”পাশে হাঁটছেন রবীন্দ্রনাথ | ভালোবাসার যুদ্ধযাত্রা” – লিখেছেন সংহিতা রায়
রাস্তার দু’পাশে ব্যস্ত কলকাতা। গেরুয়া পতাকা উড়ছে পতপত করে। কোথাও কোথাও তখনও লেগে গেরুয়া আবিরের দাগ। যুদ্ধজয়ের উৎসব থেকে ঘরের পথে মানুষ। তার মাঝেই হঠাৎ থমকে গেল শহর। দেখল ‘আকাশ ভরা সূর্য তারা’র গানে বিদ্যুতের রেখার মতো হেঁটে যাচ্ছে একটা মিছিল। পুরোভাগে মৌসুমী ভৌমিক। কণ্ঠে একের পর এক রবি ঠাকুরের গান। শেষ সূর্যের আলো তাঁদের চোখে মুখে। দৃঢ় ভঙ্গী, একরোখা জেদ। একের সঙ্গে বহু।
১৪৩৩-এর ২৫ বৈশাখে এমন দৃশ্যর সাক্ষী হল কলকাতার মানুষ।
জন্মদিনের বাঁধা মঞ্চে নয়, রবীন্দ্রনাথ নেমে এসেছেন পথে। সবার মাঝে।
এদিন কলকাতার বাগবাজার ঘাট থেকে জোড়াসাঁকো হয়ে নাখোদা মসজিদ পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথের জন্য হাঁটলেন মানুষ। “পাশে হাঁটছেন রবীন্দ্রনাথ, ভালোবাসার যুদ্ধযাত্রা”। উদ্যোগে ‘বিদ্বেষের রাজনীতি বিরোধী জনমঞ্চ’।
বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের সময় রবীন্দ্রনাথ, এই পথেই নাখোদা মসজিদ পর্যন্ত হেঁটে ছিলেন। যাত্রা শেষে নাখোদা মসজিদের ইমামকে আলিঙ্গন করে রাখী পরিয়ে দেন।
এক আশ্চর্য সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে বাংলা। সংশয়, ভয়, আর নতুন বদল। সব ভিড় ব্রিগেডের দিকে।
পশ্চিমবঙ্গে এই প্রথম সরকারি উদ্যোগে কলকাতায় পালিত হচ্ছে না ২৫ বৈশাখ, রবীন্দ্র জন্মজয়ন্তীর অনুষ্ঠান।
৪ মে প্রকাশিত হয়েছে বিধানসভা ভোটের ফল। নতুন সরকারের শপথ গ্রহণের জন্য বিজেপি নেতৃত্ব রবীন্দ্রনাথের জন্মদিন ২৫ বৈশাখকেই বেছে নিয়েছিল।
শনিবার ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী অমিত সহ বিজেপি শাসিত রাজ্যের ২০ জন মুখ্যমন্ত্রীর উপস্থিতিতে শপথ নেয় বাংলার বিজেপি সরকারের মুখ্যমন্ত্রী সহ মন্ত্রীরা।
তাই ২৫ বৈশাখের চেয়েও দিনটিতে গুরুত্ব পেয়েছে প্রথম বিজেপি সরকারের শপথ গ্রহণ।
এক সময় বাঙালির ২৫ বৈশাখ উদযাপন মানে ছিল রবীন্দ্রসদন আর জোড়াসাঁকো ঠাকুর বাড়ির অনুষ্ঠান।
তৃণমূল সরকার ক্ষমতায় আসার পর তালা পড়ে রবীন্দ্র সদনের ভোরের অনুষ্ঠানে।
রবীন্দ্রসদন নন্দন চত্বর থেকে সেই অনুষ্ঠান সরিয়ে দেওয়া হয় ক্যাথিড্রাল রোডে। ভোরের বদলে সন্ধেতে। অনুষ্ঠানে শিল্পীতালিকাতেও পূর্ণ সরকারি নিয়ন্ত্রণ।
পরিচালনায় রাজ্য সরকারের তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তর।
১৫ বছর পর আবার বদলেছে সরকার। এবছর কী সকাল, কী বিকেল একটা মালা পর্যন্ত পড়েনি সদন চত্বরের রবীন্দ্র মূর্তিতে।
প্রশাসনের একটি অংশের বক্তব্য, “৯ মে ২০২৬ রবীন্দ্রনাথের জন্মদিনে বিজেপি সরকারের শপথ গ্রহণের দিন ঠিক হওয়ার পর সমগ্র প্রশাসন সেই কর্মসূচি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। শপথ গ্রহণের অনুষ্ঠানের ব্যবস্থার সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী সহ কেন্দ্রীয় সরকারের একঝাঁক মন্ত্রী ও মুখ্যমন্ত্রীদের নিরাপত্তা ব্যবস্থার আয়োজন নিয়ে তৎপর থাকতে হয়েছে সরকারি আধিকারিকদের।”
ক্ষমতা বদলের সঙ্গে সঙ্গে ভোট পরবর্তী হিংসায় অস্থির বাংলা।বিভাজন ও বিদ্বেষের রাজনীতির বিরুদ্ধে বার্তা দেওয়ার জন্যও রবীন্দ্রনাথকে পাশে নিয়ে উদ্যোক্তাদের ভালবাসার যুদ্ধযাত্রা।
গানে গানে পথ পার করেছেন তাঁরা। গলায় রবি ঠাকুরের গান। হাতের প্ল্যাকার্ড আর পোস্টারে তাঁর কথা। বাজনা বাদ্যর বাড়তি আয়োজন নেই। শুধু পথ আছে, আর আছেন রবীন্দ্রনাথ।
বুদ্ধদেব বসু ‘রবীন্দ্রনাথের প্রতি’ কবিতায় লিখেছিলেন,
‘তোমারে স্মরণ করি আজ এই দারুণ দুর্দিনে।
হে বন্ধু, হে প্ৰিয়তম। সভ্যতার শ্মশান শয্যায়…
ঘৃণা-বিদ্বেষ-বিপন্নতার দারুণ দিনে রবীন্দ্রনাথ-ই বাঙালির প্রথম আর শেষ আশ্রয়। শুধু কাগজ কলম, ক্লাসরুম আর মঞ্চে আটকে না থেকে তিনি আজ পথের কবি।






