সুরবাহারের নীরবতা : অন্নপূর্ণা দেবী ও ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের এক অদৃশ্য ইতিহাস – ঋত্বিক গোস্বামী
ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের ইতিহাস লিখতে গেলে কয়েকটি নাম প্রায় অবধারিতভাবেই সামনে আসে – আলাউদ্দিন খান, রবিশঙ্কর, আলি আকবর খান, বিলায়েত খান। তাঁদের সংগীত, পরিবেশন, রেকর্ডিং এবং আন্তর্জাতিক পরিচিতি ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের আধুনিক ইতিহাস নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে। কিন্তু এই উজ্জ্বল ইতিহাসের আড়ালেই থেকে গিয়েছেন এমন কিছু মানুষ, যাঁদের অবদান মাপা যায় না শুধু মঞ্চে তাঁদের উপস্থিতি দিয়ে। অন্নপূর্ণা দেবী তাঁদের মধ্যে অন্যতম।
তাঁর জন্মের গল্পটাই যেন একটা ভবিষ্যদ্বাণী। প্রচলিত জীবনী অনুযায়ী, ১৯২৭ সালে মাইহারে, চৈত্র পূর্ণিমার দিনে জন্মেছিলেন রওশনআরা খান। তবে তাঁর জন্মসাল নিয়ে উৎসভেদে মতভেদ রয়েছে। সংগীত নাটক আকাডেমির সরকারি জীবনীতে ১৯২৯ সাল উল্লেখ করা হয়েছে, আবার অন্য জীবনীমূলক সূত্রে ১৯২৬ বা ১৯২৭-এর উল্লেখ পাওয়া যায়। মাইহারের রাজা বৃজনাথ সিং তাঁকে ‘অন্নপূর্ণা’ নামটি দেন – হিন্দু দেবী অন্নপূর্ণার নামে। যে নামের সঙ্গে খাদ্য ও প্রাচুর্যের প্রতীক জড়িয়ে আছে, অথচ ইতিহাস তাঁকে মনে রাখবে এমন একজন শিল্পী হিসেবে, যিনি নিজের সংগীত-ভাণ্ডারের বড় অংশ অন্যদের মধ্যে বিলিয়ে দিয়েছিলেন। সেই দেওয়ার শুরুটাও ছিল নিঃশব্দ।
ছোট্ট রওশনআরা প্রথমে আনুষ্ঠানিকভাবে সংগীতের তালিম নিচ্ছিলেন না। পরিবারের সংগীতচর্চার পরিবেশের মধ্যেই তাঁর অসাধারণ শ্রুতিশক্তি ও সুরবোধের প্রকাশ ঘটে। পরবর্তী জীবনীমূলক বর্ণনাগুলিতে আলি আকবর খানের রিয়াজ শুনতে শুনতে তাঁর সুর ধরে ফেলার ঘটনাটিকে সেই প্রতিভার একটি স্মরণীয় নিদর্শন হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। এই প্রতিভা উপলব্ধি করার পর বাবা আলাউদ্দিন খান তাঁকে কঠোর শৃঙ্খলাবদ্ধ তালিম দিতে শুরু করেন। তিনি কেবল সুরবাহার নয় – কণ্ঠসংগীত, সেতার এবং সুরবাহার, একাধিক ধারাতেই প্রশিক্ষিত হন।
আলাউদ্দিন খান ছিলেন বিশ শতকের ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের অন্যতম কঠোর ও শৃঙ্খলাবদ্ধ গুরু। তাঁর সংগীতচর্চা এবং শিক্ষাপদ্ধতির মধ্য দিয়ে মাইহার-পরম্পরা একটি স্বতন্ত্র সংগীত-ভাষা লাভ করে। এই পরম্পরার উত্তরাধিকারীদের মধ্যে ছিলেন আলি আকবর খান, রবিশঙ্কর, পান্নালাল ঘোষ, নিখিল বন্দ্যোপাধ্যায় এবং অন্নপূর্ণা দেব। যাঁরা বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রে মাইহার সংগীতের ভাষাকে বহন ও রূপান্তরিত করেন। অন্নপূর্ণা দেবী সেই উত্তরাধিকারকে বিশেষভাবে সুরবাহারের মাধ্যমে ধারণ করেন। সুরবাহার হয়ে ওঠে ওনার সিগনেচার।
