পঞ্চম বর্ষ প্রথম সংখ্যা প্রবন্ধ
‘শিকড়ে আমার তাই, অরণ্যের বিশাল চেতনা’: সুকান্ত ভট্টাচার্য, আজও
সংহিতা বন্দ্যোপাধ্যায়
এই যে ডিজিটাল সমাজমাধ্যম – যা মোটামুটি চব্বিশ ঘণ্টা আমাদের দখল নিয়েছে। আমাদের মন-মগজকে ভরিয়ে রেখেছে রাশি রাশি তথ্যে – রাজনীতি থেকে বর্তমান শিল্প-সাহিত্যের হেন বিষয় নেই যা এখানে আলোচিত হয় না, বরং বলা যায় শিল্পী ও সাহিত্যিকদের ব্যক্তি ক্যারিশমাই বেশি শোভা পায় অনুক্ষণ। সেখানে অনেক খুঁজেও সুকান্ত ভট্টাচার্য বলে কোনও কবির নামোল্লেখ পর্যন্ত দেখছি না কিছুদিন ধরে। অথচ এই নামটা উঠে আসা উচিত ছিলো শুধুমাত্র তাঁর জন্মের একশো বছর চলছে বলেই নয়। তার চেয়েও বড়ো কারণ বাংলা কবিতা গল্পের ম্যাড়মেড়ে অন্তঃসারহীন স্তূপের মৃত্যুশীতলতার মধ্যে একটা আগুনের ফুলকিকে আবার আবিষ্কার করার প্রয়োজন ছিলো বলে। যদিও জন্মের একশো বছর পরেও কোনও কবির নাম যদি উঠে আসে আবার, সে-ও বড়ো কম কথা নয়। কতজনের হবে এই সৌভাগ্য?
আমাদের ছোটবেলায় দেখেছি বছরে কয়েকবার পাড়ায় পাড়ায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হতো। তাদের বেশির ভাগেরই শিরোনাম থাকতো ‘রবীন্দ্র-নজরুল-সুকান্ত সন্ধ্যা’। আশির দশকেও এসব বহু দেখা যেত। রবীন্দ্রনাথ নজরুলের সঙ্গে একসঙ্গে উচ্চারিত হতো সুকান্ত ভট্টাচার্যের নাম। অথচ সে তো একুশ বছরেই আমাদের ছেড়ে চলে গেছে। ‘ছাড়পত্র’ আর ‘মিঠেকড়া’ তখন আমাদের হাতে হাতে ঘুরতো। এমনকী বাড়িতে বড়রা আবৃত্তি করতো সকান্তের কবিতা –
‘জড় নই মৃত নই নই অন্ধকারের খনিজ।
আমি তো জীবন্ত প্রাণ, আমি এক অঙ্কুরিত বীজ।’
আমাদের শৈশব থেকে কৈশোরে উত্তীর্ণ হবার দিনে এই প্রত্যয়ের ভাষা বিস্মিত করেছিল। যে ক্যাপিটালিসম্ ভোগ থেকে আরও ভোগ সর্বস্বতায় ডুবিয়ে দিতে চাইছে জনসমাজকে, যে ক্যাপিটালিসম্ দেশের মানচিত্র থেকে মুছে দিতে চায় গরিব হতদরিদ্রদের, যা এক অর্থে প্রকট করছে মানুষে মানুষে বিরাট ধনবৈষম্য, সেখানে সাহিত্যে যে ক’জন প্রতিভা এই উৎকট অত্যাচারের বিরুদ্ধে সোচ্চারে কথা বলেছিলেন সুকান্ত তাঁদের অন্যতম। ‘কিশোর কবি’ সম্বোধন তাঁর ক্ষেত্রে একেবারেই বেমানান একটি শব্দবন্ধ, হয়ত তাঁর অল্প বয়সেই সাহিত্যে উঠে আসা এবং চিরতরে চলে যাওয়ার জন্যই এই সব নামকরণ হয়েছিলো। কিন্তু সুকান্ত-র মতো পরিণত, সমাজ-সময়মনস্ক দৃঢ় চরিত্রের কবি খুব বেশি বাংলায় নেই। তাঁর বিশেষত্ব হলো, এতো রাজনৈতিক কথা স্পষ্টভাবে বলার পরেও তাঁর কবিতা শিল্পরসোত্তীর্ণ। ভাষা এবং বিষয়ের এক অভূতপূর্ব সংযোজন, যা ভীষনভাবে সংক্রামকও। আজ যখন বাংলা কবিতা ছন্দ ছন্দ করে লাফায়, প্রতিষ্ঠিত নামী কবিদের লেখা নকল করে সফল হতে চায়, তখন কবিতা থেকে আসলে হারিয়ে যায় বিষয়ের প্রশ্নটি। কবিতা হয়ে ওঠে একঘেয়ে ঘ্যান ঘ্যানানির প্রেডিক্টেবল পংক্তিমালা। প্রযুক্তি আমাদের সামনে রাশি রাশি তথ্য এনে দিচ্ছে, কিন্তু তার তাৎপর্য নিয়ে কেউ মাথা ঘামাচ্ছেনা। ফলে স্তুপিকৃত হচ্ছে জড়বত শব্দ, সাহিত্যে আসছে ছন্দের কারিকুরি, আসলে চেতনাহীন এক বিরাট পরাধীনতার খেলায় আমরা যেন কলের পুতুলের মতো নেচে চলেছি। এই সাড়হীন জীবন যাপনকে বারবার আঘাত করে সুকান্ত ভট্টাচার্যের কবিতা-
‘হে মহাজীবন, আর এ কাব্য নয়,
এবার কঠিন কঠোর গদ্যে আনো।
পদ-লালিত্য ঝংকার মুছে যাক
গদ্যের কড়া হাতুড়িকে আজ হানো!
