ভিনদেশী তারারা – দীপশিখা
কাল খুব বৃষ্টি হলো জানিস। Hurricane Rachel. কাচের জানলা মনে হচ্ছিল গুড়িয়ে দেবে বৃষ্টি। আমি বৃষ্টি পাগল মানুষ তাই আমার ভালো লাগার কথা.. কিন্তু লাগেনি ভালো। ভয় লাগছিল, এত শব্দ, উন্মাদিনীর মতন ঝাঁপিয়ে পড়ছে বৃষ্টিধারা.. এত অতিরিক্ত প্রাণ, উত্তেজনা, আমি এখন কাচের জানলার এদিকের মানুষ। ওদিকের পৃথিবী অজানা, অচেনা না কিন্তু পরিচিত পালটে গিয়ে নখ, দাঁত বেরিয়ে এলে যেমন লাগে।
এই রকম রাতেই তো আমি প্রথম মৃত্যু দেখি.. তারপর এই রকম বৃষ্টির দুপুরে., তারপর আরেকবার খুব ভোরে..
প্রলয়ের মতো দুর্ঘটনাগুলো ভিতরে ক্ষত ছেড়ে গিয়েছে।
তিনটে মেয়ে তিন রকমের মানুষ তিন ভাবে মারা গেল, হারিয়ে গেল।
একবার স্কুল থেকে ফিরছি পরীক্ষা দিয়ে, খুব খুশি ভালো হয়েছে ফিজিক্সের পরীক্ষা, এক হাতে প্রশ্নপত্র দুলছে আরেক হাতে Cadbury Perk. বাড়ির কাছাকাছি যাওয়ার আগেই বুঝলাম কেউ একজন তার পরীক্ষা পাস করতে পারেনি.. ডাহা ফেল! ! বাপের বাড়ি থেকে এক মাথা বৃষ্টি নিয়ে দৌড়িয়েছিল, বরকে খেতে দেবে, লাঞ্চে বোধহয় ভাপা ইলিশ ছিল, এক ঘণ্টা পর ফোনে জানানো হয় আগুন নাকি তাকে ভালো বউ না হওয়ার শাস্তি দিয়েছে.. গ্রাস করেছে তাকে, খুব চিৎকার করেছিল নাকি “আমাকে মেরো না!” কিন্তু আগুন নিষ্ঠুর। একবারও তাকে রেহাই দেওয়ার কথা ভাবেনি।
আরেকবার আমার প্রিয় বান্ধবী, ওকে সবাই বোকা বলতো, পাগলও বলতো ইচ্ছে হলে, মাঝে মাঝে শুনতাম বলতো বিয়ে দিয়ে দাও! ভস্মে ঘি ঢালছো! গান, নাচ, পড়াশোনা কিছু পারতোনা, শুধু অল্প একটু হাসি ফুটে উঠতো একটু পুরু ওর ঠোঁটের কোণায়।
ওকে আমি শাসন করতাম, বুঝিয়ে দিতাম যে ওরা কথার কথা না, কথা শোনাচ্ছে তোকে। জবাব দে। চুপ করে শুনলে বোকা বলে। চোখ দিয়ে জল গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়লে ন্যাকা বলে। গুমরে গুমরে মরলে ধ্যাতা বলে।
কিন্তু পারিনি ওর মধ্যে বিদ্রোহের কোনো কালবৈশাখী তুলতে। বরঞ্চ শান্ত পায়ে, মৌন এক সাধিকা যেন শুধু মৃত্যুকে মুক্তি ভেবেই স্বেচ্ছায় সমাধিস্থ হলো, নীল শরীরে তখন তাকে কোনো দেবীর চেয়ে কম লাগছিল না! এত বৃষ্টিতেও সেই দুপুরে আমার চোখের জল মিশে যায়নি, নির্লজ্জের মতন স্পষ্ট ছিল।
আমি শুধু উত্তর পাইনি, এই যে মানুষটাকে এত কৌশলে নির্মূল করতে হলো, তাকে যদি একবার ভালোভাবে বলতো “আমার এক প্রেমিকা আছে, আমি তার সাথেই বিছানায় শোবো, তোমার পাশে.. তোমার আপত্তি নেই তো!” আমি জানি সে বলতো, “না, আমি তো .. আমি তো.. আমি তো..” আবার অল্প হাসতো, আবার ওকে মনে করাতে হতো যে মানুষের মতন ঝাঁপিয়ে উল্টো দিকের অবয়বটাকে ক্ষতবিক্ষত করে দে, তোর অধিকার, তার সীমা বুঝিয়ে দে!
কিন্তু সেই দুপুরে ওই বৃষ্টির হাহাকারে আমার কথা তার কান অবধি পৌঁছয়নি।
শেষ রাতে যখন আরেকজন এমনভাবে তার সমস্ত কিছু পরিত্যাগ করে চলে গেল, শুধু কাদা মাটিতে মাখামাখি রয়ে গেল পায়ের ছাপ। পুকুরে কত শালুক ফুটেছিল, কী শান্ত নীল জল, আরও শান্ত তার নিথর দেহে অভিমান।
ভালোবাসা তাকে গ্রহণ করেনি। ভালোবাসা তার জন্যে হাত বাড়ায়নি, জানলার এদিক থেকে ওদিকের ছায়া ছায়া ভিড়ে বারবার জিজ্ঞেস করেছে, “এই আমার দরজাটা খুলে দিবি!”
কেউ খোলেনি, কেউ শুনেও শোনেনি। তাই জং ধরা জানলার পাল্লা একটা খুলে পড়ে যেতেই, সে ভালোবাসার পাশে পাশে শালুকের ঘন কালো জলবনে হারিয়ে গিয়েছিল।
এখন রাত তিনটে এখানে। তোর বোধহয় দুপুর সাড়ে তিনটে ওখানে।
এই বৃষ্টি কি তোর কাছেও এসেছে? তুই কি আমায় অনুভব করতে পারছিস!
আমি কি একা? না তুই আছিস!
দীপশিখা চিত্রশিল্পী, লেখিকা / ক্যালিফোর্নিয়া নিবাসী