বিশ শতকের ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের জনপ্রিয় ইতিহাসে মাইহার ঘরানার কাহিনি প্রায়ই বলা হয় আলাউদ্দিন খান থেকে রবিশঙ্কর, আর তারপর বিশ্বমঞ্চে ভারতীয় সংগীতের বিস্তার-এই সরলরেখায়। এই বয়ানে অন্নপূর্ণা দেবী যেন একটা কোঁচকানো পাদটীকা। অথচ তিনি ছিলেন একই ঐতিহ্যের অন্যতম গভীর উত্তরাধিকারী, যাঁর সুরবাহার-বাদনে ছিল এক নিজস্ব নান্দনিকতা – ধীর, অন্তর্মুখী, প্রায় ধ্যানস্থ।
১৯৪১ সালে, মাত্র চৌদ্দ বছর বয়সে, অন্নপূর্ণা দেবীর সঙ্গে রবিশঙ্করের বিবাহ হয়। বিবাহের সঙ্গে তাঁর ধর্মান্তর এবং ‘অন্নপূর্ণা’ নামের আনুষ্ঠানিক পরিচয় আরও দৃঢ়ভাবে যুক্ত হয়। এই বিবাহ পরবর্তী সময়ে তাঁর শিল্পী-পরিচয় এবং রবিশঙ্করের ক্রমবর্ধমান জনপরিচিতির সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে যায়। কিন্তু এখানেই ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন জন্ম নেয় – একজন নারী শিল্পীর নিজস্ব সংগীত-পরিচয় কতটা সহজে তাঁর বৈবাহিক পরিচয়ের আড়ালে চলে যেতে পারে?
অন্নপূর্ণা দেবীর প্রাথমিক শিল্পীজীবন কিন্তু সম্পূর্ণ মঞ্চবিমুখ ছিল না। পঞ্চাশের দশকে তিনি সফলভাবে কন্সার্ট নামক আধুনিক মঞ্চে সংগীত পরিবেশন করেছেন। ১৯৪৬ থেকে ১৯৫৭ সালের মধ্যে রবিশঙ্করের সঙ্গে তাঁর যৌথ পরিবেশনার উল্লেখ পাওয়া যায়, এবং ১৯৫০-এর দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত তিনি প্রকাশ্য সংগীতজগতে সক্রিয় ছিলেন। পরবর্তী সময়ে তিনি ক্রমশ পাবলিক পারফরমেন্স থেকে সরে যান। ‘সঙ্গীত নাটক একাডেমি’ থেকে প্রাপ্ত জীবনীতেও তাঁর ‘… successful career on the concert platform in the ’50s’-এর পর teaching-এ নিজেকে নিবেদিত করার কথা উল্লেখ করে।
তাঁর এই সরে যাওয়াটাই তাঁর জীবনের ইতিহাসকে আরও জটিল করে তোলে। এটিকে কেবল একজন শিল্পীর ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত, অথবা কেবল বৈবাহিক জীবনের ফল হিসেবে পড়লে অন্নপূর্ণা দেবীর অবস্থানের একটি বড় অংশ অদৃশ্য থেকে যায়। তাঁর নিজের বক্তব্য, পরবর্তী জীবনী এবং স্মৃতিচারণে রবিশঙ্করের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক, সংগীতচর্চা এবং পাবলিক পারফরমেন্স থেকে সরে যাওয়ার নানা ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। ফলে তাঁর নীরবতাকে একমাত্রিকভাবে ‘ত্যাগ’ বা ‘নির্যাতনের ফল’ হিসেবে পড়াও যেমন সরলীকরণ, তেমনই সেটিকে নিছক ব্যক্তিগত পছন্দ হিসেবে দেখাও অসম্পূর্ণ।
