কনভার্টার অর্ক সান্যাল
একটা বিষয় ভেবে দেখেছেন?আমরা যা বলি,আদপে তা আমরা কোনো মতেই বলতে চাই না। কিংবা যা ভাবি।যা বিশ্বাস করি।
হ্যাঁ , ঠিক ধরেছেন। সেই শতাব্দী প্রাচীন আপেক্ষিকতার ধারণা।
বিয়ে বাড়িতে গিয়ে বললাম , “মুখুজ্জে বাবু , আপনার মেয়ের বিয়ের খাওয়া দাওয়া এত ভালো লাগলো,যে কি বলবো?আমি এই ৬০ বছরের জীবনে এত নরম পাঁঠা কোনো দিন খাইনি। এ যেন অমৃত। “
সেই ৬০ বছরের অভিজ্ঞতা পুষ্ট আমি মুখার্জীর মেয়ের বিয়ে খেয়ে বাড়ি ফেরার পথে ,সহধর্মিণীকে ঢেঁকুর তুলতে তুলতে বলে বসলাম , “মাটন টা সিদ্ধ হয়নি না ?”
সহধর্মিনী বলল , “মেয়ের গায়ের রং আজ আরও চাপা লাগছে , গোলাপি বেনারসী কেউ পরে ?”
আপাতত মাটন ,কিংবা গোলাপি বেনারসি ধামাচাপা রেখে ফিরে যাওয়া যাক সেই পূর্ব উল্লিখিত আপেক্ষিকতার ধারণা তে।
ধারণা টা নির্ধারণে বোধ করি কিছু ভ্রান্তি হয়ে যাচ্ছে। কারণ ধারণাটি আপেক্ষিকতার নয়। মিথ্যা কথা বলার।
গড়পড়তা সব মানুষই আমরা বিশ্বাস করে নিই ,যে কিছু পরিমান মিথ্যা স্বাস্থ্যকর। যা কথক ও শ্রোতা উভয়কেই সুখী রাখে। তাই চাপা মেয়ের রং হয়ে ওঠে কনক চাঁপার মত সুবর্ণকান্তি,অথবা ছিবড়ে ছাগল অবলীলাক্রমে হয়ে যায় নধরকান্তি নরম পাঁঠা। অর্থাৎ ধারণাটি আপেক্ষিকতার নয়। মিথ্যা কথার।
মিথ্যে আমিও বলেছি লেখার গোড়াতেই। আমার বয়স ৬০ নয়,ঊনপঞ্চাশ।আর সত্যি কথা হল আমি এক সমাজ বিজ্ঞানী।
উচ্চমাধ্যমিকে গণিতে কম পেয়েছি বলে এই রকম এক উদ্ভট বিজ্ঞানের স্মরণাপন্ন হয়েছিলাম কিনা তা নিয়ে তুল্যমূল্য আলোচনা এখন করবো না।
আমি বরং অবতারণা করি আমার কল্প (সমাজ) বিজ্ঞানের হাইপোথিসিসের।টেকনিক্যাল কচকচানি সরিয়ে রেখে আমি তুলে দিচ্ছি আমার গবেষণার মূল প্রতিপাদ্যটি। গ্রহণযোগ্য না হওয়ার সম্ভাবনা সর্বাধিক।আর তাতেই আমার গবেষণার সর্বাধিক সাফল্য।
আমি বিশ্বাস করি ,থুড়ি, আমার ডেটা বিশ্বাস করে আমরা ;অর্থাৎ এই মানব সমাজের উত্তরসূরিরা কোনো ভাবেই এক নয়। অর্থাৎ প্রতি দুটো মানুষ কোনো ভাবেই এক নয়।
এ আবার নতুন কি ?
জৈব গঠন ,আকার আঙ্গিকের বিভিন্নতার কথা বলছি না। বলছি প্রতি দু জন গড় মানুষের স্ট্যান্ডার্ড ভাব বিনিময়ের যে মাধ্যম তাও এক নয়।
কোনো ভাবেই নয়।
পাঠক মহাশয় / মহাশয়ার বিরক্তির উদ্রেগ খুব স্বাভাবিক। আপনাদের সাপ শাপান্তে আমার লেখার গৌরচন্দ্রিকার চন্দ্রবিন্দু প্রাপ্তি শীঘ্রই হবে। কিন্তু সত্যি তা তো পাল্টাবে না।
” আসলে সত্যি বলে সত্যি ই কিছু নেই। “
আমার সংগৃহীকৃত ডেটার বিশ্বাস এই পৃথিবীতে মানুষ তথা অন্য্ যে কোনো প্রাণী যে ভাষার বা সাইন ল্যাঙ্গুয়েজের মাধ্যমে ভাব বিনিময় করে থাকে , তা আমরা ইউনিক ধরে নিলেও প্রকৃতপক্ষে n সংখ্যক বৈচিত্র্যময়তায় পরিব্যাপ্ত।আর n টেন্ডস টু ইনফিনিটি।
নাল হাইপোথিসিসটি হল , এই পৃথিবী আসলে এক বিরাট কনভার্টার। আমি বললাম চাল, তুমি শুনলে চালতা। “হিন্দী মে বলতে ক কেয়া বলতে হ্যায় ?”
