বাঙালির পাত থেকে লোকাচার– ‘রুপোলি শস্য’-র নিত্য যাতায়াত – সৌভিক রায়
‘জষ্ঠি মাসে আম কাঁঠাল/ আষাঢ় মাসে ইলিশ/ ভাদ্দর মাসে তালের তত্ত্ব/ পুজোয় কুটুম পালিশ’। গ্রীষ্মের দাবদাহ কাটিয়ে যেই না আষাঢ়ের বঙ্গে টুপ্ করে বারিধারা ঝরে পড়ে, তক্ষুনি বাঙালির মন বলে ওঠে ইলিশ। এককালে বাঙালি বাড়িতে ইলিশ হলে গৃহিনীদের বলা হতো, ‘চালু একটু বেশি নিয়ো, আজ ইলিশ হয়েছে’, ইলিশ ছাড়া বর্ষা অসম্পূর্ণ!
ভয়ঙ্কর কাঁটাওয়ালা মাছকে বাঙালি নিজগুণে আপন করে নিয়েছে। আসলে কাঁটার জন্যেই ইলিশ বাঙালির বেহাত হয়ে যায়নি। তাইতো সাহিত্যিক শংকর বলে গিয়েছেন, ‘বেঁচে থাকুক ইলিশ কাঁটা চিরজীবী হয়ে।’ বাংলায় বৃষ্টির নাম ইলশে গুঁড়ি। আবার বাংলাকে ব্যাখ্যা করতেও ইলিশেরই শরণ নেওয়া– ‘বাংলা আমার সরষে ইলিশ…’এ ভূখণ্ডে কালীর নামও ইলিশের নামে। রানী রাসমণির জামাতা মথুরামোহন বিশ্বাসের বিথারি গ্রামে খয়রাকালী পূজিতা হয়ে আসছেন দীর্ঘদিন। কথিত আছে, খয়রা ইলিশ দিয়ে দেবীকে ভোগ দেওয়া হতো, তাই মায়ের নাম খয়রাকালী।
জীমূতবাহনের রচনায় ইলিশ মাছের উল্লেখ পাওয়া যায়। ন’শো বছর আগে ‘কালবিবেক’ গ্রন্থে জীমূতবাহন ইলিশের কথা লিখেছিলেন। মধ্যযুগের শ্রেষ্ঠ কবি ভারতচন্দ্র অন্নদামঙ্গলকাব্যে ইলিশের নাম করে গিয়েছেন। বেহুলার বিয়ের ভোজে ইলিশ মাছ ভাজা ছিল অন্যতম একটি পদ। মঙ্গল কাব্যে বিজয়গুপ্ত থেকে বংশীদাস, সকলেই ইলিশ নিয়ে পদ লিখে গিয়েছেন।
বিজয়গুপ্ত লিখছেন–
‘আনিলা ইলিশ মৎস্য/ করিল ফালা।/ তাহা দিয়া রান্ধে ব্যঞ্জন/ দক্ষিন সাগর কলা।।’
দ্বিজ বংশীদাসের মনসামঙ্গল বলছে–
‘ইলিশ তলিত করে,/ বাচা ও ভাঙ্গনা।/ শউলের খদ ভাজে,/ আর শউল পোনা।।’
সংস্কৃতে ‘ইল্লিশ’ শব্দের অর্থ হল জলে গমনকারী জীব, যা অতীব সুস্বাদু। পণ্ডিতেরা শিবের ললাটে বিরাজমান চাঁদের কিরণের সঙ্গে ইলিশের তুলনা টানতেন এককালে। বুদ্ধদেব বসু ইলিশকে ‘জলের উজ্জ্বল শস্য’ বলেছেন। মনুসংহিতা-র একটি শ্লোক জানাচ্ছে–‘ইলিশ খলিশ্চৈব ভেটকি মদগুর এব চ।/ রোহিতো মৎস্যরাজেন্দ্র পঞ্চমৎস্য নিরামিষা।।’ এর মানে করলে দাঁড়ায়, ইলিশ, খলশে, ভেটকি, মাগুর এবং রুইয়ের মতো পাঁচটি মাছ নাকি নিরামিষ। মাছ আবার নিরামিষ, সোনার পাথরবাটির মতো ব্যাপার আরকি! আবার শ্লোকে রয়েছে, ‘বার্তাকু সহযোগেন সর্ব মৎস্য নিরামিষা।’ মানে হল বেগুন দিয়ে মাছ রাঁধলেই সেই মাছ নিরামিষ। ফলে বাছবিচারের দিন বেগুন দিয়ে ইলিশের ঝোল খেলে দোষ হবে না।
