অন্নপূর্ণা দেবী(১৯২৭-২০১৮) – অনিন্দ্য ব্যানার্জী
বাড়িতে সাংগীতিক পরিবেশ থাকার দরুন ছোটোবেলা থেকেই বহু সংগীতশিল্পীদের নাম জানতাম। ১৯৬৮ সালে আমি দক্ষিণ-কলকাতার লেক মার্কেটে অবস্থিত আলি আকবর কলেজ অফ মিউজিকে সরোদ শেখার জন্য ভর্তি হই। সেখানে গিয়ে শুনলাম যে আলি আকবর খানসাহেবকে দাদা, রবিশংকরজি পিসেমশাই আর অন্নপূর্ণা দেবীকে পিসিমা বলে সবাই সম্বোধন করছে। আর অবশ্যই বাবা আলাউদ্দিন খান ছিলেন সবার প্রিয় দাদু। ১৯৭৬ সালে আমি আমার গুরু আচার্য আলি আকবর খানসাহেবের মধ্যমপুত্র ধ্যানেশ খানসাহেবের কাছে ব্যক্তিগতভাবে শিক্ষাগ্রহণ করতে যেতাম ওনাদের গড়িয়াহাটের বাড়িতে। সে-সময় ধ্যানেশদা নিয়মিত যেতেন পিসিমা বা অন্নপূর্ণা দেবীর কাছে বোম্বে বা অধুনা মুম্বইতে। ওখান থেকে শিখে ফিরে আসার পর ধ্যানেশদা আমাদের পিসিমার কাছে শেখা জিনিসগুলো পরম যত্নে শেখাতেন। ফলে পরোক্ষভাবে আমি পিসিমার শিষ্য হয়ে যাই। ধ্যানেশদার কাছে শেখার সময় আমায় ধ্যানেশদার কিছু ব্যক্তিগত কাজ করে দিতে হত। তার মধ্যে প্রধান ছিল বিভিন্ন ধরনের চিঠি লেখা। ধ্যানেশদা নিয়মিত চিঠি পাঠাতেন পিসিমাকে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে। আমাকে সেইসব চিঠি লিখে দিতে হত। চিঠির ঠিকানায় কিন্তু সেইসময় ‘অন্নপূর্ণা রবিশংকর’ কথাটা লিখতে হত খাম বা Inland letter-এর ওপর। এর ৫ বা ৬ বছর পর থেকে লিখতে হত শুধু নাম, ‘অন্নপূর্ণা দেবী’-র কাছে কারণ জানতে চাওয়ায় তিনি জানিয়েছিলেন যে ‘পিসেমশাই’ অর্থাৎ রবিশংকরের সঙ্গে সরকারিভাবে বিচ্ছেদ হয়ে যাওয়াই এর কারণ। পিসিমা প্রত্যুত্তরে যেসব চিঠি পাঠাতেন সেগুলো সব ইংরেজিতে লেখা কেবল সইয়ের জায়গায় বাংলায় ‘পিসিমা’ কথাটা লেখা থাকত। যেহেতু উনি বোম্বেতে থাকতেন তাই বেশিরভাগ শিষ্য-শিষ্যাই ছিলেন অবাঙালি তাই তাঁরা পিসিমার নির্দেশানুসারে চিঠিগুলো ইংরেজিতেই লিখতেন।
এইসব চিঠি লিখতে লিখতে, পিসিমার তালিম পরোক্ষভাবে শিখতে শিখতে আর ধ্যানেশদার কাছে পিসিমা-পিসেমশাই-এর নানা গল্প শুনতে শুনতে পিসিমার কাছে সরাসরি তালিম নেবার আগ্রহ তৈরি হয় সঙ্গে সঙ্গে ওনাকে দেখা পরে কৌতুহলও। ধ্যানেশাদার কাছে ওনার কাছে শেখবার প্রসঙ্গ তোলায় বলেছিলেন ‘তুমি আরেকটু’ তৈরি হয়ে নাও আমি নিজেই তোমায় পাঠাব পিসিমার কাছে, তবে