প্রাণের কথা পানের কথা-শরবতের ইতিহাস ও কলকাতায় বিখ্যাত শরবতের দোকানের সুলুকসন্ধান – সৌভিক রায়
প্রাণের কথা পানের কথা
ঝোড়ো ব্যাটিং শুরু করেছে গ্রীষ্ম। গরমের গুঁতোয় প্রাণ ওষ্ঠাগত। এহেন দাবদাহে প্রাণ জুড়িয়ে দিতে ভরসা পানীয়। সাফ কথায়, পানেই জুড়াবে প্রাণ। লস্যি, নরম পানীয়, মোহিত, মকটেল, কোক থেকে মিল্ক সেক… পানীয়ের জুড়ি মেলা ভার! কিন্তু তৃপ্তি দিতে আজও শীর্ষে শরবত। এক চুমুক শরবত-র ‘কিমত্’ ভালোই জানে গলদঘর্ম হওয়া বাঙালি
বঙ্গ সন্তানদের আদ্যিকালের আমপানা, বেলপানা আজও সমান মাত্রায় জনপ্রিয়। পানক থেকে পানার আমদানি, ইহাই শরতবের আদিপুরুষ। তামিল, তেলুগু এবং কন্নড় ভাষাভাষী মানুষেরা বলেন পানাকম। সংস্কৃত শব্দ। যার অর্থ গ্রীষ্মকালের জন্য উপযুক্ত স্বাস্থ্যকর মিষ্টি পানীয়। বহু বছর ধরে দক্ষিণ ভারতের মন্দিরে মন্দিরে ভোগ হিসাবে অর্পণ করা হয় পানাকম। কথিত আছে, রামের প্রিয় পানীয় ছিল পানাকম। আয়ুর্বেদ শাস্ত্রেও এর গুণের উল্লেখ আছে। পানাকমের বয়স কমপক্ষে তিন হাজার বছর। দক্ষিণ ভারতে গরমে তেঁতুল আর আমলকি মিশিয়ে তৈরি পানীয়ের উল্লেখ তামিল শাস্ত্রে পাওয়া যায়। তবে পানা জগতের ‘সুপার স্টার’ কিন্তু বেলপানা-ই। তার কাছে হার মানে স্কোয়াশ, সিরাপ! মোগল দরবারে বেলপানা সমাদৃত হতো। লালমুখো সাহেবরাও বেলপানায় মজেছিল। বেলেরপানার সুখ্যাতি ১৮৯৪ সালে নিউ সাউথ ওয়েলসের এগ্রিকালচারাল গেজেটে ছাপা হয়েছিল। ওড়িশায় আস্ত একখানা উৎসব হয় শরবত খাওয়ার, নাম পানা সংক্রান্তি।
ওড়িশার এক বিখ্যাত শরবত হল টঙ্কা তোরানি। পুরীর জগন্নাথের অন্যতম ‘মহাপ্রসাদ’ এটি। এর স্বাদ কিছুটা টক আর বেশ ঝাল ঝাল। শোনা যায়, দশম শতাব্দীতে টঙ্কা তোরানি প্রথম বানানো হয়েছিল। জগন্নাথদেবের ভোগ হিসাবে এর জন্ম। ছাপান্ন ভোগে দেওয়া ভাত ভিজিয়ে রেখে তা থেকে তৈরি করা হয় এই শরবত। পানীয়টি গরমে শরীর ঠান্ডা করতে ওস্তাদ। আদতে শরীর শীতল করার উপাদান হিসাবেই শরবতের জন্ম, অন্তত ভারতীয় উমহাদেশ সে’ভাবেই চিনেছে শরবতকে। কোঙ্কন উপকূলের মানুষেরা শরীর ঠান্ডা রাখতে পোস্তর শরবত পান করেন। যার নাম খস খস রস বা খস খস উধা। ঈশ্বরের নৈবেদ্য আর নবাব, বাদশাহের প্রিয় পানীয় ব্যাতিত ভারতের প্রথম বোতলবন্দী শরবত হল রুহ্-আফ্জা। ১৯০৬ সালে গাজিয়াবাদের হমদর্দ ল্যাবরেটরিতে হাকিম হাফিজ আবদুল মজিদ ফল-ফুল-ভেষজদ্রব্যের নির্যাস থেকে রুহ্-আফ্জা বানিয়েছিলেন।
