একটিমাত্র সুখ – বিদিশা বিশ্বাস
চান করতে বিরক্তি। বোতলে খাওয়ার জল ভরতে। শুধু বিছানায় শুয়ে থাকতে ইচ্ছে করে, চিৎ হয়ে, কাৎ হয়ে, উঁপুড় হয়ে, কতরকম যে আরাম এলিয়ে থাকে বিছানায়, রত্না বিছানা হয়ে যেতে চায়। না খেয়ে না দেয়ে বিছানায় পড়ে থাকে। এভাবে বিছানায় শুয়ে শুয়েই একদিন মরে যাবে রত্না। চোখ বুজে চোখ খুলে তাই অনন্ত এক ফোঁটা জীবনকে বিছানা বলে জেনে, বিকেল পাঁচটায় টাইম কলের জল এলে হা-মুখ নর্দমা এক লাফে না পেরিয়ে এই বিছানাই রত্না সম্বল করে থাকে।নর্দমার কালো ফ্যানা তোলা জলে ব্যাঙ্গাচিরা যেভাবে ভেসে থাকে সুখ-অসুখ পেরিয়ে, রত্নাও তেমন করে বিছানায় গড়িয়ে গড়িয়ে সবটুকু সুখ চেটেপুঁটে খেতে চায় মুঠো উপচে হাত বেয়ে কনুই অবধি নেমে আসা আমের রসের মতো। হাত ছড়িয়ে শুয়ে থাকলে বগলের চুলে হাওয়া খেলে গেলে সুরসুরিতে রত্না একলা ঘরেই খিলখিলিয়ে ওঠে, দুপায়ের ফাঁকে যেখানে আলো বাতাস ঢুকতে পারেনা আজন্ম ইতিহাস, ফুটে ওঠা ভাতের হাঁড়ির উঠলে ওঠা ফ্যানের মতো ভরে ভরে জীবন চেখে দেখে রত্না।
নর্দমা পেরিয়ে তাই টাইম কলের জল বোতলে ভরা হয়না। টাইম কলের জল সময় মতো আসে, সময় মতো চলে যায়। বিছানায় শুয়ে থাকতে থাকতে জল ভরতে যাওয়ার সময় হয়না রত্নার। যে নর্দমা পেরিয়ে কল থেকে গলগলিয়ে বেরিয়ে এসে, ঘষা খাওয়া লাল সিমেন্টের উপর আছঁড়ে পড়ে জল, সেই কালো জলের ফ্যানাওয়ালা নর্দমার উপর পারাপারের জন্য পাতা থাকে থাইরয়েডে ভুগতে থাকা মহিলার, মসজিদের ডোমের মতো উঁচু হয়ে থাকা, পাছার মতো দামড়া এক পাথর। এই বাড়ির তিন ঘর ভাড়াটের সবাই ওই পাথরের উপর দিয়ে এদিক ওদিক করে। এক শানুদা ছাড়া। শানুদা ওপাশ থেকে এক আর দুই নম্বর ঘরের ভাড়াটে। ওর বাবা পঁয়তাল্লিশ নম্বর বাসের কন্ডাকটারি করতো। এই বাড়ির কারোর সাথে কথা বলেনা শানুদার বাবা। পাড়ার কারোর সাথেও ওকে কখনোই কথা বলতে দেখেনি রত্না। শানুদার গোমড়ামুখো বাবা আগে নাকি হা হা শব্দে হাসত। তারপর যেদিন বাস গুমটির জুয়ার আড্ডায় শানুদার বাবা দুশোসতেরো নম্বর বাসের ড্রাইভার গোবিন্দ মল্লিকের গায়ে হাত দিল, আর প্রায় অবশ হয়ে যাওয়া হাত নেড়ে লালায় জড়ানো গলার রগ ফুলিয়ে চিৎকার করে বলল, “তোর মাগীকে চুদেছি শুওরের বাচ্চা, আবার চুদবো, তুই খানকির বাচ্চা আঙুল চুষবি”, আর গুণে গুণে তার ঠিক ছয়দিন পরে যেদিন