সুরের ‘দেবী অন্নপূর্ণা’: পুরুষশাসিত সমাজের প্রতিস্পর্ধী এক নিষ্কম্প্র দীপশিখা – সৃজিতা স্যান্যাল
সুর যখন তার নাড়িতে নাড়িতে এমনি করে প্রবেশ করে যায় তখন সুখ-দুঃখ থাকে না, ভাবনা-চিন্তা কিচ্ছু না, তার মনে হয় সে এক প্রবল পরাক্রান্ত কিন্তু অপরিসীম প্রেমী পুরুষকে অনুসরণ করে চলেছে। কী মাধুর্য, কী ধৈর্য, কী মহিমা এই অনুসরণে। অনুসরণের পথটি সোজা নয়। কখনও আঁকাবাঁকা, কখনও ক্ষুরস্য ধারা নিশিতা দূরত্যয়া, আবার কখনও হে বিরাট নদী—বিশাল রাজপথসদৃশ রাস্তা। তার দুধারে অলৌকিক সৌন্দর্যের সম্ভার। প্রত্যেকটি বাঁকে বিস্ময়ের উপচার নিয়ে অপেক্ষা করছে অদৃশ্য গন্ধর্বরা। অবশেষে মোহনার মতো এক সুরবিস্তারে তার কল্যাণের বিলম্বিত গানটি সুরসমুদ্রের মৌলিক স্রোতে মিশে যায়। সে আবিষ্ট হয়ে যায়।
—- গান্ধর্বী, বাণী বসু
সুরের অভিসারে পাড়ি দেওয়ার পথটি হয়তো এমনই অলৌকিক। সৌন্দর্যের উপচারে ঋদ্ধ কিন্তু নিঃসঙ্গ। দুস্তর। যাঁরা পা রাখেন সেই দুরধিগম্য রাস্তায় তাঁরা সুরলোকের বাসিন্দা। তাঁদের মর্ত্য পৃথিবীর গতেবাঁধা ছক দিয়ে চেনা যায় না। অথচ এর সমান্তরালেই বয়ে যায় লৌকিক দুনিয়ায় তাঁদের যাপিত জীবন। তার সংকট, যন্ত্রণা, পিছুটান। এ দুইয়ের টানাপোড়েন কখনও কি সংগীত-সাধককে দ্বিধাবিভক্ত করে না? তদুপরি তিনি যদি সংগীত-সাধক না হয়ে সাধিকা হন? পুরুষপ্রধান সমাজ কি তাঁর জন্য আগেই লিখে রাখে না বিয়োগান্ত নাট্যের অনিবার্য নিয়তি?
কেউ কেউ অবশ্য পুরুষপ্রধান সমাজের প্রাক্-নির্ধারিত পরিণতিকে অস্বীকার করে গড়ে নেন এক নিজস্ব ভুবন। যেমন গড়েছিলেন সংগীতের একনিষ্ঠ উপাসিকা অন্নপূর্ণা দেবী। সে পৃথিবীর পরিচালক তাঁর নিজস্ব নিয়মাবলি, নিজের শর্তে জীবন বেঁচে নেওয়া।
নিভৃতবাসিনী
মুম্বাইয়ের ‘আকাশগঙ্গা’ নামের বহুতলের ছয়তলা। ফ্ল্যাট নম্বর 6A। বাইরের দরজায় একটি ফলক। সেখানে লেখা পরপর তিনটি বাক্য—
Please ring the bell only three times. If nobody answers, please leave your card/letter. Thank you for being considerate.
Smt. Annapurna Devi
এই-ই তাঁর কৌতূহলে মুখর বহির্বিশ্বকে প্রত্যাখ্যানের ভাষা। নম্র কিন্তু সুদৃঢ়। কেবল পুরুষ-শাসিত কেন, তাঁর উপেক্ষা ছিল যে কোনোরকম চমকদার দেখনদারির প্রতি। প্রতিযোগিতা আর ইঁদুর দৌড়ের জমানায় তিনি বেছে নিয়েছিলেন গভীরতার খোঁজ। তিনি একক, অন্তর্মুখী, এবং আত্মমর্যাদায় পূর্ণ এক মানবী। সুবিখ্যাত মাইহার-সেনিয়া ঘরানার উত্তরাধিকার তাঁর রক্তে। হিন্দুস্তানি ধ্রুপদী সংগীত-বিশ্বে স্বতন্ত্র ও স্বরাট তাঁর উপস্থিতি।
১৯৫৬-এর পর মঞ্চের আলোকসম্পাত থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ সরিয়ে নেন ‘পণ্ডিতানী’ অন্নপূর্ণা। যদিও এই নিভৃতবাস, এই স্বেচ্ছা-নির্বাসন সত্যিই স্বেচ্ছাবৃত ছিল কিনা সে নিয়ে অজস্র গুজব, মিথ, কিংবদন্তী। রবীন্দ্রনাথের ‘দর্পহরণ’ গল্পে স্বামীর সঙ্গে সাহিত্য-পত্রিকায় গল্প লেখার প্রতিযোগিতায় জিতে যায় স্ত্রী নির্ঝরিণী এবং প্রচুর অশ্রুবিসর্জন করে সে কড়ার আগুনে পত্রিকাটি পুড়িয়ে ফেলেছিল। অন্নপূর্ণা-রবিশঙ্করের গল্প অবশ্য আরও নাটকীয়। চারের দশকের দ্বিতীয়ার্ধ নাগাদ শুরু হয়েছিল উভয়ের যুগলবন্দি। মুম্বাইয়ের ঘরোয়া জলসা, দিল্লিতে আকাশবাণী কেন্দ্রের অনুষ্ঠান, কলকাতার ‘অল বেঙ্গল মিউজিক কনফারেন্স’ সাক্ষী ছিল ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের সেইসব অবিস্মরণীয় ও দুর্লভ লগ্নের। কিন্তু প্রতিটি অনুষ্ঠানেই নাকি রবিশঙ্করের তুলনায় শ্রোতাদের বেশি প্রশংসা পাচ্ছিল অন্নপূর্ণা দেবীর বাদনশৈলী। স্বভাবতই আঘাত পেয়েছিল রবিশঙ্করের ‘মেল-ইগো’। জনশ্রুতি আছে স্ত্রীকে দিয়ে তিনি নাকি মঞ্চ-উপস্থাপনা থেকে দূরে থাকার প্রতিজ্ঞা করিয়ে নেন। অন্নপূর্ণা দেবী নিজে জানিয়েছেন,
