কাননে কুসুম কলি – সোমনাথ রায়
কাননদেবী সম্ভবতঃ বাংলা ছবির প্রথম সুপার স্টার। বাংলা ছবির প্রথম নায়িকা যাঁর সর্বভারতীয় খ্যাতি জুটেছিল। তাঁর সমসাময়িক নায়িকা চন্দ্রাবতী দেবী, ছায়া দেবী বা পদ্মা দেবী কারোরই এই সৌভাগ্য হয়নি। সৌন্দর্যে হয়তো চন্দ্রাবতী দেবী তাঁর চেয়ে কয়েক কদম এগিয়ে থাকবেন। অভিনয় দক্ষতায় ছায়া দেবী বা মলিনা দেবী নিঃসন্দেহে সমসাময়িক তো বটেই হয়তো বা বাংলা ছবির এখনও অবধি সেরা দুই অভিনেত্রী। কিন্তু কানন দেবী ছিলেন পরিচালকদের কাছে একটা টোটাল প্যাকেজ। যেমন সৌন্দর্য তেমনই অপূর্ব ছিল তাঁর গানের গলা। এই দুই-এর সমন্বয়ে তাঁর অভিনয়ে যেটুকু খামতি ছিল তা ঢেকে যেতো। বিশেষতঃ তাঁর গান। সেকালের বাংলা চিত্রগীতিকে এক অসামান্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন একের পর এক হিট গান দিয়ে। ‘তুফান মেল’, ‘আমি বনফুল গো’, ‘দিও না মন, যদি ভালো না লাগে তো’ ইত্যাদি গান তো সেকালে লোকেদের মুখে মুখে ফিরতো। শেষোক্ত গানটি তো এতো জনপ্রিয় হয়েছিল যে সাহেবরা অবধি এই গানটি গুন গুন করতো – If you don’t like me, don’t give your heart.
এক ঈশ্বরদত্ত চেহারা ও কণ্ঠস্বর নিয়ে জন্মগ্রহণ করেছিলেন কানন দেবী। তখন শুধুই কানন। চলচ্চিত্রে নামার সময় কিশোরী কাননের নাম হলো কাননবালা। বিখ্যাত চলচ্চিত্র সাংবাদিক বাগীশ্বর ঝা-র বর্ণনানুযায়ী এক আস্তাকুঁড়ে জন্ম হয়েছিল কাননের। বড় হয়ে উঠেছিলেন হাওড়ার এক বস্তিতে। মা-এর নাম রাজবালা হলেও বাবার প্রকৃত নাম কেউ জানে না। অসীম দারিদ্র্যের মধ্যে ১৯১৪ সালের ২২ শে এপ্রিল জন্মগ্রহণ করেছিলেন কাননবালা। প্রায় একক প্রচেষ্টায় সেই ভয়ংকর দারিদ্র্যের সঙ্গে অকুতোভয়ে লড়াই করে দু’হাতে সব বাধা-বিপত্তি সরিয়ে জীবনে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিলেন কানন। সংগ্রামী জীবন শেষে প্রতিষ্ঠা পেয়ে ধীরে ধীরে কাননবালা থেকে হয়ে উঠেছিলেন কানন দেবী। বাংলা ছবির এক নম্বর নায়িকা। উত্তর জীবনে হয়ে উঠেছিলেন সর্বজনশ্রদ্ধেয়া এক মহিলা যিনি নিজের অভিনয়জীবনের নানান সব তিক্ত অভিজ্ঞতার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলা ছবির পরবর্তী নায়িকাদের বিষম অভিজ্ঞতা এবং শোষণ থেকে বাঁচাতে একরকম ঢাল হয়ে দাঁড়িয়ে তাঁদের নেতৃসমা হয়ে উঠেছিলেন এবং সেই উদ্দেশ্যে তৈরি করেছিলেন – মহিলা শিল্পী মহল।
