কোন কাননের ফুল – অলক রায় চৌধুরী
ভারতীয় ছায়াছবির উষাকালে হাতে গোনা কয়েকটি উদ্ভাসিত নাম। এঁদের মাঝখানে স্বতন্ত্রচিহ্নিত ছিলেন কানন দেবী। তাঁর সহজাত অভিনয়-দক্ষতা নিয়ে কম আলোচনা হয়নি। প্রতিভা এবং পরিশ্রমের সুষম মিশ্রণ সেখানে। আজকের আলোচনা অবশ্য কাননবালার গান নিয়ে। অবিস্মরণীয় তা। তিরিশ ও চল্লিশের দশকে তাঁর অনুপম কণ্ঠশৈলী এবং গায়কি ভারতীয় চলচ্চিত্র সংগীতে তৈরি করলো নতুন কথামুখ।১৯১৬ সালে জন্ম,অতি দরিদ্র পরিবারে। বাধ্যত উপার্জনের পথ খুঁজে নিতে হয়েছিল কণ্ঠকে হাতিয়ার করেই। অন্তহীন সে পথ চলা শুরু মাত্র দশ বছর বয়সেই। স্বপ্ন এবং জেদ এগিয়ে দিলো তাকে প্রায় ধরাছোঁয়ার বাইরের রূপকথার জগতে। মনে ছিল সংকল্প, রবীন্দ্রনাথের গানে যা “অচেনাকে ভয় কি আমার ওরে”। সেই নির্ভয় দৃষ্টিপাতেই জীবনের সিংহদুয়ার খুলে গেলো প্রায় বালিকা কাননবালার।
বিখ্যাত সংগীতজ্ঞ আল্লারাখা খাঁ এবং ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়ের কাছে শাস্ত্রীয় সংগীতের প্রাথমিক তালিম নেওয়ার সাথে সাথে সমান্তরালভাবে রাইচাঁদ বড়াল, পঙ্কজ কুমার মল্লিক এবং কাজী নজরুল ইসলামের মতো কিংবদন্তীদের সংস্পর্শে এলেন কানন। সালটা ১৯৩৭। নিউ থিয়েটার্স-এর ‘মুক্তি’ মুক্তি পেলো। প্রমথেশ বড়ুয়ার বিপরীতে তিনি। সে ছবিতে পঙ্কজ কুমার মল্লিকের পরিচালনায় তাঁর গাওয়া “আজ সবার রঙে রঙ মেশাতে হবে” এবং “হৃদয় আমার প্রকাশ হলো” গান দুটি শোনা গেল ছবির সংলাপের মতো করে। দীপ্র, সুস্থির সে গায়কি। রবীন্দ্রনাথের গানের ভাণ্ডারে এ দুটিই অতুলন রতন। ছবিতে তার ব্যবহারে দুর্দান্ত মুন্সীয়ানা দেখিয়েছিলেন পঙ্কজকুমার। “আজ সবার রঙে”-র লয় নির্বাচন এবং নাটকীয়তা আজকের সমূহ রবীন্দ্রসংগীত চর্চার গাইডলাইন হতে পারে।
এরপর একে একে ‘বিদ্যাপতি’ (১৯৩৭), ‘সাথী’ (১৯৩৮), ‘স্ট্রিট সিঙ্গার’ (১৯৩৮), এবং ‘শেষ উত্তর’ (১৯৪২) চলচ্চিত্রের গান তাঁকে জনপ্রিয়তার শীর্ষে নিয়ে যায়। ‘স্ট্রিট সিঙ্গার’ ছবিতে তাঁর গাওয়া হিন্দি গান “বাবুল মোরা নৈহার ছুটো হি যায়ে” আজও ভারতীয় চলচ্চিত্র সংগীতের ইতিহাসে একটি মাইলফলক হিসেবে গণ্য। কতটা তৈরি হলে তবে সে যুগে এতখানি পারঙ্গমতা দেখানো যায়, এমনকি হিন্দি ছবিতেও, এ আজও আলোচনার কেন্দ্রে।
অনন্য কণ্ঠস্বর তাঁর , মধুর এবং আবেগপূর্ণও। সহজ অভিব্যক্তিতে কঠিন শাস্ত্রীয় তান বা সুরকেও তিনি সাধারণ মানুষের কাছে অত্যন্ত সহজ ও হৃদয়গ্রাহী করে তুলতে পারতেন। এ প্রসঙ্গে কাজী নজরুল ইসলামের গানে তাঁর বিশেষ অধিকার নিয়ে দু চার কথা বলা যেতেই পারে। নজরুল কাননের কণ্ঠের নাটকীয়তায় মুগ্ধ হয়ে তাঁকে বেশ কিছু গান শিখিয়েছিলেন। রেকর্ডে সে সব গানের জনপ্রিয়তা ছিল বিপুল।