দর্শকদের সামনে আমি যতবারই পারফর্ম করেছি, সকলেই আমার ভীষণ প্রশংসা করেছেন। আমি বুঝতে পারতাম, পণ্ডিতজী এটা ভালোভাবে নিতে পারছেন না। আমার দর্শকের সামনে বাজানোর খুব ইচ্ছা ছিল এমনটা নয়। তাই এটা বন্ধ করে আমার নিজের মতো রেওয়াজ করে যেতে থাকি।
জনসমক্ষে বাজানো বন্ধ করলেন অন্নপূর্ণা দেবী। যে সম্পর্ক আর বিয়েকে বাঁচানোর জন্য এই সংকল্প অন্নপূর্ণার, তাও টিকল না শেষপর্যন্ত। কমলা শাস্ত্রীর সঙ্গে রবিশঙ্করের প্রেমসম্পর্কের জেরে ও আরও নানা কারণে তাঁদের দাম্পত্যে যে ভাঙন ইতিমধ্যেই ধরেছিল, তা আইনি চেহারা পেল ১৯৮২-এর বিচ্ছেদে। প্রায় চার দশকের পথ-চলার শেষে পৃথক হলেন রবিশঙ্কর অন্নপূর্ণা।
বলা বাহুল্য, স্বামীর বিশ্বাসভঙ্গে আহত-অসহায়-ভঙ্গুর ইমেজকে আঁকড়ে ধরে থাকার মতো ‘সামান্যা রমণী’ নন অন্নপূর্ণা। অন্য ধাতুতে গড়া তিনি। শৈশব থেকেই উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া আকাশস্পর্শী প্রতিভাকে ধারণের উপযুক্ত আধার। আবার পিতৃতন্ত্রের অন্ধ গলিঘুঁজির সঙ্গেও পরিচয় ঘটেছিল তাঁর কৈশোরবেলা ত্থেকেই। সে কাহিনি জানতে গেলে ওলটাতে হবে ইতিহাসের পাতা। যেতে হবে মধ্যপ্রদেশ রাজ্যের মাইহার প্রদেশে, যেখানে ‘শান্তি-কুটীর’ নামে এক আটপৌরে বাড়িতে সংসার পেতেছেন সেকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাংগীতিক নক্ষত্র—বাবা আলাউদ্দিন খান।
শৈশব-কৈশোর-তারুণ্য
চৈতি পূর্ণিমায় জন্মেছিলেন বলে মাইহার-রাজ ব্রিজনাথ আলাউদ্দিন-মদিনা বেগমের কনিষ্ঠা কন্যাটির নাম রাখলেন ‘অন্নপূর্ণা’। ছেলেবেলায় আর পাঁচটি উচ্ছল কিশোরীর মতোই তাঁর বেড়ে ওঠা। স্নেহে-আহ্লাদে হাসি-কান্নায় পরিপূর্ণ সেই কৈশোরকাল। আদ্যন্ত সাংগীতিক পরিবেশে জন্ম হলেও অন্নপূর্ণার আনুষ্ঠানিক শিক্ষার শুরু কিন্তু বেশ খানিক দেরি করেই। একে তো ভদ্রঘরের কন্যাসন্তানকে যন্ত্রসংগীতে তালিম দেওয়া সে সময়ে রেওয়াজ-বহির্ভূত। কণ্ঠসংগীতের জগতে মেয়েরা এলেও তাদের কপালে জুটত ‘তওয়ায়েফ’ বা বারাঙ্গনার অভিধা। তার ওপর আলাউদ্দিন খাঁর সামনে কন্যা জাহানারার মর্মান্তিক দৃষ্টান্ত। জাহানারার বিয়ে হয়েছিল ঢাকার এক গোঁড়া মুসলিম পরিবারে। হলেনই বা আলাউদ্দিন-কন্যা! হিন্দু দেবতার নামে ভজন গাওয়ার অপরাধে তাঁর ওপর নেমে আসে শ্বশুরবাড়ির অকথ্য অত্যাচার। তানপুরা নষ্ট করা, অন্ধকার ঘরে বন্ধ করে রাখা… শেষতক সহ্য করতে না পেরে অসুস্থ দুর্বল শরীরে মাইহারে ফিরে এসেছিলেন জাহানারা। তখন অনেকটা দেরি হয়ে গেছে। বাবা-মায়ের স্নেহচ্ছায়াও মৃত্যুদূতকে ঠেকিয়ে রাখতে পারল না।
জাহানারার দুর্ভাগ্য যাতে পুনরাবৃত্ত না হয়, আলাউদ্দিন তাই সংগীতচর্চা থেকে দূরে দূরেই রেখেছিলেন আদরের মেয়ে অন্নপূর্ণাকে। কেবল ছেলে আলি আকবরকে বাজনা শেখাতেই নিয়োজিত করেছিলেন সমগ্র মনপ্রাণ। তবে রক্তে যাঁর সংগীতের অমোঘ টান, তাঁকে কি সুর থেকে বেশিদিন দূরে রাখা যায়?
