চতুর্থ বর্ষ দ্বিতীয় সংখ্যা – সাক্ষাৎকার ||হল্লার পরেও: বাদল সরকার ও সফদর হাশমির এক কল্পিত কথোপকথন|| ——দেবার্ঘ্য দাস
ভূমিকা: স্বাধীনোত্তর ভারতের নাট্যভূমিতে দুটি প্রবণতা একসঙ্গে বিকশিত হয়। প্রথমত, বাদল সরকারের তৃতীয় নাট্য, যা প্রোসেনিয়ামের সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে খোলা আকাশের নিচে, ন্যূনতম উপকরণে, দর্শক–অভিনেতার দূরত্ব কমিয়ে আনতে চেয়েছে (Katyal, 1990)। দ্বিতীয়ত, সফদর হাশমির পথনাটক, যা বিশেষত শ্রমিক আন্দোলন ও জনসমাবেশের ভিতর রাজনৈতিক বার্তাকে সংক্ষিপ্ত ও তীক্ষ্ণ রূপে হাজির করেছে (Machine(মেশিন), 1978; Aurat,(অওরৎ) 1979)।
এই দুটি ধারার সঙ্গে যদি যুক্ত করা যায় মণ্টোর ট্রমা-সাহিত্য—যেখানে পার্টিশনের ক্ষত সংক্ষিপ্ত অথচ শকপ্রদ দৃশ্যে উন্মোচিত—এবং রবীন্দ্রনাথের নাটক ও উপন্যাস, যেখানে নন্দনশিল্পের মধ্যেই নৈতিক ও রাজনৈতিক প্রশ্ন নিহিত, তবে ভারতীয় নাটকের একটি চার-ধারার মডেল পাওয়া যায়: ১.পাল্টা-আর্কাইভ (বাদল সরকার), ২.এজিট-প্রপ সংক্ষিপ্ততা (সফদর হাশমি),
৩.ফরেনসিক বাস্তববাদ (সাদাত হাসান মন্টো),
৪.নান্দনিক-নৈতিকতা (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)।… লিখতে লিখতে চোখ গেল জানলার বাইরে। বৃষ্টিটা ভালোই পড়ছে; মেঘলা আকাশ , গুমোট ভাবটা কাটবে কি কাটবেনা চিন্তা করতে করতে টেবিল থেকে উঠে ঘরের বাইরে লাল বারান্দায় এসে বিড়িটা ধরালাম। ঠিক কোন সময় আমার সামনের সবুজ বাগান নাটকের স্টেজে পরিবর্তিত হয়েছে মনে নেই— (একটি খোলা আঙিনা। তিন দিক গাছ, এক দিকে অর্ধনির্মিত ফ্লাইওভার। মাঝখানে চক দিয়ে আঁকা বৃত্ত। একটু আগেই বৃষ্টিটা থেমেছে। ভেজা মাটি। দু’টি ভাঙা বেঞ্চ—একটায় বাদল সরকার, অন্যটায় সফদর হাশমি। দূরে ট্রামলাইনের মতন লম্বা একটা ছায়া। চারদিকে ছড়িয়ে আছে কাগজের পোস্টার, বাঁশি, ডাফ, আর কয়েকটা লাঠি—প্রপ না অস্ত্র তা বোঝা কঠিন।)
বাদল: (বৃত্তের দিকে তাকিয়ে) এই বৃত্ত—নিরাপত্তা নয়, দায়। দর্শকের সঙ্গে একটা চুক্তি। আমি যখন আঙিনামঞ্চ বলেছিলাম, আসলে চেয়েছিলাম মঞ্চ আর দর্শকের দূরত্বটাকে বিয়োগ করতে। দেহ, কণ্ঠ, শ্বাস—তারাই প্রপ। পাঁচশো ওয়াটের আলো নয়, বরং চোখের ভেতরকার আলোই হচ্ছে মঞ্চের আলোকসজ্জা।
