ভালোবাসার মোড়কে এড়িয়ে যাওয়া দায় এবং পিতৃতন্ত্র – তিন ভারতীয় ছবি – দেবাদৃতা
থাপ্পাড় সে ডর নেহি লাগতা সাহেব, প্যার সে ডর লগতা হেয়
সমস্ত না এর মধ্যে লুকিয়ে থাকা হ্যাঁ কে টেনে হিঁচড়ে বের করে আনার যে প্রয়াশ এবং সমস্ত মেয়েদের হ্যাঁ বা না এর তোয়াক্কা না করেই একেবারে তুলে নিয়ে গিয়ে মন্ডপে বসিয়ে দেওয়ার যে চূড়ান্ত হিরোগিরি এবং ভালবাসি ভাব, তার বাইরে ক্রমশ তৈরি হয়েছে অন্য ন্যারেটিভ। শুধু দৃশ্যমান ভায়োলেন্স নয়, অতি অদৃশ্য গ্যাসলাইট – তুমি যা ভাবছ, আসলে সেরকম কিছুই নয় সোনা বা একটা ছোট্ট, সামান্য দায় স্বীকার যা পাঁচ বছরেও আসেনা, দশ, পনের – আসে আর না – সেই সমস্ত নিয়েও কথা বলার সময় এবং প্রয়োজন হয়েছে।
কিছু স্মৃতি কখনোই শুধু গল্প হয় না। পুরো গল্প হয় না। তাদের শুরু নেই, শেষও নেই। হঠাৎ কোনো গন্ধ, কোনো শব্দ, কোনো আলোয় আলোয়ে, অথবা বহু পরিচিত কোন এক রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ফিরে আসে তারা। মনে হয়, এই তো, এই মুহূর্তই তো আগেই যেন বেঁচে থাকা হয়ে গেছে । যদিও ঠিক কোথায়, কখন, কার সাথে—সব মনে পড়ে না কিছুতেই। ধোঁয়াশা থাকে – স্মৃতি আমার না আমাদের, জীবনের নাকি কোন পূর্বজীবনের। শুধু শরীর সমস্ত মনে রেখে দেয়, শরীরের খাঁজে চাপা থাকে সব, স্মৃতি বা ইতিহাস। ভালোবাসা অথবা অপমান। ভালোবাসার মোড়কে করে আসা আর যা কিছু ঠিক ভালোবাসা নয় – শরীর সমস্ত কিছু জমিয়ে রাখে। তার একটা নিজস্ব খাতা আছে, সেখানে কোনো পৃষ্ঠা ছেঁড়া যায় না। ছিঁড়ে বাতিল করা যায় না।
স্মৃতির সঙ্গে সিনেমার সম্পর্কটা হয়ত এই কারণে এত জটিল। সিনেমা অনেক সময় আমাদের এমন কোনো অভিজ্ঞতার নাম দেয়, যার নাম আমরা নিজেরা কখনও রাখিনি। ঠিক এই কথা মনে হয় Soni দেখতে বসে।
Ivan Ayr-এর Soni খুব সহজে “নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা”র ছবি হয়ে থেকে যেতে পারত। কিন্তু ছবি সেই সহজ পথে যায় না। সে বড় কোনো ঘটনা তৈরি করে আমাদের কাঁদায় না। বরং দিল্লির মত একটা শহুরে, প্রায় নির্লিপ্ত দৈনন্দিনতার মধ্যে আমাদের আটকে দেয়। সোনি একজন পুলিশ অফিসার, যার রাতের ডিউটি, নারীদের বিরুদ্ধে অপরাধ ঠেকাতে ডিকয় অপারেশন, তার শরীর এমন এক পেশায় আছে যেখানে ভায়লেন্স তার কাজের অংশ, অথচ একই শরীরকে রাস্তায় পুরুষের হিংসার মুখোমুখি হতে হয়। এই বৈপরীত্যই ছবির ভিতরের সবচেয়ে শক্তিশালী আইরনি।