ভীষণ গোলমেলে ব্যাপার মশাই। একটু ঝেড়ে কাশি।
ভয় পাবেন না। মাস্ক তো পড়াই আছে, আর তা ছাড়া আপনার তো ভ্যাকসিনের দুটো ডোজ ই ……
এই সমাজ, এই পৃথিবী আসলে এক বিরাট কনভার্টার। ঠিক যে ভাবে পৃথিবীর দুটি মানুষের মধ্যে নূন্যতম কিছু বৈসাদৃশ্য আছে শারীরিক ভাবে ,মানসিক বৈসাদৃশ্য তার সহস্রগুণ। কোনো ভাবেই তা এক নয়।
তাহলে এত জগ ধরে, সেই গুহাবাসী মানুষের গুহাচিত্র থেকে এই এত ভাবের আদান প্রদান হচ্ছে কিভাবে?
হচ্ছে না তো। কোনো আদান প্রদান হয়নি তো। সবই ভবের মায়া। ভাবের মায়া ও বলা যায়। আর সেই মায়ার নাম কনভার্টার।
কিন্তু কনভার্টারের মায়ার কি কোনো কায়া রূপ আছে?জানা নেই ঠিক। তা নিয়েই তো চলছে গবেষণাটি।
আপনারা তো যুক্তিবাদী। পাতার পর পাতা দার্শনিক উদাহরণে আমায় বিশ্বাস করবেন না জানি। তাহলে কিছু বিজ্ঞান সম্মত প্রমান পেশ করা যাক ?
ঠিক যে কারণে আমাদের, মানে পৃথিবীর প্রীতি দুই মানুষের মধ্যে নূন্যতম কিছু বৈসাদৃশ্য আছে – তাই ইউনিক পেয়ার পাওয়া অসম্ভব ,ঠিক সে ভাবেই প্রতি এক জোড়া মানুষের জ্ঞানেন্দ্রিয় ও আলাদা।
ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়টি যে সবার আলাদা আলাদা , আর তাই কেউ কেউ ভূত দেখে ফেললেও বাকি সব পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের মালিক তা নিয়ে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে থাকেন ,কিংবা ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ের দাপাদাপিকে পাগলামি বলে খান্ত হলেও , এটা তো মানবেন যে এই পঞ্চ ইন্দ্রিয়েই বিস্তর গোলমাল।
শব্দ ই ব্রহ্ম।তাই ব্রহ্মা জানেন গোপন কম্মটি।
শুরু করা যাক কান থেকেই। শ্রবণেন্দ্রিয়।
দেখলেন তো ? বললাম শ্রবণ। শুনলেন শোভন। আর তারপরেই তা তা থৈ থৈ ?
চক্ষু কর্ণের বিবাদ আপাতত দীর্ঘজীবী হোক। থাকি কানেই। আপনি যদি ধান শুনে থাকেন ,তাহলে মশাই আপনার ধান্দা ভালো নয়।
বিজ্ঞান বলে ২০ থেকে ২০,০০০ হার্জ , এই হচ্ছে মানব কর্ণের পরিধি।এই পরিধির বেশি বা কম তরঙ্গদৈর্ঘ্যের শব্দ আমাদের কান উপলব্ধি করতে পারে না।
কুকুর পারে। বাদুড় ও পারে। পারত প্রফেসর হিজিবিজবিজ।
এই রেঞ্জের মধ্যেও প্রত্যেক কণ্ঠস্বর আলাদা। তাই ভৌগোলিক ভাবে এক দেশের মানুষের উচ্চারিত যুক্তাক্ষর অন্য দেশের মানুষ উচ্চারণ করতে পারে না ।সেই তত্ব এটাই প্রমান করে যে , প্রতিটা মানুষ কানে সমান শব্দ বা ধ্বনি শোনে না।
এ আবার কিরকম কথা? জন্মের পর প্রায় সব বাঙালি বাচ্চা “মা ” বলতে শেখে।
কিন্তু না। মা শব্দ টা যে আমার বাচ্চা “মা” ই উচ্চারণ করছে ,কিংবা স্তনপান করানো মা যে সেটা “মা ” হিসাবেই শুনছে তার কি প্রমান আছে?