সফদর: (হাতে ডাফ টোকা দেন) আর আমি চেয়েছিলাম রাস্তার শব্দটাই হোক স্কোর। বাসের হর্ন, ভিক্টোরিয়ার ঘোড়া, ইউনিয়নের স্লোগান—সব মিলেই তো স্ট্রিট থিয়েটার-এর সাউন্ড-ডিজাইন। আমরা JANAM/ জনম-এ শিখেছিলাম, নাটককে দ্রুত জড়ো হতে হয়, দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে হয়, আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—দ্রুত মনে গেঁথে দিতে হয়। পাঁচ মিনিটের ‘মেশিন’ও কখনও কখনও এক ঘন্টার বক্তৃতার চেয়ে তীক্ষ্ণ হয়।
বাদল: ‘মেশিন’—শুধু বিষয় নয়, ভঙ্গিও। শ্রম আর অভিনয়ের সম্পর্কটা সেখানে নগ্ন। আমি ‘ভোমা’, ‘মিছিলে’ খুঁজেছি এই নগ্নতাই—যেখানে ভাষা দণ্ডায়মান, আর শরীর তার ব্যাকরণ। প্রোসেনিয়াম আমার কাছে ছিল এক ধরনের বাধ্যতামূলক শালীনতা; তৃতীয় থিয়েটার সেই শালীনতার গায়ে কাদা ছুঁড়ে দিয়েছে।
সফদর: শালীনতা ভাঙতে গিয়ে আমরা কখনও অশালীন হইনি—বরং কর্তৃপক্ষের শালীন মিথ্যাকে অশালীন বলেছি। আমাদের ‘হল্লা বোল’ রক্তে লিখিত এক উচ্চারণ—সেখানে থেমে যাওয়ার মানে হত পরাজয়; তাই আমরা থামিনি। নাটকের দেহে যে আঘাত এসেছিল, মানুষের দেহে যে আঘাত এসেছিল, তাকে আমরা প্রতিদিন রিহার্সালে সেলাই করেছি। এটাই আমার নন্দন—প্রতিবাদের কর্মশালা।
বাদল: নন্দনের কথায় মনে পড়ল—আমি নন্দনের বাইরে যে পার্কে, মাঠে, ছাদে নাটক করেছি, সেখানে দর্শক ছিল অনিয়ন্ত্রিত। কেউ এসে বসছে, কেউ উঠে যাচ্ছে, কেউ প্রশ্ন ছুড়ে দিচ্ছে—“শেষে কী হবে?” তৃতীয় থিয়েটারের ‘শেষ’ নেই; আছে ‘সম্পর্ক’। তুমি সেই সম্পর্ককে পথে নামিয়ে দিলে।
সফদর: সম্পর্ক মানে সংগঠনও। ইউনিয়নের গেটে সকাল আটটায় ‘অওরৎ’ খেলতে গিয়ে বুঝেছি, নাটকের ভাষা বদলাতে হবে। কোরাস ব্যবহার করেছি স্লোগানের মত, ব্যঙ্গ ব্যবহার করেছি আয়নার মত, তথ্য ব্যবহার করেছি হাতুড়ির মত। কিন্তু হাতুড়ি দিয়ে কাচ ভাঙার আগে কাচের কারিগরিকে বুঝতে হয়—তাই লেখার আগে আমরা কারখানায় যেতাম, বাসডিপোর চালকদের সঙ্গে বসতাম, নারীদের মিটিংয়ে আলোচনা শুনতাম। লেখার ঘরে তত্ত্ব খুঁজে, রাস্তায় প্রমাণ করে দেখিয়েছি।
বাদল: আমি অফিস থেকে নাটকে এসেছিলাম—নকশা আঁকা হাতটা একদিন লোকজ আঙ্গিকে ডুবে গেল। শতাব্দীতে আমরা টেক্সটকে দেহে নামালাম: রিপিটেশন, ইম্প্রোভাইজেশন, কালেক্টিভ ডিভাইসেস—সবকটা ছিল রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। শিল্পের ‘খরচ’ কমালে দর্শকের ‘খরচ’ও কমে; মুক্তি তখন টিকিটের দামে নয়, দেহের সদিচ্ছায়। আমি বলেছি: “অভিনেতা বেতন নেবে, কিন্তু দর্শক বেতন দেবে না—দেবার কথা নয়।” এই অর্থনৈতিক ব্যাকরণটাই ছিল তৃতীয় থিয়েটারের রাজনীতি।
