এসআরএফটিআই আর সত্যজিতের ‘আগন্তুক’ – লিখেছেন সংহিতা রায়
‘ঘর ছাড়ার অনেক আগে আমার মজ্জার মধ্যে ঢুকে গেছে শেক্সপিয়র, বঙ্কিম, মাইকেল, মার্ক্স, ফ্রয়েড, রবীন্দ্রনাথ…’
মনমোহন মিত্র বলেছিলেন।
আবার ‘আগন্তুক’ দেখলাম। আগেও বহুবার দেখেছি। কিন্তু এ বার দেখতে দেখতে ভীষণ রাগ হচ্ছিল। কেমন একটা জ্বালা জ্বালা ভাব।
প্রতিটা চরিত্র যেন এক এক পক্ষ। অস্তিত্বর প্রশ্নে কোণঠাসা করতে চায় একজনকেই। কারণ সেই মানুষটি অন্যরকম। বাকিদের চেনা ছকে মেলেন না। তাদের বুদ্ধিতে ব্যাখ্যা মেলে না। তাই প্রশ্ন ওঠে। চলে সহজের সঙ্গে জটিলের লড়াই। গোস্পদে সমুদ্র মাপার চেষ্টা।
সুধীন্দ্র বোসের বাড়ির ড্রইংরুমটা কোর্টরুম হয়ে ওঠে নিমেষে! গৃহকর্তা এবং কর্ত্রীর উপস্থিতি পর্বে পর্বে চলে ‘হিউমিলিয়েশন’। দেখতে দেখতে কেমন একটা শক লাগে।
কিন্তু মনমোহন মিত্র একটা লড়াই শেখাতে শেখাতে যান। আলতামিরার বাইসনের মতো সেই লড়াই। তেজি আর একরোখা।
সিনেমার লাইন-বাই-লাইন তাই ফিরে ফিরে শুনতে হয়।
এই ছবি করার আগে অসুস্থ ছিলেন সত্যজিৎ। সেই সময় পড়েছিলেন ফরাসি নৃতত্ত্ববিদ ক্লদ লেভি স্ত্রসের রচনা। সেই সূত্রেই আদিম এবং আধুনিকতার দ্বন্দ প্রভাব ফেলেছিল ‘আগন্তুক’-এ।
১৯৯১-এর মে মাসে সত্যজিৎ এক সাক্ষাৎকারে সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়কে বলেছিলেন, “‘আগন্তুক’-এ আমি উৎপলকে বলে দিয়েছিলাম যে, উৎপল, তুমি আমার স্পোকসম্যান, এটা মনে রেখো।
অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, সত্যজিতের জীবনের শেষ ছবি ‘আগন্তুক’—মতাদর্শের নিরিখে তাঁর সর্বোত্তম সৃষ্টি।
১৯৯০-এর ২২ নভেম্বর শুরু হয়েছিল ‘আগন্তুক’-এর শুটিং। কলকাতা ময়দানে। ‘আগন্তুক’ ছবির শেষ অংশের শুটিংয়ের হয় শান্তিনিকেতনে। গোয়ালপাড়ার কোপাই নদীর পাশে দুপুকুরিয়া গ্রামে।
‘আগন্তুক’-এর প্রধান চরিত্র মনমোহন মিত্র ঘর ছেড়েছিলেন ১৯৫৫ সালে। সে বছরই মুক্তি পেল সত্যজিতের প্রথম ছবি ‘পথের পাঁচালি’। ভিয়েতনাম যুদ্ধের শুরু। আইনস্টাইনের প্রয়াত হলেন। ঠিক পাঁচ বছর আগেই ঘটে গিয়েছে হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে পরমাণু বিস্ফোরণের ঘটনা।
আলতামিরার গুহায় আদিম মানবের আঁকা বাইসন দেখে ঘর ছাড়লেন কলকাতার এক মেধাবী ছাত্র। সে ভেবেছিল শিল্পী হবে। কিন্তু গুহার দেওয়ালের বাইসন মোড় ঘুরিয়ে দিল জীবনের।
ঘর ছাড়ার পর, দেশ ছাড়া হওয়ার আগে ওই শান্তিনিকেতনেই কিছুদিন কাটিয়ে উড়ে গিয়েছিলেন পশ্চিমে।
কলকাতার টান কখনও অনুভব করেননি। কিন্তু সেই টানে আটকালেন দীর্ঘ পঁয়ত্রিশ বছর। কলকাতায় সাতটা দিন কাটাতে চাইলেন ভাগনি অনিলার কাছে।
আর এই পর্বেই তিনি মুখোমুখি হলেন এক অদ্ভুত অস্ত্বিত্বের সংকটে। তিনি আসল না কি নকল? তিনি তিনিই নাকি কোনও ভণ্ড প্রতারক?
শেষ পর্যন্ত লড়াইটা হয়ে দাঁড়াল আদিম বনাম আধুনিক পৃথিবীর। ধর্ম, ধর্মের রাজনীতি আর ঈশ্বরের প্রশ্নে একেবারে সরাসরি এবং অতি স্পষ্ট ভাষায় তিনি বলেন, যা মানুষে মানুষে বিভেদ সৃষ্টি করে তা তিনি মানেন না।
তিনি বলেন,
‘ঘর ছাড়ার অনেক আগে আমার মজ্জার মধ্যে ঢুকে গেছে শেক্সপিয়র, বঙ্কিম, মাইকেল, মার্ক্স, ফ্রয়েড, রবীন্দ্রনাথ…’
পৃথ্বীশ সেনগুপ্ত ওরফে ধৃতিমান বারবার পরাজিত হন তাঁর যুক্তির সামনে। এই তর্কের লড়াইতে বারবার ফিরে ফিরে আসে ২০২৬-এর চলতি সময়।
এক সপ্তাহের ব্যবধানে পর পর দুই রবিবার হামলার মুখে পড়ল এসআরএফটিআই। সত্যজিৎ রায় ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউট। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মুক্ত-চিন্তার চর্চা কেন্দ্র হিসাবে পরিচিত।
সেখানেই হামলা চালায় বিজেপি-আরএসএস। পারস্পরিক সংঘাতে জড়ালেন ওই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পড়ুয়া এবং রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ বা আরএসএসপন্থী সংগঠনের সদস্যেরা।
প্রাতিষ্ঠানিক দমননীতির ছবি মনমোহন মিত্রের সেই প্রশ্নগুলো নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। যে প্রতিষ্ঠানের প্রবেশদ্বারে সত্যজিৎ রায়ের নাম খোদাই করা, সেই প্রতিষ্ঠানের প্রাত্যহিক কর্মকাণ্ড কি আদতে তাঁর দর্শনের সঙ্গে মেলে? নাকি কেবলই ‘কূপমণ্ডূক’ বানানোর চেষ্টা?
ছোটবেলায় প্রথমবার যখন দেখেছিলাম ‘কূপমণ্ডূক’ শব্দটা শিখে নিয়েছিলাম। এখন আবার যখন দেখছি, তখনও নতুন শেখার পাঠ। টানা দু’দিন ধরে একটাই সিনেমা ফিরে ফিরে দেখে গেলাম।
মরা সময়ে, হাজার এক মন্দ মানুষের দ্বন্দ এড়িয়ে বাঁচার বর্মটাও চিনিয়ে দেন ‘মিস্টার নিমো’।
আসলে এ শহরের সে কেউ না। তাকে ঘর ছাড়তে হবে। বাঁচার জন্য অন্য দুনিয়ার খোঁজ করতে হবে। বারবার।
যেখানে নিঃশ্বাস নেওয়া যায় সহজে…