উনি শেখাতে রাজি হবেন কি হবেন না সে বিষয়ে আমি কিন্তু নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারব না। তখন থেকেই জেনে গিয়েছিলাম যে বাবা আলাউদ্দিন খানসাহেব এবং অন্নপূর্ণা দেবী দুজনের কেউই সহজে কাউকে শেখাতে চাইতেন না। এরপর নানা কারণে আমার আর পিসিমার কাছে শিখতে যাওয়া হয়ে ওঠেনি। অনেক কারণের একটা ছিল আমার আর্থিক সমস্যা; তখন আমি পড়াশুনা করছি আর বাবাও অবসর নিয়েছেন। আর তখনকার দিনে বোম্বে গিয়ে থেকে শেখার জন্য ভালো অর্থেরই প্রয়োজন হত। যেটা আমার পক্ষে বহন করা সম্ভব ছিল না। কিন্তু মনে মনে প্রচণ্ড ক্ষুধা ছিল একবার যদি অন্তত ওনাকে একটু দেখতেও পাই। কিন্তু নানা কারণে সেই সুযোগও হয়ে উঠছিল না। ১৯৭৯ সালে আমি আমার দাদাগুরু আলি আকবর খানসাহেবের সঙ্গে তানপুরাবাদক হিসাবে বাংলাদেশ সফরে যাই। ধ্যানেশদাও সঙ্গে গিয়েছিলেন। কিন্তু সেইসময় ধ্যানেশদার হাত ভেঙে যাওয়ায় আমাকে ওনাদের দুজনেরই দেখাশোনা করতে হয়েছিল। কোনো কারণে ওইসময় আমি আচার্য আলি আকবর খানসাহেবের নেকনজরে পড়ে যাই আর ওনার ঘনিষ্ঠ সঙ্গলাভ করতে শুরু করি। এর পিছনে অবশ্যই ধ্যানেশাদার অনেক অবদান ছিল। তখনও আমি খানসাহেবকে মেসোমশাই বলে সম্বোধন করতাম এবং উনি আমেরিকা ফিরে যাওয়ার পর আমি নিয়মিত ওনাকে চিঠি লিখতে শুরু করি। এবং এতে করে ঘনিষ্ঠতা আরো বাড়ে। যাই হোক, উনি দেশে এসে বিভিন্ন জায়গায় অনুষ্ঠান করতেন আর তার মধ্যে বোম্বেতে তো যেতেনই। আমাকেও সঙ্গে নিয়ে যেতেন ওনার সঙ্গে তানপুরা বাজানোর জন্য আর ওনার দেখাশোনার জন্যও বটে। বোম্বে গেলে উনি সাধারণত একদিনের বেশি থাকতেন না। কিন্তু ১৯৮১ সালে উনি বেশ কয়েক দিনের জন্য বোম্বতে ছিলেন আর বোন অর্থাৎ অন্নপূর্ণা দেবীর সঙ্গে দেখা করতে যেতেন। বাড়িতে ফোন থাকা সত্ত্বেও অন্নপূর্ণা দেবী কখনো ফোন ধরতেন না। ফলে ফোনে কথা বলা অসম্ভব ছিল। তো সেবার খানসাহেব আমাকে সঙ্গে করে নিয়ে গেলেন পিসিমার কাছে। যাওয়ার আগে অবশ্যই ওনাকে জানাতে হয়েছিল যে উনি আমাকে সঙ্গে করে নিয়ে যাচ্ছেন, কেননা পিসিমা সবাইয়ের সঙ্গে দেখা করতেন না বা ওনার বাড়ি গিয়ে দেখা করা ছিল অসম্ভব যাকে ইংরেজিতে বলে Next to Imposible আর এই নিয়ে বহু