বলা হয়, ভারতভূমিতে শরবত এসেছিল মোগলদের সঙ্গে। বাবরের রাজসভায় নানা রকম ফল এবং ফুলের সুগন্ধে ভরা পানীয় পরিবেশন করা হতো। এই পানীয়ের জন্য হিমালয় থেকে বাবর বরফ আনাতেন! সমরকন্দ, কাবুলকে বাবর কোনওদিন ভুলতে পারেননি। ফুল, ফলের নির্যাস, জল আর বরফ দিয়ে বানানো ‘শার্বা’কে দিল্লির দরবারেও সম্মানজনক আসন দিয়েছিলেন বাবর। ‘শার্বা’ থেকেও শরবতের উৎপত্তি হতে পারে। ইবন বতুতা থেকে উজবেক পণ্ডিত আল গর্গানি, সকলেই শরবতের উল্লেখ করেছেন নিজেদের লেখায়। ফল শুকিয়ে তার নির্যাস থেকে তরল সিরাপ এবং তা থেকে শরবত বানানো সে’যুগের ফসল। ইসলামে মদ্যপান নিষিদ্ধ এবং রমজানের উপবাসভঙ্গে পানীয়-ই প্রধান, এই জোড়া প্রয়োজনই মধ্যপ্রাচ্যে শরবতকে চূড়ান্ত জনপ্রিয় করে তুলেছিল। মোগল আগমনের পূর্বেও ভারতে শরবত ছিল। সূর্যাস্তের পর বৌদ্ধ ভিক্ষুকরা কেবল পানীয় গ্রহণ করতেন। খেজুর আর বেদনার রস খেতেন জৈন সাধুরা। কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে ধন্যামলা নামের আমলকির পানীয় এবং গুড়ের পানীয় গাগোধক-র উল্লেখ আছে। মহাভারতে কৃষ্ণের শরবতের মতো পানীয় পান করার কাহিনি আছে।
নয়ন মেলে একটু বিশ্বভুবনের দিকে চাওয়া যাক। ফরাসি দেশের রাজকীয় ভোজসভায় থাকতো ডজনখানেক পদ। মোটামুটি হাফ ডজন পদ শেষ হলে হাজির হতো বিশ্রাম পদ। তার নাম ‘সরবে’। ফলের বা ফুলের নির্যাসে বরফ মিশিয়ে পান করতেন বিত্তবানরা। এহেন ‘সরবে’ ‘ভ্যানিশ’ হয়ে গিয়েছিল ইউরোপ থেকে। ‘সরবে’ জাঁকিয়ে বসে আরবে। ডিউক অফ অরলিয়ঁর সঙ্গে ক্যাথরিন দ্য’মদিশির বিয়ের ভোজসভায় ১৫৩৩ সালে ফ্রান্সে ‘কামব্যাক’ হয় ‘সরবে’র। নিরো আবার মৌচাকের খাঁটি মধুতে বরফ মিশিয়ে পান করতেন। মিশরের ফেরাওরাও বরফ সহযোগে ফলের রসে চুমুক দিতেন। বাইবেল-এ ‘জেলাতো’র উল্লেখ রয়েছে। আইজ্যাক, আব্রাহামকে বরফ মেশানো ভেড়ার দুধ পরিবেশন করেছিলেন, সেই বস্তুটিই ‘জেলাতো’।