শানুদার সাত বছরের ভাই বড় পুকুরে তলিয়ে গেল, শানুদার বাবার হাসিও সেই সাথে মায়া কাটালো পৃথিবীর। প্রায় ঘণ্টা দুয়েক এঁফোড় ওঁফোড় জল থেকে তুলে আনা হয়েছিল শানুদার সাত বছরের ভাইকে, সাদা ফ্যাটফ্যাটে, কমলা রং লাগার আগে ক্লাবঘরের দেওয়াল যেমন ছিল, মে মাসের রোদ পড়লে যে দেওয়ালে কখনও সন্ধে নামতোনা, অবিকল ওরকম হয়ে গেছিল শানুদার তলিয়ে যাওয়া ভাইয়ের মুখ, জলে ডুবে থেকে থেকে সাদা ফুলে ওঠা চামড়া কেমন যেন আলগা হয়ে গেছিল গা থেকে, সদ্য মাথা গজানো আগাছাকে মাটি থেকে এক টানে উপড়ে ফেললে যেমন খানিকটা মাটি উঠে আসে প্যাতপ্যাতে শিকড়টার সাথে, ডুবে যাওয়া ছেলের কপালের চামড়াও ভিজে যাওয়া কাগজের মতো কারোর হাত লেগে গুটিয়ে সরে এসেছিল একদিকে। শানুদার মা, শম্পা জেঠিমা একছুটে ঘরে গিয়ে শানুদার গেলবারের জন্মদিনের একটা ছবি নিয়ে এসেছিল, পিছনে ফ্লেক্সে ঝুলে থাকা সমুদ্র, আর হেলে পড়া নারকেলগাছের সারি। সামনে দুদিকে প্লাস্টিকের টবে রাখা রঙিন পাতাবাহার। মাঝখানে থতমত বাবা-মার সামনে ক্যাপবন্দুক কোমড়ে গোঁজা শানুদা আর ওর পাশে ফুটফুটে জ্যান্ত ভাইটা কেমন ড্যাবড্যাব করে চেয়ে আছে, বাকি মুখটার সাথে খাপ খায়না চোখের এরকম লম্বা লম্বা পাতা নিয়ে ওই ছবিতে আজন্মকাল ড্যাবড্যাব করে চেয়ে থাকবে ডুবে যাওয়া ভাইটা, সেই ছবি দেখিয়ে শম্পা জেঠিমা জড়ো হওয়া ভিড়ের সকলকে এক এক করে ভূতে পাওয়া মানুষের মতো বিড়বিড় করে বোঝাচ্ছিল, ছবির ছেলেই তার আসল, বড় পুকুরে দুঘন্টা ডুবে থেকে যে ছেলের শরীর ফুলে ঢোল, ডান পায়ের কড়ে আঙুলের নখের কোণটা খানিক খোবলানো, না জানি কোন জলজ জানোয়ার মহোল্লাসে কামড়ে খেয়েছে ওইটুকুন মাংস, হুড়োহুড়িতে কার হাত লেগে কুঁচকে একদিকে সরে গেছে কপালের চামড়া, সে ছেলে ওর নয়।
এমন মরে যাওয়া তো আর রোজ হয়না, কস্মিনকালে এক আধবার, তাই যে কোনো রংচটা মামুলি বেঁচে থাকাকে গো হারান হারিয়ে শুধু মরে যাওয়াটাই মনে রাখে সবাই। তখন গল্প হয়ে যাযাবরের মতো এপথ সেপথ ঘুরতে হয় তাকে। গল্পে নাক খ্যাদা কেলেকুষ্টি ভাই তখন ফর্সা রাজপুত্তুর। এমন সত্যি-গল্প এতজনের মুখে এতবার শুনে নিজেকে ভাগ্যবান মনে করে রত্না। তবে রত্নার সবচেয়ে প্রিয় বেবিদিদার গল্প। বেবিদিদা যতবার এ গল্প বলে, শানুদার ভাই ততবার ডুবে যায় বড় পুকুরের জলে। দম বন্ধ হয়ে কেমন