শুটিঙ শুধু একিদন” – অভিনন্দন দত্ত
মনে আছে তখন আমার কোন একটা ছবির শুটিং চলছিল, ঋতুদার ইউনিট থেকে দেবুদা ফোন করে বলল, ‘সত্যান্বেষী’ ছবিতে খুবই একটা ছোট চরিত্র আছে, আসলে রিতুদা তোমার কথা বলছে… শুটিঙ শুধু একদিন, তুমি কি করবে?” প্রথমে একটু হকচকিয়ে গেলাম, অভিনয়ের জন্য আমার কাছে ফোন আসছে তাও আবার ঋতুপর্ণ ঘোষ। তারপর মনে হল ঋতুদা আমায় দেখলেন কোথায়? Production house এর অফিসে কয়েক বার দেখা হয়েছে ঠিকই, কিন্তু বাক্যালাপ তেমন কিছু হয়নি বললেই চলে। দেবুদা বললেন “গয়নার বাক্সে তোমায় দেখেছেন”। মজার ব্যাপার; চরিত্রের ছোট বড় সে ব্যাপারে মাথা না ঘামিয়ে হ্যাঁ করে দিলাম… ভাগ্যিস; ‘হ্যাঁ’ বলেছিলাম… কারন ঐ শুটিঙের তিনদিন পরেই ঋতুদা চলে গেলেন।
শুটিঙের দিন লোকেশনে পৌঁছে চারপাশ ঘুরে দেখছি। অভিকদা (মুখারজি) আলো করছেন, ইউনিটের অনেকেই আমার চেনাশুনো। একজন সহযোগী পরিচালক এসে বলল “তুমি কি ব্যাপার”? তাকে বললাম… সে আমায় মেকাপ ভ্যানে বসিয়ে বলল, “দেবুদা এসে বুঝিয়ে দেবে… তুমি তৈরি হয়ে নাও”। তৈরি যে হব, আমার চরিত্র কি তাই তো জানি না। যা হোক কিছু পরে দেবুদা এসে বলল,
“বলতে খুবই খারাপ লাগছে, এখানে তোমার করবার মতন কিছুই নেই, এক ফুলওলার চরিত্র, রাজার মন্দিরের বাইরে বসে ফুল বিক্রি করছ… রাজা এসে ফুল কিনছে তোমার কাছে, আসলে এটা তোমার করবার মতন…”
“বেশ বেশ,” বলে ব্যাপারটা থামিয়েদি… দেবুদার লজ্জিত মুখ দেখে বুঝতেই পারলাম, যে কোনো জুনিয়ার আর্টিস্টকে দিয়েই বিষয়টা হয়েযেত… অর্থাৎ এখানে অভিনয় করার কিছুই নেই। সত্যজিৎ রায় যাকে বলতেন ‘living prop’, এ ক্ষেত্রে আমিও তাই। আমি অবশ্য ওতে কিছু মনে করিনা, কারন জীবনের সব অভিজ্ঞতাই আমার কাজে লেগেছে, যে কোন জায়গা থেকেই আমি শিক্ষানি, সেটাই আমার practice. আমি যেহেতু কোন বড় institute এ পড়ার সুযোগ পাইনি, তাই কজের যায়গা থেকেই আমার সব কিছু শেখা। ঋতুদার শুটিং তো চট করে দেখার সুযোগ হয়না, এক প্রকার সেই জন্যই রাজি হয়েছিলাম।
অনেক পরিচালকের সঙ্গে থেকে কাজ করতে করতে বুঝেছি, প্রত্যেক পরিচালকেরই একটা নিজেস্ব ধরন আছে (অবশ্যই যাদেরকে আমি পরিচালক মনে করি), কেউ অভিনয়ে জোর দেন, কেউ camera, কেউ composition, কেউ আবার light, set, অথবা সংলাপ… ইত্যাদি। অর্থাৎ সামগ্রিক নির্দেশনার বাইরেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে বিশেষ নজর দেন। ঋতুদা সে ক্ষেত্রে অবশ্যই অভিনেতা এবং তার অভিনয়… এ ছাড়াও পোশাক আর ঘর সাজানোতে নজর দিতেন খুব বেশী।