লোকের বহু গল্পও আছে। পিসিমার বাড়ি যাওয়ার আগে খানসাহেব আমাকে শিখিয়ে দিয়েছিলেন যে কীভাবে প্রণাম করতে হবে, কীভাবে কথা বলতে হবে ইত্যাদি। এদিকে আমি তো ভাবতেই পারছি না যে সত্যি আমি যাব পিসিমাকে দেখতে আর তা ছাড়া আমি তো লজ্জা ও ভয়ে খানসাহেবকে বলতেই পারিনি যে উনি যদি আমায় একটা ব্যবস্থা করে দেন পিসিমার সঙ্গে দেখা করার। ফলে উনি যখন আমায় বলেছিলেন চলো আজ তোমায় আমার সঙ্গে ‘অন্নপূর্ণ’র (উনি এইভাবে উচ্চারণ করতেন) বাড়ি যেতে হবে তখন আমি সত্যিই নিজের গায়ে চিমটি কেটে দেখেছিলাম যে সত্যি আমি জেগে আছি না স্বপ্ন দেখছি। যাই হোক, উত্তেজনায় কাঁপতে কাঁপতে দুরুদুরু বক্ষে তো ওনার বাড়ি গেলাম। এর কারণ আমি শুনেছিলাম যে উনি ওনার বাবারই মতো খুব রাগী। উনি থাকতেন ওয়ার্ডেন রোড অধুনা ভুলা ভাই দেশাই রোডের বহুতল ‘আকাশগঙ্গা’ বাড়ির সাততলায়। ফ্ল্যাটটি, কিনেছিলেন রবিশংকরজি। তাই নীচে লেটার বক্সে আর দরজায় ওনার নামও লেখা ছিল। পরবর্তীকালে সে-নাম মুছে দেওয়া হয়। পিসিমার ফ্ল্যাটের দরজাতে কয়েকটা নিয়ম লেখা। ছিল যেমন তিন বারের বেশি বেল বাজানো যাবে না, দরজা না খুললে বক্তব্য কাগজে লিখে দিয়ে যেতে হবে, বৃহস্পতিবার বেল বাজানো যাবে না ইত্যাদি। স্কুল, কলেজ বা মন্দির ছাড়া অন্য কোনো বাড়ির দরজায় যে এইরকম কিছু লেখা থাকতে পারে তা ভাবতেও পারিনি। ওইসব লেখা পড়ে তো আরো ভয় পেয়ে গেলাম। শীতকালের সকালেও ঘামতে শুরু করলাম। পা দুটোও কাঁপছিল। যাই হোক, বেল দেওয়ার এক মিনিটের মধ্যে। ওনার শিষ্য বংশীবাদক নিত্যানন্দ হলদিপুর দরজা খুলে আমাদের। অভ্যর্থনা করে বসতে বললেন আর জানালেন যে ‘মা’ এক্ষুনি আসবেন আপনাদের সঙ্গে দেখা করতে। মিনিট ২-৩ বাদে পিসিমা এলেন লাল পাড় শাদা শাড়ি পরে মাথায় সিন্দুর। চুল খোলা খুব সম্ভবত স্নান সেরে বেরিয়েছেন। উনি ঘরে ঢুকতেই আমরা সবাই দাঁড়িয়ে উঠলাম এমনকী খানসাহেবও। উনি আমাদের ‘আপনি’ সম্বোধন করে বসতে বলে খানসাহেবকে ভক্তিভরে প্রণাম করলেন। এরপর খানসাহেব আমাকে পরিচয় করিয়ে দিতে পিসিমা জানিয়েছিলেন যে তিনি আমার নাম ধ্যানেশদার কাছে শুনেছেন। এটা শুনে আমি যেমন বিগলিত হয়েছিলাম তেমনই ভয়ও অনেকটা কেটে গিয়েছিল। কে জানে। আমি হঠাৎ ওনাকে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করতে গিয়েছিলাম আর উনি বাধা দিয়ে একটু দৃঢ়তার সঙ্গে বলেছিলেন যে, ‘ওসব নাটক করবেন না।’ এটা শোনার পর আমার ভয় এত বেড়ে গিয়েছিল। যে আমি ঠিকভাবে ওনাদের প্রণামও করতে পারিনি। খানসাহেব সাধারণত কারো সঙ্গে দেখা করতে গেলে হাতে করে ফুল বা মিষ্টি