ইতিহাসের নাড়াচাড়া অনেক হল, এবার বাইবেল থেকে বইপাড়ায় যাওয়াই শ্রেয়। কারণ বাঙালির শরবতের স্বর্গরাজ্য সেখানেই অবস্থিত। কফি হাউস থেকে বেরিয়ে বাম দিক বরাবর হেঁটে এসে, ডানদিকে প্রথম যে রাস্তাটা পড়বে তা বরাবর সোজা মিনিটখানেক হাঁটলেই চোখে পড়বে শরবতের স্বর্গরাজ্য। প্রথম ঠিকানা ছিল ১/এ বঙ্কিম চ্যাটার্জি স্ট্রিট, আর এখনকার ঠিকানা ১/১/১ডি বঙ্কিম চ্যাটার্জি স্ট্রিট। নাম তার প্যারামাউন্ট। প্যারামাউন্টের ইতিহাস, ঐতিহ্যই এর সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপন। শরবতের অমরাবতী। বরিশালের বিপ্লবী-তরুণ সতীন সেনের সঙ্গে পকেটে চাট্টি পয়সা নিয়ে শিয়ালদহে নেমেছিলেন নীহাররঞ্জন। গোলদীঘির পিছনের বাড়িটায় বরিশালের অনুশীলন সমিতির তরুণদের আড্ডা। তাঁদের সঙ্গে যোগ দিয়ে নীহাররঞ্জনের শরবতের দোকান চালু হল। স্বদেশি আদর্শে অনুপ্রাণিত নীহাররঞ্জন তখন আখড়ায় কুস্তি শিখছেন। পুলিনবিহারী দাসের কাছে লাঠিখেলার পাঠ নিচ্ছেন।
১৯১৮ সালে নীহাররঞ্জন মজুমদার কলকাতায় প্রতিষ্ঠানের সূচনা করেন, তখন নাম ছিল প্যারাডাইস। কিন্তু শরবত বিক্রি তাঁর প্রকৃত উদ্দেশ্য ছিল না। শরবতকে সামনে রেখে চলত স্বদেশী আন্দোলনের কাজ। বিপ্লবী সতীন সেন-র অঘোষিত কার্যালয়, স্বদেশী অনুশীলন কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল শরবতের এই ঠেক। বাঘাযতীনের মতো বিপ্লবীরা আসতেন, পরবর্তীতে নেতাজিও এসেছেন। দোকানের দেওয়ালে স্টাফ করা হরিণের শিংয়ের নিচে একটা বোর্ড রয়েছে। বিখ্যাত মানুষ, যাঁদের পদধূলিতে ধন্য এই শরবত-পীঠ, তাঁদের নাম লেখা। নজরুল থেকে সত্যজিৎ, উত্তমকুমার থেকে সুচিত্রা সেন; সকলেই এখানে নিয়মিত আসতেন। মেঘনাদ সাহা, জগদীশচন্দ্র বসু, সত্যেন বসু, মানবেন্দ্রনাথ রায় থেকে শুরু করে শচীন কত্তা, উদয়শঙ্কর কে আসেননি! মেসবাসী গরিব ছাত্র, প্রেসিডেন্সি-কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী, কৃতি থেকে লাহাবাড়ি, মল্লিকবাড়ি, রাজপরিবারের অভিজাতদের এক ঘাটে জল থুড়ি শরবত খাইয়েছিল প্যারামাউন্ট। স্বদেশীদের গোপন ডেরা একদিন প্রকাশ্যে এসে পড়ল। পুলিশ বন্ধ করে দিল শরবতের দোকান। কেটে গেল অনেকগুলো বছর। ১৯৩৭ নাগাদ ফের খুলল দোকান। নাম বদলে প্যারামাউন্ট নাম রাখা হল। এখানকার হার্ট থ্রব হল ডাবের শরবত। শোনা যায়, এই শরবতের রেসিপির আবিষ্কারক হলেন আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়। প্রফুল্লচন্দ্র রায় নীহাররঞ্জন