গোড়ায় একটা মজার কথা বলতে ভুলেছি। গাড়ি করে আসবার সময় আমাদের প্রোডাকশন ম্যানেজারের ফোনে ঋতুদা ফোন করে বলেন “একটা ফুচকার গাড়ি চাই”। ম্যানেজার তো হই হই করে উঠল… সহযোগীদের ফোন করে বলতে লাগলেন, “তোমরা আগে থেকে কেন বলনি, এখন শেষ মুহূর্তে কোথায় পাই”, ইত্যাদি। সহযোগী বেচারা সত্যি জানেনা, ব্যোমকেশে’র গল্পে ফুচকার গাড়ি কেন লাগবে! এদিকে ঋতুদাকে ভয়ে কেউ জিজ্ঞেসও করতে পারছেনা। “এটা creative call, উনি এখুনি ভেবেছেন” এই বলে তারা পাশ কাটিয়ে গেলো। এরপরে আর কারো কিছু বলার উপায় নেই। যাহোক লোকেশনে পৌঁছনোর কিছু পরেই দেখলাম ফুচকার গাড়ি এসে উপস্থিত। একজন এসে ফুচকাওলাকে দৌড়ে নিয়ে গেলো costume এর ঘরে।
আমার Make-up van এ বসে থাকার অভ্যেস নেই, শুটিঙে গিয়ে দৌড়ঝাঁপ করে কাজ করতেই অভ্যস্ত। তাই ভ্যান থেকে নেবে অভিকদার আলো করা দেখছি, এমন সময় ঋতুদা এসে উপস্থিত। একজন এগিয়ে এসে আমার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিলেন, ঋতুদা বলল “বেশ বেশ, তোমার অভিনয় খুব সুন্দর ছিল,” বলে হাত বাড়িয়ে দিলেন shake hand করার জন্য। করমর্দন করতেই বুঝলাম এমন সুললিত কোমল হাত মেয়েদেরও চট করে হয়না। আমি এক কোনায় একটি চেয়ারে বসলাম। ঋতুদা মনিটারের সামনে বসে বললেন “অভিক আলো কি তোর শেষ?” অভিকদা ঋতুদার পাশের চেয়ার টেনে বসে বললেন “বাকি আলোটা মশাল দিয়ে হবে…” ঋতুদা বললেন… “বেশ তো actor দের দাও… একটা rehearsal করি” একজন assistant ছুটল অভিনেতা ডাকতে। এতক্ষন একটু ঢিলেঢালা ভঙ্গিতে কাজ চলছিল, এবার পরিবেশ একটু সরগরম হল… “মশাল জ্বালাও, দারোয়ান পেয়াদা সব কই…”? এদিক ওদিক থেকে দারোয়ান পেয়াদাদের এক রকম তাড়িয়ে নিয়ে এল সহযোগীরা। এক পেয়াদা কে দেখে ঋতুদা বললেন… “না না একে আমার মোটেই ভালো লাগছে না, একে সরিয়ে নিয়ে যাও” সহযোগী হাঁক পেড়ে তাকে সরিয়ে নিয়ে গেলো অন্য দিকে, জুনিয়ার আর্টিস্ট বা থিয়েটার থেকে নতুন অভিনেতা যারা সিনেমায় আসেন কাজ করতে, তারা সব সময়ই একটু কুণ্ঠিত থাকেন। সেই কুণ্ঠাকেই সিনেমার লোকেরা ভাবেন তার দুর্বলতা, তাই তাদের প্রতি তুচ্ছ তাচ্ছিল্য ঘটেই থাকে। ঋতুদা বললেন “ঐ খানে মাটিতে একজনকে কম্বল মুড়ি দিয়ে শুইয়ে দাও দেখি”। জায়গাটা একটা রাজ মন্দিরের দুয়ার, সেই দুয়ারের সামনে কেউ একজন শুয়ে থাকবে, এই হল ভাবনা। আবার হই হই শুরু হল… কারন কে ঐ খানে মাটিতে কম্বল মুড়ি দিয়ে শোবে? সময়টা মে মাস, বৃষ্টি হয়নি অনেকদিন, পাখানেই, অভিকদার আলো, এবং মশালের আগুনে জায়গাটায় প্রচণ্ড গরম… সহযোগীরা একে ওকে ধরে টানামানি করছে, কারন এই বারেই আসল creative call, বুঝলাম এই জুনিয়ার আর্টিস্ট টি আসেনি, কারন এটা এই মুহূর্তের সিদ্ধান্ত। ঋতুদা বলল “কি হল কি… তোমরা একটা পুরুষ মানুষ পেলেনা যে কম্বল চাপা দিয়ে ঘুমবে, কি আশ্চর্য!” একজন এসে বলল “দাদা কম্বলটা কি লাগবেই?”