বলতেই পারেন , সাতটাই তো সুর। সেই গ্রামারের বাইরে যাওয়া যাবে না। আমি বলবো, মানে আমার ডেটা বলবে , তা সঠিক নয়। আসলে শিশুর চিৎকার করা প্রথম মা ডাক কণ্ঠ থেকে বেরিয়ে জননীর কানে যাওয়ার যাত্রাপথে যে যে মাধ্যম অতিক্রম করছে তাতেই বিরাজমান সেই আশ্চর্য কনভার্টার। তাই শিশু ঠিক কি বললো, আর মা ঠিক কি শুনলো,তা আমরা জানি না। অদৃশ্য কনভার্টার আমায় বা আপনাকে “মা ” বোঝালো। গানের ক্ষেত্রেও একই শর্ত কাজ করে।
এবার প্রশ্ন উঠবে ,শব্দের না হয় কনভার্সন হচ্ছে। প্রতি দুটো মানুষ আলাদা শব্দ শুনছে। তা এই অদৃশ্য কনভার্টারে স্পন্দিত হয়ে প্রতিটা মানুষের কানে আলাদা আলাদা নাদের সৃষ্টি করছে। শব্দ তো ব্রহ্ম।
কিন্তু ঠোঁটের জেসচারের কি হবে ? স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে “মা” উচ্চারণ করার সময় শিশুর দুটি ঠোঁট পরষ্পরকে স্পর্শ করছে।
তাহলে এবার আসা যাক চোখের কথায়। দর্শনেন্দ্রিয়।
চোখের ভিতর থাকে রড ও কোন কোষ. যা বিভিন্ন আলোক তরঙ্গ দৈর্ঘ্যে বিভিন্ন ভাবে উদ্দীপিত হয়ে ওঠে। অন্ধকারে আমরা যতটা অন্ধকার দেখি ,সব প্রাণী ততটা দেখে না।
কতটা অন্ধকার ? জীবনানন্দের ” এক অদ্ভুত আঁধার “?সেখানে তো আবার দৃষ্টিহীনের দৃষ্টিশক্তি সর্বাধিক।
যে চোখে দেখে না , সে কি কিছুই দেখে না?
আমি দেখলাম রেল লাইনে আত্মহত্যা করতে যাওয়া এক মেয়েকে বাঁচাতে এক ছেলে ঝাঁপিয়ে পরলো।কোনো মৌলবাদী দেখলো ছেলেটি মেয়েটির অনুমতি ছাড়া তাকে জোর করে স্পর্শ করলো। যৌন হেনস্থা।
কে ঠিক?
সেই কনভার্টার আসলে যে যা দেখতে চাইলো তাকে তা দেখিয়ে দিল। সবই সেই কনভার্টারের খেলা।
আলোক স্পন্দিত চক্ষুকোষ দেখছে মগজ দিয়ে। তার দৃশ্যপট গুলো আলাদা। আলাদা আলাদা সিনেমা স্ক্রিনে কনভার্টার দর্শকের অক্ষিগোলক অনুযায়ী সিনেমা দেখিয়ে চলেছে।
বাকি তিন ইন্দ্রিয়ে কনভার্টারের তত্বকেও এবার ঐকিক নিয়মে ফেলা যায়।
প্রেয়সীর ঘামের গন্ধ আমার কাছে ফিরোমেন না হরমোন তা ঠিক জানি না ,তবে ভালো লাগছে। তোমার লাগছে না। একই রান্নায় কারোর নুন বেশি লাগছে ,কারোর কম। একই স্পর্শ কখনও হয়ে যাচ্ছে গুদ টাচ,কখনো ব্যাড টাচ; হেনস্থা। কেউ আবার ফুলের ঘায়ে মূর্ছা ও যাচ্ছে।
এই এত বিভিন্নতা যেখানে ,সেখানে কনভার্টার ঠিক কি কাজ করছে ?
