‘আনন্দযজ্ঞে তোমার মধুর আমন্ত্রণ’ – সুপর্ণা ভট্টাচার্য
হুগলি নদীর ধারটিতেই একাকী একটি কোয়ার্টার ছিল আমাদের বাসা। নীল আকাশের সাদা মেঘের ভেলা দেখলেই মনে বলত,এবার শরৎ এলো। বাবা মহালয়ার দিন আমাদের তখনকার দিবানিশি সঙ্গী রেডিয়োতে জোরে মহালয়া চালাতেন।আমাদের ঘর উঠোনে ছড়িয়ে যেত বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের গভীর নাদ থেকে ওঠা কন্ঠস্বর।এক সম্মোহিত করা সুরে দেবীর মর্ত্যে আগমনের বর্ণনা,অসুর বধের সময় উত্তেজিত অথচ চিৎকৃত নয়। সেদিন চরাচর জুড়ে শুধু ‘বাজল তোমার আলোর বেণু’। এখন তেমন প্রাণের হয়ে ভুবন মাতে আর কই?একটু ভাবুক গোছের ছিলাম,তাই পুজোয় নতুন জামা জুতোর থেকে সোনাঝরা রোদ্দুর পছন্দ ছিল খুবই। মা পা মেশিনে বুকে ফ্রিল দেওয়া ঘটি হাতা ফ্রক বানিয়ে দিত, মনে আছে,ডিসিএম থেকে কাপড় কেনা হত। কী নরম রঙ আর ডিজাইন।আর চেনা এক দোকান থেকে কালো নিউকাট জুতো। বাবা কিনে আনত শারদ পত্রিকা দেব সাহিত্য কুটিরের। পরে আনন্দমেলা,কিশোরভারতী আসত। আরো বড় হতে দেশ,আনন্দবাজার,আজকাল। ঘটি হাতা ফ্রক বদলে শাড়ি। আমাদের বাড়ির আশেপাশে কোথাও কোন পুজো মণ্ডপ ছিল না।
হয়ত বাবার হাত ধরে একটু দূরের মণ্ডপ,না হলে ঘরে বসে উপুড় হয়ে শারদীয় পত্রিকায় চোখ। মা কি নতুন শাড়ি পরত? মা যে ভারি সুন্দর,শান্ত ,বৃষ্টিধোয়া মেঘের মত ছিল। হেমন্ত নারী যেন। আছে,তবু যেন জোরালো ভাবে নেই। আমার মা সাদা আর হালকা ছাই রঙ পছন্দ করত বরাবর। এখন তো মায়ের বের হতে কষ্ট। আমরা ম্যাক্সি বা হাউস কোট কিনে দি। এখন মায়ের পুজো আমাদের কলিং বেলের শব্দের পথ চেয়ে।
হাইস্কুলে উঠতে মন আনচান বন্ধুদের সঙ্গে হৈ হৈ করার। এদিকে পাড়ায় থাকি না যে বন্ধুদল থাকবে। মা পাঠিয়ে দিত আমাকে মেজ মামার বাড়ি। মেজমামা থাকতেন সরকারি আবাসনে। দিদা,মেজমামা আর আমার প্রায় সমবয়সী বড় মামার দুই ছেলে। বড় মামা থাকতেন স্ত্রী সহ মুম্বাই। এবার দুগ্গা পুজো এলো নতুনভাবে জীবনে। কাক ভোরে স্নান করে ফল কাটা,বন্ধুরা,হাতে হাত ধরে মণ্ডপে মণ্ডপে ঘোরা,এক পংক্তিতে বসে ভোগ খাওয়া,কোনো সুঠাম যুবকের দিকে অপাঙ্গে তাকানো,কোন ছেলে লুকিয়ে কাকে অষ্টমীর অঞ্জলি দেওয়ার সময় ফুল দেওয়ার ছলে হাত ছুঁয়ে দিয়েছে,তাই নিয়ে হাসাহাসি,বিসর্জনের দিন লড়িতে উঠে ‘বলো দুগ্গা মাঈ কি,,জয়,আসছে বছর আবার হবে’,তারপর আবাসনের প্রতি বাড়িতে ঘুরে ঘুরে বিজয়া সারতে যাওয়া। সে এক অনিন্দ্যসুন্দর সোনালী দিন। আজ সে দুই মামাত ভাইয়ের একজন আমেরিকায়,একজন কলকাতায়। দিদু মামা, পরবর্তীতে মামা বিয়ে করেন,সেই মামী,মামাত বোন কেউ আর ইহজগতে নেই। আমার লিখতে লিখতে সেই আবাসনের কত বন্ধুর মুখ মনে পড়ছে। মনে পড়ছে মামাত ভাইদের সঙ্গে খুনসুটি,দিদার হাতের নিরামিষ তরকারি,নাড়ু।মেজমামার আমাকে পনিটেল করে দেওয়া।কী গুচ্ছ চুলের রাশি যে ছিল আমার।ওই যে প্রাণের ঠাকুর বলে গেছেন অমোঘ কথা,’রাতের সব তারাই থাকে দিনের আলোর গভীরে’।