বাবার কাছে সরোদ শেখার সময়ে শিশুসুলভ দুরন্তপনায় অমনোযোগী হতেন আলি আকবর। সুর ভুল করলে মেজাজ হারাতেন বাবা। কখনও সখনও রেগেমেগে উঠে চলেও যেতেন। তখন দাদার উদ্ধারকর্ত্রী হতেন বোন অন্নপূর্ণা। বাতলে দিতেন সুর তোলার সঠিক উপায়। বাবার দাদাকে শেখানোর সময়ে পাশ দিয়ে যেতে যেতে বা দরজার আড়ালে থেকে আগেই সুর তুলে নিয়েছেন যে তিনি!
একদিন, যখন দাদাকে দেখিয়ে দিচ্ছেন সুর-স্বরের গতিবিধি, সেই মোক্ষম মুহূর্তে মেয়ের গান শুনে ফেললেন আলাউদ্দিন খাঁ। খাঁটি জহুরি আলাউদ্দিন বোঝেন এই বিরল প্রতিভাকে সংগীতস্পর্শ থেকে সরিয়ে রাখা অন্যায়ের নামান্তর। সেদিন থেকেই সিদ্ধান্ত নিলেন নিজের সংগীতবৈভব উজাড় করে দেবেন কনিষ্ঠা কন্যাকে। ‘বাবা’ আলাউদ্দিনের কাছে শুরু হল অন্নপূর্ণার সংগীতশিক্ষা। অসামান্য দক্ষতায় সেই ঐশ্বর্যকে কণ্ঠ আর দুই-হাত ভরে গ্রহণ করতে থাকলেন তরুণী অন্নপূর্ণা।
নানা সংস্কার আর বিধিনিষেধের বেড়ায় ঘেরা পিতৃতান্ত্রিক সমাজ। তারই মধ্যে চলতে থাকে অন্নপূর্ণার অনুশীলন। মাইহারের বাতাসে ভেসে বেড়ায় প্রাচীন আমলের কত কিস্সা-কাহিনি। কতটা তার সত্যি, কতটাই বা কল্পনা, কে জানে? একবার আলাউদ্দিন বাইরে থেকে মাইহারে ফিরে এসে শুনলেন বাড়িতে নাকি ভূতের উপদ্রব হয়েছে। সন্ধে থেকে হাওয়া না থাকতেও ঝড়ের বেগে দুলে উঠছে পিপুল গাছ। দাসী থেকে মদিনা বেগম সকলেই সাক্ষী সেই ভূতুড়ে কার্যকলাপের। পরে আলাউদ্দিন জানতে পারলেন, সন্ধের দিক থেকে রাত অবধি সাত-আটঘণ্টা টানা মালকোষ অভ্যেস করছেন অন্নপূর্ণা। বারণ করলেন সন্ধের দিকে একটানা মালকোষ গাইতে। মালকোষের বিশুদ্ধ রূপ নাকি অপদেবতাদের উত্তেজিত করে। এদিকে মালকোষ যে তাঁর মেয়ের প্রিয় রাগ! তাই বিকল্প হিসেবে আলাউদ্দিন ভৈরব আর মালকোষ মিশিয়ে তৈরি করলেন কৌশী মালকোষ।
এরপর ১৯৩৮ সালে মাইহারের নির্জন পরিবেশে একঝলক নতুন বাতাসের মতো এসে পড়েছিলেন বিশ্বখ্যাত উদয়শঙ্করের আত্মীয় রবি, তখনও তাঁর দেরি আছে ‘পণ্ডিত রবিশঙ্কর’ হতে। উদ্দেশ্য—বাবা আলাউদ্দিনের কাছে সংগীতশিক্ষা। উদয়শঙ্করের সঙ্গে ১৯৩৬-এ ইউরোপ সফরে যাওয়ার ফলে ইতিপূর্বেই পরিচয় ছিল রবিশঙ্কর এবং আলাউদ্দিনের। শুধু পরিচয় নয়, বাবা আলাউদ্দিনের বিশেষ স্নেহের অধিকারীও ছিলেন তিনি। পরে ১৯৪১-এ সেই পারিবারিক পরিচয় গড়াল রবিশঙ্কর-অন্নপূর্ণার পরিণয়ে। ১৯৪২-এ জন্ম নিল পুত্র শুভেন্দ্রশঙ্কর।
যুগলবন্দী থেকে একক: আরোহ-অবরোহ
সংগীতজগতে এই তারকাদম্পতির বিচ্ছেদকথা তো বহু-আলোচিত এবং বহু-চর্চিত, যদিও নিজের জীবনের ট্র্যাজেডিকে একান্ত ব্যক্তিগত বলয়েই রাখতে চেয়েছিলেন অন্নপূর্ণা দেবী। মুখরোচক চর্চা ও আলোচনার বিষয় করে তুলতে চাননি। কিন্তু দিল্লি-মুম্বাই যাওয়ার আগে, মাইহারের দিনগুলিতেই কি লুকিয়ে ছিল তাঁদের মনোমালিন্যের প্রায়-অদৃশ্য বীজ? কেবল পুরুষ বলেই কি অন্নপূর্ণার শ্রেষ্ঠতা মেনে নিতে অপারগ ছিলেন রবিশঙ্কর?