কনভার্টার এই বিভিন্ন আপেক্ষিকতাকে কনভার্ট করছে ,পাল্টে ফেলছে – ভালোকে খারাপ,সত্য কে মিথ্যেতে।
তাই আমার পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের অনুভূতি আপনার থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। সবাই তাই আলাদা আলাদা রেসপন্সের কনভার্টেড রেজাল্ট পাচ্ছি। আর সেই রেজাল্ট প্রত্যেকের জন্য ইউনিক।তা এক নয়। তাই দুটি গড় মানুষ এক নয়। তাকে এক করার প্রতিনিয়ত চেষ্টা করে যাচ্ছে প্রাকৃতিক কনভার্টার।
সেই প্রাকৃতিক কনভার্টারের কল কব্জা বহু প্রাচীন।গোলমাল বিস্তর।
তাই X – Y কে মারছে । Y – Z কে ধর্মান্তরিত করছে। Z আবার X ” কে তার রাজনৈতিক মতাদর্শ বোঝাচ্ছে। আর তাতেই বাঁধছে কাটাকাটি ,মারামারি। কারণ সব মানুষ ই তার কনভার্টেড উদ্দীপনা কেই পরম ধরে নিয়ে অন্যকে বিচার করে। তাই ভাবে বাকি সবাই ভুল করে।
পৃথিবীর সমস্ত অশান্তির মূলে এই কনভার্সন এরর। (Conversion Error )
এই error এর সমাধান এখন সময়ের অপেক্ষা। তখন আর এর ওর কথা শুনে মানতে হবে না। গোটা পৃথিবী পরিব্যাপ্ত হবে এক অভিন্ন সত্যতে। মার্কেটের সত্যতা। বাজারি সত্য ও বলা যায়।
সেই আদি সত্যের মেকানিক্যাল কনভার্টার বানানের কাজে আমি অনেকটা অগ্রসর হয়েছি। সেই কাজের সূত্রেই আমার এই গবেষণা পত্র লিখন।
কনভার্টার বানানোর বাকি কাজ থমকে আছে “govt. fund ” এর অপেক্ষায়।
আপনি অবিনাশ বাবু হয়ে যতই আমি নিয়ে মশকরা করে আমার এই কাজের বিনাশের প্রার্থনা করুন না কেন ,এই ত্রিলোকেশ্বর থামবে না। বানিয়েই ছাড়বে , স্টেট্ ফান্ডেড কনভার্টার।
মানুষ থাকবে না আর কোনো ইন্দ্রিয়ের দাস। সবাই চলবে কমন কনভার্টেড রেসপন্স।
স্টেট ফান্ডেড কনভার্টার বন্ধ হবে জাতের নাম বজ্জাতি। রাজনীতি হবে একনীতি ,থাকবে না অপজিশন। একটা মানবতা বাদী অ্যাঙ্গেল ও রাখবে এই মেশিন। তবে আবার যদি তালিবানি সমস্যা মাথা চারা দে,কিছু করবে না এই মেশিন। কারণ ধর্মে আঘাত করা তো ঠিক নয়। আরো ঠিক নয় তেলের একচেটিয়া বাজারে আঘাত করা।
কত সহজ হবে তখন বাজার। প্রতিটা মানুষের নিজস্বতায় যে error আছে ,তা আটকে দেবে আমার এই কনভার্টার।
রক্তকরবীর বিশু পাগল ,নন্দিনী তখন ১৭ ঘ ,১৯ ছ হয়ে মেশিনের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে হয়ে যাবে rational mass .
কনভার্ট করবো বলে এই আমি ,কল্প (সমাজ) বিজ্ঞানী কবে থেকে বসে আছি যন্তর মন্তর ঘরে।consunerism উপাসনা কেন্দ্রের পুরোহিত সেজে। ইন্দ্রিয় প্রক্ষালক যন্ত্রের লিভার ধরে।তবে এই যন্ত্রে থাকবে না আলাদা আলাদা কৃষক,শ্রমিক,বা শিক্ষকের মন্ত্র। সব অভিন্ন। আপনাদের বিশ্বাস না হলে একবার এসে দেখে যাবে আমার ল্যাবরেটরিতে এসে।
কাজ চলছে সেই কনভার্টারের। দেখবেন কেমন বাঘে – গরুতে এক ঘটে জল খাওয়াবো।
তবে এই লেখা কনভার্টারের কাজ সম্পূর্ণ শেষ হওয়ার আগে কেউ পড়বেন না। কারণ আমি যা লিখলাম , আর আপনি যা পড়লেন বা পড়ে মানে বুঝলেন , তা কিন্তু কোনো ভাবেই এক নয়। প্রাকৃতিক কনভার্টারে আপনি তার এসেন্স বুঝতে পারলেও ,লেখক আমি আর পাঠক আপনির চক্ষু কর্ণের বিভেদ ঘোচাবে আমার এই স্টেট ফান্ডেড কনভার্টার।কাজ শেষ হল বলে।
আর তারপর , আমি মানে আমরা।
“আমরা সবাই রাজা। “
