নানা রঙের দুর্গারা – সৌভিক রায়
দেবী দুর্গার বর্ণনায় বলা হয়, মা দুর্গা হবেন গৌরবর্ণা, স্বর্ণবর্ণা, পীতবর্ণা, তপ্তকাঞ্চনবর্ণা। তেমন রূপে প্রতিমা গড়েন বাংলার মৃৎশিল্পীরা। তবে ব্যতিক্রমও রয়েছে, কৃষ্ণবর্ণের দুর্গারও আরাধনা হয় বাংলায়। শাস্ত্র অনুযায়ী, দুর্গা হবেন অতসীপুষ্পবর্ণা। পল্লীগ্রামে যে অতসী ফুল দেখা যায়, তার বর্ণ সোনার মতো। তেমনই দুর্গা গড়েন বাংলার পটুয়ারা।
বাংলার নানা প্রান্তে কালো দুর্গা প্রতিমার পুজো হয়। সেগুলো মূলত পারিবারিক দুর্গাপুজো। অতসী শব্দের অভিধানিক অর্থ ক্ষুমা। গ্রাম বাংলার ক্ষুমা ফুলের বর্ণ কিন্তু কালো। ফলে তেমনভাবে দেখলে কালো দুর্গা অশাস্ত্রীয় নয়। বর্ধমানের ভট্টাচার্য পরিবারে প্রায় তিনশো বছর ধরে ‘ভদ্রকালীরূপী দুর্গা’র পুজো হচ্ছে। দেবীর রঙ কালো। পুজো শুরু হয়েছিল ওপার বাংলায়। প্রচলিত কাহিনি অনুসারে, এই পরিবারের পূর্বপুরুষ হরিদেব ভট্টাচার্যকে দেবী দুর্গা স্বপ্নাদেশ দিয়ে ভদ্রকালীরূপে পুজো করতে বলেন। সেই থেকে কালো দুর্গার আরাধনা চলছে ভট্টাচার্য বাড়িতে। যদিও কেউ কেউ বলেন, প্রতিমাশিল্পী ভুলবশত কালো রঙ করে ফেলেছিলেন এবং সময় না-থাকায় ওই মূর্তিই পুজো করা হয়। দেশভাগের পর ভট্টাচার্য পরিবার এপার বাংলায় চলে আসে। পরিবারের কিছু সদস্য কর্মসূত্রে নানান জায়গায় ছড়িয়ে পড়েন। আসানসোল ও কলকাতায় পুজো শুরু হয়। সাতের দশক পর্যন্ত আসানসোলে, তার পর আরও বছর পাঁচেক দুর্গাপুরে পুজো হয়। এর পর কলকাতার বেলেঘাটায় পুজো স্থানান্তরিত হয়। বর্ধমানের পাশাপাশি বেলেঘাটার রামকৃষ্ণ নস্কর লেনের ভট্টাচার্যবাড়িতেও কালো দুর্গার পুজো হয়। কালো দুর্গার প্রতিমায়, দেবীর বাম দিকে থাকেন গণেশ এবং ডান দিকে কার্তিক। পূর্ববঙ্গে শুরু হওয়া অধিকাংশ বাড়ির পুজোয় গণেশ ও কার্তিকের প্রচলিত স্থানের এমন অদল-বদল দেখা যায়।
নদিয়া জেলাতেও কালো দুর্গার আরাধনা হয়। হাঁসখালির বাহিরগাছি গ্রামের দেবীমূর্তির রঙ কুচকুচে কালো। এই পুজো আশ্রমের। যা এলাকায় শান্তি আশ্রম বলে পরিচিত। একদা এই পুজো হতো বাংলাদেশের পাবনা জেলার স্থলগ্রামের জমিদারবাড়িতে, সে বাড়িরই পুজো। সেই পরিবারের ভভূপেশচন্দ্র ভট্টাচার্য হিমালয় ভ্রমণে বেরিয়ে সন্ন্যাসী হয়ে যান, বাহিরগাছিতে এসে আশ্রম প্রতিষ্ঠা করে দুর্গাপুজো শুরু করেন। জানা যায়, ভুল করে দেবীর গাত্রে কালো রঙ করে ফেলেছিলেন মৃৎশিল্পী। জনশ্রুতি রয়েছে, ঘুমের ঘোরে রঙ করতে গিয়ে বিপত্তি বাঁধান পটুয়া, তার পর দেবী স্বপ্নাদেশে জানান কৃষ্ণবর্ণের রূপেই পুজো হোক।
ক্যানিংয়ের দিঘিরপার এলাকার ভট্টাচার্য পরিবারের দুর্গা প্রতিমার মুখের রঙ কালো, গাত্রবর্ণ বাদামি। এক অগ্নিকাণ্ডের জেরে এই রূপেই সৃষ্টি। ঢাকা-বিক্রমপুরের পাইনখাঁড়া গ্রামে প্রায় সাড়ে চারশো বছর আগে সূচনা হয়েছিল এই পুজোর। খড়ের ছাউনির শনি ও কালী মন্দিরে দুর্গা পুজোর আয়োজন করা হতো। পাশে আর একটি মন্দিরে মনসা পুজো হতো। প্রায় ২০০ বছর আগে ঘটে দুর্ঘটনা। হঠাৎই একটি কাক মনসা মন্দির থেকে প্রদীপের জ্বলন্ত সলতে ঠোঁটে তুলে নিয়ে এসে দুর্গা মন্দিরের খড়ের চালে বসে, ঘটে যায় ভয়ঙ্কর অগ্নিকাণ্ড। আগুনে পুড়ে যায় দুর্গা প্রতিমার অনেকটা অংশ। কী ভাবে হবে পুজো? ধ্যানে বসেন পূর্বপুরুষরা। ধ্যানে পুড়ে যাওয়া মূর্তিকেই পুজো করার আদেশ দেন দেবী। তার পর থেকে কালো দুর্গার পুজো শুরু হয়।
উত্তর দিনাজপুর জেলার কালিয়াগঞ্জের ধনকৈল গ্রামের পাকড়াশি বাড়ির দুর্গাও কালো। ওপার বাংলার পাবনায় এই পুজোর সূচনা। বাংলার প্রায় প্রতিটি কালো দুর্গা পুজোর শিকড় রয়েছে ওপার বাংলায়। কোথাও দুর্ঘটনা, কোথাও পটুয়ার ভুল, আবার কোনও পরিবারে দেবীর স্বপ্নাদেশের কাহিনি, যেন লৌকিকভাবে দেবীর কালো রূপের নির্মাণ হয়েছে!