আছাড়িপিছাড়ি করে শানুদার সাত বছরের ভাই, ভরদুপুরে পুকুরের জলে মধুর মতো চুঁয়ে পড়া সূর্যের ঘোরলাগা আলোয় তলিয়ে যেতে যেতে শেষবারের মতো তাকিয়েছিল কি শানুদার ভাইটা, মরে যাওয়াকে স্বপ্নের মতো টলটলে আর রূপকথার মতো অবিশ্বাস্য লাগে রত্নার। বেবিদিদা ওদের এক্কেবারে পাশের ঘরের ভাড়াটে, বেবিদিদার ঘরের ডানদিকের দেওয়ালটাই রত্নাদের ঘরের বাঁ দিকের দেওয়াল। বেবিদিদার ঘরের ভিতরে ওই দেওয়ালে ঝোলে অনেক ছোট বড় ঠাকুরের ছবি। অনেক ঠাকুরের ছোট বড় ছবি। বাঁধানো ফ্রেমের উপরে ছোট্ট ছোট্ট দুটো পেরেক থেকে ঝোলে প্লাস্টিকফুলের মালা। সাদা প্লাস্টিকের রজনীগন্ধা, লাল প্লাস্টিকের জবা, হলুদ প্লাস্টিকের গাদা। আর একটা কি যেন ফুল, ওটার সত্যি হয়না, শুধু প্লাস্টিক হয়। রত্নাদের ঘরের ভিতর সেই দেওয়ালেই ঝোলে দুকোণ টাঙ্গানো মশারি, আর মশারির দঁড়িতে চব্বিশ ঘণ্টা ঝোলে একটা লাল চৌকো প্রিন্টের গামছা। পুরনো হয়ে যাওয়া নীলচে মশারির গায়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে অসংখ্য কালো কাপড়ের তাপ্পি। রাতের বেলা আর দুটো কোণ টাঙ্গিয়ে মশারির ভিতর শুয়ে থাকে রত্না। ঘুমে তখন চোখ জুড়িয়ে থাকে ওর, আর ঘুম জুড়িয়ে থাকে ঠিক শানুদাদের বয়সী একটা ছেলে, স্বপ্নের মধ্যে যাকে রোজ মরে যেতে দেখে রত্না। রোজ, প্রতিদিন। কারা সব লাঠি দিয়ে মারে ছেলেটাকে, স্পষ্ট নয়, কাঁপা কাঁপা, চলন্ত ট্রেনের জানালার বাইরের দিগন্তরেখা যেমন বেঁকে বেঁকে যায়, স্বপ্না সেভাবে ছেঁড়া ছেঁড়া দেখে কিভাবে ঠিক একই কায়দায় ছেলেটার মাথাটা দুভাগ হয়ে যায় রোজ, ঘিলু ছিটকে পড়ে মাটিতে, আর মাথার ভিতর থেকে ঝুলে থাকে আরও খানিকটা। রত্না বুঝতে পারে, ঘিলুটা চটচটে, পাশের বাড়ির শ্যামলকাকু যে চামড়ার কারখানায় কাজ করে, সেখানে এক বছর বিশ্বকর্মা পুজোর জন্য দিদি একবার একটা কাগজের চাঁদমালা তৈরি করতে গিয়ে আটা গুলে আঠা বানিয়েছিল, অবিকল সেই আঠার মতোই দেখতে ছেলেটার ঘিলু, লাঠির বাড়িতে যে এক খাবলা ঘিলু ছিটকে পড়েছিল রাস্তার উপরে, আর খানিকটা ঝুলছিল ছেলেটার ভেঙে যাওয়া মাথা থেকে। ফ্যানা ফ্যানা থুতুর মতো। রত্না ওর স্বপ্নে ছেলেটাকে রোজ একটু একটু করে মরে যেতে দেখে। ছেলেটা কোনদিন বেঁচে থাকেনা, রত্নার স্বপ্নে আটকে পড়ে কোনদিন পালাতে পারেনা কোথাও। রোজ রোজ একইভাবে মার খেয়ে মাথা দুভাগ হয়ে মরে