এবং এই বৈপরীত্য দেখাতে খুব সচেতনভাবে ক্যামেরাকে প্রদর্শক হতে দেননি পরিচালক। ছবির অধিকাংশ দৃশ্য একজন নীরব সাক্ষীর মতো থেকে গেছে David Bolen-এর ক্যামেরা। এই সংযমের কথা একাধিক সমালোচনাতেও উঠে এসেছে; দৃশ্যগুলো এমনভাবে চলতে থাকে যে ক্যামেরা যেন ঘটনার মধ্যে হস্তক্ষেপ করছে না, তার কোন দায় নেই সে শুধু আমাদের আটকে রাখছে দৃশ্যের ভেতর। আমরা সাধারণত ভায়োলেন্স দেখতে অভ্যস্ত তার নাটকীয়তায় । চিৎকার, বিজিএম, ক্লোজ আপ, কাট, রিএকশন শট। সোনি সেসব কিছুই খুব বেশি করে না। ফলত হ্যারাসমেন্টও যেন যথাযথ দৃশ্যমান হয়ে ওঠে না। সে ঠিক যেমনভাবে ঘটে—হঠাৎ, আকস্মিক, কখনও হাস্যকর, , এততাই সাধারণ যে প্রতিবাদ করাটাই যেন বাড়াবাড়ি মনে হতে পারে—সেভাবেই থেকে যায়। ঠিক যেভাবে এক একটা সম্পর্কের মাঝে সুপ্ত নিয়ন্ত্রণ কাজ করে, প্রায় নামহীন, দৃশ্যহীন এমনকি অধিকাংশ ক্ষেত্রে সামাজিক হয়ে থেকে যায়, ক্যামেরা এখানে সেই নিয়ন্ত্রনের মতই নিঃস্পৃহ, তার সাথে সাথে হ্যারাসমেন্ট যেন দৈনন্দিন, স্বাভাবিক এমনকি সহজ।
সোনির রাগও তাই ছবির কাছে কোনো সহজ নারীবাদী বিরত্বের ব্যাপার নয়। সে রেগে যায়, ভুল করে, নিয়ম ভাঙে, কখনও নিজের রাগ সে নিজেই সামলাতে পারে না। তার সিনিয়র তাকে বারবার সাবধান করতে চায়। কিন্তু একই সঙ্গে তার সিনিওর নিজেও এমন এক ব্যবস্থার মধ্যে কাজ করে যেখানে সংবেদনশীলতা এবং শৃঙ্খলার মধ্যেকার সরু সুতোর ওপর তার চলাফেরা। এর মধ্যে তাকে প্রতিদিন মানিয়ে চলতে হয়। ছবিতে দুই নারীকেও একে অপরের আয়না বানানো হয় না কখনও। সোনি আবেগপ্রবণ হলে কল্পনা অনেকটাই প্রাতিষ্ঠানিক l. একজনের শরীর আগে কথা বলে করে, অন্যজনের মাথা ।
আর এইখানেই পুরুষের দায় নেওয়ার প্রশ্নটা একটু অন্যরকম হয়ে ওঠে। কারণ Soni দেখায় না যে পুরুষ কী করে। সে দেখায়, পুরুষের আচরণকে সামলানোর দায় ঠিক কার ওপর বর্তায়। পুরুষ হ্যারাস করলে মেয়েদের সাবধান হতে হয়। পুরুষ সীমা অতিক্রম করলে মেয়দের নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। যেন এন্টাইটেল্মেন্ট-এর সবচেয়ে অদৃশ্য রূপ: পুরুষের আচরণ ঘটনমাত্র, নারীর প্রতিক্রিয়া হল সমস্যার।