নদীয়ায় পূজিতা হন নীল দুর্গা। একই পরিবারের দুই শরিকের বাড়িতে নীল দুর্গার আরাধনা চলে। দুর্গার নাম থেকে বাড়ির নাম হয়ে গিয়েছে নীল দুর্গাবাড়ি। কৃষ্ণনগর নাজিরাপাড়ায় চট্টোপাধ্যায় বাড়ির দুর্গামূর্তি নীল। চট্টোপাধ্যায় পরিবারের আদি বাড়ি ছিল বাংলাদেশের বরিশাল জেলার রামরাইন গ্রামে, সেখানে পুজোর সূত্রপাত। তবে প্রথম থেকে মূর্তি নীল রঙের ছিল না। শোনা যায়, প্রতিমা শিল্পী রাতের অন্ধকারে ভুল করে নাকি দেবীমূর্তির গায়ের নীল রঙ করে ফেলেছিলেন। চালির রঙ প্রতিমার গায়ে আর প্রতিমার হলুদ পড়েছিল চালিতে।
নদিয়ায় আবার লাল দুর্গারও দেখা মেলে, লাল দুর্গার পুজো হয় নবদ্বীপের যোগনাথতলার ভট্টাচার্য বাড়িতে। দুর্গামূর্তি লাল হয়ে যাওয়ার নেপথ্যে রয়েছে এক জনশ্রুতি। সে কাহিনি বড় মর্মান্তিক। ঘটনাটি ওপার বাংলার। ভট্টাচার্যদের আদি বাড়ি ছিল বাংলাদেশের ঢাকা জেলার মিতরা গ্রামে। জনশ্রুতি অনুযায়ী, এই পরিবারের দেবীর গায়ের রঙ প্রথম থেকে এমন রক্তবর্ণ ছিল না। সতের শতকের ঘটনা, পুজো উপলক্ষ্যে ভট্টাচার্য পরিবারের গৃহকর্তা রাঘবরাম ভট্টাচার্য নবমীর দিন চণ্ডীপাঠে বসেছেন, পুজোর বিশেষ তিথি পেরিয়ে যাচ্ছে, তাই একটু দ্রুতই পাঠ করছিলেন। পাশেই ছিলেন রাঘবরামের তৃতীয় পুত্র রামভদ্র, তাঁর কানে বাঁধে বাবার উচ্চারণ। বাবার চণ্ডীপাঠকে ত্রুটিপূর্ণ বলে মনে হয় তাঁর। বাবাকে বলেন। ছেলের মুখে নিজের দোষের কথা শুনে রেগে যান রাঘবরাম। চণ্ডীপাঠ থামিয়ে ছেলেকেই আদেশ করেন চণ্ডীপাঠ করতে। বাবার আদেশে পূর্বদিকে মুখ করে চণ্ডীপাঠ করতে বসলেন রামভদ্র। শুরু হল বাবা আর ছেলের একইসঙ্গে চণ্ডীপাঠ। এমন সময় হঠাৎই দিক পরিবর্তন করলেন দেবী, দক্ষিণমুখী থেকে ঘুরে পশ্চিমমুখী হয়ে একেবারে রাঘবপুত্রের দিকেই যেন ঘুরে দাঁড়ালেন মা। চণ্ডীপাঠ চলল আর দেবীর গায়ের রঙ বদলাতে থাকল ধীরে ধীরে। লাল বর্ণ ধারণ করলেন দেবী, অন্যদিকে রামভদ্রের সারা শরীর ক্রমেই রক্তশূন্য হয়ে গেল। চণ্ডীপাঠ শেষ হল, আর রামভদ্রও মারা গেলেন। আজও দেবী এখানে পশ্চিমমুখী। এ বাড়িতে পুজোয় চণ্ডীপাঠ নিষিদ্ধ।
দুর্গা বঙ্গে তপ্তকাঞ্চনবর্ণা ছিলেন। কখনও ভুলবশত, কখনও বা দুর্ঘটনার জেরে তাঁর গাত্রবর্ণ বদলে গিয়েছে। আবার জুড়ে গিয়েছে স্বপ্নাদেশের কিংবদন্তি। এখানে বৈচিত্রের পুণ্যভূমি বাংলার সার্থকতা।