এই প্রসঙ্গে একটি গল্পের কথা স্মরণ করা যায়। আলাউদ্দিন সভাশিল্পী ছিলেন যে মাইহার-রাজের, মুসলিম প্রথা অনুযায়ী রাখা নাম ‘রোশেনারা’ বদলে গিয়ে অন্নপূর্ণা ‘অন্নপূর্ণা’ হয়ে ওঠেন যাঁর কল্যাণে, সেই ব্রিজনাথ একবার অন্নপূর্ণা দেবীর সুরবাহার শুনতে চেয়েছিলেন তাঁর বিবাহোত্তীর্ণ সময়ে। মহারাজের অনুরোধ উপেক্ষা করা আলাউদ্দিনের পক্ষে সম্ভব ছিল না। অন্নপূর্ণা দেবীর বাজানো শুনে মুগ্ধ হন মহারাজ এবং তাঁকে বহু যৌতুকে ভূষিত করতে চান। এরপর পণ্ডিত রবিশঙ্কর তাঁকে নিজের বাজনা শোনাতে চাইলে, ব্রিজনাথ নারাজ হননি বটে, কিন্তু নৈশভোজের সময় হয়ে যাওয়ায় রাগ-বিস্তারের মাঝখান থেকেই উঠে যান। এই ঘটনার ক্ষোভ নাকি বেশ অনেকদিন পুষে রেখেছিলেন রবিশঙ্কর।
অন্নপূর্ণা-জীবনীর এর পরবর্তী অধ্যায়টি তুলনামূলকভাবে বেশি আলোচিত। রবিশঙ্কর ১৯৪৯ থেকে ১৯৫৬ পর্যন্ত অল ইন্ডিয়া রেডিও-র সংগীত পরিচালকের কাজ করেছিলেন। সেই সূত্রে দিল্লিতেও কিছুদিনের জন্য সংসার পেতেছিলেন অন্নপূর্ণা। এই সময়পর্বেই রবিশঙ্করের সঙ্গে যৌথভাবে কয়েকটি আসরে ও অনুষ্ঠানে বাজিয়েছিলেন তিনি। বাজিয়েছেন শ্রী, ইমন-কল্যাণ, কোশী কানাড়া, মাঝ খামাজ প্রভৃতি রাগ। যুগল-পরিবেশনা বিষয়ে রবিশঙ্কর একটি সাক্ষাৎকারে বলেছেন,
বিয়ের পরে আমার সঙ্গে বাজাতে ওকে অনেক জোর করেছি। কিছু অনুষ্ঠানও করেছি আমরা, তবে এরপর থেকে সে আর একা অনুষ্ঠান করতে চাইতো না, আমার সঙ্গে বসেই বাজাতে চাইত। আমরা আলাদা হয়ে যাওয়ার পরে তো ও অনুষ্ঠান করাই ছেড়ে দিল। সে হয়তো দর্শকের সামনে যেতে চাইতো না বা বিচলিত হয়ে যেত। এটা খুব আফসোসের ব্যাপার, কারণ ও অসাধারণ একজন সুরস্রষ্টা।
যদিও রবিশঙ্কর তাঁকে অনবদ্য সংগীতকার হিসেবে মেনে নিয়েছেন; কিন্তু এই কথা অস্বীকার করার উপায় নেই অন্নপূর্ণার নির্ভুল, শুদ্ধ, একাগ্র পরিবেশন যশ-অভিলাষী রবিশঙ্করের অহংবোধকেও কোথাও নড়িয়ে দিয়েছিল। পণ্ডিত রবিশঙ্করের বাজানোর ভুল ধরার স্পর্ধা রাখতেন হয়তো এই একজনই। অন্নপূর্ণা দেবী পণ্ডিতজিকে নিছক ‘অ্যাডমায়ার’ না করে তাঁর প্রতিভাকে বিচারের ক্ষমতা রাখতেন বলেই কি তাঁকে অন্য কোনোখানে খুঁজে নিতে হল প্রেমের আশ্রয়? স্ত্রী-র প্রতিভা সম্পর্কে শ্রোতাদের উচ্ছ্বাসকেও জয়ের চেয়ে বেশি ‘পরাজয়’ বলেই হয়তো মনে করেছিলেন তিনি। এই পেশাগত ঈর্ষার কথা সরাসরি স্বীকার না করলেও রাগ-অনুরাগ বইতে তিনি পরোক্ষে জানিয়েছেন ‘অহমিকার সংঘর্ষ’-এর কথা—
আমার সেরকম মেয়েই তো খুব ভালো লাগে যার হয়তো সংগীতের চেতনা আছে, যে সুরের পাগল, সুর চেনে, কিন্তু সংগীতচর্চা করে না…। আমি মনে করি, স্বামী-স্ত্রী উভয়েই একই প্রোফেশনের লোক হলে তাদের সম্পর্কের মধ্যে তা একটা অন্তরায় গোছের হয়।… প্রায়ই একটা অহমিকার সংঘর্ষ ঘটতে পারে। আর বিশেষ করে যে জিনিসটার ওপর স্বামী এবং স্ত্রীর উভয়ের সম্মান নির্ভর করে, অর্থাৎ অ্যাড্মিরেশন, সেটা ক্রমশ কমে যেতে বাধ্য হয় যদি স্বামী-স্ত্রী একই শিল্পের চর্চা করেন।… স্বামী-স্ত্রী যদি উভয়েই উভয়ের শিল্পের এবং ক্ষমতার পুরোটাই বিচার করে দেখতে পারেন তাতে ওই অ্যাড্মিরেশন জিনিসটা মার খায়। ক্ষতিটা তাই ভালোবাসার। (রবিশঙ্কর ১৬৪)