বাঙালি ঝালে-ঝোলে-অম্বলে, ভর্তা-ভাপা-ভাজায়, সব রকমভাবে ইলিশকে আপন করে নিয়েছে। পান্তায় ইলিশ, খিচুড়ির সঙ্গে ইলিশ, পোলাওতে ইলিশ (মাহী পোলাও, মুর্শিদকুলী খাঁর প্রিয় পদ) আবার বিরিয়ানীতেও ইলিশ, সর্বত্র ইলিশের জন্য দুয়ার উন্মুক্ত। কাসন পোড়া ঝোল থেকে সরষের ঝাঁঝ। বিজয়া দশমী এবং সরস্বতী পুজোয় বাড়িতে বাড়িতে জোড়া ইলিশ আনার প্রথা রয়েছে। ভাদ্রের রান্না পুজোতেও ইলিশ খাওয়ার চল আছে।
বাঙালির ইলিশ খাওয়া শেষ হয় দশমীতে আর শুরু হয় সরস্বতী পুজোয়, শ্রীপঞ্চমীতে। মাঝের ক’মাস ইলিশ ধরা বা খাওয়ার নিয়ম নেই। বাঙালিদের কাছে মাছ অত্যন্ত শুভ। মাছ দেখে বা খেয়ে যাত্রা করাকে শুভ হিসাবে গণ্য করা হয়। দেবী দুর্গা বাড়ির মেয়ে। যেদিন মেয়ে বাপের বাড়ি ছেড়ে শ্বশুরবাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হয়, সেদিন যাতে তাঁর যাত্রা শুভ হয়, তার জন্য মাছ এসে পড়েছে নিয়মে। মাছ এনে, গায়ে সিঁদুর লাগিয়ে দেওয়া হয়। মনে করা হয়, দেবী মাছ দেখে যাত্রা শুরু করলে, নির্বিঘ্নে গন্তব্যে পৌঁছবেন। এমনকী, দেবীকে মাছ নিবেদন পর বিভিন্ন বাড়িতে প্রতিমা বিসর্জনের নিয়ম আছে। বাড়ির এঁয়োরা মাছ খেয়ে দেবী বরণ করেন। রাঢ় বাংলায় বিভিন্ন এলাকায় আজও দশমীর সকাল মাছ ধরতে দেখা যায় স্থানীয়দের। রীতিটি ‘মাছ যাত্রা’ নামে পরিচিত।
মাঘের পয়লায় হুগলির আদিসপ্তগ্রামের কাছে কৃষ্ণপুর বা কেষ্টপুর গ্রামে ফি বছর যে মেলা হয়, তাও ইলিশের দান। আশ্চর্যের বিষয় হলো, সে মেলা বৈষ্ণবদের কিন্তু মেলার নাম মাছের মেলা। মেলার বয়স পাঁচশো বছরের বেশি। পঞ্চদশ শতকের শেষভাগে সাতগাঁও এবং পাশ্ববর্তী এলাকার শাসক ছিলেন রাজা হিরণ্যদাস মজুমদার ও গোবর্ধনদাস মজুমদার। হিরণ্যদাস ছিলেন নিঃসন্তান। ১৪৯৮ সালে গোবর্ধনদাসের পুত্র সন্তান জন্মায়। পুত্রের নামকরণ করা হয় রঘুনাথদাস। পুত্রের জন্মের আনন্দে তিনি নির্মাণ করেন কৃষ্ণ মন্দির। এই রঘুনাথদাস হলেন শ্রীচৈতন্য ও নিত্যানন্দের প্রিয় রঘুনাথ দাস গোস্বামী।
