“রবীন্দ্রনাথের দেওয়া নাম পালটে দিলেন বুদ্ধদেব!”- সংহিতা রায়
রবীন্দ্রনাথ নাম দিয়েছিলেন ‘কাকলি’। কবির মৃত্যুর পর বুদ্ধদেব বসু সেই নাম বদলে রাখলেন ‘দময়ন্তী’।
তাঁর কনিষ্ঠা কন্যার নাম। তখন বেশ বড় হয়ে গিয়েছে মেয়ে। শুনতে অবাক লাগলেও ঘটনা সত্যি।
সাহিত্যিক বুদ্ধদেব বসু এবং প্রতিভা বসুর দুই কন্যা। মীনাক্ষী আর দময়ন্তী। দুই কন্যার-ই নাম রেখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ।
জেষ্ঠা কন্যার নাম রাখার গল্পটিও বেশ মজার। জন্মের পর বুদ্ধদেব বড় মেয়ের নাম রেখেছিলেন ‘উজ্জয়িনী’। ডাকনাম ‘মিমি’। কিন্তু পরে কবিগুরু-ই বদলে দিয়েছিলেন সেই নাম।
সেবার বসু দম্পতি গিয়েছেন শান্তিনিকেতন। সঙ্গে কবি সমর সেন আর সাহিত্যিক কামাক্ষীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়।
কন্যা মিমির তখন বছর আড়াই বয়স।
প্রতিভা বসু সফর প্রসঙ্গে লিখেছেন,
শান্তিনিকেতনে থাকাকালীন একদিন কবিগুরুর সচিব সুধাকান্ত রায় চৌধুরী জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কন্যার নাম কী রেখেছেন?’ তাঁরা সত্য গোপন করে বললেন ‘এখনও তো ঠিক করতে পারিনি’।
তিনি কবি দম্পতিকে পরামর্শ দিলেন, ‘গুরুদেবের কাছে কিন্তু নাম চাইবেন, না হলে উনি রেগে যাবেন।’
প্রথম দিন দেখা হতেই কবিগুরু প্রতিভা বসুকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কন্যার কি নাম হল?’
তিনি মজা করে উত্তর দিলেন, ‘আপনি দিলে তবে তো হবে।’
শুনে বেশ খুশি হলেন কবি।
কন্যার মা বললেন , ‘বেশ একটা যুক্তাক্ষর যুক্ত নাম হলে ভাল হয়’। ব্যস! অমনি রেগে গেলেন গুরুদেব। বললেন ‘তা বেশ তো জরৎকারু রেখে দাও না’। শুনে চুপ করে যান বুদ্ধদেবজায়া। কিন্তু এখানেই শেষ নয় গল্পটা।
তাঁদের কথাবার্তার মধ্যেই আইসক্রিম এল। প্রতিভা দেখেন, তাতে রবীন্দ্রনাথ লিখে দিয়েছেন ‘মীনাক্ষীর জন্য’। মানে কন্যার নাম স্থির করে রেখেছিলেন কবি।
কিন্তু এই নাম মোটেই পছন্দ হয়নি তাঁর। কারণ আগেই শুনেছিলেন সাহিত্যিক নরেশ সেনগুপ্তের কন্যার নামও ‘মীনাক্ষী’। তবে সেই মুহূর্তে রবীন্দ্রনাথকে কিছু বলার সাহস তাঁর ছিল না।
ফিরে এসে চিঠি লিখেছিলেন তাঁকে। একথা-সেকথার পর অনুযোগ করেন ‘আমার কন্যার জন্য কিন্তু আপনি একটা নাম ঠিক করে দিলেন না’।
অচিরেই জবাব এল সে চিঠির। তাতে লেখা ‘মীনাক্ষী কেমন আছে?’
