“বাস্তুহারা”: ‘রিফিউজি ও কুপার্স ক্যাম্প’- সংহিতা রায়
ইমতিয়াজ.আলির সাম্প্রতিক ছবি প ‘ম্যায় ওয়াপাস আউঙ্গা’। এ ছবি নতুন করে উস্কে দিয়েছে দেশ ভাগের ক্ষত।
ভাঙা দেশ, ভাঙা মানুষ, চেনা ব্যথা। তবু এ ছবি দেখতে গিয়ে আবার কেঁদেছে সাধারণ দর্শক। পঞ্জাবের গল্প মনে পড়িয়ে দিয়েছে দেশ ভাগে বাঙালির বেঘর হওয়ার স্মৃতি। এখনও দগদগে সেই জখম।
প্রাক্তন ইংরেজ বিচারক স্যার সেরিল র্যাডক্লিফের টানা রেখায় আলাদা হয়ে গেল ভূ-খন্ড। এপারের মানুষ ওপারে এল । ওপারের মানুষ এপারে।
ভারত থেকে প্রায় বিশ লাখ মুসলিম জনতা আসেন তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তানে। অন্যদিকে, পূর্ববঙ্গ থেকে ৫৮ লাখ হিন্দু ভারতে দেশান্তরী হন। বেসরকারি হিসেবে এ সংখ্যা আরও বেশি।
তাঁরা ঠাঁই নেন বিভিন্ন উদ্বাস্তু শিবিরে। নতুন পরিচয় হয় ‘রিফিউজি’।
সেখানে কেমন করে মানিয়ে নিল মানুষগুলো?
নব্বইয়ের দশকে ভিন্ন আঙ্গিকে সেই গল্প শুনিয়েছেন
জি. অরবিন্দন। ১৯৯১ সালে মুক্তি পায় তাঁর বিখ্যাত ছবি
‘বাস্তুহারা’।
মালায়লম ছবির ভুবনে মাইল ফলক হয়ে আছে এই ছবি ।
জনপ্রিয় লেখক সি. ভি. শ্রীরামন-এর ছোটগল্পের আধারে নির্মিত।
ছবিটি একাত্তর সালের কলকাতার পটভূমিতে তৈরি।। জুড়ে গিয়েছে নদিয়ার রানাঘাট। সেখানেই বিখ্যাত কুপার্স ক্যাম্প।
বরিশালের মুলাদি, হিজলা, নোয়াখালী, পিরোজপুর, গোপালগঞ্জ, খুলনা, বাগেরহাট প্রভৃতি অঞ্চল থেকে লঞ্চে, স্টিমারে, ট্রেনে দেশ ছেড়ে আসা অসহায় মানুষগুলোর স্থান হয় রানাঘাটের কুপার্স ক্যাম্পে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যেটি ছিল ব্রিটিশ সেনার গো-ডাউন। এছাড়াও, ধুবুলিয়া ক্যাম্পে, অশোকনগর, বিজয়গড় প্রভৃতি ক্যাম্পে। যেসব অসহায় নারীদের যাওয়ার জায়গা ছিল না Permanent Liability (PL) হিসেবে তাদের জায়গা হয় ক্যাম্পে।
প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন মোহনলাল, নীনা গুপ্তা, নীলাঞ্জনা মিত্র এবং পদ্মিনী।
‘বাস্তুহারা’ অরবিন্দনের শেষ ছবি। মুক্তির ঠিক আগেই এই পরিচালকের প্রয়াণ ঘটে।
ছবিটি মালায়লম ভাষার শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র হিসেবে জাতীয় পুরস্কারে সম্মানিত হয়। একাধিক কেরল রাজ্য চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করে।
কেরল থেকে সরকারি অফিসার বেণু আসে কলকাতায়। ভূমিকায় মোহনলাল। প্রায় ৩৫ থেকে ৪০টি শরণার্থী পরিবারকে আন্দামান দ্বীপপুঞ্জে পাঠানোর দায়িত্ব তাঁর কাঁধে।
রানাঘাটের শরণার্থী শিবিরে যায় সে। দরিদ্র বাস্তুচ্যুত মানুষের ছিন্নবিচ্ছিন্ন জীবনের অভিজ্ঞতা তাকে বিদ্ধ করে। সেখানেই আরতি পানিকরের (নীলাঞ্জনা মিত্র) মুখোমুখি হয় বেণু। বুঝতে পারে যে এই পরিবার আসলে তার আপন কাকার পরিবার। তার কাকা বিপ্লবী কুঞ্জুন্নি পানিকার কবি ও বিপ্লবী। ছোটবেলায় কাকা ছিল তার পছন্দের মানুষ। বেণু যখন যখন ছোট তখনi কাকা বাড়ি ছেড়ে চলে যান।
এখন কাকার মেয়ে দময়ন্তী পড়াশোনা ছেড়ে কমিউনিস্ট দলে যোগ দিয়েছে। বাবার মতোই সে স্বপ্ন দেখে বিপ্লবের।
দক্ষিণ ভারতের রক্ষণশীলতা, সামাজিক বিভেদ, দেশভাগের ফলে ছিন্নভিন্ন হয়ে যাওয়া এক বাঙালি পরিবারের করুণ ইতিহাস যেন জেগে ওঠে ঘুম ভেঙে।
আরতির মেয়ে দময়ন্তীর ভূমিকায় অভিনয় করেছেন নীনা গুপ্ত। এটিই তাঁর প্রথম ছবি। সঙ্গীতে সলিল চৌধুরী।
ছবিতে ছকভাঙা অভিনয় করেছিলেন মোহনলাল। নীনা গুপ্ত অভিনেত্রী হিসাবে নজর কেড়েছিলেন দর্শকদের।
ছবির শেষ ফ্রেমেও দর্শকদের কানে লেগে থাকে দময়ন্তীর আকুল চিৎকার— ‘চিঠি লিখো দাদা… দময়ন্তী পানিকর, সেন্ট্রাল জেল, ক্যালকাটা’…
এ ছবি নিয়ে বড় একটা কথা হয় না। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের প্রেক্ষাপটে এমন মালায়লাম ছবির নজির খুব একটা নেই। কেরালা স্টেট চলচ্চিত্র একাদেমির উদ্যোগে পুনরুদ্ধারের পর ছবিটি ২০২৩-২০২৪ সালে আইএফএফকে (IFFK) এবং বেঙ্গালুরু ম্যাপ (MAP)-সহ বিভিন্ন প্রদর্শনীতে দেখানো হয়।
ছবিটি এখনও ইউটিউবে দেখার সুযোগ করেছে। দেশভাগের কলকাতা আর কুপার্স ক্যাম্পের স্মৃতি বড় যত্নে সেলুলয়েডবন্দী করেছিলেন জি অরবিন্দন।