রঘুনাথ মহাপ্রভুর কৃপাধন্য ছিলেন। শ্রীক্ষেত্রে শ্রীস্বরূপ দামোদরের কাছে সাধন মার্গে দীক্ষা নেন রঘুনাথ। এরপর তিনি পুরী থেকে সপ্তগ্ৰাম ফিরে আসেন। সঙ্গে নিয়ে আসেন মহাপ্রভুর দেওয়া উপহার, মদনমোহন বিগ্ৰহ। বিগ্ৰহটি তিনি রাধাকৃষ্ণ মন্দিরে প্রতিষ্ঠা করেন। বিগ্রহ স্থাপন উপলক্ষ্যে সপ্তগ্ৰামে রঘুনাথ দাস এক মহোৎসবের আয়োজন করে। রঘুনাথের ভক্তি পরীক্ষা নেওয়ার জন্য তাঁর কাছে ভাত, ইলিশ মাছ ও (তখন মাঘ মাস, অসময়ে কাঁচা আম খেতে চাওয়ার উদ্দেশ্যই ছিল পরীক্ষা নেওয়া) আমের টক খেতে চান গ্রামবাসীরা। রঘুনাথ সরস্বতী নদী থেকে ইলিশ মাছ ও নিজের আম বাগান থেকে আমের ব্যবস্থা করেন প্রভুর কৃপায়। মন্দিরের পাশে মাঠে বসিয়ে সকল ভক্তদের খাওয়ান। গ্রামবাসীরা তৃপ্ত হন। এ ঘটনার পর রঘুনাথের নামে ধন্য ধন্য রব ওঠে গোটা কেষ্টপুরে। দিনটা ছিল পয়লা মাঘ। সেই থেকে শুরু মাছের মেলা। আজও চলছে। এই মেলা উত্তরায়ন মেলা নামেও পরিচিত। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসেন, আসেন মাছ ব্যবসায়ীরা। বিকিকিনি চলে। মাছ কিনে, মজে যাওয়া সরস্বতীর তীরে মাছ ভাজা খেয়ে পিকনিক পর্যন্ত হয়। পেল্লাই সাইজের মাছও আনেন বিক্রেতারা। তা দেখতে ভিড় জমে। অন্যদিকে শ্রীপাটে চলে নাম-গান, মহোৎসব।
ইলিশ নিয়ে অসংখ্য ছড়া, কবিতা, শ্লোক, প্রবাদ, লোককথা, উপকথা আছে বাংলায়। প্রেমেন্দ্র মিত্রের ঘনাদা থেকে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পদ্মানদীর মাঝি, সাহিত্যে অজস্রবার ইলিশ এসেছে। সৈয়দ মুজতবা আলীর ইলিশপ্রীতির কথা না বললেই নয়। একবার এক পাঞ্জাবি অধ্যাপকের সঙ্গে ইলিশের শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে তর্ক বাঁধিয়ে কথা বন্ধ করে দিয়েছিলেন। সৈয়দ মুজতবা আলি ইলিশ গপ্পোও লিখেছেন। তিনিই বলেছেন, তিনি বেহেস্তে যাবেন না। কারণ বেহেস্তে ইলিশ পাওয়া যায় না! ছন্দের যাদুকর সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত ইলিশকে কবিতায় বেঁধেছেন।