তারপর তো পাকা রোমান্টিক এই আমি প্রেম করলাম থিয়েটার করতে গিয়ে,নাহ,প্রেম করার ইচ্ছা তখন অন্তত ছিল না। তুই,তোকারি,দাদা বোনের সম্পর্ক ছিল,কিন্তু ওই যে করেই হোক,প্রেমটা হল। ,বিয়ে করে নিলাম একুশ পার করেই। বরের বয়স সাতাশ। বরের প্রাইভেট চাকরি,কী আর এমন উপার্জন!তবু আমরা পুজোয় বেশ রাজসিক ভাবেই ঘুরতাম। গাড়ি ভাড়া করে প্রতিবছর কলকাতায় গেছি সপরিবারে মণ্ডপ ঘুরতে। ওহো বলা হয়নি,আমি নদীর ধার থেকে দূরে গেলেও আছি এখনও একই মফস্বলে। তাই কলকাতায় যেতে সময় লাগে। পুত্র হল যখন, তখন ধীরে বন্ধ হল কলকাতার পুজো দেখতে যাওয়া। পুত্র বড়ো হতে হতে থিম পুজোর প্রবেশ ঘটে গেল। বিভিন্ন পুরস্কার,কী অপূর্ব সব মণ্ডপ,আলোর প্রতিযোগিতা,থৈ থৈ ভিড়,প্রতিমা দেখতে বিশাল লাইন। দমবন্ধ হতে লাগল। বার দুয়েক ছেলের হাত ধরে যাওয়ার চেষ্টা করে একবারে পূর্ণচ্ছেদ। ছেলে বড়ো হতে লাগল,আমি প্রৌঢ়া। ছেলের বন্ধুবৃত্ত হল। ম্যাডক্স স্কোয়ারে আড্ডা হল,সারা রাত পর বাড়ি ফিরতে লাগল পাখির ডাকের সঙ্গে। আমি একটু আধটু আমার নাট্যদলের ছেলেপুলেদের সঙ্গে আশেপাশের মণ্ডপ ঘুরতে যেতাম,একসাথে খাওয়া দাওয়া করতাম।একসময় সেটাও বন্ধ করলাম। হাঁটু জানান দিতে শুরু করল যে,এ ভার তিনি আর বহন করতে পারছেন না। কোভিডের নির্মম থাবা আমার শরীরকে একেবারেই ক্ষীণজীবি করে দিয়ে গেল। থিয়েটারে নিমগ্ন প্রাণ,তাই সেটিতে খানিক শারীরিক পরিশ্রম করতেই হয়,অন্য সবকিছুই খুব প্রয়োজন না হলে জীবন থেকেই বাদ দিতে হয়েছে। পুজোর কটা দিন মহলা বন্ধ থাকে,তাই বড় একা লাগে ইদানীং। আবেগী হয়েছি বেশি,বেদনা ফুটে ওঠে কলমে।
বছর চারেক একটি দিন গ্রামের পুরাতন জমিদার বাড়ি বা রাজবাড়ির পুজো দেখতে ভোরবেলা বের হয়ে ঘন্টা তিনেক গাড়ির যাত্রায় চলে যাই । মহিষাদল,শোভাবাজার,মথুরা বাটি,,,কী যে শান্তি লাগে। ছেলে গত কয়েকবছর চলে যায় পুজোতে ট্রেকিং এ। আমরা আরো নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ি,তাই এসব জায়গায় অতীত অন্বেষণ। গল্প শুনি ক্ষয়ে যাওয়া বিশাল প্রাসাদের পুরাতন মানুষের কাছে। ঘুলঘুলিতে পায়রা ডাকে। পুকুরঘাটে পা ডুবিয়ে বসতে ইচ্ছা করে। শোভাবাজারে অবশ্য বেশ জাঁকজমকপূর্ণ এখনও,মহিষাদলেও।নহবৎ বসে। বিদেশ থেকে বাড়ির উত্তরাধিকারীরা আসেন। আমার ঋতুপর্ণ ঘোষের ‘ উৎসব’ মনে পড়ে,অপর্ণা সেনের ‘পরমা’। আমি কিশোরী হয়ে চঞ্চল দৃষ্টির হয়ে উঠি। এখনও,,
এ বছর কিন্তু আমাদের পরম একাকীত্ব নেই। আমার এক লক্ষ্মীমণি বৌমা এসেছে গিরিবালা হয়ে। সে মেয়ে মুখে নয়,মনে আধুনিক। সে মেয়ে রান্না থেকে অফিস প্রজেক্টে তুখোড়। আমি বিস্মিত হই তাকে দেখে দেখে।
এবার আমরা যাব শ্রীরামপুর রাজবাড়ি আর রাজা রামমোহনের রায়ের মামার বাড়ির পুজো দেখতে। বৌমার উৎসাহের অন্ত নেই। এবছর পাহাড় ডাকলেও পুত্রের যাওয়ার উপায়টি নেই। হয়ত পরের বছর দুজনেই যাবে,হয়ত যাবে না। সে তখন ভাবব,আজ আনন্দ টুকু অন্তর থেকে গ্রহণ করি।
আমার বাড়িতে পুজোর আসন নেই।পুজোপাট,উপোস,মন্ত্র,উপাসনা নেই। পুজোর সময় মানুষ দেখতে ইচ্ছা করে মুখোমুখি বসে। শিল্পীদের অসামান্য কাজ দেখতে ইচ্ছা করে। ইচ্ছা করে প্রতিমার ত্রিনয়নের দিকে তাকিয়ে বলতে,’জাগ্রত হও উমা,অশুভ শক্তির বিনাশ করো,তোমার চিন্ময়ী উমারা যে আজও বড় লাঞ্ছিত,তারা নিজেদের জন্য অসম লড়াই লড়ে যাচ্ছে প্রতি মুহূর্তে।
আর কতদিন,,,,’
ঈশান কোণে শঙ্খচিলের উড়ান দেখার অপেক্ষায় থাকি,ডানা দুটি গচ্ছিত রেখেছি যার কাছে। জানি অপেক্ষায় থেকে থেকে বেলাশেষের গান গাইব।
সুপর্ণা ভট্টাচার্য, নাট্যকর্মী / বজবজ




