ডুবে থাকা স্মৃতির অতলে—ডুবে থাকা রাবাংলা – হোমাগ্নি ঘোষ
রাবাংলার কথা মনে পড়লেই আজও আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে কুয়াশায় মোড়া একটি ছোট্ট পাহাড়ি শহর। দক্ষিণ সিকিমের বুকের সেই শান্ত, নির্জন শহরটির সঙ্গে আমার সম্পর্ক বহুদিনের। জীবনের নানা সময়ে বহুবার সেখানে থেকেছি, হেঁটেছি তার নির্জন পথ ধরে, পাহাড়ের গন্ধ নিয়েছি, ভোরের আলোয় দাঁড়িয়ে দূরের তুষারশৃঙ্গ দেখেছি। কিন্তু রাবাংলার সঙ্গে আমার সবচেয়ে গভীর স্মৃতিগুলোর একটি জড়িয়ে আছে আমার সেই অ্যাডভেঞ্চার কোর্সের দিনগুলোর সঙ্গে। সেবার আমরা ইউব্যাক মাউন্টেনিং অ্যাসোসিয়েশনের একটি মাউন্টেনিং অ্যাডভেঞ্চার কোর্সে অংশ নিয়েছিলাম। জীবনে নানা ধরনের কোর্স করেছি—জীববিজ্ঞানের প্রশিক্ষণ, সারভাইভাল কোর্স, রক ক্লাইম্বিং, পাহাড়ে চলার নানা কৌশল—অজানাকে জানার এবং প্রকৃতিকে আরও কাছ থেকে বোঝার সেই তাগিদ থেকেই একের পর এক প্রশিক্ষণে নিজেকে জড়িয়েছি। কিন্তু সেই মাউন্টেনিং কোর্সটির স্মৃতি আজও আমার কাছে আলাদা। কারণ সেই কোর্সেরই সূত্রে আমাদের পৌঁছতে হয়েছিল দক্ষিণ সিকিমের ময়নাম পাহাড় আর তার পাদদেশে বসে থাকা রাবাংলায়।
আমাদের দিনের অধিকাংশ সময়ই কেটে যেত প্রশিক্ষণ, অনুশীলন, পাহাড়ে ওঠানামা এবং নানা ধরনের অভিযানের কাজে। নিজেদের জন্য খুব বেশি অবসর ছিল না। অ্যাডভেঞ্চার কোর্সের আনন্দের সঙ্গে জুড়ে ছিল কঠোর পরিশ্রম, নিয়ম আর শৃঙ্খলা। শরীর ক্লান্ত হয়ে পড়ত, পা ব্যথা করত, তবু পাহাড়ের টান সেই ক্লান্তিকে কোথায় যেন মুছে দিত। ময়নাম পাহাড়ে ওঠার সেই দিনগুলো আজও মনে পড়ে। প্রায় দশ হাজার ফুট উচ্চতার ময়নাম শীতকালে বরফের চাদরে ঢেকে যায়। আমরা ময়নাম–ভালেদুংগা ট্রেকের অংশ হিসেবেই সেই অরণ্যপথে চলেছিলাম। ময়নামের অরণ্য যেন পাহাড়ের বুকের মধ্যে লুকিয়ে থাকা এক বিশাল সবুজ গোপনভূমি—বুনো বাঁশ, ফার, পাইন, দেবদার, নানা অচেনা গাছপালা, দুর্লভ অর্কিড আর ভেষজ উদ্ভিদে ভরা। কখনও ভেজা মাটির গন্ধ, কখনও পাইনপাতার গন্ধ, কখনও অচেনা ফুলের মৃদু সুবাস এসে মনকে আচ্ছন্ন করে দিত। মনে হতো আমরা শুধু একটি পাহাড়ে উঠছি না, প্রকৃতির বহু পুরোনো কোনও গোপন দরজার ভিতর দিয়ে প্রবেশ করছি।
সেই অরণ্যে আমাদের একটি গোপন আকাঙ্ক্ষা ছিল—রেড পান্ডা দেখা। মইনাম অঞ্চল রেড পান্ডার উপযুক্ত আবাসভূমি বলেই চোখ সবসময় ব্যস্ত থাকত গাছের ডাল, ঝোপঝাড় আর অরণ্যের ছায়ার দিকে। কখনও মনে হতো, এই বুঝি কোনও গাছের আড়াল থেকে ছোট্ট লালচে শরীর আর সাদা মুখ নিয়ে সে উঁকি দিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই সৌভাগ্য আমাদের হয়নি। রেড পান্ডাকে দেখতে পাইনি। তবু আজ মনে হয়, সেই না-পাওয়াটাও যেন স্মৃতির একটি সুন্দর অংশ। কারণ পাহাড় তার সমস্ত রহস্য একদিনে প্রকাশ করে না। বরং অদৃশ্যের উপস্থিতি, না-দেখা প্রাণীর সম্ভাবনা, ঝোপের ভিতর থেকে ভেসে আসা অচেনা শব্দ—এসবই তো অরণ্যের আসল