নিয়ে যেতেন কিন্তু পিসিমার কাছে গিয়েছিলেন খালি হাতে কারণ উনি ওনার বাবার মতন। কারো কাছ থেকে কিছু নিতেন না। যদিও পরবর্তীকালে আমি কয়েক বার কলকাতার সন্দেশ পাঠিয়েছিলাম ওনার শিষ্য সুরেশ ব্যাসের হাতে যা উনি গ্রহণও করেছিলেন। অন্য জায়গায় নিমন্ত্রণ থাকায় সেবার খানসাহেব পিসিমার বাড়ি বেশিক্ষণ থাকেননি। তাও যতটুকু ছিলেন তাতে দেখেছিলাম দাদার প্রতি কী অসীম শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। আর ওনার গলার স্বর এত সুমিষ্ট যে বলবার নয়। ওনাকে দেখার রেশ কাটতে আমার বেশ কিছুদিন লেগেছিল। কেমন একটা ঘোরের মধ্যে ছিলাম। এরপর আরো দু-বার আমার ওনার কাছে যাবার সুযোগ হয়েছিল। তার ভেতর একবার খানসাহেবের অনুমতি নিয়ে ওনাকে অনুরোধ করেছিলাম যদি আমায় একটু শেখান। কিন্তু আমার অনুরোধ প্রত্যাখান করে উনি যা বলেছিলেন তাতে আমি এতই লজ্জা পেয়েছিলাম যে কম উচ্চতার মোড়ায় বসেও আমি প্রায় মাটিতে পড়ে গিয়েছিলাম। উনি বলেছিলেন, আপনি (উনি সবাইকে ‘আপনি’ বলে সম্বোধন করতেন) মহাগুণী, আপনি দাদার কাছে শিখছেন ওনার কাছেই শিখুন এ সুযোগ হারাবেন না। আমার কাছে শেখার কথা কখনো কল্পনাও করবেন না এমনকী কখনো বোম্বে এলে আমার কথা মনেও আনবেন না। জানি না উনি কেন এরকম কথা বলেছিলেন যদিও খুব নরম করেই বলেছিলেন, এরপর খুব যত্ন করে আমাদের দুপুরের খাবার খাইয়েছিলেন। উনি নিজে নিরামিশাষী ছিলেন কিন্তু মাংস রেঁধেছিলেন অসাধারণ। উনি খেতেনও খুব অল্প এবং তাও একবার। পরবর্তীকালে কখনো ওনার বাড়ি যাবার সুযোগ হয়নি এমনকী ব্যক্তিগত কোনো যোগাযোগও ছিল না। যদিও নিয়মিতভাবে ওনার খবর নিতাম বা পেতাম ওনার শিষ্যদেরই মাধ্যমে। উনি যেমন আমায় শেখানো প্রত্যাখান করেছিলেন কিন্তু দুটি অনুরোধ আমার রেখেছিলেন এক, স্বপন বন্দোপাধ্যায় রচিত ‘অন্নপূর্ণা’ বইটি সই করে দিয়েছিলেন আর আমার সম্পাদিত দ্বিতীয় বই বাবা আলাউদ্দিন খানসাহেবের আত্মজীবনী “আমার জীবনী”-র মুখবন্ধ বা ভূমিকা উনি ইংরেজিতে লিখে আমায় পাঠিয়েছিলেন। এর জন্য আমি ওঁর কাছে চিরকৃতজ্ঞ।