Soni-র একটা অসাধারণ দিক হল তার স্পেসের-এর ব্যবহার। বাড়ি, পুলিশ স্টেশন, রাস্তাঘাট ক্রমাগত চরিত্রগুলোর ওপর চাপ তৈরি করে। NDTV-র সমালোচনাতেও ছবির এই চারটি principal space-এর কথা বলা হয়েছে—দুজন নারীর বাড়ি, রাস্তা এবং পুলিশ স্টেশন—যেগুলো মিলে তাদের ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনের ছন্দ তৈরি করে। আইরনি হল স্পেসের ব্যাবহার- সেই স্পেস যার খুব অভাব দেখা যায় অধিকাংশ মেয়েদের জীবনে । তারপর সেই রাতের হাঁটা। নির্মাণাধীন মেট্রোর ব্যারিকেডে রাস্তা সরু হয়ে এসেছে। সোনি হাঁটছে এবং রাতের সেই গলিতে তার শরীরে অস্বস্তি । নারী যে পাবলিক স্পেস ব্যবহার করে, সেই স্পেসও ক্রমাগত অদৃশ্য ব্যারিকেডে ভরা। কোথায় দাঁড়াবে, কতক্ষণ দাঁড়াবে, কার দিকে তাকাবে, কার দিকে তাকাবে না, রাতে কতটা হাঁটবে—সবকিছুর সঙ্গে একটা অদৃশ্য হিসাব ।
তারপর রাস্তা থেকে রান্নাঘর পৌঁছতে পৌঁছতে দেখা যায় ব্যারিকেড বদলে গেছে।
The Great Indian Kitchen এ Jeo Baby-র সবচেয়ে উজ্জ্বল সিদ্ধান্ত সম্ভবত এই যে রান্নাঘরকে ব্যাকড্রপ হিসেবে ব্যবহার করেননি। রান্নাঘর নিজেই হয়ে উঠেছে তার চালিকাশক্তি। নতুন বউ বাড়িতে আসে, এবং প্রথমদিকে খাবার দেখা যায়—রান্নার সৌন্দর্য দেখা যায়। কলা ভাজার চড়চড় শব্দ, মাছ, ঝোল, নানা খাবারের ক্লোজ আপ শট। যেন একটি খাদ্যকেন্দ্রিক ছবির শুরু । কিন্তু খুব অল্প সময়ের মধ্যে ক্যামেরা খাবার থেকে হাতের দিকে চলে যায়। কে রান্না করছে? কতক্ষণ করছে? সেই হাত কেমন?
এই হাতগুলোই ছবির আসল কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে।
একসময় যে রান্নার দৃশ্যগুলো নান্দনিক, পরবর্তীতে সেগুলোই বারবার হতে হতে যান্ত্রিক লাগে। ক্রমশ ক্লোজ আপ হতে হতে স্পেস হয় বিচ্যুত- এক রান্নাঘরের সিঙ্কের থেকে অন্য রান্নাঘরের সিঙ্কের পার্থক্য বোঝা যায় না। ক্রমশ ডিটেল মুছে যায়, ইরেজ হয়ে যায় আর সেই ইরেজ অংশের অংশ হয়ে যায় মেয়েদের পরিচয়। মেয়ে, বোন, বউ সমস্ত কিছুর আগে সে হয়ে ওঠে রান্নাঘরের একজন।