রোমাঞ্চ। মইনামের অরণ্যে হিমালয়ান কালো ভালুক, চিতাবাঘ, মেঘলা চিতা, হরিণ, নানা সরীসৃপ এবং অসংখ্য পাখির উপস্থিতির কথাও জানা যায়। তাই সেই পথে হাঁটার সময় প্রতিটি শব্দের আলাদা অর্থ ছিল। শুকনো ডাল ভাঙার শব্দ, হঠাৎ পাখির ডেকে ওঠা কিংবা ঝোপের ভিতর কোনও অদৃশ্য প্রাণীর নড়াচড়া—সবকিছুই আমাদের সতর্ক করে দিত। জঙ্গলে প্রকৃতিকে ভালোবাসা মানে শুধু তার সৌন্দর্য দেখা নয়, তার নীরব ভাষাটাও বুঝতে শেখা।
ময়নামের পাদদেশেই আমাদের ক্যাম্প ছিল রাবাংলায়। আর সেই রাবাংলাতেই একদিন, কালীপুজোর আগের দিন, বিকেলের পর আমরা বেরিয়েছিলাম একটু হাঁটতে। সেদিনের রাবাংলাকে আজও ভুলতে পারিনি। সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে গোটা শহরটা কুয়াশায় ঢেকে গেল। পাহাড়ি বাতাসে ঠান্ডার কাঁপুনি, চারপাশে অস্পষ্ট আলো আর দূরের পাহাড়ের কালো অবয়ব—সব মিলিয়ে রাবাংলাকে মনে হচ্ছিল যেন বাস্তব পৃথিবীর কোনও শহর নয়, স্বপ্নের ভিতর থেকে উঠে আসা এক রহস্যময় জনপদ। দীপাবলির আলোয় পাহাড়ের ঘরবাড়িগুলো জ্বলছিল। কোথাও একটি আলো, কোথাও কয়েকটি প্রদীপ, কোথাও জানলা দিয়ে বেরিয়ে আসা হলুদ আলো কুয়াশার ভিতর মিলিয়ে যাচ্ছিল। আর বাজারের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল সবুজ পাহাড়টি সন্ধ্যার পর ধীরে ধীরে কালো হয়ে উঠছিল। দূর থেকে তাকে মনে হচ্ছিল এক বিশাল কালো দৈত্য—দুহাত বাড়িয়ে যেন গোটা শহরটাকে নিজের মধ্যে টেনে নিতে চাইছে। কখনও আবার সেই অন্ধকার অবয়বের মধ্যে ইয়েতির মতো কোনও রহস্যময় পাহাড়ি প্রাণীর ছায়া দেখতে পেতাম।
রাবাংলার সৌন্দর্য আসলে তার জাঁকজমকে নয়, তার নীরবতায়। শান্ত, নির্জন, নিরাভরণ এক পাহাড়ি সৌন্দর্য। চারপাশে সবুজ পাহাড়, পেছনে অরণ্য, সামনে কুয়াশার পথ—মনে হতো পৃথিবীটা যেন এখানে একটু ধীরে চলছে। সেই রাতে ঠান্ডা ছিল তীব্র। তবু আমরা হাঁটছিলাম। পাহাড়ের ঠান্ডায়ও যেন এক ধরনের মাদকতা আছে। শহরের ঠান্ডা শরীরকে কাঁপায়, আর পাহাড়ের ঠান্ডা শরীরের সঙ্গে সঙ্গে মনকেও জাগিয়ে দেয়। সেই কুয়াশার মধ্যে হাঁটতে হাঁটতে মনে হচ্ছিল, আমরা যেন কোনও অদৃশ্য গল্পের ভিতর দিয়ে এগিয়ে চলেছি।
পরদিন সকালে রাবাংলার রূপ আবার বদলে গেল। কুয়াশা ধীরে ধীরে সরে গেল, পূর্ব আকাশে সূর্য উঠল, ধ্যানমগ্ন পাহাড়ের গায়ে সূর্যের প্রথম আলো এসে পড়ল। রাতের সমস্ত রহস্য যেন আলোর স্পর্শে ধীরে ধীরে খুলে যেতে লাগল। দূরের তুষারমণ্ডিত পর্বতশৃঙ্গগুলো সূর্যের সাত রঙে কখনও সাদা, কখনও রুপোলি, কখনও সোনালি হয়ে উঠছিল। মেঘমুক্ত আকাশের নীচে সেই দৃশ্য ছিল অবিশ্বাস্য সুন্দর। মনে হচ্ছিল, হিমালয় যেন নিজের সমস্ত রং একসঙ্গে মেলে ধরেছে আমাদের সামনে।