আত্মজীবন-কথনে স্বামী-স্ত্রী উভয়ের দিক থেকেই রবিশঙ্কর এর ব্যাখ্যা দিলেও, উলটোটা হলে, অর্থাৎ স্বামীর প্রতিভা স্ত্রীকে ছাপিয়ে গেলে এ হেন সমস্যার উদ্রেক হত না বলেই মনে হয়। অবশ্য স্ত্রী-র যে কোনও দিক থেকে স্বামীর সমকক্ষ হয়ে ওঠাকে কবেই বা মেনে নিয়েছে পুরুষতান্ত্রিক সমাজ?
অন্নপূর্ণা দেবী মঞ্চে কোনও রাগ বাজানোর মুহূর্তে কোনও তাৎক্ষণিক চমক বা improvisation-এর পরিবর্তে তার বিশুদ্ধ রূপটিই তুলে ধরতে চেয়েছেন বরাবর। যে রূপ অবিকৃত। অবিক্রীতও বটে। সুরকে ব্যবসার পণ্য করে তুলতে তিনি নারাজ। অন্যদিকে সংগীত নিয়ে নানা নিরীক্ষায় আগ্রহী পণ্ডিত রবিশঙ্কর। প্রাচ্য আর প্রতীচ্যের সংগীত ঘরানাকে তিনি বেঁধে নিতে চান একই সূত্রে। শুধু তো একলা বসে বাজানো নয়, তানকারী-লয়কারী দিয়ে শ্রোতাদের মন জয় করে নেওয়াও তাঁর অন্যতম অভীষ্ট। সংগীতপ্রীতি তো বটেই, সঙ্গে পার্থিব খ্যাতির মোহও তাঁকে ছুটিয়ে নিয়ে বেড়িয়েছে পৃথিবীর এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে। এসেছে বৈদেশিক স্বীকৃতি, একের পর এক কনসার্ট, পুরস্কার। আর এই আলোকবৃত্ত থেকেই দূরে থাকতে চেয়েছেন স্বভাব-অন্তর্মুখী অন্নপূর্ণা। শ্রোতাদের পরিবর্তিত রুচির সঙ্গে আপস করে নিজেকে নামানোর চেয়ে, শ্রোতাদেরকেই তাঁর স্তরে উন্নীত করতে চেয়েছেন। লঘু অলংকারের প্রগল্ভতার চেয়ে বেছে নিয়েছেন মীড়ের গাম্ভীর্য। সংগীতে, জীবনেও। বাবা আলাউদ্দিনও তাঁর এই কন্যা তথা শিষ্যার জন্য নির্বাচন করেছিলেন এমন এক যন্ত্র যার গম্ভীর, মন্দ্রস্বর খুব সহজ বা চটজলদি উপায়ে শ্রোতাদের টেনে নিতে পারে না। বরং অপেক্ষা রাখে নিবিড় অভিনিবেশের। অন্নপূর্ণাও তাঁর সংগীতসাধনায় কোনো ফাঁকি রাখতে চাননি। তাই পণ্ডিতজি ও অন্নপূর্ণার চলার পথ একসময়ে ভিন্ন হয়ে গেল। আগে হোক বা পরে, যা একপ্রকার অবশ্যম্ভাবী ছিল। দুজনের মন ছিল ভিন্ন তারে বাঁধা।
অথচ দিল্লিতে কঠিন অসুখের সংক্রমণের সময়ে এই পণ্ডিতজিকেই নিঃস্বার্থ প্রেমে সেবা করেছেন অন্নপূর্ণা। আরোগ্যের দিনগুলিতে রবিশঙ্করের সংগীত-স্মৃতি ফিরিয়ে আনতে সুরবাহার ছেড়ে সেতার ধরেছেন। আর বিচ্ছেদ কি কেবল সঙ্গীর থেকে? বড়ো হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুত্র শুভেন্দ্রও তো ক্রমশ দূরে সরছিল মায়ের থেকে। গানের জগৎ থেকে কমার্শিয়াল আর্টের জগতে তার প্রবেশ মেনে নিতে পারেননি আজীবন সুরের সাধিকা জননী অন্নপূর্ণা। ভাগ্যের প্রহসনই বলা চলে, নিষ্ঠুর মৃত্যু শুভেন্দ্রও কেড়ে নিল অন্নপূর্ণার দেবীর কাছ থেকে।
বিজন ঘরে…