কঠোর জীবন যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে সেই শৈশবেই কানন বুঝতে পেরেছিলেন যে সীমাহীন দারিদ্র্য, শোষণ এবং আত্মীয়দের অত্যাচার থেকে বাঁচতে অল্প বয়স থেকেই অর্থ রোজগার করার কথা ভাবতে হবে এবং তার জন্য তখন থেকেই নিজেকে তৈরি করতে হবে। আর্থিক কারণে প্রথাগত বিদ্যালয় শিক্ষা মাঝপথেই ছেড়ে দিতে হলেও তাঁর প্রাথমিক শিক্ষাটুকু মা-এর কাছ থেকেই পেয়েছিলেন। তারপর বিভিন্ন প্রয়োজনীয় বই কিনে মা-এর তত্ত্বাবধানে নিজে নিজেই অনেকটা পড়াশোনা এগিয়ে নিয়ে গেছিলেন। আর ভগবানও তাঁকে দুটি সম্পদ অঢেল পরিমানে দিয়ে পৃথিবীতে পাঠিয়েছিলেন। প্রথমটি অতুলনীয় সৌন্দর্য ও মুখশ্রী এবং দ্বিতীয়টি অসামান্য কণ্ঠ সম্পদ। প্রথমটি বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চন্দ্রকলার ন্যায় বিকশিত হয়ে যৌবনে পূর্ণিমার চাঁদ হয়ে দেখা দিয়েছিল। আর দ্বিতীয়টি নিয়মিত অনুশীলন এবং গুরুর শিক্ষার সাহায্যে পরিপূর্ণতা লাভ করেছিল। প্রথম জীবনে আল্লারাকা এবং পরে অনাদি দস্তিদারের কাছে গানের পাঠ নিয়েছিলেন। নিয়েছিলেন উচ্চাঙ্গসংগীতেরও তালিম। পরে ছায়াগীতির প্রয়োজনে পঙ্কজ মল্লিক, রাইচাঁদ বড়াল ও ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়ের কাছেও গান শিখেছিলেন।
আরেকটি জিনিসও ভগবান তাঁকে যথেষ্ট-রও বেশি দিয়েছিলেন। সেটি হচ্ছে তাঁর বুদ্ধি। যা তাঁর অভিজ্ঞতার ঘষা-মাজায় তা আরও উজ্জ্বল হয়ে এই সহায়-সম্বলহীন পৃথিবীতে নানা পেশাদারি বিপদের মধ্যে রক্ষাকবচ হয়ে দাঁড়িয়ে তাঁর প্রতিভাকে গানে, অভিনয়ে, চলচ্চিত্র প্রযোজনায়, মহিলা শিল্পীদের সংস্থা সংগঠনে ছড়িয়ে দিতে পেরেছিল। অবশ্য এই বুদ্ধি তাঁকে কিছুটা কূটকৌশলীও করে তুলেছিল। সেই কূটবুদ্ধি তাঁর কাজে লেগেছিল নিজের পায়ের নিচের জমিটাকে শক্ত করতে এবং ছবি ও গানের জগতে প্রতিষ্ঠা পেতে এবং ধীরে ধীরে বাংলা ছায়াছবির এক নম্বর নায়িকার আসনটি দখল করতে।
কাননবালার ছায়াছবির প্রধান জুটি মূলতঃ প্রমথেশ বড়ুয়ার সঙ্গে হলেও তখনকার প্রায় সব বিখ্যাত নায়কদের সঙ্গে জুটি বেঁধেই কাজ করেছিলেন, যেমন – জহর গাঙ্গুলি, পাহাড়ি সান্যাল, ধীরাজ ভট্টাচার্য প্রভৃতি। সেকালের সর্বাধিক চর্চিত এবং বিখ্যাত জুটি হলেও প্রমথেশ বড়ুয়ার সঙ্গে (এবং পরিচালনায়) কাননবালা ছবি করেছিলেন মাত্র দুটি – প্রথমে ‘মুক্তি’ (নিউ থিয়েটার্স/১৯৩৭) এবং এম পি প্রোডাকসন্সের ‘শেষ উত্তর’ (১৯৪২)। এই ‘মুক্তি’ ছবিতেই রবীন্দ্রকাহিনির বাইরে প্রথম কোনও ছবিতে রবীন্দ্রসংগীত ব্যবহৃত হয়েছিল। কাননবালা গেয়েছিলেন দুটি গান – ‘আজ সবার রঙে রঙ মেশাতে হবে’ এবং ‘তার বিদায়বেলার মালাখানি’। ‘মুক্তি’ ছবির সংগীত পরিচালনা করেছিলেন পঙ্কজ কুমার মল্লিক – যিনি ছিলেন নিউ থিয়েটার্সের মাস-মাইনের ছায়াছবির সঙ্গীতপরিচালক।