যায় ছেলেটা। রত্নাও জানেনা স্বপ্নে কিভাবে কাউকে বাঁচাতে হয়, স্বপ্নের বাইরেও কেউ কখনো কাউকে বাঁচিয়েছে বলে শোনেনি রত্না, তাই শুধু ওই থকথকে আঠালো ঘিলুই রত্নার স্বপ্নের গায়ে লেগে থাকে, আর ঘিলুর ছিটকে যাওয়ার দৃশ্য নেশার মতো ঝিম ধরায় রত্নার চোখে, ঠিক যেভাবে সন্ধ্যার পরে বাড়িতে বাড়িতে আলো জ্বলে উঠলে ভাঙা, ইট বার করা পাঁচিলের এক কোণের ঘন হয়ে আসা অন্ধকার থেকে অবিরাম ডেকে চলে ঝিঁ ঝিঁ পোকারা, ঠিক যেভাবে রোজি ভাবি ঘ্যানঘ্যানে একটানা কেঁদে গেছিল কপিলা আন্টি মরে যাওয়ার পর। রোজি ভাবি কপিলা আন্টির ছেলের বউ, গেল বছর এপ্রিলে ওদের বিয়েতে এবাড়ির সক্কলকে ঝেঁটিয়ে নেমন্তন্ন করেছিল ওরা, রত্নাকে রোজি ভাবির পাশে বসিয়ে দিয়েছিল কপিলা আন্টি, সবুজ লাল চিকচিকে কাগজে মোড়ানো যা কিছু গিফট পেয়েছিল রোজি ভাবি, সব চোখে চোখে রাখার দায়িত্ব ছিল রত্নার। রত্না যত্ন করে গুছিয়ে রেখেছিল সব, একটাতেও লোভ দেয়নি, শুধু ভাবির সাজগোজের জিনিস থেকে একটা গোলাপি রঙের লিপস্টিক কোনো এক ফাঁকে নিজের কড়কড়ে মাড় দেওয়া ব্রায়ের ভিতর লুকিয়ে ফেলেছিল, আর ভালো করে বুকের উপর টেনে দিয়েছিলো খয়েরী রঙের ওড়না। সেই স্বপ্ন আর স্বপ্নের ভিতর থোকাথোকা ফুলের মতো ঘিলু দেখতে দেখতে রত্না তখন পাশ ফিরে জানালার দিকে ঘুরে শোয়, ঘরের একটিমাত্র জানালা, জানালার ওদিককার বাড়িতেই থাকে রোজিভাবিরা, কপিলা আন্টির ছেলের বউ। গত পরশু কপিলাআন্টি মরে গেলে যে ঘ্যানঘ্যানে একটানা কেঁদেছিল অনেকক্ষণ, এতক্ষণ যে কখন যেন অজান্তে সে শব্দ মিশে গেছিল হইচই, হল্লা আর কোলাহলের সাথে, যেভাবে ঘড়ির টিকটিক মিশে যায় পাখার বনবন শব্দে। কপিলা আন্টির পায়খানা হতোনা, পেটের মধ্যে তাই পায়খানার পাইপ ফেটে পায়খানার ছ্যায়লা পড়েছিল সারাপেট। ডাক্তারকেই তখন পেট কেটে ছড়ানো সবটুকু গু গ্লাভস হাতে বার করতে হয়েছে, তারপর দুপাশের চামড়া একজয়গায় করে বড় বড় সেলাই, তাও বাঁচানো যায়নি কপিলা আন্টিকে। কোনো এক ভুলতে বসা সময়ে বিহার থেকে চলে এসেছিল বলেই কপিলা, আন্টি হয়, কাকিমা বা জেঠিমা হয়না। সেই কপিলা আন্টি মরে গেল গত পরশু। মরে যাওয়ার আগে প্রায় মরে যাওয়া কপিলা আন্টি রোগে ভোগা ঘরে ঘড়ঘড়ে পাখার দিকে ফ্যালফ্যালে চেয়ে চৌকিতে ঠায় শুয়ে থাকত, বাইরে খোল করতাল নিয়ে তারস্বরে চেঁচাতো বিহারী কীর্তনের