তাঁর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান সম্ভবত এখানেই – নিজের মঞ্চের ক্যারিয়ারের চেয়ে তাঁর টিচিং ট্রাডিশন ক্রমশ বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। মুম্বাইয়ে অপেক্ষাকৃত ব্যক্তিগত জীবনযাপন করে তিনি নির্বাচিত শিষ্যদের তালিম দিতে থাকেন। নিখিল বন্দ্যোপাধ্যায়, বাহাদুর খান, হরিপ্রসাদ চৌরাসিয়া, আশিস খান, নিত্যানন্দ হালদিপুরসহ বহু বিশিষ্ট শিল্পীর সংগীতশিক্ষায় তাঁর প্রত্যক্ষ ভূমিকার উল্লেখ রয়েছে। এমনকি, রবিশঙ্করের সংগীত জীবনেও অন্নপূর্ণা দেবীর সংগীতের প্রভাব ছিল অসামান্য। তিনি যদিও ছিলেন মূলত অন্নপূর্ণা দেবীর পিতা আলাউদ্দিন খানের শিষ্য। তবে অন্নপূর্ণা ও রবিশঙ্করের দীর্ঘ সংগীত-সম্পর্ক, তাঁদের যৌথ পরিবেশনা এবং অন্নপূর্ণার সংগীত-ভাবনার সম্ভাব্য প্রভাব আলাদা ঐতিহাসিক অনুসন্ধানের বিষয়। অন্যদিকে অন্নপূর্ণা দেবীর গুরু হিসেবে উত্তরাধিকার বহন করেছেন তাঁর প্রত্যক্ষ শিষ্যরা- এবং তাঁদের সংগীতের মধ্য দিয়েই তাঁর শিক্ষার একটি বড় অংশ পরবর্তী প্রজন্মে প্রবাহিত হয়েছে।
রাগ শেখানোর ক্ষেত্রে অন্নপূর্ণা দেবীর সংগীত-দর্শনের কেন্দ্রে ছিল রাগের স্বরূপ ও বিশুদ্ধতা রক্ষা। তাঁর শিষ্যদের স্মৃতিচারণে বারবার ফিরে আসে তাঁর কঠোরতা, সূক্ষ্মতা এবং সংগীতের ভেতরের কাঠামোকে অক্ষুণ্ণ রাখার প্রয়াস। তাঁর অবদানের একটা বিশাল অংশ সংগীতের পরিবেশনা ছাড়িয়ে প্রেষনে দিয়ে দাঁড়ায়। তিনি নিজে যতটা দৃশ্যমান পারফর্মার ছিলেন, তাঁর পরবর্তী জীবনে তার চেয়ে অনেক বেশি হয়ে উঠেছিলেন অদৃশ্য গুরু। এই পার্থক্যটা ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের ইতিহাস বোঝার জন্য জরুরি। কারণ সংগীতের প্রচলিত ইতিহাস আসলে মঞ্চ, রেকর্ড, সংবাদপত্র, পুরস্কার এবং জনপ্রিয়তার ইতিহাস। কিন্তু একজন গুরুর ঘরে প্রতিদিনের রিয়াজ, শিষ্যের সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা নীরব অনুশীলন, একটা তানের সূক্ষ্ম মোচড় ঠিক করে দেওয়া-এসবের প্রায় কিছুই কোনো ফর্মাল আর্কাইভে সংরক্ষিত হয় না।
অন্নপূর্ণা দেবীর ক্ষেত্রে এই ‘আর্কাইভাল এবসেন্স’ আরও তাৎপর্যপূর্ণ। বলাই বহুল্য তাঁর লিপিবদ্ধ উত্তরাধিকারী অত্যন্ত সীমিত, এবং তাঁর শিক্ষাদানের বহু গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত ধরা পড়েনি। তিনি পাবলিক পারফরমেন্স এবং রেকর্ডিং সম্পর্কে অত্যন্ত সংযত ছিলেন বলেও জীবনীমূলক সূত্রে উল্লেখ রয়েছে। ফলে তাঁর সংগীতের উত্তরাধিকারকে কেবল রেকর্ডিং দিয়ে পুনর্গঠন করা সম্ভব নয়, শিষ্যদের স্মৃতি, তাঁদের বাজনার ভিতরের স্টাইলিস্টিক ট্রেসেস এবং মৌখিক ট্রান্সমিশনও এখানে প্রাথমিক প্রমাণ হয়ে ওঠে।
