সার্থক উদযাপন – পার্থ প্রতিম চ্যাটার্জী
হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে মহেন্দ্র মনে করতে থাকলো মুহূর্ত গুলো।পুলিশের লাঠিচার্জের লাঠির আঘাতে কপাল ফাটলো তার, তবুও বুকে চেপে ধরে রাখলো জাতীয় তিরঙ্গা পতাকা। রক্তে ভেসে যেতে লাগলো সারা শরীর আর ত্রিবর্ণ রঞ্জিত পতাকা।
প্রত্যন্ত গ্রামের এক প্রান্তিক পরিবারে যখন খবর এলো সেই বাড়ির ছোটছেলে মহেন্দ্র উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকের চাকরি পেয়েছে, তখন তাঁদের বাড়ি সহ পাড়ায় আনন্দের স্রোত বয়ে গেলো। মহেন্দ্রর দাদার গ্রামে ছোট মুদিখানার দোকান। তাতে যৎসামান্য যা আয় হয় তার থেকে মিষ্টিমুখ করালো পাড়ার সবলোককে। নতুন চাকরি তে যোগ দিয়ে সংসারের আর্থিক হাল কিছুটা ফেরাতে সমর্থ হলো মহেন্দ্র। চাকরি পাওয়ার দুই বছরের মাথায় বিয়ের পিঁড়িতে বসলো মহেন্দ্র। বাড়িতে এলো নতুন বৌ কল্যাণী। নতুন বৌয়ের রূপে কথায় ব্যবহারে সারা পাড়া মুগ্ধ। নতুন বাড়িতে এসে কয়েক দিনেই সকলকে আপন করে নিলো কল্যাণী। বিয়ের আড়ায় বছরের মাথায় মহেন্দ্র আর কল্যাণীর কোল আলো করে এলো ফুটফুটে একটি কন্যা সন্তান। সংসারের সব অপূর্ণতা ঢেকে গিয়ে, আনন্দে পরিপূর্ণ হয়ে উঠলো। মহেন্দ্রর একমাত্র ভাইপো, তার খেলার এক সঙ্গী পেয়ে খুশিতে মেতে থাকলো সারাদিন।
সবকিছুই যখন সাবলীল ভাবে এগিয়ে চলেছে, হঠাৎ করেই বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো খবর এলো, মহেন্দ্রর যে পরীক্ষা দিয়ে চাকরিতে নিয়োগ হয়েছে, সেই চাকরির নিয়োগের অস্বচ্ছতার অভিযোগে আদালতে কেস ফাইল হয়েছে। আশংকার আর আতঙ্কের মেঘ ধীরে ধীরে ঘনীভূত হতে থাকলো।
সব আশার আলো নিভিয়ে দিয়ে আদালতের নির্দেশে বাতিল হলো নিয়োগের প্যানেল। সংসার নতুন বৌ কন্যাসন্তান নিয়ে পথে বসলো মহেন্দ্র আর মহেন্দ্রর মতো হাজার হাজার শিক্ষক শিক্ষিকা।
শুরু হলো তাঁদের পথে নেমে আন্দোলন। হাতের চক ডাস্টার ফেলে মিটিং মিছিল সমাবেশ আন্দোলনে কাটতে থাকলো দিন। আন্দোলনের সব আয়োজন বৃথা হতে থাকলো, পেরিয়ে যেতে লাগলো দিনের পর দিন।
শেষে শুরু হলো রিলে অনশন। রাস্তায় পড়ে রইলো মহেন্দ্র আর মহেন্দ্রর মতো শিক্ষক শিক্ষিকারা।
দেখতে দেখতে রিলে অনশন পৌঁছে গেলো ১৪৯ তম দিনে। আর একদিন হলেই ১৫০ দিনে পড়বে তাঁদের রিলে অনশন আন্দোলন। তাই আগামীকাল আন্দোলনকে আরো তীব্র করে তোলার জন্য মিটিংয়ে বসেছে সবাই। এমন সময় বাড়ি থেকে তার ভাইপো কল্যাণীর ফোন থেকে ফোন করে বললো, ” কাকা স্কুলে বন্দেমাতরম এর সার্ধশতবর্ষ নিয়ে রচনা লিখে নিয়ে যেতে বলেছে, কি লিখবো বলে দাও। ” মহেন্দ্র বললো আগামীকাল আমাদের সকাল থেকে জোর আন্দোলন শুরু হবে, তোমাকে আগামীকাল বিকেলে বলে দেবো কি লিখবে।
পরের দিন দিগন্ত লাল আভায় ভরিয়ে দিয়ে নতুন একটা দিনের শুরু হলো। ১৫০ দিনের রিলে অনশন ক্লান্ত শিক্ষক শিক্ষিকাদের সাথে মহেন্দ্রও যোগ দিলো মিছিলে। হাতে তাদের জাতীয় পতাকা আর বিভিন্ন দাবিদাওয়া লেখা প্ল্যাকার্ড। বন্দেমাতরম এর সার্ধশতবর্ষকে সম্মান জানাতে, সবার কন্ঠে উচ্চারিত হচ্ছে বন্দেমাতরম ধ্বনি। মুষ্টিবদ্ধ হাত উপরে তুলে গলা ছেড়ে প্রতিবাদ জানাতে লাগলো সবাই। এমন সময় শুরু হলো পুলিশের লাঠিচার্জ, এদিক ওদিক ছুটে পালাতে লাগলো সবাই। হঠাৎ এক লাঠির আঘাত লাগলো, মহেন্দ্রর কপালের বামদিকে। গলগল করে ঝরে পড়া রক্তে ভিজে যেতে লাগলো পোশাক। নিজেকে কোনোমতে সামলেনিয়ে রক্তাক্ত শরীরেই এগিয়ে যেতে লাগলো মহেন্দ্র। এবার লাঠির আঘাত লাগলো হাঁটুতে, রাস্তায় লুটিয়ে পড়লো মহেন্দ্র। তবুও হাতে থাকা তিরঙ্গা পতাকাকে মাটিতে স্পর্শ করতে না দিয়ে বুকে চেপে ধরে থাকলো সে। রক্তের ধারা ভিজিয়ে দিতে লাগলো জাতীয় পতাকা কেও। জাতীয় পতাকার সব রংকে ঢেকে দিলো রক্তের লাল রং। চারিদিকে তাকিয়ে দেখলো, তার মতো অগণিত শিক্ষক শিক্ষিকা ভুলুন্ঠিত। ধীরে ধীরে দুচোখে নেমে আসতে লাগলো অন্ধকার। মহেন্দ্রর কন্ঠ থেকে অস্ফুটে বেরিয়ে এলো একটি শব্দ “বন্দেমাতরম”।