এখানে পুরুষেরা খুব গুরুত্বপূর্ণ কারণ তারা বসে থাকে, খায়, প্রত্যাশা করে এবং টেবিল ছেড়ে উঠে যায় নিজেদের খাওয়া হয়ে গেলে। পুরুষকে কাজ না করাকে কাজ হিসেবে ভাবতেই হয় না। তার শ্রমের অনুপস্থিতি দৃশ্যমান হয় না। কিন্তু নারী কাজ না করলে সেটা সঙ্গে সঙ্গে দৃশ্যমান হয়ে যায়।
নারীর অবর্তমানে একটা ঘর নোংরা থাকবে। খাবার হবে না। কাপড় পড়ে থাকবে। কেউ চা দেবে না।অর্থাৎ পুরুষের কাজ না করাটাই প্রিভিলেজ, কিন্তু প্রিভিলেজকে প্রিভিলেজ বলে বোঝা যায় না যতক্ষণ না অন্য কেউ তার দাম দিচ্ছে।
ছবির ড্রেন পাইপ তাই শুধু একটা নষ্ট পাইপ নয়। সেটা পরিবারের ভিতরের জমে থাকা অসন্তোষের একটা অসাধারণ মেটাফর। জল আটকে থাকে, ময়লা জমে থাকে, পাইপ দিয়ে দুর্গন্ধ আসে—কিন্তু সমস্যাটা সঙ্গে সঙ্গে ঠিক করা হয় না। বাড়ির পুরুষেরা সেটা দেখে, জানে, তবু সেটা নারীটির কাজের তালিকায় চলে যায়।
আর সেই গন্ধ। স্ত্রী নিজের হাতের গন্ধ শোঁকে। রান্নার গন্ধ, খাবারের গন্ধ, সিঙ্কের গন্ধ, ময়লার গন্ধ—সব মিশে গেছে। তার নিজের শরীর আর রান্নাঘরের শরীর যেন আলাদা নয়।
আর এইখানে শ্রম আর যৌনতা একে অপরের মধ্যে ঢুকে যায়।
যে রান্না করছে। যে রান্নাঘর পরিষ্কার করছে। সেই যৌনতার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। সে ফোরপ্লের কথা বলছে। একজন নারী সারাদিন অন্যের শরীর, অন্যের ক্ষুধা, অন্যের আরাম সামলানোর পর নিজের শরীরের আরামও যখন আলাদা করে চাইতে হয়, তখন বোঝা যায় বিবাহের ভিতরে labour আর desire কীভাবে গুলিয়ে গেছে। ছবিটি তাই রান্নাঘর ও বেডরুমের মধ্যে এই সংযোগ খুব সচেতনভাবে ব্যবহার করে।
এখানে পুরুষের এন্টাইটেল্মেন্ট আরেকটু সূক্ষ্ম। সে কখনও ভাবতেই পারে না যে অপরকে উপেক্ষা করা অথবা অপরের যৌন চাহিদাকে উড়িয়ে দেওয়ার মধ্যে অবহেলা বা অপমান আছে। বরং তার কাছে চাইতে গেলে সে বলে অভিযোগ, সে বলে আমি বনাম তুমি, সে বলে ধুর। তার কাছে এইভাবেই সংসার চলে। তাকে বোঝাতে গেলে তুমি তার পাশে না, উলটোদিকে, তার কাছে রাগ দেখালে সেই ভিক্তিম।
এই ছবির পুরুষ চরিত্ররা কোনো দানব নয়। কোনো সিনেমার মত ভিলেন নয়। এক একজন সাধারন পুরুষ, যে অতি সাধারনভাবে তার স্ত্রীর শ্রম এবং শরীরকে নিজের অধিকার মনে করে।
প্রেমের মোড়কে যখন এত ভয়ের কারন লুকিয়ে থাকে, গালের ওপর সরাসরি একটা চড় কেমন লাগবে ?
