিয়ে আসতে হত। হ্যাঁ তখন ‘ফটোর দোকানই’ বলার চল ছিল। ‘স্টুডিয়ো’ শব্দটা এতটাও প্রচলিত হয়নি বোধহয়। সেই ফটোর দোকান থেকে ছবি ধুয়ে, অ্যালবামে করে একেবারে যখন বাড়ি আসত তখন হুড়োহুড়ি পড়ে যেত কে আগে দেখবে।
আরেকটা যে ব্যাপার না বললেই নয় সেটা হল তখনকার দিনে কিন্তু এই প্রফেশনাল ফটোগ্রাফারের চলটা একেবারেই ছিল না। জন্মদিন, পৈতে, অন্নপ্রাশন, এমনকি বিয়েতেও এই গুরু দায়িত্ব সানন্দে কাঁধে তুলে নিত পরিবারেরই কেউ। রন্তু পিসির ছেলে, ছোট কাকা, মেজো ভাগনে এরা হৈহৈ করে বাড়িতে এসে পড়া মানেই ছবির দায়িত্ব এদের। কেউ হয়ত আলগোছে জল খাচ্ছে, টুনু মাসি সবে হাত খোঁপা পাকিয়েছে, মটু খুড়ো লুচিটা মুখে পুড়তে যাচ্ছে…. গোটা অ্যালবাম জুড়ে থাকত এইসব ছবি। ফুলশয্যার দুষ্ট মিষ্টি ছবিগুলো তোলার সময় আমাদের ছিল ওই ঘরে প্রবেশ নিষেধ। দূর থেকে শুনতাম মাঝে মাঝেই দিদি বা বৌদিদের হাসির কলরব ভেসে আসছে। মনে মনে ভারী রাগ হত। তবে প্রতিবার এই ছবি পর্বের শেষে কারোর না একটা অভিযোগ থাকবেই যে তার একটাও ভাল ছবি নাকি অ্যালবামে নেই। ব্যাস অমনি খানিক মান অভিমানের পালাও থাকত বৈকি। এমনি ভাবেই একেকটা অ্যালবামের পিছনে থাকে একেকটা ইতিহাস।
তখন অমুকে প্যাংলা ছিল বলে তাকে ‘প্যাংলা’ বলেই ডাকা হত এবং সেও হাসি মুখে তাতে যোগ দিত ( আজ্ঞে হ্যাঁ, তখন বডি শেমিং কনসেপ্টটাই ছিল না ) এখন এমন মুটিয়েছে যে তাকে আর চেনাই যায়না! গায়ে বিয়ের জল পড়েছে বা নতুন চাকরির চেকনাই – এই জাতীয় সব মন্তব্য আলগোছে ভাসিয়ে দিত গুরুজনরা। এখন বুঝি বাবা কেন আগলে রাখে অ্যালবামগুলো। যতদিন যায় অ্যালবামের সব মানুষগুলো আস্তে আস্তে জীবন থেকে কর্পূরের মত উবে যায়, থেকে যায় সম্পর্কের সুগন্ধ। আর ওই অ্যালবামটা রয়ে যায়। স্মৃতি আবছা হয়ে এলেও অ্যালবামে কিন্তু মানুষটা দিব্যি সুন্দরী হাসিখুশি বা স্মার্ট থেকে যায়।
ভালো দিদা, বড়ো দাদু, মেজো মামা, নতুন মাসি, ছোটু পিসি, পঞ্চু মেসো, বাগানের দিকের কাকিমা, বা বর্ধমানের রাঙা মাসি- এগুলো শুধু একেকটা নাম নয়। এগুলো একেকটা অধ্যায়। শৈশব থেকেই আজ অবধি জুড়ে থাকে এই নামগুলো। কেউ এসে হাতে গুঁজে দেয় একটা টাকা তো কেউ টুক করে গালে পুরে দিচ্ছে দুটো নারকেল নাড়ু বা এক্লেয়ার্স, কাউকে হয়ত রাস্তায় দেখতে পেলেই অবলীলায় জড়িয়ে ধরে আবদার করা যায় এটা ওটা সেটা।
আর বাংলা ভাষাটিও কম যায়না, যত আদর আবদারের প্রবাদও – মামা মাসিকে নিয়েই, ‘মামাবাড়ি ভারী মজা কিল চড় নাই / মায়ের চেয়ে মাসির দরদ বেশি/ নেই মামার চেয়ে কানা মামা ভালো ‘ – এরকম আরও কত কী।
সত্যিই তো! মা যদি বা কখনও চোখ পাকিয়ে দুটো বকবে অমনি মাসি এসে ছোঁ মেরে নিয়ে চলে গেল আমাকে। মাসিদের দরদ, আদর, আহ্লাদ আগাগোড়া একটু বেশিই, সে যে যাই বলুক।
ছোটবেলায় সেই এক্কাদোক্কার বিকেলে বা গরমের ছুটির লম্বা দুপুরের লুডোর বোর্ডে বসে ভাবতাম কবে যে অনেক বড়ো হব! তখন বুঝতেই পারতাম না বড়ো হতে গেলে অনেক মূল্য চোকাতে হয়, অনিচ্ছা সত্ত্বেও ছেড়ে দিতে হয় হাত। বড়ো হবার তো এটাই জ্বালা তখন আর এই আদরের মানুষগুলো থাকে না, একেকটা নাম হয়ে যায়। একটা সময় যে মানুষগুলো গোটা শৈশব, কৈশোর জুড়ে ছিল এখন তারা একে একে সব অ্যালবামে ঠাঁই নিয়েছে। শুধুই ছবির অ্যালবামে। নিথর মূহুর্ত… অনন্ত!

অপূর্ব লেখনী।
আপনি আরও লিখুন, লিখে চলুন অনন্যা।
আপনার নামেই আপনার সার্থকতা।
সত্যিই অনন্যা আপনি এবং আপনার এই লেখা।
আমিও একজন একান্নবর্তী পরিবারে বেড়ে ওঠা মানুষ।
তাই যেন আরও বেশি করে আপনার এই লেখার সঙ্গে নিজেকে সংপৃক্ত করতে পারলাম।
আবারও বলছি, প্রিয় অনন্যা, আপনি এভাবেই লিখে চলুন এবং আগামীতে সেই সব লেখা প্রকাশিত হয়ে আমাদের ঋদ্ধ করুক, এই কামনা করি।
ভালো থাকুন, সুন্দর থাকুন।