সফদর: (হেসে) আমরা টিকিট নিতাম না; কিন্তু কেউ যেন বলুক যে, টিকিট বিনামূল্যে ছিল! অভিনয়কারীর সাহস, কোরাসের শ্বাস, প্রপসের তৎপরতা—সবই দামি। ‘বিনা টিকিট’ মানে ‘বিনা দায়’ নয়। তাই রুটিন করেছি—সকাল মিটিং, দুপুরে রিহার্সাল, সন্ধ্যায় শো, রাতে আলোচনা। যারা ভাবে আগিটপ্রপ মানেই হালকা, তারা কখনও দেখেনি আমরা ভুল তথ্যের বিরুদ্ধে কেমন শান দিতাম। আগিটপ্রপ—এজিটেশন প্লাস প্রোপাগান্ডা—আমার কাছে ছিল যুক্তিযুদ্ধ; স্লোগানও যুক্তি, ব্যঙ্গও যুক্তি, গানও যুক্তি।
বাদল: যুক্তিরও আবার দেহ আছে। এবং ইন্দ্রজিৎ—সেখানে ‘আমি’ আসলে কোরাস; ব্যক্তির নাম—অমল, বিমল, কমল—পুনরাবৃত্তিতে ভঙ্গুর। পুঁজিবাজার যখন আপনাকে এক-একটা ব্র্যান্ড বানায়, নাটক তখন আপনাকে ফিরিয়ে দেয়—মানুষ হিসেবে। তৃতীয় থিয়েটার এই কারণে পেশাদারিত্বকে প্রশ্ন করেছে; পেশাদারিত্ব ভাল, যদি মানুষের প্রতি দায়বদ্ধ থাকে; খারাপ, যদি শুধুই বাজারের প্রতি দায়বদ্ধ থাকে।
সফদর: বাজার এখন ডিজিটাল—আলগোরিদম দর্শকের কাঁধে কর্তৃপক্ষের হাত রেখে বলে: “এটাই দেখো।” রাস্তার জায়গা কমে গেছে, মলের জায়গা বেড়েছে। পারমিশন পেতে ফাইল ঘোরে; তবু আমি বলব—রাস্তা এখনো আছে; যতক্ষণ ফুটপাথে একজন নাটক দেখতে গিয়ে থামে, নাটক বেঁচে থাকে। ক্যমেরার রিলস ‘ভিউ’ দেয়, রাস্তার মিটিং ‘ভয়স’ দেয়। ‘ভিউ’ ও ‘ভয়স’-এর টানাপোড়েনে আমাদের কাজ আজ আরও জরুরি।
বাদল: তুমি মৃত্যুর মুখে নাটক থামাওনি; আমি বৃদ্ধ বয়সেও পার্কের ধুলোয় গড়িয়েছি। আজ যারা থিয়েটার করে, তাদের বলব—রিস্ক নাও, কিন্তু রিস্কের তত্ত্ব বানাও। শুধু স্লোগান নয়, স্কোর বানাও; শুধু চরিত্র নয়, ডকুমেন্ট বানাও। আমি ‘বিয়ন্ড দ্য প্রোসেনিয়াম’-এ লিখেছিলাম—দর্শককে ‘সাক্ষী’ বানাও। সাক্ষী সে-ই, যে নিজের দায় বুঝতে পারে।
সফদর: সেইসব সাক্ষীকে ‘সাথী’ করাই আমার লক্ষ্য ছিল। তাই লেখায় ‘কালেকটিভ অথরশিপ’—রিহার্সালে যে লাইন জন্মেছে, সেটা লেখকের নাম পায় না; পায় দলের নাম। ‘অওরৎ’-এ নারীর শ্রমের হিসেব, ‘ডিটিসি কি ধন্ধলি’-তে শহরের পাবলিক সার্ভিসের লুট—এসব আমরা কথা বলেছি সরাসরি ভাষায়, কিন্তু সরলতা মানেই সহজ সম-সরলীকরণ নয়। ব্যঙ্গের ভিতরে ছিল তথ্যের ধার।