দল। বিরতিহীন। বেবিদিদার সাথে তাই যেদিন ওর ঘরের দরজার সামনে দাঁড়িয়েছিল, কপিলা আন্টিকে রত্নার জ্যান্ত ভূত বলে মনে হয়েছিল, ওর পেটের মাঝখান বরাবর ডাক্তার পেটের মধ্যে ছ্যায়লা পড়া পায়খানা গ্লাভস হাতে বার করার পর যে সেলাইটা টেনে দিয়েছিল, সেটার চারিদিকে জমে উঠেছিল থকথকে পুঁজ, পেটের দুপাশ দিয়ে রস গড়িয়ে ফোঁটা ফোঁটা হয়ে পিঠের নিচে পাতা চাদরটাকে স্যাঁতস্যাঁতে করে দিয়েছিলো। পেটের মাঝ বরাবর ওই সেলাইটাকে দরজার কাছ থেকে একটা লালচে হলুদ তেঁতুল বিছে মনে হয়েছিল রত্নার। কপিলা আন্টি তখন রত্নাকে দেখেনি, শুধু অপলক চেয়ে ছিল সিলিংয়ের পেটমোটা কালো কালো ছোপওয়ালা টিকটিকির দিকে যেটা পাখার ব্লেডের পাশ দিয়ে উঁকি মেরে দেখছিল মাকড়শার জালে আটকে পড়া একটা কাঠরঙা মথকে।
যে বড় পুকুরের জলজ কোন জানোয়ার ঠুকরে খেয়ে নিয়েছিল শানুদার সাত বছরের ভাইয়ের ডান পায়ের কড়ে আঙুলের কোণ, সেই পুকুরটাই কোনদিন চোখে দেখেনি রত্না, মাটি ফেলে ফেলে ওখানে এখন তিনটে বাইশতলা ফ্ল্যাট। চ্যাপ্টা চ্যাপ্টা। রাতেরবেলা ওদিকে তাকালে মনে হয়, ইয়া বড় মোবাইল ফোন। ওই পুকুরধারে প্রায় পঞ্চাশ ঘরের একটা ঝুপড়ি ছিল। রত্নার কিছুই মনে নেই। ও তখন তিনমাসের এইটুকুন। দিদির কাছে শুনেছে রত্না, রাতবিরেতে কিভাবে যেন একদিন আগুন লেগে যায় ওই ঝুপড়িতে, কালচে ধোঁয়া গলগলে বমির মতো উগরে ওঠে পাক্কা দেড়দিন। ছাই হয়ে যাওয়া সংসার আগলে হা হুতাশ করে সর্বহারার দল। তারপর বয়ে যাওয়ার নিয়মে একদিন হা হুতাশ বন্ধ হলো, পুড়ে যাওয়া সংসারের দিকে পিছন ফিরে এ ও মিশে গেল অন্য অন্য ঝুপড়িতে, পোড়া গন্ধ গলায় করে অপেক্ষায় মরলো বুড়ো বুড়ি, জোয়ানমদ্দরা নেশায় নেশায় বুড়ো হলো, আর সেদিনের সব কোলের শিশু আদি অনন্ত গুলিয়ে ফেলে হয়ে বসলো জোয়ানমদ্দ। ওই পাড়ারই ছেলে বাবুদা। খুব ভালো ইলেকট্রিকের কাজ জানে। তবু বাবুদার সাথে দিদির বিয়ে মেনে নেয়নি মা, মা বলেছিল ছেলের চরিত্রের দোষ আছে। চরিত্রের দোষ দিদির কাছে এমনকিছু বড় ব্যাপার ছিলনা কখনোই। রত্না জানতো, দিদি একদিন ঠিক পালিয়ে যাবে। দিদি ওর থেকে সাত বছরের বড়। দিদি আর রত্না একসাথে তাই পাড়া বেড়িয়েছে, কুল খেয়েছে, শাড়ি পরে দিদিমনি দিদিমনি খেলেছে, ঝগড়া করে তিনদিন কথা বন্ধ করে থেকেছে হাজারবার, কোটিবার, লক্ষবার। সেবার সরস্বতীপুজোর