কাননবালা তখন সদ্য রাধা ফিল্মস ছেড়ে নায়িকা হিসেবে যোগ দিয়েছেন নিউ থিয়েটার্সে ১৯৩৬ সালে। নিউ থিয়েটার্সে কাননবালার শুরু জোড়া ছবি দিয়ে – ‘বিদ্যাপতি'(১৯৩৮) এবং ‘মুক্তি’- শেষের ছবিটি আগে মুক্তি পেয়েছিল। ‘বিদ্যাপতি'(পরিঃ- দেবকী কুমার বসু) ছবিটি ছিল দ্বিভাষিক। এই ছবিটি এবং ছবির গান কাননবালাকে গায়িকা-নায়িকা হিসেবে সর্বভারতীয় খ্যাতি এনে দিয়েছিল। আর ‘মুক্তি’ ছবির গানের সাফল্যে কাননবালা ক্রমশঃই নিউ থিয়েটার্সের দুই সঙ্গীত পরিচালক রাইচাঁদ বড়াল এবং পঙ্কজ মল্লিকের প্রিয় হয়ে ওঠেন এবং প্রথমজনের সঙ্গীত পরিচালনায় অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে নায়িকা-গায়িকা হিসেবে ‘বিদ্যাপতি’/’সাথী’/’সাপুড়ে’/
‘পরাজয়’/’অভিনেত্রী’ প্রভৃতি ছবিতে কাজ করে দর্শকদের কাছে নায়িকা এবং গায়িকা দুই ভূমিকাতেই দর্শকদের কাছে দারুণ জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। কাননবালার ‘কাননবালা’ বা ভবিষ্যতের ‘কানন দেবী’ হয়ে ওঠার পিছনে নিউ থিয়েটার্সের অবদান সর্বাধিক।
কাননবালার প্রথম জীবনে উচ্চাকাঙ্খা আর অর্থোপার্জনের ইচ্ছা ছিল আকাশছোঁয়া। আর ছিল নিজের পঙ্কিলতার ইতিহাসকে মুছে ফেলে সমাজের উঁচুতলায় প্রতিষ্ঠিত এবং সম্মানিত হবার লোভ। তাঁর জন্ম তারিখ ১৯১৪ সালের ২২শে এপ্রিল অবশ্যই তর্কযোগ্য। কাননবালার জন্ম এবং শৈশব নিয়ে বিশদে কোনও আলোচনা কাদা ঘাঁটারই সামিল এবং এই লেখার সেটি উদ্দেশ্যও নয়। কানন দেবীর আত্মজীবনী ‘সবারে আমি নমি’তে (দে’জ পাবলিশিং) দেওয়া তথ্য অনুযায়ী তাঁর বাবার নাম ছিল রতন চন্দ্র দাস। উত্তরজীবনে বিবাহসূত্রে তিনি কখনও কানন মৈত্র (স্বামী অশোক মৈত্র) বা কানন ভট্টাচার্য (স্বামী হরিদাস ভট্টাচার্য) নামে পরিচিত হলেও কুমারীজীবনে কখনও কানন দাস বলে পরিচিত ছিলেন কী না জানা নেই। প্রথম স্বামী অশোক মৈত্র ছিলেন তখনকার বিখ্যাত শিক্ষাবিদ ও বিজ্ঞানী হেরম্ব মৈত্রের ছেলে। হেরম্ব মৈত্র ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্নেহধন্য। আর হরিদাস ভট্টাচার্য ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন রাজ্যপালের এ ডি সি। স্পষ্টতঃই বোঝা যায় যে এই দুই বিয়ের মাধ্যমেই কাননবালা সমাজের উঁচুতলায় প্রতিষ্ঠিত এবং সম্মানিত হতে চেয়েছিলেন। হয়েওছিলেন।