বাদল: তথ্যের ধার অভিনয়ের হাড়ে ঢুকতে হবে। থিয়েটার স্কুলে শেখানো ‘প্রজেকশন’-এর আজ অর্থ বদলেছে—সোশ্যাল মিডিয়া প্রজেক্ট করে, অভিনেতা নয়। কিন্তু কণ্ঠ যখন বাতাসে খোদাই হয়, তখন সে খোদাই হয় সোয়াসের পাথরে। আমার প্র্যাকটিসে কোরিওগ্রাফড রিপিটেশন—একই গতির প্রত্যাবর্তন—দেখিয়েছে কিভাবে অভ্যাসে রাজনীতি লুকিয়ে থাকে। মার্চিং কেবল সৈন্যদলের নয়; শহরের অফিস-বাসও এক ধরনের মার্চ। নাটককে সেই মার্চে ফেলে দিতে হবে একটা বাধা হিসেবে—একটা ‘ভুল তাল’হিসেবে।
সফদর: ভুল তালই নতুন তাল। আমরা দৃশ্যমান শত্রুর বিরুদ্ধেই শুধু কথা বলিনি; অদৃশ্য ক্ষমতার বিরুদ্ধেও কথা বলেছি—বাণিজ্যের ছদ্মশালীনতা, সংবাদমাধ্যমের শৈল্পিকতার মুখোশ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বাজারিকরণ। আজ যখন কন্টেন্টই পণ্য, থিয়েটারকে হতে হবে কন্ট্রা-কন্টেন্ট—একটা ঘটমান প্রতিরোধ, যা প্ল্যাটফর্মে আপলোড হয় না, মানুষের স্নায়ুতে আপলোড হয়।
বাদল: (হালকা হাসি) আপলোড—ভাল শব্দ। তৃতীয় থিয়েটার চাইত ডাউনলোড—লোকজ, পালা, কবিয়ালের বডি-নলেজ। নৃত্যশরীর, বাউলের দেহ-বাক—এসব আমরা ‘মডার্ন’ বানাইনি; বরং নিজেদের ‘মডার্ন’ ভাঙতে ব্যবহার করেছি। আধুনিকতা যদি কেবল কংক্রিট ও কাঁচের দালান হয়, তা হলে পার্কের ঘাস-ও আধুনিকতার বিপ্লব।
সফদর: আমাদের পরের প্রজন্মের জন্য তিনটে কথা বলি—এক, রিগর। রাস্তায় যাবার আগে তথ্য যাচাই, স্ক্রিপ্টে ফাঁক না রাখা, সময়-জ্ঞানের জরুরী শিক্ষা; দুই, রিস্ক। কেবল পুলিশের ঝুঁকি নয়; নিজের আরামের বিরুদ্ধে ঝুঁকি নিতে শেখা। তিন, রিলেশন। নাটক শেষ মানে ‘সমাপ্তি’ নয়—আলোচনা, বিতর্ক, সংগঠন। দর্শক যেন টিমে ঢুকে পড়ে; পরদিন ফ্যাক্টরির গেটে যেন সেই দর্শকই কোরাসে অংশগ্রহণ করে – সেইদিকে লক্ষ্য রাখা।
বাদল: আর আমি বলি—রূপ। প্রতিবাদের রূপও শিল্পের আর্কিটেকচার চায়। ওপেন ফর্ম মানে অবিশৃঙ্খল নয়—বরং সংগত, সংগঠিত স্বেচ্ছাচার। একটি চক-বৃত্ত এঁকে তাতে ঢুকে পড়া মানে নিয়ম বানিয়ে তাকে ভাঙা। ল্যাঙ্গুয়েজ—কেবল শব্দ নয়; ব্লকিং, ব্রেথিং, ব্রেক। ‘পাগলা ঘোড়া’ যখন কালো হাসি ছুঁড়ে দেয়, তখন তার অন্তর্গত মিটার জানে কখন থামতে হয়।