রাবাংলা থেকে রালং যাওয়ার পথও আমার কাছে বিশেষ প্রিয়। পাহাড়ের কোলে বসে থাকা রালং গুম্ফার শান্ত পরিবেশ, লামা বালকদের প্রার্থনা, বৌদ্ধ দর্শনে নিমগ্ন সেই নীরবতা—সব মিলিয়ে সেখানে দাঁড়ালে মন আপনিই শান্ত হয়ে আসে। পাহাড়ে কিছু কিছু জায়গা থাকে যেখানে বাইরের শব্দ কমে যায়, অথচ ভিতরের কথাগুলো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। রালং আমার কাছে তেমনই একটি স্থান। আর এই সমগ্র অঞ্চল যেন ঝরনা ও জলপ্রপাতের দেশ। পাহাড়ের বুক চিরে কোথাও সরু জলধারা নেমে এসেছে, কোথাও বৃষ্টির জল সবুজ ঢাল বেয়ে ঝলমল করে নেমে যাচ্ছে। বর্ষার পরে পাহাড়ের শরীর তখন আরও সতেজ, আরও সবুজ। মনে হয়, পাহাড় যেন প্রতিদিন নতুন করে জন্ম নিচ্ছে।
রাবাংলার পথে হাঁটতে হাঁটতে আমরা কখনও পাইনবনের মধ্যে ঢুকে যেতাম, কখনও নির্জন পায়ে-চলা পথ ধরে অনেকটা দূর চলে যেতাম। চারপাশে শুধু গাছের নিস্তব্ধতা। পাইন, ফার, দেবদার আর পাহাড়ি অরণ্যের অচেনা গাছপালা। কোথাও এলাচের গন্ধ এসে বাতাসকে ভরে দিত। আমরা কখনও কোনও পাহাড়ের ঢালে চুপ করে বসে থাকতাম। সামনে মেঘমুক্ত আকাশ, দূরে তুষারমণ্ডিত পর্বতশৃঙ্গ, মাথার ওপর অসীম নীল। সেই মুহূর্তগুলোতে কোনও কথা বলার প্রয়োজন হতো না। পাহাড়ের সঙ্গে কথা বলার জন্য শব্দ লাগে না।
রাবাংলা আমাকে তাই শুধু একটি শহরের স্মৃতি দেয় না। সে আমাকে ফিরিয়ে নিয়ে যায় আমার সেই তরুণ অভিযাত্রী জীবনের দিনগুলিতে—যখন পাহাড় মানেই ছিল নতুন কিছু শেখা, অজানাকে ছুঁয়ে দেখা, ক্লান্ত শরীর নিয়ে আরও একটু এগিয়ে যাওয়া এবং দিনের শেষে ক্যাম্পে ফিরে বন্ধুদের সঙ্গে বসে পাহাড়ের গল্প করা। আজ এত বছর পরও রাবাংলার কথা মনে পড়লে প্রথমে কোনও নির্দিষ্ট বাড়ি বা রাস্তার কথা মনে পড়ে না। মনে পড়ে কুয়াশা। মনে পড়ে দীপাবলির আলো। মনে পড়ে বাজারের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা সেই কালো পাহাড়। মনে পড়ে পাইনবনের গন্ধ। মনে পড়ে ময়নামের অরণ্যপথ। মনে পড়ে রেড পান্ডাকে দেখতে না-পাওয়ার সেই অপূর্ণ ইচ্ছা। মনে পড়ে রালং গুম্ফার নীরব প্রার্থনা। আর মনে পড়ে এক শীতল সকালে সূর্যের আলোয় ধীরে ধীরে জেগে ওঠা পাহাড়।
জীবনে অনেক পাহাড় দেখেছি, অনেক অরণ্যে হেঁটেছি, বহুবার তুষারশৃঙ্গের সামনে দাঁড়িয়েছি। কিন্তু কিছু কিছু জায়গা থাকে, যাদের সঙ্গে সম্পর্কটা শুধু ভ্রমণের নয়—স্মৃতির। রাবাংলা আমার কাছে তেমনই এক জায়গা। ময়নামের অরণ্য আর রাবাংলার কুয়াশা আজও আমার ভিতরে পাশাপাশি বেঁচে আছে। কখনও কোনও শীতের সকালে জানলার বাইরে কুয়াশা দেখলে মনে হয়—আমি আবার সেই রাবাংলায় ফিরে গেছি। দূরে পাহাড় অন্ধকার হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, পাইনবনের ভিতর দিয়ে ঠান্ডা বাতাস আসছে, আর দীপাবলির আলো কুয়াশার মধ্যে নরম হয়ে জ্বলছে। সময় চলে যায়, মানুষ বদলে যায়, পাহাড়ের পথও হয়তো বদলে যায়। কিন্তু কিছু পাহাড় কখনও পুরোনো হয় না। রাবাংলা আমার কাছে সেইরকমই এক পাহাড়ি স্মৃতি—যেখানে আজও কুয়াশার ভিতর আমার সেই তরুণ অভিযাত্রী সত্তাটি হাঁটতে থাকে, ময়নামের অরণ্যের দিকে তাকিয়ে থাকে, আর মনে মনে বলে—পাহাড়ে ফিরে আসা আসলে কোনওদিন শেষ হয় না।