পাঠক ভাবছেন বাবা আলাউদ্দিন খানসাহেব মুসলমান হয়ে মেয়ের কেন হিন্দু নাম রেখেছিলেন। এর পেছনে একটা ঘটনা। আছে। অন্নপূর্ণা দেবীর জন্ম ১৯২৭ সালের চৈত্র মাসে মধ্যপ্রদেশের প্রত্যন্ত গ্রাম মাইহারে। এখানে বাবা আলাউদ্দিন ছিলেন সভাবাদক। অন্নপূর্ণার জন্মের সময় আলাউদ্দিন খান ছিলেন মাইহারের বাইরে। কয়েক দিন বাদে মাইহারে ফিরে কন্যাসন্তানের মুখ দেখলেন। আলাউদ্দিন তারপর গেলেন রাজা ব্রিজনাথ সিং-এর সঙ্গে দেখা করতে, রাজদরবারে পৌঁছেলে রাজা বললেন, ‘আপনার সন্তান চৈত্রপূর্ণিমার দিন জন্মেছে। হিন্দু ধর্মে চৈত্র মাসের অষ্টমী তিথি দেবী অন্নপূর্ণার পূজার জন্য নির্ধারিত। অন্নপূর্ণা পূর্ণতার প্রতীক, পরিপূর্ণ ভাণ্ডার, ঐশ্বর্য আর পরিতৃপ্তির প্রতীক এই দেবী। আমার বিশ্বাস যে এই কন্যা আপনার ভাণ্ডার পূর্ণ করবে আপনার জীবনে সুখ-সমৃদ্ধি আনবে তাই ওর নাম রেখেছি অন্নপূর্ণা; জানি না আপনার নামটা পছন্দ হবে কিনা তবে আপনার ধর্মমত মেনে মুসলিম নামও আপনি রাখতে পারেন। কিন্তু এ হল আমার দেওয়া নাম।’
রাজার কথা মন দিয়ে শুনে আলাউদ্দিন জোড়হাত করে স্বভাবসিদ্ধ বিনয়ে বললেন, ‘আপনি যা নাম রাখলেন তাই শিরোধার্য করলাম।’ পরবর্তীকালে রাশিচক্র দেখে মেয়ের মুসলিম নাম রেখেছিলেন রওশনআরা কিন্তু সে-নাম এখন ইতিহাসের পাতায়।
জন্ম থেকেই তিনি অসাধারণ সংগীত প্রতিভার অধিকারী ছিলেন। কথিত আছে বাবা আলাউদ্দিন খান তাঁর দ্বিতীয় সন্তান জাহানারাকে কণ্ঠসংগীতের তালিম দিয়েছিলেন। তাঁর বিবাহ হয় পূর্ব-পাকিস্তানের (অধুনা বাংলাদেশের) এক বাঙালি মুসলমান পরিবারে। কিন্তু বিবাহের পর শ্বশুরবাড়ি থেকে তাঁর সংগীতচর্চায় কোনোরকম সহযোগিতা পাননি। পরে শ্বশুরবাড়ির অত্যাচারে জাহানারার মৃত্যু হয়। এই ঘটনায় বাবা আলাউদ্দিন গভীর দুঃখ পান এবং স্থির করেন যে কন্যাসন্তানদের আর সংগীতশিক্ষা দেবেন না। একদিন পুত্র বালক আলি আকবর খানকে কিছু রেওয়াজ করতে দিয়ে উনি বাড়ির বাইরে গিয়েছিলেন, কিন্তু কোনো বার আলি আকবর খান তা সঠিকভাবে যন্ত্রস্থ করতে পারছিলেন না, ফিরে এসে শুনতে পান যে অন্নপূর্ণা দেবী তাঁর দাদাকে গান গেয়ে তার ভুলে যাওয়া অংশটি মনে করিয়ে দিচ্ছেন। এই ঘটনা দেখা ও শোনার পর বাবা আলাউদ্দিন তাঁর মত বদল করে অন্নপূর্ণাকে তালিম দিতে শুরু করেন। জাহানারার মৃত্যু বাবা আলাউদ্দিনকে এতটাই বিচলিত করেছিল তিনি