সফদর: আজকের প্রেক্ষাপট—সংকুচিত প্রতিবাদের জায়গা, নজরদারির প্রযুক্তি, ঘৃণার দ্রুতবেগ, মতের বাজার—এদিকে অনলাইন সক্রিয়তা প্রায়ই অফলাইন নিষ্ক্রিয়তার আড়াল। তবু আশার জায়গা আছে—ছোট শহরের নতুন দল, ভাষাভিত্তিক উপভাষার নাট্য-উদ্যম, নারীকেন্দ্রিক স্ক্রিপ্ট, দলিত ও আদিবাসী তরুণ দলের জনমুখী রচনা। পাবলিক স্পেস গায়েব হলে কমন স্পেস বানাও—বাড়ির ছাদ, স্কুলের মাঠ, কমিউনিটি কিচেন, বইমেলার গলি, ট্রামডিপোর শেড।
বাদল: (ট্রামলাইনের দিকে) ট্র্যাক মানে দিকও বটে। থিয়েটারকে বারবার উৎসে ফিরে যেতে হবে—‘কেন’ করি, ‘কার’ জন্য করি, ‘কিভাবে’ করি। আমি যখন বলেছিলাম—থিয়েটার অভ্যাস—তার মানে ছিল প্রতিদিন নিজেকে প্রশ্ন করা। শিল্পীর অহংকারকে প্রতিদিন ডিফ্লেট করতে হবে; না হলে প্রতিবাদের ভাষা দাঁতে লাগে না।
সফদর: শিল্পীর ইগো-হাইজিন—চমৎকার শব্দ। আমরা দল চালাতে গিয়ে শিখেছি, ভিন্নমতকে দমন করলে শিল্প শুকিয়ে যায়। ক্যালিব্রেশন যেমন প্রয়োজন, তেমনি কনফ্লিক্ট ম্যানেজমেন্ট—মিটিংয়ের টেবিলে যে বিবাদ মেটাতে পারি, রাস্তার মোড়ে তার দাম পড়ে না। তাই স্ক্রিপ্টে বিরোধ রাখো—চরিত্ররা যেন মতভেদে বাঁচে, মোনোলিথ না হয়ে যায়।
বাদল: ফর্মাল এক্সপেরিমেন্ট করো—কিন্তু এক্সপেরিমেন্ট যেন মানুষের জীবনের খরচে না হয়। দুঃখকে ফেটিশ কোরো না; দারিদ্র্যকে দৃশ্যাবলী বানিও না। তোমার ক্যামেরা না থাকলেও দৃষ্টি আছে—সে দৃষ্টির নৈতিকতা প্রতিষ্ঠা করো। আর, নিজের ভাষাকে ভালবাসো—বহুভাষার দেশ, বহুস্বরের নাটক। অনুবাদ করো, কিন্তু ট্রান্সক্রিয়েশন হবে—শুধু শব্দ নয়, শরীরের রেজিস্টার বদলে দাও।
সফদর: (ডাফে ধীরে তাল) শেষ কথা—ভয়। ভয় থাকবে—আক্রমণ, মামলা, নিষেধাজ্ঞা, অনুদান বন্ধ, হল না পাওয়া, রিভিউ না মেলা। তবে ভয়কে রিহার্সাল করাও—সাইট-রিডিং এর মতো। যে ভয়কে চেনা হয়, সে ভয় নাটকে জায়গা পায়; যে ভয় অচেনা, সে ভয় নাটককে থামায়। আমরা ভয়কে চরিত্র করেছি; কখনও ক্লাউন, কখনও প্রেত, কখনও আমলা।
বাদল: (চকের বৃত্ত মুছে দিতে দিতে) বৃত্ত মুছে গেলেও সম্পর্ক মুছে যায় না। থিয়েটার শেষ হয়ে গেলে থিয়েটার-পরবর্তী আলোচনাই আসল পর্ব। আমরা দু’জন চলে গেছি—কিন্তু প্রশ্ন বেঁচে আছে: ১) বাজারে কীভাবে থাকা যায় বাজারের দাস না হয়ে? ২) বিনোদনের জালে না পড়ে প্রতিবাদকে কীভাবে নন্দনে উত্তীর্ণ করা যায়?
৩) শিখে নেওয়া ভাষাকে কীভাবে ভুলতে শেখা যায়?