দিন দিদি যখন মায়ের একটা বেগুনি রঙের খসখসে শাড়ি পরে ওর বন্ধুদের সাথে হেঁটে হেঁটে ইশকুল যাচ্ছিলো, শানুদা নাকি একপাল ছেলে ছোকরা নিয়ে গিয়ে দিদিকে ওর সাথে হেদোপার্কে যেতে বলেছিলো, হেদোপার্ক দিদির পছন্দ নয় বলে যায়নি, সিনেমা দেখতে যেতে বললে দিদি নিশ্চয় যেতো। দিদি এসব কিছু বলেনি, কিন্তু রত্না জানে, দিদি অনেক ছেলের সাথেই রক্সিসিনেমার অন্ধকারে লেপ্টালেপ্টি করেছে। এমনকি দিদি যেদিন বাবুদার সাথে পালিয়ে মন্দিরে বিয়ে করল, তার সাতদিন আগেও দিদি সিনেমায় গেছে সন্তুদার সাথে। রত্না শুনেছে দিদি এখনও সিনেমায় যায়। আর বাবুদা দিঘা যায় পিয়ালিদির সাথে। দিদির সামনে পিয়ালিদিকে কক্ষনও পিয়ালিদি বলতে পারেনা রত্না, পিয়ালি বলতে হয়। খুব রেগে গেলে দিদির চোখ ছলছল করে, আর রত্না নিজের জিভে কেমন নোনতা স্বাদ পায়। ছোটবেলায় রত্না যেভাবে কষকষে টক ফুচকা খেলেই দিদি পাশে দাঁড়িয়ে চোখ আর ঠোঁট কুঁচকে মাথা ঝাঁকাতো এদিক ওদিক আর টপ করে মুখে পুরে দিত বাপিকাকুর দোকানের সামনে পরপর সাজিয়ে রাখা কাঁচের বয়ামের একটার থেকে গোলগাল চিনিঠাসা মোরোব্বা। দিদি কোনোদিন টক খেতে পারেনা।ওর দাঁত টকে যায়। রত্নার দাঁত টকেনা, তাও রত্না জানে দাঁত টকে গেলে মাথার ঠিক কোথায় এনামেলের হাঁড়ির নিচে লেগে থাকা ভাত স্টিলের হাতা দিয়ে চেঁছে তোলার একটা খ্যানখ্যানে আওয়াজ হয়।
দিদি যেদিন পালিয়ে গেল, মা বাড়ি ফিরে কাঁদলোনা, কাউকে কিছু বললোনা, রত্নাকে ভাত বেড়ে দিয়ে নিজে খেয়ে দিদির পুরনো ছেঁড়া নাইটি, যেটা কখনও ন্যাতা কখনও পাপোশ হয়ে পায়ে পায়ে ঘুরতো সারাঘর, দিয়ে সকরি মুছলো, তারপর স্নান করে শুয়ে পড়ল উদলা গায়ে। বাবা আর একটা বিয়ে করে বাড়ি ছেড়েছিল আজ প্রায় ষোল বছর, মা তবে থেকেই শোয়ার সময় জামা গায়ে রাখতে পারেনা, মার গা জ্বলে। বাড়ি থাকলে ডিসেম্বরের শীতেও মা রাতেরবেলা হুস হুস ঠান্ডা জল ঢালে মাথায় আর ভিজে টসটসে চুল এলিয়ে শুয়ে পড়ে খালি মেঝেয়। মা আয়ামাসির কাজ করে প্রাইভেট নার্সিংহোমে। সপ্তাহে চারদিন নাইট ডিউটি। অন্য কোনো আয়ামাসি ছুটি নিলে মা সাগ্রহে তাদের নাইটডিউটি করতে রাজি হয়, নার্সিংহোমের কনকনে এসির সামনে মা চেয়ার পেতে বসে থাকে।