তাঁর জীবনকে জেন্ডারের প্রশ্ন থেকে আলাদা করে দেখা যায় না। অন্নপূর্ণা দেবী গড়ে উঠেছিলেন এক শক্তিশালী পুরুষতান্ত্রিক সাংস্কৃতিক পরিসরের মধ্যে- কন্যা, স্ত্রী, শিল্পী এবং গুরু, এই একাধিক পরিচয় নিয়ে। কিন্তু এর মধ্যে কোন পরিচয়টি পাবলিক মেমরীতে সবচেয়ে বেশি জায়গা পেয়েছে? রবিশঙ্করের সঙ্গে তাঁর বিবাহিত জীবন এবং রবিশঙ্করের বিশ্বজোড়া খ্যাতির কারণে তাঁর নিজের সংগীত-পরিচয় বহুক্ষেত্রে আরেকজন পুরুষ শিল্পীর জীবনকাহিনির উপ-অধ্যায়ে পরিণত হয়েছে। এখানেই ফেমিনিস্ট হিস্টোরির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে – একজন নারী শিল্পীকে কি তাঁর নিজের সংগীত-বংশধারার মধ্যে দেখা হয়, নাকি কোনো পুরুষ শিল্পীর সঙ্গে সম্পর্কের মধ্য দিয়ে?
রবিশঙ্কর যেখানে কনসার্ট স্টেজ , রেকর্ডিং ইন্ডাস্ট্রি , আন্তর্জাতিক সফর এবং মাস মিডিয়ার মাধ্যমে বিশ্বজোড়া পরিচিতি পেয়েছিলেন, অন্নপূর্ণা দেবী ক্রমশ সরে গিয়েছিলেন প্রকাশ্য পরিবেশনার জগৎ থেকে। এই পার্থক্যকে কেবল দুই শিল্পীর ব্যক্তিগত ইচ্ছে-অনিচ্ছার পার্থক্য হিসেবে পড়লে ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা অদৃশ্য হয়ে যায়। এর মধ্যে বিবাহ, জেন্ডারড এক্সপেকটেশন্স , পাবলিক পারফরমেন্সর সামাজিক চরিত্র, রেকর্ডিং ইকোনমি এবং সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা – সবকিছুকেই বিবেচনায় নিতে হয়।
তবে এখানে একটি সতর্কতা জরুরি। অন্নপূর্ণা দেবীকে সরাসরি ‘সাবঅলটার্ন ’ বলা তাত্ত্বিকভাবে সমস্যাজনক। তিনি একেবারেই কোনো প্রান্তিক সামাজিক গোষ্ঠীর প্রতিনিধি ছিলেন না। বরং তিনি ছিলেন ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের একটি শক্তিশালী ও ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক বংশধারার উত্তরাধিকারী। তাঁর অবস্থানকে বরং এভাবে বোঝা যায় – একটি এলিট সাংস্কৃতিক পরম্পরার ভিতরে থেকেও লিঙ্গ, বৈবাহিক পরিচয় এবং পাবলিক ভিসিবিলিটির প্রশ্নে এক ধরনের প্রান্তিকীকরণের অভিজ্ঞতা। এই দ্বৈত অবস্থানই তাঁকে ইতিহাসচর্চার জন্য গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে।