সফদর: আর চতুর্থ—কীভাবে আমরা একসঙ্গে থাকি? অভিনেতা, শ্রমিক, গৃহশ্রমে ক্লান্ত নারী, নিরুদ্যোগী ছাত্র, প্রান্তিক ভাষার কবি—সবাই মিলে। দল মানে কেবল থিয়েটার-টিম নয়; দল মানে শহরের নতুন কমন্স। সেখানে নাটক কেবল অভিনয় না, অভ্যাস—জনজীবনের একধরনের দৈনিকতার পাঠ।
(হঠাৎ দূরে ভ্যানে করে কিছু তরুণ-তরুণী আসে। ব্যানার: “আজ সন্ধেবেলায়—আঙিনা নাটক।” তারা চুপচাপ মঞ্চ বানায়: প্লাস্টিকের ক্রেট, দড়ি, পোস্টার। বাদল ও সফদর উঠে দাঁড়ান।)
বাদল: (তরুণদের দিকে তাকিয়ে) আলো না, আহ্বান লাগবে। সফদর: (হেসে) পারমিশন না, পার্টিসিপেশন লাগবে।
(তরুণরা কোরাসে গলা মেলায়; সুর মিলেমিশে যায় শহরের দূরবর্তী ট্রাফিকের সঙ্গে। বাদল ও সফদর পেছনের ছায়ায় সরে যান।)
(একটি খোলা মঞ্চ। টেবিল নেই, কেবল মেঝেতে বই রাখা—ট্যাগোরের নাটক, মণ্টোর গল্প, বাদল সরকারের তৃতীয় নাট্যচিন্তা, সফদরের স্ট্রিট থিয়েটার পেপার। আলো মাঝেমধ্যে ঝাপসা হয়, যেন এক সেমিনার-আলোচনা আর নাট্য-অভিনয় একসঙ্গে হচ্ছে।)
সফদর:
“রবীন্দ্রনাথের নাটক, বিশেষত রক্তকরবী, আজকের সমাজেও Labour Studies–এর পাঠ্য হতে পারে। রাজশক্তি শ্রমিককে মাটির নিচে নামিয়ে দেয়, আর নন্দিনী দাঁড়ায় ‘Agency’ হিসেবে। এটাকে যদি মাইনিং কর্পোরেশন, SEZ, বা আধুনিক কর্পোরেট শোষণের প্রেক্ষিতে রাখি, নাটকটা হয়ে ওঠে সমসাময়িক প্রতিবাদের নন্দন।”
বাদল:“হ্যাঁ, কিন্তু আমি বলব—রবীন্দ্রনাথ কেবল প্রতিরোধ নয়, Ritual of Liberation বানান। ডাকঘর–এ মৃত্যু মানে মুক্তি, কিন্তু সেটা শিশু অমলকে কেন্দ্র করে। আসলে একটি Existential Metaphor, যেখানে রাজনৈতিক প্রতীকও লুকিয়ে আছে। উপনিবেশিক সেন্সরশিপের সময়ে ডাকঘর আয়ারল্যান্ডে মঞ্চস্থ হয়েছিল—অসুস্থ দেহ = উপনিবেশিত দেশ। আজকের দিনে এটাকে পড়লে বোঝা যায়—রাষ্ট্র যার শ্বাসরুদ্ধ করে, শিল্প তার জানালা খুলে দেয়।”
“মণ্টোকে আমি পড়ি যেন তিনি এক ধরনের সোশ্যাল হাইপোথিসিস। Partition–এর অভিজ্ঞতা থেকে তিনি দেখালেন যে রাষ্ট্রের আঁকা রেখা মানুষকে ভেঙে দেয়, কিন্তু শরীরের ক্ষত সেই লাইন মানে না। টোবা টেক সিং–এ ভৌগোলিক বিভাজন এক অসামঞ্জস্যের নাটক—যেখানে মূল চরিত্র এক উন্মাদ। এটা প্রোসেনিয়ামে রাখলে কেবল গল্প হয়, কিন্তু আঙিনা থিয়েটারে করলে দর্শক হয়ে ওঠে সেই সাক্ষী—যারা আজও সীমান্ত নীতির শিকার।”
সফদর:“ঠিকই বলেছ। আমার কাছে মণ্টো ডকুমেন্টারি থিয়েটার–এর পূর্বসূরি। Brecht যেভাবে Verfremdungseffekt–এ শক ব্যবহার করেন, মণ্টোও শক ব্যবহার করেন, তবে ভাষার ভেতরে। তাঁর গল্প ছোট, কিন্তু চমক দেয়। এই চমক আসলে Distancing–এরই ভারতীয় রূপ। আজও যদি ‘খোল দো’ মঞ্চে আনি, সেটা কেবল যৌন সহিংসতার কথা নয়, বরং রাষ্ট্রীয় সহিংসতার দেহলিপি-এর কথা বলবে।”