ছোটবেলায় তাই রত্না আর দিদি দিনের বেশীটাই থাকত দোলনদিদিদের ঘরে, দোলনদিদিরা আগে বেবিদিদার ঘরে ভাড়া ছিল, দোলনদিদি দিদির পিঠোপিঠি, ওরা দুজন একসাথে বেণী দুলিয়ে ইশকুল যেত। দোলনদিদি যে বাংলা ছড়া এক নি:শ্বাসে বলে যেত আর দিদি সরু সরু চোখে তাকিয়ে দাঁত দিয়ে চিবিয়ে খেত ঠোঁটের সবটুকু চামড়া। দোলনদিদির বাবা স্কাইলাইন কমপ্লেক্সে সিকিউরিটি গার্ডের কাজ করত, সারারাত ডিউটি করে বাড়ি ফেরার সময় বড় রাস্তা পার হতে গিয়ে দূরপাল্লা বাসের ধাক্কায় একদিন মাজা ভেঙে যায় দোলনদিদির বাবার, তারপর মাঝদিয়া থেকে দোলনদিদির ছোটমামা এসে নিয়ে যায় ওদের। রত্না আর দিদি ফিরে আসে নিজেদের ঘরে। বিছানায় শুয়ে দুই বোন এর ওর পিঠে একশবার করে সুরসুরি দিত, দিদির পিঠ ভর্তি পক্সের দাগ, আর রত্নার পিঠে সাদা সাদা খড়ি। দিদি পালিয়ে গিয়ে বাবুদাকে বিয়ে করার পর থেকে বাড়িতে একলা রত্না। গোটা বিছানাটা তাই ওর। রাণাদা বলেছে পুজোর সময় ভিড় সামলাতে নতুন নতুন মেয়ে নেয় অনেক চকচকে ব্রা প্যান্টির দোকান, সেখানে একটা কাজ জোগাড় করে দেবে ওকে। তখন আর দুপুরবেলা শুয়ে বসে কাটাতে পারবেনা রত্না। বিছানায় শুয়ে শুয়ে নিরলস আকাশ পাতাল ভাবতে রত্নার কেমন একটা নেশা নেশা লাগে। ও মাঝেমাঝেই তাই শোলার ঝাঁটা দিয়ে বিছানাটা ঝেড়ে নেয়, ভাঁজ পড়া চাদর টানটান করে দেয়, আর জলের ধারে ঝুঁকে পড়া গাছের পাতা যেভাবে নি:শব্দে ঝড়ে পড়ে জলে, ঠিক সেভাবেই হাত পা ছড়িয়ে শুয়ে পড়ে রত্না, বিছানার স্যাঁতস্যাঁতে ঠান্ডা বুকের নীচ অবধি জামা তুলে পেট দিয়ে শুষে নেয় ও, আর কিছু চায়না রত্না, বিছানার সাথে মিশে যাওয়া ছাড়া। সেই যে কখন থেকে শুয়ে আছে, চান করতে যাওয়া হলোনা আজও। জল ভরতেও না। না খেয়ে না দেয়ে সেই যে টুপ করে খসে পড়েছে বিছানায়, আর একবারও উঠে বসার কথা রত্নার মনেই আসেনি। খিদে পায়নি, কে জানে মাঝখানে কখনো চোখ লেগে গেছিলো কিনা। রত্না জানে ঘুম আর জেগে থাকার মধ্যে আসলে কোনও তফাত হয়না, যেভাবে তফাত হয়না বেঁচে থাকা আর মরে যাওয়ার মধ্যে। একদিন রত্না আর বিছানার মধ্যেও কোনও তফাত থাকবেনা, ততদিন অবধি শুয়ে থাকবে রত্না। পিঠ টানটান করে বুক অবধি জামা তুলে কখনো চিৎ হয়ে, কখনো কাৎ হয়ে, কখনো উঁপুড় হয়ে শুয়ে থাকবে ও। চোখ খুলে চোখ বুজে এলিয়ে থেকে একদিন নিজেই সবটুকু আরাম চেটেপুটে খেয়ে নেবে রত্না, কাড়িয়ে কুড়িয়ে যেখানে যতটুকু, তার সবটাই । পুরোটাই। সেই তো ওর একটিমাত্র নিরবচ্ছিন্ন সুখ।