মজুমদারকে বলেছিলেন কীভাবে ডাবের শাঁস মিশিয়ে শরবতে আনতে হবে নতুন স্বাদ। চা-পানে ঘোর বিতৃষ্ণা ছিল আচার্য প্রফুল্লচন্দ্রের। ভারতে চায়ের প্রচলনের বিরুদ্ধে তিনি আন্দোলনও করেছিলেন। পরাধীন দেশের ছেলেছোকরাদের স্বাস্থ্য রক্ষায় পেট ভরানো, সুস্বাদু, পুষ্টিতে ঠাসা শরবতের পরামর্শ তিনিই দিয়েছিলেন প্যারামাউন্টের প্রাণপুরুষ নীহাররঞ্জন মজুমদারকে। শুধু ডাবের শরবত নয়, প্যারামাউন্টের গ্রেপস ক্রাশ, ম্যাঙ্গো ম্যানিয়া, ট্যামারিন্ড, পাইন্যাপেল মালাই, স্ট্রবেরি মালাই, রোজ মালাইয়ের স্বাদও কম নয়।



বিধান সরণির উপরে শ্রীমানী বাজার এলাকায় ছিল কপিলা আশ্রম। আজও আছে তবে শরবতখোরদের মতে সে স্বাদ আর কই! বংশধর দাবি করে যে যে দোকান গজিয়ে উঠেছে, তারা কেউই আর তেমন শরবত বানাতে পারেন না। হৃষিকেশ শ্রীমানির কপিলা আশ্রমই ছিল কলকাতার প্রথম হাতে বানানো শরবতের ঠিকানা। ১৯০৭ সালে জন্ম কপিলা আশ্রমের। গঙ্গাসাগরের কপিল মুনির আশ্রমের সঙ্গে সাযুজ্য রেখে ‘কপিলা আশ্রম’ নাম রাখা। ব্যবসা নয়, সেবার হিসাবে দোকান চালাতেন হৃষিকেশ শ্রীমানি। কাঁচা আম, হিং, পুদিনা, গোলমরিচ, জিরে গুঁড়ো, দই আর কিছু মশলা পাথরের পাত্রে মিলেমিশে অমৃতসমান এক পানীয় তৈরি হতো। কেশর মালাই, আবার খাই, দধিতি আজ কিংবদন্তি পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছে। জনশ্রুতি রয়েছে, টাঙাইল থেকে আসা চন্দনী ক্ষীর দিয়ে তৈরি হতো শরবত। সেই ক্ষীরের স্বাদও নাকি ছিল চমৎকার। সেই ক্ষীর আর দুধ থেকে বাড়িতে তৈরি হতো মালাই। তা থেকে মালাই শরবত। যাত্রা শুরু হয়েছিল লেবুর শরবতের মাধ্যমে। মূল আকর্ষণ ছিল বাড়িতে তৈরি বরফ। শরবতের ক্ষেত্রে এরা রেশনিং চালু করেছিল। বড় বড় করে লেখা থাকতো একজনকে দু’গ্লাস বা তিন গ্লাসের বেশি শরবত দেওয়া হবে না! রোঁয়াব কাকে বলে!
হেদুয়ার পার্কের কাছাকাছি অবস্থিত শিব আশ্রমের শরবতেরও নাম ডাক হয়েছে। দোকানের বয়স বেশি নয়। আহিরীটোলা ঘাটের অদূরেই রয়েছে শিবশক্তি শরবত শপ। আম শরবত বানানোয় হাতযশ কম নয় ওদের! খিদিরপুরে কার্ল মার্ক্স সরণিতে আছে শরবত মহল। শরবতপ্রেমীদের গন্তব্য হতে পারে বড়বাজারের গুরুজি ঠান্ডাইওয়ালা বা দাক্ষিণাত্যের অর্থাৎ ধর্মতলার ওপাশে ভবানীপুরের দ্য ইয়েলো স্ট্র।