কাননবালার চলচ্চিত্রে হাতেখড়ি হয়েছিল নির্বাক যুগে – ম্যাডান কোম্পানির ‘জয়দেব’ (পরিঃ- জ্যোতিষ বন্দ্যোপাধ্যায়/১৯২৬) ছবিটির মাধ্যমে। অর্থোপার্জনের কঠোর তাগিদে পড়শী তুলসী বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত ধরে ম্যাডান স্টুডিওতে হাজির হয়েছিলেন কানন। এরপর আরও একটি নির্বাক ছবিতে (‘শঙ্করাচার্য’) অভিনয় করে ভয়েস টেস্ট দিয়ে কানন সবাক ছবিতে অভিনয় করতে নির্বাচিত হয়েছিলেন। চলচ্চিত্রে প্রবেশের পূর্বে তিনি কিছুকাল মঞ্চে অভিনয় করেছিলেন তবে সেটা কিছু উল্লেখযোগ্য কাজ নয়। সবাক ছবিতে কাননের প্রথম কাজ ম্যাডানেরই ‘জোরবরাত’ (পরিঃ- জ্যোতিষ বন্দ্যোপাধ্যায়/১৯৩১)। এরপর ম্যাডানের আরও কয়েকটি ছবিতে অভিনয় করে ১৯৩২ সালে কানন যোগ দিয়েছিলেন রাধা ফিল্মস-এ। এখানকার ‘মানময়ী গার্লস স্কুল’ ( পরিঃ- জ্যোতিষ বন্দ্যোপাধ্যায়/১৯৩৫) ছবিটি কাননকে প্রথম দর্শকমনে নায়িকা হিসেবে প্রতিষ্ঠা দেয়। তবে অভিনয়ের চূড়ান্ত সার্থকতা এবং উপার্জনের উচ্চ স্থিতি তিনি পেয়েছিলেন নিউ থিয়েটার্সের ছবিগুলিতে অভিনয় করে। তাঁর সংগ্রামী ব্যক্তিত্বও গড়ে উঠেছিল এই নিউ থিয়েটার্সেই। একই সঙ্গে মেগাফোন রেকর্ডস থেকে প্রকাশিত গানের রেকর্ডগুলির মাধ্যমে পেয়েছিলেন সঙ্গীত জগতে প্রতিষ্ঠা। আধুনিক বা বেসিক গান এবং ছায়াছবির গান – দুটোতেই।
জীবনের অমোঘ নিয়মে কাননবালার সেই অনিন্দ্যসুন্দর চেহারাতেও সময়ের মেদ জমতে শুরু করেছিল। সেই কিন্নর কণ্ঠও সময়ের দাবীতে ম্লান হতে শুরু করেছিল। বুদ্ধিমতী কাননবালাও খুব দ্রুত সেই খামতি জনিত অসুবিধাগুলো অনুধাবন করতে পেরেছিলেন। এটাও বুঝতে পেরেছিলেন যে খ্যাতির শীর্ষে থাকতে থাকতেই তরুনী নায়িকা চরিত্রে অভিনয় করা থেকে সরে এসে একটু বয়স্ক অথচ নারীপ্রধান ছবিতে অভিনয় করা শুরু করেন। এই সময়েই তিনি নিজের প্রযোজনা সংস্থা শ্রীমতী পিকচার্সের গোড়াপত্তন করেন। এই ব্যাপারে তাঁকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন তাঁর স্বামী হরিদাস ভট্টাচার্য – যিনি শ্রীমতী পিকচার্সের বেশ কয়েকটি ছবি পরিচালনাও করেছিলেন। শ্রীমতী পিকচার্সের ব্যানারে নির্মিত ছবিগুলি হলো – ‘অনন্যা'(প্রথম ছবি), ‘মেজদিদি’, ‘দর্পচূর্ণ’, ‘নববিধান’, ‘আশা’ ইত্যাদি। ‘আশা’ ছবিতেই কানন দেবীর গান শেষবারের মতো শোনা গিয়েছিল। দেহের স্থূলত্বের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এইসব ছবিতে তাঁর অভিনীত চরিত্রগুলিও একটু ভারিক্কি মতো হতো। সম্ভবতঃ এই কারণেই তাঁর ‘বালা’ থেকে ‘দেবী’-তে উত্তরণ ঘটেছিল। তিনি পরিচিত হলেন কানন দেবী বলে। শ্রীমতী পিকচার্সের ব্যানারেই তাঁর শেষ ছবি – ‘ইন্দ্রনাথ, শ্রীকান্ত ও অন্নদাদিদি'(পরিঃ- হরিদাস ভট্টাচার্য/১৯৫৯)। তারপরেই তিনি অভিনয় জগৎ থেকে সরে আসেন।
সত্যজিৎ রায় মারা যাবার মাস তিনেক পরেই সেই বেলভিউ নার্সিং হোমেই ১৯৯২ সালের ১৭ই জুলাই কানন দেবী পরলোক গমন করেন।