প্রতিভা ভেবেছিলেন, কবি বোধহয় নামের কথা ভুলে গিয়েছেন। টের পেলেন কবি কিন্তু মোটেই ভুলোমনা নন।
বুদ্ধদেব ও প্রতিভা বসুর দ্বিতীয় কন্যা জন্মেছিলেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বছরে। মানে ১৯৩৯-এ। সেবার গ্রীষ্মে তাঁরা গেলেন শান্তিনিকেতন। রবীন্দ্রনাথ খুব অসুস্থ, তাঁকে দেখতে যাওয়াই মূল উদ্দেশ্য।
তাঁদের থাকার ব্যবস্থা হল টাটা বিল্ডিং-এ। কবিগুরু তখন থাকতেন উত্তরায়নে। রোজ দেখা করতে যেতেন তাঁরা। দেড় বছরের কন্যাও সঙ্গে থাকত। নতুন খেলার সাথীটিকে রবীন্দ্রনাথ বিশেষ পছন্দ করতেন। একদিন জিজ্ঞাসা করলেন ‘এই মেয়ের নাম কী হল?’
সেই একইভাবে প্রতিভা বললেন, ‘আপনি একটা রেখে দিন’। এবারের চাওয়ায় কিন্তু আগেরবারের মতো কোনও ছল ছিল না।
রবীন্দ্রনাথ বললেন, ‘, ঐ তো দুটো নাম পড়ে আছে নাও না, চন্দনা আর কাকলি।
তাঁর মতে মেয়ে কলকল করে কথা বলে, তাই কাকলি নামটাই তার সঙ্গে যায় ভাল।
সেই নাম মেনে নিয়েই ঘরে ফিরলেন তাঁরা।
কিন্তু কবির মৃত্যুর পর বুদ্ধদেব নিজেই বদলে দিয়েছিলেন মেয়ের নাম।
বুদ্ধদেব বসু এবং প্রতিভা বসুর জীবনের প্রথম লগ্ন থেকেই জুড়ে ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। কবির সঙ্গে তাঁর প্রথম দেখা দার্জিলিং-এ। প্রতিভা তখন ‘রাণু সোম’। ঢাকার তরুণী গাইয়ে। দিলীপ রায়ের মাধ্যমেই বিশ্বকবি তাঁর কথা জানতে পারেন। ডেকে পাঠান। প্রতিদিন ভোরে গান শিখতে যেতেন কবির কাছে। পরবর্তী সময়ে সেই চেনা-জানায় লাগে অম্ল-মধুর স্বাদ।
বুদ্ধদেব বসু তখন কল্লোল গোষ্ঠীর তরুণ এবং উজ্জ্বল মুখ। রবীন্দ্র সৃষ্টিকে নতুন দেখায় চিনিয়েছিলেন তিনি। বুদ্ধদেবকে ‘রবীন্দ্র বিরোধী’ বলে একসময় দেগে দেওয়া হলেও, তিনি একই সঙ্গে রবীন্দ্র প্রেমিক ও সমালোচক। চিঠি চলত তাঁদের মধ্যে। সে চিঠিতে কেবলই অগ্রজ-অনুজ শ্রদ্ধার সম্পর্ক।
রাণু সোমের সঙ্গে বিবাহের পর নববধূকে নিয়ে জোড়াসাঁকোয় দেখা করেন। প্রতিভাকে দেখে অবাক হয়ে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, একে তো আমি চিনি। সেই গাইয়ে কন্যাটিকেই তুমি বিয়ে করলে তাহলে…”
রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে দুর্যোগও এসেছে কবি দম্পতির জীবনে। ১৯৬১-তে রবীন্দ্র জন্ম শতবর্ষ উপলক্ষ্যে বুদ্ধদেব বসুর প্যারিসের বক্তৃতা নিয়ে তোলপাড় পড়ে যায় কলকাতার বুদ্ধিজীবী মহলে। সেই ঘটনা আজও টাটকা।
তথ্য ঋণ :
জীবনের জলছবি – প্রতিভা বসু
বুদ্ধদেব বসুর চিঠি: কনিষ্ঠা কন্যা রুমিকে – দময়ন্তী বসু সিং
চিঠিপত্র- বিশ্বভারতী