Anubhav Sinha একই এন্টাইটেল্মেন্টকে একেবারে অন্য visual language-এ ধরেন। Thappad-এর শুরুটা লক্ষ করলে বোঝা যায় ছবিটি ইচ্ছা করেই একটা সুখি দাম্পত্যের ভ্রম তৈরি করে। সকালের আলো, শহরের পরিষ্কার রাস্তা, বাড়ির রুটিন, বেড টি, ব্রেকফাস্ট, বরের অফিসে যাওয়া—সবকিছু যেন এত স্বাভাবিক যে কোনো দ্বন্ধ থাকার কথা নয়। বেশ আরামদায়ক একঘেয়েমি। সেই একঘেয়েমি ছবির সবথেকে বড় আইরনি হয়ে ওঠে।
কারণ বোঝা যায় অমৃতার জীবনটি কতটা নির্দিষ্ট। সে ঘর চালায়। বরের কেরিয়ার, প্রমোশন, ভবিষ্যতের স্বপ্ন আর সেই স্বপ্নের মধ্যে তার নিজের জায়গা ।
এমনকি তার নিজের একটা জীবন আছে—সে নাচ শেখায়, ছোট ছোট মানুষের জীবনের সঙ্গে যুক্ত, নিজের একটা রিদম আছে। কিন্তু বিবাহের ভিতরে সেই রিদম ধীরে ধীরে বরের অত বড় স্বপ্নের সাথে তাল মিলিয়েই তৈরি যেন।
তারপর পার্টি। বরের ক্রাইসিস। উত্তেজনা। তর্ক। চড় ।
এই চড়কে খুব বড় করে দেখান হয় না, কিন্তু তারপর সব বদলে যায়।
আশেপাশের মানুষ অবাক হয়ে যায়, “একটা চড়।”
এটাই আসলে ছবির বিরুদ্ধে থাকা সমাজের ভাষা। কারণ সকলেই এই ঘটনাকে ছোট এবং বিয়েকে বড় করে দেখতে চায়। The Great Indian Kitchen-এর মতই কেউ প্রকাশ্যে বলে না অধিকারের কথা। কিন্তু শ্রম অথবা শরীরের অধিকার বুঝে নেয় যথাযথ।
আর দুটো ক্ষেত্রেই সম্পকে থেকে পুরুষটির এন্টাইটেল্মেন্টকে জাস্টিফাই করা হয় ক্রমাগত।
“সে তোমার স্বামী, পরিবার, এত বছরের সম্পর্ক। একটা ভুল।” “একটা চড়।” “এত কিছুর পরও?”
এই “এত কিছুর পরও” আসলে মেয়েদেরকেই জিজ্ঞেস করা হয়। পুরুষকে নয়—
এই পার্থক্য হল দায় এরিয়ে যাওয়ার কেন্দ্র।
Thappad-এর visual world-ও তাই গুরুত্বপূর্ণ। ছবিটি ইচ্ছাকৃত সুন্দর। ঘর সুন্দর। বিছানা সুন্দর। সকালের চা সুন্দর। বর মানুষটা সুন্দর। বিয়ের ছবিগুলো সুন্দর। শুধু সেই সুন্দর ছবির ভিতর একজন মানুষ নিজের জায়গাটা একটু একটু করে হারিয়ে ফেলছে। এবং সম্ভবত এই কারণেই Thappad-এর সেই এক চড় এত বড় হয়ে ওঠে। কারণ চড়টি নতুন কোনো ভায়লেন্স তৈরি করে না। বরং আগে থেকে থাকা ভায়লেন্সকে দৃশ্যমান করে তুলছে।
Soni আমাদের দেখায় পাবলিক স্পেসে নারী কীভাবে ক্রমাগত মানিয়ে চলে। The Great Indian Kitchen দেখায় ব্যাক্তিগত পরিসরে সেই মানিয়ে নেওয়া কীভাবে শ্রমে পরিণত হয়। Thappad এ দেখতে পাই ইন্টিমেট স্পেস এবং ব্যাক্তির মালিকানা। কিন্তু আমি এদের এভাবে তিনটি ভাগে রাখতে চাই না। কারণ ছবিগুলোর আসল শক্তি বরং তাদের মিলমিশে ।