নাবালিকা কানন নজরুলের সংস্পর্শে আসা মাত্র কবি ধরতে পেরেছিলেন তার জাত। ছবির গানের প্রয়োজনেই তাঁর কাছে আসা। মেগাফোনের রিহার্সাল রুমে কবির সঙ্গে কানন দেবীর সাক্ষাৎ ঘটালেন রেকর্ড কোম্পানির কর্তা, কর্ণধার জে. এন. ঘোষ। নজরুলের নির্দেশে অনেকগুলি গানের মধ্যে কাননবালা চমকে দিতে পেরেছিলেন, “আকাশে হেলান দিয়ে পাহাড় ঘুমায় ওই ” গানের রূপায়ণে। সাপুড়ে ছবির সে গান পর্দানশীন পরিবারের অন্দরমহলকে শুধু বিদ্ধ করলোনা, মেয়েদের অজ্ঞানতার অন্ধকারে এ গান আলো হয়েই এলো। ভাটিয়ালির নির্ভার চলনে কানন শোনালেন,”চিতাবাঘ মিতা আমার, গোখরো খেলার সাথী “। সংগীতকে ছবি করে তুলতে জানতেন কানন। তাইনা তেপান্তরের মাঠ ছাড়ানো তুফান মেল-এর সাওয়ারি হিসেবে তাঁর-ই কথা ভেবেছিলেন নজরুল। ছবির গানে নজরুলের কাছে নেওয়া সেই পরম পাঠ জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত মনে রেখেছেন কানন। দুরারোগ্য স্নায়ুর রোগে নীথর, নীরব কবির জন্য কানন লিখেছেন “কবি কি সত্যিই নীরব? না আপন ধ্যানের জগতে সমাহিত বলেই বাইরের কোনো কোলাহল তাঁকে আর স্পর্শ করতে পারছে না? এককালে দেখা মাত্রই আনন্দে যার মন ভরে উঠত আজ তাঁকে নীরব প্রণাম জানিয়ে চলে আসা ছাড়া কিছু করার নেই৷ জন্মদিনে কবিকে ঘিরে সকল উৎসব সভা যখন তারই গানে, কথার সুরে ঝলমল করে ওঠে, তখন কবিরই ভাষায় তাকে প্রশ্ন করতে ইচ্ছে হয়, ফুলের জলসায় নীরব কেন কবি?”
‘মুক্তি’ ছবি এবং সে ছবির গান আদৃত হওয়ার পরে ‘হিন্দুস্তান রেকর্ডস’-এর সৌজন্যে রবীন্দ্রনাথকে প্রথম দেখেছিলেন কানন। বিদ্যাপতি, মুক্তি- র প্রধান মুখ কাননকে রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতনে যেতে বললেন। যাওয়া হয়নি, সে আক্ষেপ জীবনভোর ছিল ওঁর। আর গবেষকেরা যতই গল্প তৈরি করুন না কেন, কাননবালার জন্মপরিচয় অন্ধকারেই, আজও। নিজেও তেমন কিছু বলতে চাননি। সম্ভবত জানতেনও না কোন কাননের ফুল তিনি। নিজেকে প্রস্ফুটিত করতে পেরেছিলেন, এই পরিচয়েই অনেকখানি বাঁচা ওঁর। তবে খ্যাতনামা হওয়ার আগে তাঁর কয়েকটি ডেরার কথা জানা যায়। একটি ডেরায় বসে ‘ভোলাদা’ নামের একজন তাঁকে বিস্তর হিন্দি ও বাংলা ভজন ও ভক্তিগীতি শিখিয়েছিলেন বলে জানা যায়। অপরজন আশ্চর্যময়ী দাসী। কাননদের বাড়ির নিকটেই তাঁর আবাস। উপশাস্ত্রীয় গানে তিনি দক্ষ করে তুলেছিলেন কাননকে। ইতিহাস এর বেশি কিছু বলেনা। গালগল্প অবশ্য অনেক তৈরি হয়েছে। সুন্দরী, গায়িকা-নায়িকা, জন্মপরিচয় নেই, দুটি বিবাহ। তাঁকে নিয়ে নির্বিচার, রগরগে আকাশকুসুম কাহিনী তৈরি করাই যায়।
নির্বাক ছবির আগের যুগে ‘জয়দেব’ -এ প্রথম কাজ। সেই ১৯২৬ -এই ওয়ার্নার ব্রাদার্স’-এর নির্বাক ‘ডন জুয়ান’- কাজের অভিজ্ঞতা মোড়া কাননবালা তাঁর গায়িকা সত্ত্বার জন্যই তাঁর সময়ের এবং তাঁর পরবর্তী সকল নায়িকাদের মধ্যে অনন্যা হয়েই থেকে গেলেন। ‘জয়দেব’ ছবিতে কাজ করার অভিজ্ঞতা যদি ওঁর প্রথম পছন্দের হয়ে থাকে, প্রথমেশ বড়ুয়ার ‘দেবদাস’-এ না বলে দেওয়া ওঁর জীবনে অনিচ্ছার মর্মান্তিক সত্য।
কিন্তু নজর উঁচু, উচ্চনাসা সেই মানুষটি যখন ধরেছেন, “আমি বনফুল গো “, বাসন্তিকার আগমন ঘোষণায় শিহর লাগিয়েছেন শ্রোতামনে,”প্রণাম তোমায় ঘনশ্যাম”-এর তদগত ভাবনায় নিজে হয়েছেন বিভোর, শ্রোতাকে দিয়েছেন শ্রবণ- যাপনের আনন্দ — কোনো তুলনাই তার কাছে আসতে পারে না। তিনি এক,আদ্বিতীয়া । গায়িকা, নায়িকা হিসেবে তো বটেই, বাংলা গানে স্মার্টনেসের আদি জননী হিসেবে তাঁকে মনে রাখতেই হবে।