বাদল:“মণ্টো আমাদের Wound–এ দাঁড় করান, রবীন্দ্রনাথ আমাদের Healing–এ নিয়ে যান। নাট্যচর্চায় এ দুইই দরকার—Disruption আর Consolation। Brecht বলেছিলেন থিয়েটারকে ‘শিক্ষা’ দিতে হবে; মণ্টো ‘শক’ দিয়ে শেখান। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন নাটক হলো মানুষের অন্তরের-অভ্যাস; তিনি সৌন্দর্য দিয়ে দায় শেখান।”
সফদর:“হ্যাঁ, একদিকে মণ্টো Subaltern Body–কে সামনে আনে, অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথ Universal Consciousness–এর কথা বলেন। কিন্তু একসঙ্গে রাখলে দেখা যায়—উভয়েই ক্ষমতার বিরুদ্ধে দাঁড়াচ্ছেন। মণ্টো ক্ষত খুলে দেন, রবীন্দ্রনাথ শ্বাস নিতে শেখান। দুটোই সমাজতান্ত্রিক নাট্যচর্চার প্রয়োজনীয় উপাদান।”
কোরাস:
“ঘাসের ডগায় আজও থিয়েটার,
চকের বৃত্তে আজও শহর।
যারা জিজ্ঞেস করে—‘শেষে কী?’
তাদের বলি—‘এখন শুরু।’”
(আলো ধীরে নিভে আসে। বৃষ্টির গন্ধ। দর্শক চারদিকে; মঞ্চ মাঝখানে—আজও।)ভারতীয় নাটকের এই চার ধারা (বাদল সরকার, , সফদর হাশমি, সাদাত হাসান মন্টো, এবং অবশ্যই রবীন্দ্রনাথ) আসলে সমাজের অদৃশ্য ইতিহাস ও নৈতিক দ্বন্দ্বকে দৃশ্যমান করার অভ্যাস। আজও এনারা প্রাসঙ্গিক কারণ এঁদের টেক্সট স্মৃতি, শ্রম, নারীর দেহ, রাষ্ট্রের সহিংসতা—সবকিছু মঞ্চে টেনে আনে।
বাদল সরকারের তৃতীয় নাট্য ও সফদর হাশমির পথনাটক শুধু ভারতীয় থিয়েটারের বিশেষ অধ্যায় নয়, বরং পাল্টা-আর্কাইভ তৈরির প্রক্রিয়া। যখন এগুলি মণ্টোর ক্ষত-উন্মোচন ও রবীন্দ্রনাথের শ্বাস–সৌন্দর্য–এর সঙ্গে মিলিত হয়, তখন থিয়েটার —
..ইতিহাসের মুছে দেওয়া দাগের পুনর্লিখনের অস্ত্র,
..সমাজের পিতৃতান্ত্রিক/শ্রমপীড়িত কাঠামোর বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ভাষা,
..এবং দর্শককে কেবল ভোক্তা নয়, নাগরিক ও সাক্ষী বানানোর অভ্যাস — হয়ে ওঠে।
আজও বাকি ইতিহাস, পাগলা ঘোড়া, মেশিন, আওরাত এবং রক্তকরবী — প্রাসঙ্গিক—কারণ তারা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে শিল্প কেবল সৌন্দর্যের চর্চা নয়; বরং নৈতিকতা ও রাজনৈতিক অনুশীলন।
(বি.দ্র.- প্রসঙ্গত বলে রাখা জরুরী পুরো লেখাটাই কাল্পনিক জায়গা থেকে লেখা। বিশেষ করে আমাদের প্রজন্ম এবং পরবর্তী প্রজন্মের বেশিরভাগ মানুষেরা বাদল সরকার, সফদর হাসমি, মান্টো-কে জানেন না ! এ দুঃখজনক হলেও সত্যি! তাই কিছু জায়গায় ইচ্ছে করেই কথোপকথনের মধ্যে ‘বাংরেজি’ ভাষার ব্যবহার করা হয়েছে)
