ফিচারের দুনিয়ায়
“পয়লা বৈশাখ-২৫শে বৈশাখ”
লিখেছেন সংহিতা রায়
‘নববর্ষ-ধরতে গেলে রোজই তো লোকের নববর্ষ৷ কেননা, এই হচ্ছে মানুষের পর্বের একটা সীমারেখা৷ রোজই তো লোকের পর্ব নতুন করে শুরু হয়৷’
রবীন্দ্রনাথের কথায়, প্রতিদিন নতুন শুরু হচ্ছে। তাই প্রতিদিন নববর্ষ। রানী চন্দের লেখা ‘আলাপচারি রবীন্দ্রনাথ’ অনুযায়ী ১৯৩৯ সালে এই উক্তি করেন কবি। নতুন বছর আসলে নতুন এক জন্মদিন।
শান্তিনিকেতনে কবিগুরুর জন্মদিন পালিত হত পয়লা বৈশাখের দিন।
১৩০৯ (১৯০২) থেকে, ১ বৈশাখ শান্তিনিকেতন আশ্রমে নববর্ষের অনুষ্ঠানের সূচনা হয়েছিল
২৫ বৈশাখে জন্ম রবীন্দ্রনাথের। কিন্তু শান্তিনিকেতনে সেই সময়ে রুক্ষ শুষ্ক। গ্রীষ্মের প্রবল জলাভাবে ভুগত। তাই ২৫-এর বদলে পয়লা দিনেই জন্মোৎসবের অনুষ্ঠান পালন করা হত।
রানী চন্দ লিখেছেন, ‘আজ নববর্ষ৷ এবারে ১লা বৈশাখেই গুরুদেবের জন্মোত্সব হবে-আগে থেকেই ঠিক করা হয়েছিল৷ ভোরবেলা কচি শালপাতার ঠোঙায় কিছু বেল জুঁই কামিনী তুলে ‘উদয়ন’-এর দক্ষিণের বারান্দায় গুরুদেবের হাতে দিয়ে তাঁকে প্রণাম করলুম৷ আজ অনেক আগে থেকেই গুরুদেব বারান্দায় এসে বসেছেন৷ ফুলের ঠোঙাটি হাতে নিয়ে তা থেকে গন্ধ শুঁকতে শুঁকতে ধীরে ধীরে বললেন, ‘আজ আমার জীবনের আশি বছর পূর্ণ হল৷ আজ দেখছি পিছন ফিরে-কত বোঝা যে জমা হয়েছে৷ বোঝা বেড়েই চলেছে৷’
রবীন্দ্রনাথের পয়লা বৈশাখ মনে মননে নিজেকে নতুন করে তোলার দিন । চিত্রা কাব্যগ্রন্থের নববর্ষে লিখেছেন,
‘নিশি অবসানপ্রায়, ওই পুরাতন
বর্ষ হয় গত!
আমি আজি ধূলিতলে এ জীর্ণ জীবন
করিলাম নত।
বন্ধু হও, শত্রু হও, যেখানে যে কেহ রও,
ক্ষমা করো আজিকার মতো
পুরাতন বরষের সাথে
পুরাতন অপরাধ যত।’
কবির শেষ জন্মদিন, অর্থাৎ ৮০-তম জন্মদিনও পালিত হয়েছিল পয়াল বৈশাখের দিন। সে বার কবিগুরু হুইল চেয়ারে বসেছিলেন উদয়ন গৃহে। তাঁর সামনেই ‘সভ্যতার সংকট’ পাঠ করেছিলেন ক্ষিতিমোহন সেন। পরবর্তীত সময়েও পয়লা বৈশাখেই কবির জন্মদিন পালন করা হত।
জোড়াসাঁকোর ঠাকুরপরিবারে মহাসমারোহে উদযাপিত হত পুণ্যাহ বা নববর্ষের অনুষ্ঠান। রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, সেদিন যাকে বলে জমিদারি সেরেস্তার ‘পুণ্যাহ’, খাজনা আদায়ের প্রথম দিন। কাজটা নিতান্তই বিষয়-কাজ। কিন্তু জমিদারি মহলে সেটা হয়ে উঠেছে পার্বণ। সবাই খুশি। যে খাজনা দেয় সেও, আর যে খাজনা বাক্সেতে ভর্তি করে সেও। এর মধ্যে হিসেব মিলিয়ে দেখবার গন্ধ ছিল না। যে যা দিতে পারে, তাই দেয়।