তবে স্বামীজির মতো ইলিশপ্রেমী ভূ-ভারতে আর ছিল না। তাঁর গুরু রামকৃষ্ণও ইলিশের ভক্ত ছিলেন। একদা পূর্ববঙ্গে গিয়ে ইলিশ মাছ ধরা দেখে উত্তেজিত হয়ে পড়ে স্বামীজি ষোলোটা ইলিশ কিনে ফেলেছিলেন। শেষ দিন অর্থাৎ ১৯০২ সালের ৪ জুলাই, ইলিশের নানা পদে মধ্যাহ্নভোজন সেরে ছিলেন স্বামীজি। বেলুড় থেকে ইলিশ কিনে প্রেমানন্দকে ফরমান দিয়েছিলেন, শুধু ঝোল নয়, গোটাকতক মাছ ভাজা করতে হবে, কারণ ভাজা ইলিশের স্বাদ অপূর্ব। কিছুটা মাছের টক করতেও বলেছিলেন। দুপুরে সে’দিন তিনি নাকি ইলিশ মাছের তেল দিয়ে ভাত, আর ডাল দিয়ে ভাজা মাছ খেয়েছিলেন। ঝোল তেমন ঝাল হয়নি বলে আবার কাঁচালঙ্কা ডলে নিয়েছিলেন। শেষ পাতে মাছের অম্বল। ইলিশ মাছের ঝোল, ভাজা, অম্বল দিয়ে ভাত খেয়ে তৃপ্ত বিবেকানন্দ বলেছিলেন, ‘‘একাদশী করে খিদেটা খুব বেড়েছে, ঘটিবাটিগুলো ছেড়েছি অনেক কষ্টে।’’
ইলিশ নিয়ে কিন্তু মিথের ছড়াছড়ি। দাবি করা হতো, ইলিশ নাকি, মধুর, রেচক, স্নিগ্ধ, বহ্নিবর্ধক, পিত্ত, কফ ও বাতনাশক। ইলিশের চাহিদা এমন ছিল যে, আঠারো-উনিশ শতকের কলকাতায় মেছুনিরা চড়া দামে পচা ইলিশও ঘছিয়ে দিত! শুধু পদ্মার ইলিশ বললেই কেল্লাফতে। দীনেন্দ্রকুমার রায়ের পল্লীচিত্রে এমন প্রমাণ মেলে। ডাক্তার তার স্ত্রীকে পচা ইলিশ খেতে নিষেধ করেছেন বলে, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কাজিয়া বেঁধে গিয়েছিল। রাগে ডাক্তার গিন্নি একদিন পাকঘরে ঢোকেননি। আবার কলকাতার রাস্তায়, ইলিশ চাই গো ইলিশ গঙ্গার ইলিশ বলে হাক দেওয়া হতো এককালে। আজ এসব অবিশ্বাস্য মনে হয়। এখন ইলিশে ছুঁলে আঠারো ঘা! ইলিশের দামে আম বাঙালির পকেটে ছ্যাকা লাগে।
তবুও মরশুমে অন্তত এক-আধবার কামড় না দিলে চলেই না। ভাপা, বেগুন-কালো জিরে দিয়ে ঝোল, কলাপাতায় পাতুরি, ভাজা ও ভাজার তেল, ইলিশের ডিম ভাজা, ইলিশের লেজের ভর্তা, ইলিশের টক, ইলিশ মাছের মাথা দিয়ে কচুর শাক, সর্ষে ইলিশ, পেঁয়াজ রসুন দিয়ে ইলিশের কোর্মা পদের পাঁচালি বলে শেষ করা যাবে না। হুমায়ুন আহমেদের ইলিশের ডিম দিয়ে কলমি শাক খাওয়ার গপ্পো শুনেছিলাম ওপার বাংলার এক প্রকাশকের কাছে। ইলিশ নিয়ে বাঙালি লড়ে। গঙ্গাপাড়ের এক ক্লাব হারলে ইলিশের দর বাড়ে বাজারে। হিলসা পদ্মার নাকি এপারের তা দিব্য ধরতে পারে বঙ্গ সন্তানদের জিহ্বা…আদতে ইলিশ, বাঙালি আর বর্ষাকাল হল ত্রিকোণ প্রেমের মহাকাব্য।