অন্নপূর্ণা দেবীর ইতিহাস তাই শুধু একজন প্রতিভাবান নারীর নীরবতার ইতিহাস নয়। এটা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে ‘নীরবতা’ আর ‘অদৃশ্যতা’ এক জিনিস নয়। একজন শিল্পী মঞ্চ থেকে সরে যেতে পারেন, কিন্তু তাঁর সংগীত বেঁচে থাকতে পারে অন্যের মধ্যে। তাঁর রেকর্ডিং কম হতে পারে, কিন্তু তাঁর শিষ্যদের রিয়াজে থেকে যেতে পারে তাঁর শিক্ষার ছাপ। তাঁর নাম জনপ্রিয় ইতিহাসে কম উচ্চারিত হতে পারে, অথচ একটা ঘরানার জ্ঞান-কাঠামোর ভিতরে তাঁর প্রভাব হতে পারে গভীরতম। এই অর্থে তাঁর জীবনকে বলা যায় এক ফাঁকা তানপুরার খোলের ইতিহাস – নিজে কোনো সুর তোলে না, অথচ তাকে ঘিরেই বেজে ওঠে অন্য সবার সুর। এখানে উপস্থিতির চেয়ে অনুপস্থিতিই বেশি প্রশ্ন তৈরি করে – কেন তিনি কম বাজালেন? কেন তাঁর সংগীতের নথিপত্র এত সীমিত? কেন তাঁর শিষ্যদের ইতিহাসের ভেতরে তাঁর ভূমিকা খুঁজে বের করতে হয়, নিজে থেকে চোখে পড়ে না? আর কেন ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের ইতিহাসে প্রকাশ্য না হওয়াটা এতটাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল? তবে তাঁকে ‘ভুলে যাওয়া শিল্পী’ বলা পুরোপুরি যথাযথ নয়। রাষ্ট্র ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান তাঁকে স্বীকৃতি দিয়েছিল – ১৯৭৭ সালে পদ্মভূষণ , ১৯৯১ সালে সঙ্গীত নাটক আকাডেমি অ্যাওয়ার্ড , ১৯৯৮ সালে বিশ্বভারতীর ‘দেশিকোত্তম’ এবং পরে ‘সঙ্গীত নাটক আকাডেমি ফেলোশিপ’ তাঁর দীর্ঘ সংগীতজীবনের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির সাক্ষ্য। ফলে সমস্যাটি সম্পূর্ণ বিস্মৃতির নয়; বরং তাঁর ঐতিহাসিক গুরুত্বের তুলনায় তাঁর পাবলিক ভিসিবিলিটি কতটা সীমিত ছিল, সেই প্রশ্নের।
অন্নপূর্ণা দেবীকে নতুন করে আবিষ্কার করার অর্থ তাই কোনো ‘ভুলে যাওয়া শিল্পীকে’ শুধু আবার বিখ্যাত করে তোলা নয়। বরং প্রশ্ন তোলা—ভারতীয় সংগীতের ইতিহাস কীভাবে লেখা হয়েছে, কারা সেই ইতিহাসের কেন্দ্রে এসেছেন, আর কারা প্রান্তে থেকেও সেই ইতিহাস গড়ে দিয়েছেন।
মঞ্চের আলোয় যাঁরা ছিলেন, তাঁদের ইতিহাস আমরা সহজেই দেখতে পাই। কিন্তু সংগীতের ইতিহাস শুধু মঞ্চের ইতিহাস নয়। কখনও কখনও তার সবচেয়ে গভীর সুর তৈরি হয় মঞ্চের ঠিক বাইরে – একটা বন্ধ দরজার ওপাশে, যেখানে একটা শিশু প্রথম সুর ধরে ফেলেছিল; একটা ঘরের নীরবতায়, যেখানে একজন গুরু শিষ্যের হাত ধরে সুর ঠিক করে দিতেন; অথবা এমন এক নারীর নীরবতায়, যাঁর সংগীত নিজের কণ্ঠে যতটা উচ্চারিত হয়নি, তার চেয়ে ঢের বেশি বেঁচে থেকেছে অন্যের সংগীতে।
তিনি মঞ্চে খুব কম বাজিয়েছেন। কিন্তু তাঁর সুর থেমে থাকেনি। তা বাজতে থেকেছে অন্যের আঙুলে।
অন্নপূর্ণা দেবীর ঐতিহাসিক গুরুত্ব সম্ভবত এখানেই – তিনি আমাদের শেখান, অদৃশ্য হওয়া মানেই ইতিহাসের বাইরে চলে যাওয়া নয়। অদৃশ্যতাও ইতিহাসের একটি অংশ।