সোনির শরীর ঘরে ফিরে যায়। রান্নাঘরের পরিসরে মেয়েরা বাইরের পৃথিবীর নিয়ম মেনেই ঢোকে। অমৃতা একদিন নিজের চেনা পরিসরে নিজের স্পেস দাবি করে। পুরুষতান্ত্রিক এন্টাইটেল্মেন্টের কোন বাউন্ডারি হয় না। পথে, ঘাটে, বিছানায়, “ভালোবাসি” বলার ভঙ্গিতেও সে ঢুকে যেতে পারে এবং সবচেয়ে কঠিন জায়গাটা এখানেই—কারণ এন্টাইটেল্মেন্ট সবসময় নিষ্ঠুরতার মতো দেখতে হয় না। কখনও সে যত্নের পোশাক পরে আসে। কখনও মর্যাদার। কখনও প্রেমের। কখনও পরিবারের। কখনও বেচারা পুরুষের মহান ইগো, তার দাবি হয় নারিকে সমস্ত কিছু ছেড়ে সেই ইগোর সামনে দাঁড়িয়ে ভালোবাসার প্রমাণ দিতে হবে।
এর মধ্যে কিছু জিনিস হারিয়ে যায়।
ভালোবাসা মানে মালিকানা নয়। একটি সম্পর্কের দীর্ঘতা কন্সেন্টের বিকল্প নয়।
একবার ভালোবেসেছি বলে সে কারোর আবেগের প্রয়োজনে সারা জীবন হাজিরা দিতে বাধ্য নই। বিয়ের কাগজ আছে মানে আমার শরীর তোমার ব্যাক্তিগত মালিকানা নয়।
এই তিনটি ছবির মধ্যে আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জিনিস তাই “empowered woman” নয়। বরং একজন নারীর সেই মুহূর্ত, যখন সে নিজের অভিজ্ঞতাকে বিশ্বাস করতে শুরু করে।
সম্ভবত এই কারণেই এই তিনটি ছবিকে একসঙ্গে দেখতে এত ভালো লাগে। তারা সব পুরুষ একই রকম ভিলেন বানায় না। বরং কিছু অস্বস্তিকর প্রশ্ন রাখে। তারা দেখায়, এনটাইটেল্মেন্ট কীভাবে স্বাভাবিক হয়ে যায়। একজন পুরুষ খুব ভালো মানুষও হতেই পারে এবং একই সঙ্গে এমন একটি ব্যবস্থার সুবিধাভোগী হতে পারে যেখানে তার স্ত্রী তার থেকে অনেক বেশি পরিশ্রম করে। একজন মানুষ তার বউকে ভালোবাসতেও পারে এবং একই সঙ্গে মনে করতে পারে যে তার রাগের কায়িক প্রকাশের অধিকার আছে। একজন শহুরে শিক্ষিত পুরুষ হ্যারাসমেন্টের ব্যক্তিগতভাবে নিন্দা করেও এমন সামাজিক কাঠামোর অংশ হতে পারে যেখানে নারীর সুরক্ষার দায় তার একার । একবারও চিৎকার না করে, একবারও গায়ে হাত না তুলে একজন মানুষ তার সঙ্গীর সমস্ত মতামত, ইচ্ছা, পছন্দ অপছন্দ উপেক্ষা করে একটা জীবন কাতিয়ে দিতেই পারে।
এখানে কেউ চট করে ভিলেন হয় না। বরং প্রশ্নটা ভুলে যাওয়ার। পুরুষের প্রিভিলেজ তাকে ভুলে যেতে সাহাজ্য করে।
কে তার জন্য রান্না করল।
কে অপেক্ষা করল।
কে নিজের কাজ সরিয়ে রাখল।
কে তার রাগ দেখেও ছুপ করে থাকল।
মেয়েদের এই হিসাবগুলো অনেক সময় মনে রাখতে হয়। আর সেই memory-ই হয়তো একদিন resistance হয়ে ওঠে। তাই এই তিনটে ছবি শেষ পর্যন্ত তিন আলাদা মেয়ের গল্প নয়। এগুলো একই শরীরের তিনটি অবস্থান—রাস্তার শরীর, রান্নাঘরের শরীর, ভালোবাসার শরীর। আর একটাই প্রশ্ন
ভালোবাসা? নাকি তার মোড়কে নিয়ন্ত্রণের অধিকার?