ততদিনে শূন্যতার সঙ্গে ঘর করে বোধহয় অভ্যস্ত হয়ে গেছেন সুরবাহার-সম্রাজ্ঞী। মাইহারের সেই সহজ আবেগপ্রবণ কিশোরীটি তো আর নেই তিনি। রিক্ততাকে কীভাবে ভূষণ করে তুলতে হয়, সেই গত ততদিনে আয়ত্ত করে ফেলেছেন। জীবনের কঠিন পথ আর একাগ্র সংগীতসাধনাই তাঁকে দিয়েছে এই সম্পদ। বিচ্ছেদ-পরবর্তীকালে তাঁর জীবনসঙ্গী হলেন তাঁরই শিষ্য রুশিকুমার পাণ্ড্য, যিনি ছিলেন একাধারে অধ্যাপক ও সংগীতসাধক। কিন্তু স্বামীবিচ্ছিন্ন কোনো অসহায় নারীর আর্তি বা দীনতা নিয়ে তাঁকে আঁকড়ে ধরেননি অন্নপূর্ণা দেবী। বরং রুশিকুমারের বহুদিনের গবেষণা, খ্যাতি, প্রতিষ্ঠাকে অনায়াসে উড়িয়ে দিয়ে বলতে পেরেছেন “বক্তৃতা করা আসান, কিন্তু বাজনা বহুৎ মুশকিল কাম, বুঝলেন?” (বন্দ্যোপাধ্যায়, “অন্নপূর্ণা” ২০৭)
তাঁদের দাম্পত্যে তথাকথিত সামাজিক আনুগত্যের ছাঁচ ছিল না। যৌথজীবন গড়ে উঠছিল পারস্পরিক মর্যাদাবোধের এক বিরল সমীকরণে। গুরু হিসেবে রুশিকুমারের অহং ভেঙেছেন অন্নপূর্ণা দেবী, কিন্তু অন্য কারও সাহায্য দাক্ষিণ্যের আকারে এলে তা গ্রহণ করতে প্রস্তুত ছিলেন না এই প্রখর ব্যক্তিত্বময়ী রমণী। আর রুশিকুমারও পরম মমতায় রক্ষা করেছেন এই সংগীত-সম্রাজ্ঞীর নিভৃতচারিতা ও স্বাতন্ত্র্য। অন্নপূর্ণার একক যাপনকে সযত্নে আগলে রেখেছেন বাইরের জগতের আগ্রাসন থেকে। বাইরের জগতের সঙ্গে অন্নপূর্ণা দেবীর সংযোগের একমাত্র বিশ্বস্ত সেতুও ছিলেন তিনিই।
সংগীত-শিক্ষক
অন্নপূর্ণা দেবীর কাছে সংগীত আনন্দের এমন এক অ-লৌকিক উৎসার, যেখানে কোনও লৌকিক লেনদেন চলে না। তাই সংগীতশিক্ষা দিয়ে গুরুদক্ষিণা আদায়েও তাঁর ঘোরতর অনীহা। বিচ্ছেদের পর একসময়ে রবিশঙ্করের পাঠানো টাকা অনিয়মিত হয়েছে, তবু শিষ্যদের থেকে অর্থ নিতে চাননি। পরে বোম্বাইয়ের ‘ন্যাশনাল কলেজ অফ পারফর্মিং আর্টস’-এর ‘মাস্টার্স ক্লাসে’ শেখানোর জন্য অবশ্য পাঁচশো টাকা সাম্মানিক পেতেন তিনি।
সংগীত-শিক্ষক হিসেবে বিদুষী অন্নপূর্ণা ছিলেন কঠোর, শৃঙ্খলাপরায়ণ, আপোসহীন। নিখুঁত, নির্ভুল সুর শেখানোর সংকল্পে এমনই অটল যে ছাত্রকে একটিমাত্র রাগ আয়ত্ত করাতে মাসের পর মাস কাটিয়ে দিতে দ্বিধা করেননি। পণ্ডিত হরিপ্রসাদ চৌরাসিয়া তাঁর কাছে শিখেছেন দুটি মাত্র রাগ, ইমন আর ভৈরবী। শুধু তাই নয়, শিখিয়েছিলেন নতুন করে শিখতে শুরু করার আগে কীভাবে আগের সংস্কার ত্যাগ করতে হয়, আজকের পরিভাষায় যাকে বলে ‘আনলার্ন’ করা। ডান হাতি হরিপ্রসাদ চৌরাসিয়া তাঁরই নির্দেশে বাঁ হাতে বাঁশি ধরেছিলেন। অন্নপূর্ণাকে “embodiment of knowledge, compassion and abundance” (Jataayu, Foreword) বলে উল্লেখ করেছিলেন তাঁর এই শিষ্য। রবিশঙ্করের মতো আন্তর্জাতিক খ্যাতি হয়তো পাননি অন্নপূর্ণা, কিন্তু তাঁর পদতলে বসে শিক্ষা নিয়েছেন সংগীতজগতের কিংবদন্তীরা। কী ঐশ্বর্যময় সে নামের তালিকা! সেতারে পণ্ডিত নিখিল বন্দ্যোপাধ্যায়, সুধীর ফাড়কে, হীরেন রায়, সুব্রত রায়চৌধুরী, শুভেন্দ্রশঙ্কর, রুশিকুমার পাণ্ড্য, বাঁশিতে পণ্ডিত চৌরাসিয়া ও নিত্যানন্দ হলদিপুর, সরোদে অমিত ভট্টাচার্য, উস্তাদ বাহাদুর খাঁ, প্রদীপ বরোট, সুরবাহারে সাসিয়া কাফেলে, বাসন্তী রায়—আরও কত শিল্পী! আর প্রত্যেকের ক্ষেত্রেই দুষ্কর তপস্যার পথপ্রদর্শক হয়ে ছিলেন তাঁদের ‘মা’, মা অন্নপূর্ণা—