স্থির করেছিলেন, অন্নপূর্ণার বিয়ে দেবেন না। সংগীতের সঙ্গেই তাঁর বিয়ে হবে। কিন্তু পরে মত বদল করে ১৯৪১ সালে নিজের সুযোগ্য শিষ্য পণ্ডিত রবিশংকরের সাথে বিয়ে দিয়েছিলেন। প্রথমে সেতার এবং পরে সুরবাহারে অন্নপূর্ণা দেবীর তালিম হয়। ১৯৪২ থেকে ১৯৫৬ সালের মধ্যে অন্নপূর্ণা দেবী ও পণ্ডিত রবিশংকর ভারতবর্ষের বিভিন্ন জায়গায় কয়েকটি অনুষ্ঠানে সেতার ও সুরবাহারের যুগলবন্দীর অনুষ্ঠান করেন।
১৯৪২ সালে অন্নপূর্ণা দেবীর একমাত্র পুত্র শুভেন্দ্রশংকরের জন্ম হয়। যিনি পরবর্তীকালে সেতারি ও চিত্রশিল্পী হিসেবে খ্যাত হন। ১৯৫৬ সালে কলকাতায়
আলি আকবর কলেজ প্রতিষ্ঠিত হলে তিনি প্রথম পর্যায়ে সেখানে শেখাতেন, পরবর্তীকালে বোম্বেতে থাকাকালীন National Centre for Performing Arts-ও শেখাতেন। ভারতীয় সংগীতে শ্রীমতী অন্নপূর্ণা দেবীর অবদান বলতে তাঁর তালিমপ্রাপ্ত শিষ্য-শিষ্যা। যাঁদের মধ্যে অনেকেই আজ ভারতীয় সংগীতে উজ্জ্বল রত্ন হিসাবে চিহ্নিত। যেমন নিখিল বন্দ্যোপাধ্যায়, বাহাদুর খান, যতীন ভটাচার্য, হরিপ্রসাদ চৌরাশিয়া, আশিস খান, বসন্ত কাব্রা ও নিত্যানন্দ হলদিপুরের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
এ প্রতিশ্রুতি রক্ষাই ছিল ওনার কাছে পরমধর্ম। ওনার বাবা আলাউদ্দিন খাঁ-কে কথা দিয়েছিলেন বলেই তিনি অনেক কিছু মেনে চলতেন। সেটা দৈনন্দিন জীবনের কোনো ছোটো ব্যাপারই হোক বা সংগীতের মতন বিশাল কিছু। অন্নপূর্ণা ছিলেন Positive and Negative Myth-এর সংমিশ্রণ। ওনার বাজনা বা সাধনার অনুরাগী হলে আপনারা এই Positive Myth-কেই বাড়িয়ে বলবেন আর ওনার সঙ্গে দৃষ্টিভঙ্গি না মিললে আমরা ওনার Negative Myth-কেই বাড়িয়ে দেখব। কিন্তু তিনি এইসব Myth-এর অনেক উর্ধে। তিনি প্রথমত ও শেষপর্যন্ত একজন মহিলা, বরেণ্য এক শিল্পী আর অসামান্য এক গুরু। শোনা যায় অন্নপূর্ণা সম্পর্কে বাবা আলাউদ্দিন খান বলতেন, ‘আমার মাইয়ার বাজনায় ধরম আছে।’ তাঁর সম্পর্কে এটাই বোধ হয় শেষ কথা।
কথিত আছে বাবা আলাউদ্দিন খানসাহেব নাকি বলতেন ‘আমার মাইয়ার বাজনায় ধরম আছে।’ এও বলতেন আমার বাজনার ভাবটা অন্নপূর্ণার বাজনায় আশিভাগ, আলি আকবরের বাজনায় সত্তর ভাগ আর রবিশংকরের বাজনায় চল্লিশ ভাগ আছে।’
- আরেক রকম, ষষ্ঠ বর্ষ, ত্রয়োবিংশ সংখ্যা- ১, ১৫ ডিসেম্বর।