“কি অদ্ভুত! শীতকালে মানুষ গায়ে কম্বল দেবেনা, বুঝতেই পারছি তুমি কিচ্ছু script পড়নি… যাও একটা ছেঁড়া কম্বল নিয়ে এসো” রাগত স্বরে বলল ঋতুদা।
সে আবার পড়িমড়ি ছুটল… কিছু বাদেই একখানা আসতো কম্বল এনে হাজির করল… কিন্তু সেই কম্বলকে যে গায়ে দিয়ে ঘুমবে সেই লোকটি এখনও জোগাড় হয়নি। এই বারে আমি প্রমাদ গুনছি। আমার চরিত্রের যা দশা, তাতে ঋতুদা বলতেই পারেন “যা তুই যা, গিয়ে শুয়ে পড়”। তাহলেই তো গেছি… তাই ঋতুদার মাথার পেছনে এক কোনায় অনেক লোকের মাঝে নিজেকে লুকিয়ে এইসব লক্ষ্য করছি। হঠাৎ করে ঋতুদা বললও “এই অভিক…” অভিকদা সচকিত ভাবে তাকালেন, ভেবেছেন বুঝি ওনাকেই ঋতুদা এবারে কম্বল চাপিয়ে শোয়াবেন…. ঋতুদা বলল… “তোর ঐ আলোর ছেলেটাকে বল না, ওর তো কোনো কাজ নেই” অভিকদা একটু মিউ মিউ করছেন… “না মানে ও তো এইচ এম আই টা ধরে আছে” “এইচ এম আই তো কি… ওটা কি ফস্ করে মাথায় খুলে পড়বে, যে ওকে ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে” অন্য একটি আলোর ছেলে খুব মজা পেয়েছে, নিজেদের ভেতর একজনকে বেশ বুলি করা হবে, সে এগিয়ে এসে বলে “না দাদা আমি আছি…” অভিকদা দেখি সেই ছেলেটার দিকেই কট্ করে তাকালেন, ব্যাস সে আর ত্রিসিমানায় নেই… দে দৌড়।
ইতিমধ্যে রাজার সেই বাড়তি পেয়াদাকে পোশাক ছাড়িয়ে নিয়ে আসা হয়েছে, ঋতুদা বলল, “এর মুখ দেখা যাবে না একেই বরং শুইয়ে দাও, কই দেখি কম্বলটা… একি! এটা তো আস্ত একটা কম্বল, দাও দেখি কাঁচি” art assistant মুখ কাচুমাচু করে মিনমিন স্বরে বলল, “দাদা কম্বলটা কি না ছিঁড়লেই নয়…”? “অসভ্য ছেঁড়া কম্বল আনিসনি কেন… এটাই ছিঁড়ব, দাও কাঁচি দাও” কচকচ করে আস্ত একটি কম্বলের মধ্যভাগ ছিঁড়ে ফালা ফালা করে দিল… হঠাৎ অতি উৎসাহে একজন dresser কম্বল ছিঁড়তে হাত বাড়াল, যেন সে পরিচালক কে খুব সাহায্যের হাত বাড়াচ্ছে, আসলে বিষয়টা অন্য। অন্য কোনোদিন art assistant কোন একটা costume ছিঁড়েছিল এইরকমই উৎসাহের সঙ্গে, আজ তারই প্রতিশোধ। সিনেমার শুটিঙে পরিচালকের অগোচরে এরকম অনেক গল্প তৈরি হয় রোজ… যাকে আমরা বলি behind the scene.
বেশ অনেকক্ষণ সময় চলে গেছে এই বিষয়টা করতে এবার shot নেবেন ঋতুদা… “কই অভিনন্দন” বলে হাঁক পাড়তেই আমি চমকে উঠি, তড়িঘড়ি আমি উঠে গেলাম সামনে। আমায় বললেন ঐ খানে বসতে, কিন্তু দৃশ্যের মূল অভিনেতারা এখন অনুপস্থিত… ঋতু দা বলল “কই কই বাকি অভিনেতারা কই” “মেকাপ হচ্ছে দাদা” “মেকাপ, সেকি দুজন পুরুষ মানুষের মেকাপ করতে এত সময় লাগে নাকি! যাও আলিকে ডাকো…” কিছুক্ষনের মধ্যেই আলিদা (make-up artist) অভিনেতা সহ এসে হাজির। আলিদাও একচোট বকুনি খেলো দেরির জন্য। ইন্দ্রনীল (সেনগুপ্ত) আর অনিন্দ্যদা’র (চট্যোপাধ্যায়) পোশাকের হাতা গোটানো, চুলের ভাঁজ, চাদর নেওয়ার ধরন,
এই সব নিজে হাতে ঠিক করে দিলেন। একবার rehearsal, তারপর take. Rehearsal এ আমিও বুঝে নিলাম (যে আমার কিছুই বিশেষ করার নেই আরকি) ব্যাস… “ready for the take”.