অন্নপূর্ণার রিয়াজ মানে কঠোর অনুশাসন। মূর্চ্ছনা এর প্রধান অঙ্গ। তিন সপ্তক ধরে সরগম আর বাঁ হাত চলবে। লয় বাড়বে ক্রমে। এরই মধ্যে গমক ঘষিট প্রভৃতি অলঙ্কারের প্রয়োগ চলবে। বাঁ হাতের মধ্যমা আর তর্জনীর ক্ষতমুখ যত বড় হতে থাকবে ততই যেন সুখের হবে। সুরবাহারে মোটা তার ব্যবহার হয়। একটা পর্দা থেকে পাঁচ স্বরের মীড় টানতে হয়। সেই মীড়েও বিভিন্ন অলঙ্করণ থাকে। সেতারে মধ্য সপ্তকে তবু পাঁচ স্বরের মীড় টানা যায়, তবে সে বেশ শক্ত। হাতে প্রচণ্ড জোর লাগে। যেমন রেখাব থেকে ধৈবত টানা, চাঁচাছোলা মীড়। সেতারে মধ্য সপ্তকে তবুও চেষ্টা চালানো যায়, কিন্তু মন্দ্র সপ্তকে সেতারের একেবারে মাথায় প্রথম পর্দায় কড়ি মধ্যম থেকে ষড়জ টানা বেশ কঠিন কাজ। হাত ওপরে ওঠে, ওই উঁচুতে আঙুল জায়গা পায় কম। তবু এই মীড়ের কাজ, অনুশীলনই রিয়াজের মুখ্য উদ্দেশ্য অন্নপূর্ণার কাছে। আর মীড় মানে চটুল অলঙ্কার নয়, বেশ ভারি গম্ভীর, এমন এক আওয়াজ যার মধ্যে হাই সিরিয়াসনেস্ আছে। তাই অনেকে অন্নপূর্ণার তালিমকে সুরবাহার অঙ্গের সেতার বাজানো বলেছেন। (বন্দ্যোপাধ্যায়, “অন্নপূর্ণা” ২০৪)
এভাবেই ছাত্রদের মাইহার-সেনিয়া ঘরানার খুঁটিনাটি অন্নপূর্ণা শিখিয়েছেন অতন্দ্র নিষ্ঠায়। শিখিয়েছেন রাগের আলাপ অংশকে বিস্তৃত, অনুপম আর হৃদয়গ্রাহী করে তুলতে। বাঁশিতে সচরাচর ‘জোড়’ বা ‘ঝালা’ বাজানোর রীতি ছিল না, এগুলি কেবল তারযন্ত্রেরই স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য। কিন্তু বাঁশিতেও পণ্ডিত চৌরাসিয়াকে ‘জোড়’ ও ‘ঝালা’ বাজাতে উৎসাহিত করেন গুরু-মা অন্নপূর্ণা। নিজের কলমেই সেই স্মৃতির পুনরুদ্ধার করেছেন তিনি—
Ma has taught me everything I know, nurtured me with selfless care and affection, without expecting anything in return except hard work…. this great initiation into the world of music seems like such a plunge into a deep, unfathomable ocean. (Jataayu, Foreword)
ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ তটরেখা নয়, অন্নপূর্ণা দেবীর জীবন আর সংগীত যেন সেই মাঝসমুদ্রের অতলান্ত স্থিরতা। সময়ের সঙ্গে আরও আত্মস্থ, নিমগ্ন হয়েছেন তিনি। নিঃশর্তে নিজেকে সমর্পণ করেছেন সুরের কাছে। একসময়ে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে তাঁর আন্তরিক সুসম্পর্ক ছিল। কিন্তু তাঁর অনুরোধেও নিজের আড়াল ভেঙে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বেহালা-বাদক ইহুদি মেনুহিনের সামনে বাজাতে রাজি হননি। অবশেষে রাতের আঁধারে অন্নপূর্ণা দেবীর রেওয়াজের সময়ে দরজার আড়াল থেকে শোনার অনুমতি পেয়েছিলেন মেনুহিন। যদিও, মেনুহিন ঘটনাচক্রে উপস্থিত থাকতে পারেননি। উপস্থিত ছিলেন বিটলসের জর্জ হ্যারিসন। তিনিই একমাত্র বিদেশি সংগীতব্যক্তিত্ব যিনি অন্নপূর্ণা দেবীর বাজনা এইভাবে শোনার সৌভাগ্য লাভ করেন।
