“‘একদিন প্রতিদিন’- একইভাবে আজও!”- লিখেছেন সংহিতা রায়
শ্যামবাজারের নবীন মল্লিক লেন। গলির ভিতর ভাড়াবাড়ি। সেই বাড়িতেই থাকেন চিন্ময়ী সেনগুপ্ত। ওরফে চিনু।
বয়স ২৫। গায়ের রং ফরসা। গড়ন ভাল। সে চাকরি করে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাঙ্কে। বেতন ৫৮০।
পরিবারে মূল আয়ের উৎস সে। বাবা হৃষিকেশ সেনগুপ্ত পেনশন পান। তবে সেই টাকায় বাড়ি ভাড়াটাই শুধু চলে। বাকি সব কিছুর দায়িত্ব তার উপর।
চিনুর যখন দু’বছর বয়স তখন হৃষিকেশবাবু পরিবার নিয়ে এই বাড়িতে আসেন। বারো ঘর এক উঠোনের বাড়িতে গায়ের সঙ্গে গা লাগিয়ে ঘর। কার ঘরে কী চলছে -সেই আখ্যান নিয়েও কৌতূহলের শেষ নেই।
একদিন চেনা সময়ের হিসাব পেরিয়ে গেলেও ঘরে ফিরল না চিনু। মেয়ে ফেরেনি -অন্দরমহলের টেনশনটাকে শত চেষ্টা করেও আটকানো গেল না। আস্তে আস্তে ঠিক ছড়িয়ে পড়ল। লোক জানাজানি, কানাকানি, কেচ্ছা! পেটের দায়ে ঘর থেকে রাস্তায় বেরিয়েছে ভদ্রবাড়ির অবিবাহিত মেয়ে। বাড়ি ফিরতে দেরি যে হবে তার কোনও খবর নেই। একটা ফোনও নেই। কাউকে কিছু না জানিয়ে বাড়ির বাইরে রাত কাটানো- এক মুহূর্তে তাকে টেনে নামায় ভদ্রবাড়ির অন্দরমহল থেকে মধ্যবিত্ত বাঙালির মনের মর্গে। সেখানে ময়নাতদন্ত চলে তার। কার সঙ্গে, কোথায় রাত কাটিয়ে এল সে? কোন লক্ষণরেখা অতিক্রম করল?
বেকার মেজভাই তপু তার বন্ধুকে নিয়ে দিদিকে খুঁজতে মর্গে যায়। মর্গের রক্ষী এক একটা ট্রে টেনে টেনে একটার পর একটা মৃত নারী দেখিয়ে চলে তাদের। শেষ দেহটি দেখে বমি করে ফেলে তপু।
শেষ পর্যন্ত মধ্য রাত পার করে বাড়ি ফেরে চিনু। কিন্তু কেউ তাকে ডেকে জিজ্ঞাসা করল না-কেন তার এত দেরি হল?
সবাই ধরে নিয়েছে তার যখন কোনও বিপদ হয়নি, অক্ষত শরীরে ফিরে এসেছে তখন যা ঘটেছে তার নিজের ইচ্ছেতেই ঘটেছে।
‘একদিন প্রতিদিন’ ছবির মূল কাহিনিতে লেখক অমলেন্দু চক্রবর্তী মেয়েটির কেন বাড়ি ফিরতে দেরি হয়েছিল তার উত্তর দিয়েছিলেন পাঠকদের। ছবির পরিচালক মৃণাল সেন কিন্ত দর্শকদের সেই উত্তর দিতে নারাজ। চিনু কোথায় গিয়েছিল তা তিনি জানাননি। দর্শকদের ছেড়ে দিয়েছিলেন এক জটিল অমীমাংসিত ধাঁধার মধ্যে।
স্মৃতিকথা ‘অলওয়েজ বিয়িং বর্ন’-এ মৃণাল লিখেছিলেন, ‘ছবি মুক্তির পর অনেক কর্মরতা মহিলাও তাঁর কাছে একই প্রশ্ন রেখেছিলেন। ছবি তাঁদের ভাল লেগেছে। ছবির শেষটাও পছন্দ হয়েছে, কিন্তু মেয়েটা রাতে কেন দেরি করে ফিরল? কোথায় গিয়েছিল সে?
পরিচালকের মনে হয়েছিল, এই ভদ্রমহিলারা আসলে একটা ‘কনফার্মেশন’ চাইছে। চাকরি করতে গিয়ে ছবির নায়িকা স্বেচ্ছাচারী হয়ে ওঠেনি, সমাজ-সংসারের বেঁধে দেওয়া লক্ষণগন্ডি সে অতিক্রম করেনি-এটার আশ্বাসই তারা পেতে চাইছিল।
তাঁদের প্রতি মৃণালের উত্তর ছিল- ‘আমি জানি না’। তাঁর মনে হয়েছিল এই জানতে চাওয়াটাই খুব অশ্লীল।
১৯৭৯ সালে মুক্তি পেয়েছিল ছবিটি। কান চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শীত হয়। সেরা বাংলা ছবি হিসাবে জাতীয় পুরস্কারে সম্মানিত হয়, কিন্তু এই ছবি নিয়ে বন্ধুরাও কটাক্ষ করতে ছাড়েননি মৃণালকে। অনেকেরই মনে হয়েছিল এ ছবি নৈরাশ্যবাদী।
কিন্তু মৃণাল সেন দর্শকদের মনে প্রশ্ন জাগিয়ে রাখতে চাইতেন। ‘একদিন প্রতিদিন’-এর শোয়ে মেট্রো সিনেমা হলের লবিতে সম্ভ্রান্ত চেহারার এক বাঙালি প্রৌঢ় তাঁকে গলা চড়িয়ে ইংরেজিতে বলেন, ‘মিস্টার সেন, মেয়েটির কী হয়েছিল সেটা জানাটা কিন্তু আমাদের জন্য খুব জরুরি!’
মৃণাল সেন পরিষ্কার বাংলায় তাঁকে উত্তর দিয়েছিলেন, ‘আমার তো মনে হচ্ছে ছবিটা আমি আপনার মতো দর্শকদের জন্যই বানিয়েছি। আপনারা দেখবেন আর যন্ত্রণা পাবেন, কারণ আপনারা জবাব পাবেন না।’
আসলে ‘হিপোক্রেসি’ আর ‘ভিক্টম ব্লেমিং’-এর সংস্কৃতি মধ্যবিত্ত বাঙালি সমাজের মজ্জাগত। আজও তারা মহিলাদের ‘চাকরির পারমিশন’ দেয়। অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে বাড়ির বাইরে গিয়ে মেয়েকে চাকরি করতে হলেও, তার গতির সুতো পিতৃতন্ত্রের লাটাইয়ে বাঁধা। আমি যতটুকু সুতো ছাড়ব ততটুকুই দৌড়।
সমাজ আর দেশের মাথায় যারা বসে আছে তারা বলে ‘দরকার কি রাত বিরেতে বাইরে পা রাখার’! আবার আরও একটু এগিয়ে কেউ বলে ‘মেয়েরা বাড়ির ভিতরেই থাক’। আর ২০২৬-এ দাঁড়িয়েও মধ্যবিত্ত বাঙালি ভদ্রমহিলারও মুখ থেকে বেরিয়ে আসে ‘মেয়েদের কারও আন্ডারে থাকাই ভাল’।
কার আন্ডারে?
কখনও বস, কখনও বাড়ি, কখনও বা ঘড়ি… পার করা যাবে না লক্ষণরেখাটি…