প্রথম টেক’টি শুরু হলো ঋতুদা “তুমি এসো, অমুক করো, তুমি চলে যাও” ইত্যাদি instructions বলতে বলতেই, ব্যাস cut cut… রাজা তখন মন্দিরের ভেতরে। ঋতুদা গেলেন রেগে… ইন্দ্রনীল বেচারা মন্দিরের ভেতর থেকে আর বেরচ্ছেই না… আমার সামনে অনিন্দ্যদা মুখ নীচু করে দাঁড়িয়ে, আমিও বোকা… কারন কি ভুল, কে করেছে সেটা আমি তখনও বুঝতে পারিনি। ভুলটি ছিল সামান্যই, মন্দিরে জুতো খুলে সিঁড়ি দিয়ে উঠে যাওয়ার আগে একটু বাড়তি pause নিয়েছিল ইন্দ্রনীল… বাংলা ভাষায় যাকে বলা হয় উত্তম মধ্যম বকুনি, ঠিক সেই রকম বকুনি চলল ঝাড়া দশ মিনিট। আমাদের সর্বাঙ্গ ঘেমে যাচ্ছে মশালের আগুনের তাতে… ধোঁয়ায় চোখ জ্বলছে, আর যিনি কম্বলের ভেতর তার কথাতো ছেড়েই দিলাম। আজকালকার যে কোন অভিনেতা, মানে যাদের একটু নামটাম হয়েছে তারা যদি সকলের সামনে ঐ বকুনি খেত; কেঁদেকেটে set ছেড়ে চলে যেত, এ আমি হলপ্ করে বলতে পারি…। থিয়েটারে বকুনি খাওয়ার রেওয়াজ আজও আছে অভিনেতাদের, কিন্তু এখন সিনেমার পরচালকেরা বেশ ভয়েই থাকে, বকাবকি তো দূরঅস্ত।
যে ইন্ডাস্ট্রি তে ফেসবুক আর ইন্সট্রাগ্রাম এর ফলোয়ার দেখে সিনেমা বা web series এর কাস্টিং হয়, remuneration নির্ধারণ হয়, সেখানে অভিনেতারা পরিচালকের বকুনির যে তোয়াক্কাই করেনা, তা বলাই বাহুল্য। সেদিন ইন্দ্রনীল একটা কথাও বলেনি। মুখ চুন করে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়েছিল, ভয়ে লুকিয়ে দাঁড়িয়েছিল মন্দিরের ভেতরে। ভুল তুচ্ছ হোক বা বড়, পরিচালকের বকুনি মাথা নিচু করে শোনার মধ্যে যে একটা শিক্ষা আছে, সেটা আমি সেদিন শিখেছিলাম। কারন একমাত্র পরিচালকই জানেন গোটা ছবিটা, বাকি আর কেউ নয়।
এরই মধ্যে একজন assistant যে এতক্ষন ফ্লোরের বাইরেছিল, থমথমে পরিবেশ দেখে ঋতুদার কানে কানে ফিসফিসিয়ে বললে… “ফুচকাওলা কিন্তু রাজ পোষাকে তৈরি আছে দাদা” ঋতুদা কিছুক্ষন চুপ; সবাই স্তব্ধ; আমরা মশালের অগুনে সেদ্ধ। গুটি গুটি ফুচকাওলা এগিয়ে এসে সামনে দাঁড়াল। সে বেচারা অনেকক্ষণ ধরে ঐ ধড়াচুড়ো পরে বসে আছে। তাকে প্রোডাকশন ম্যানেজার হয়তো বলেছে “এই তো এক ঘন্টার মধ্যেই সকলে তোমার ফুচকা খেয়ে নেবে” সেই আনন্দেই সে এসেছে। শুটিং কি বস্তু মোটেই জানেনা সে। ফুচকা বিক্রি করতে এসে অভিনয়ে নেবে পড়েছে, কে শরদিন্দু, কে ব্যোমকেশ, আর কেই ঋতুপর্ণ… কেন যে তাকে নায়েবের পোশাক পরিয়ে বসিয়ে রাখা হয়েছে; তার মাথায় সেসব কিছুই ঢুকছেনা। মুখ চুন করে ফ্যাল ফ্যাল চোখে চেয়ে ঠোঁটের কোনায় অল্প হাসি আনলেন। তার দিকে তাকিয়ে ঋতুদা বলল…
“ফুচকা তো আমি খাবো বলে এনেছিলাম, মুখপোড়া বলিসনি কেন এতক্ষন। আর এই ফুচকাওলাকে নায়েবের costume পরিয়েছে কে? সে যেন দোতলা বাস চাপা পড়ে মরে… তার মরণেই মঙ্গল। হতচ্ছাড়া কেউ একজন সেকো বিষদে, খেয়ে মরি”।
….বাংলা সিনেমা তোমায় মিস্ করে ঋতুদা…।