বাবা আলাউদ্দিন কন্যাকে বারবার বলতেন “মন দিয়ে শেখো মা, এই সংগীত আমাদের সব দুঃখ-কষ্ট সারিয়ে তোলে।” (চক্রবর্তী, “যে সংগীত”) সেই কথাকে আজীবনের পাথেয় করেছিলেন অন্নপূর্ণা। সঙ্গী রুশিকুমার বাইরে বক্তৃতা করেছেন ‘স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট’, ‘রিলাক্সেশন টেকনিক’ নিয়ে, কিন্তু এসব পোশাকি পরিভাষা থেকে বরাবর দূরেই থেকেছেন তাঁর স্ত্রী। যাবতীয় ঝড়-ঝাপটায় শক্তি খুঁজেছেন কেবল নিজের কাছে, সংগীতের কাছে।
অন্নপূর্ণা জেদি। অন্নপূর্ণা একরোখা, একনিষ্ঠ। সুরই ছিল তাঁর একমাত্র আরোগ্য, শুশ্রূষা ও নিরাময়। মীড় আর স্বরের ওঠাপড়াতেই তাঁর মুক্তি। পরিণয়ের সময়ে স্বেচ্ছা-নির্বাচনের সুযোগ তিনি পাননি ঠিকই, কিন্তু পরিস্থিতির কাছে হার না মেনেই জনসমক্ষ থেকে দূরে গেছেন। নারী হিসেবে সে তাঁর দুর্বলতা নয়, স্ব-নির্বাচন। আপন দুর্ভাগ্য জয় করার মৌলিক তরিকা। অন্ধকারে সেই-ই তাঁর একলা চলার পথ। লোকে তাঁকে ‘দুর্ভেদ্য, রহস্যময়ী’ বলেছে। ‘রুক্ষ, বদমেজাজি’ তকমাও জুটেছে কখনও সখনও। অথচ সেই কঠিন বর্মের অন্তরালে বয়ে গেছে স্নেহের ফল্গুধারা। প্রেমের উৎসার। যে প্রেম অপার্থিব। ঐশ্বরিক। সে কেবল নতজানু হয় সুরের কাছে। আর কিছুরই পরোয়া করে না। জীবন একের পর এক পরীক্ষার মুখোমুখি এনেছে তাঁকে। তবু আমৃত্যু ‘দুঃখদিনের রক্তকমল’ সংগীতের পায়েই সঁপে দিয়ে নিরুচ্চারে আত্মদীপ হয়ে জ্বলেছেন বিদুষী অন্নপূর্ণা—সুরের সরস্বতী।
Dr. Srijita Sanyal
Research Assistant
School of Cultural Text and Records
Jadavpur University
গ্রন্থপঞ্জি:
রবিশঙ্কর. রাগ-অনুরাগ. শংকরলাল ভট্টাচার্য অনুলিখিত, আনন্দ, ১৯৮০.
বন্দ্যোপাধ্যায়, স্বপনকুমার. “অন্নপূর্ণা.” শারদীয় দেশ, ১৪০৪ বঙ্গাব্দ, পৃ. ১৭১-২১৬.
চক্রবর্তী, শ্রীদর্শিনী. “যে সংগীত দুঃখ সারায়, সেই সংগীতের আরাধনা করেছিলেন অন্নপূর্ণা দেবী.” রোববার.ইন, ৬ সেপ্টেম্বর ২০০৬. (https://robbar.in/daily-update/an-article-about-annapurna-devi-on-her-birth-anniversary/pid/10608/)
Jataayu, Atul Merchant. Annapurna Devi: The Untold Story of a Reclusive Genius. Penguin, 2021.
Bandyopadhyay, Swapan Kumar. An Unheard Melody: Annapurna Devi, An Authorised Biography. Roli Books, 2005.
Links
- https://annapurna-devi.org/biography-annapurna-devi/
- https://www.theguardian.com/music/2018/oct/22/annapurna-devi-obituary
- https://www.npr.org/2018/10/23/659786993/annapurna-devi-poised-star-surbahar-spent-60-years-her-apartment
- https://timesofindia.indiatimes.com/city/kolkata/Every-Note-Annapurna-Devi-Plays-Is-Like-An-Offering-Rooshikumar-Pandya/articleshow/41890785.cms
- https://archive.roar.media/bangla/main/biography/annapurna-devi-story-of-a-music-legend
- https://www.mansworldindia.com/lifestyle/people/annapurna-devi-the-tragedy-and-triumph-of-ravi-shankars-first-wife
- https://robbar.in/daily-update/an-article-about-annapurna-devi-on-her-birth-anniversary/pid/10608/