প্রয়োজন নেই কবিতার স্নিগ্ধতা
কবিতা তোমায় দিলাম আজকে ছুটি।
ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়
পূর্ণিমা চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি।’
– হে মহাজীবন : সুকান্ত ভট্টাচার্য
আজ যখন আধুনিকতার নামে চুড়ান্ত ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা মান্যতা পায়, তখন সাহিত্যেও তার ছাপ পড়াটাই স্বাভাবিক। আমি-তুমির প্রেমের বাইরে যে বিরট ব্যাপ্ত পৃথিবী প্রতিনিয়ত রূপ বদলে চলেছে, সেখানে দেশে দেশে, জাতিতে জাতিতে যুদ্ধ হয় বছরের পর বছর। হাজার হাজার শিশুকে মেরে ফেলা হয় একটা সুইচ টিপে, গণহত্যা আজ একবিংশের স্বাভাবিকতম ঘটনা, নাগরিকত্বের অন্যায় প্রমাণ চেয়ে বেনাগরিক করে দেওয় হয় হাজার লক্ষ মানুষকে। এখন সাহিত্য – শিল্প কী করতে পারে? করতে পারে একটাই কাজ, তা হল – প্রশ্ন তোলা, জবাব চাওয়া, কুতসিৎ বাস্তবটাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়া। মানুষের চেতনায় যে জড়ত্ব বাসা বেঁধে থাকে, তাকে ধাক্কা দিতে পারে কবিতা। তাই যুগে যুগে শিল্পী আর ক্ষমতার মধ্যে এক অদ্ভুত রসায়ন থেকে গেছে। কখনও শিল্পী ক্ষমতার দাস, কখনও বা প্রতিস্পর্ধী। দুই দলেরই জোটে নিজস্ব প্রাপ্য। কেউ পারিতোষিক পান। কারুর স্থান হয় জেলে। সুকান্ত ভট্টাচার্যের মতো কবিতা স্বেচ্ছায় রাজনীতিকে উপজীব্য করেন তাঁর সাহিত্যে। সমস্ত রক্তচোখকে উপেক্ষা করেই –
‘শোনরে মালিক শোনরে মজুতদার,
তোদের প্রাসাদে জমা হল কত মৃত মানুষের হাড়
হিসাব কি দিবি তার?’
ছবিটা আজও কেমন মিলে যাচ্ছে না আমাদের সময়ের সঙ্গে? কিংবা, ‘রবীন্দ্রনাথের প্রতি’ কবিতায় বলছেন –
‘আমার বসন্ত কাটে আমার খাদ্যের সারিতে প্রতীক্ষায়
আমার বিনিদ্র রাতে সতর্ক সাইরেন ডেকে যায়।
আমার রোমাঞ্চ লাগে অযথা নিষ্ঠুর রক্তপাতে।
আমার বিস্ময় জাগে নিষ্ঠুর শৃঙ্খল দুই হাতে।
তাই আজ আমারো বিশ্বাস –
‘শান্তির ললিত বাণী শোনাইবে ব্যর্থ পরিহাস……’।’
একবিংশের পৃথিবীতে গাজা কিংবা ইরান আজও ঘটে। তাই সুকান্তর কবিতা প্রাসঙ্গিক হয়ে থেকে যায়। শান্তির ললিত বাণী না হয়ে তাঁর কলম ঝলসে ওঠে এই অমানবিক, আগ্রাসী, প্রতিহিংসাপরায়ন, নিষ্ঠুর, প্রযুক্তিসম্বলিত সভ্যতার বিরুদ্ধে।
১৯২৬ সালে জন্ম, চলে যাওয়া ১৯৪৭-এ। ছোট্ট একুশ বছরের জীবনে শুধু কবিতা লেখা নয়। গল্প, প্রবন্ধ, গান, নাটক সবেতেই অনায়াস ছিলেন সুকান্ত। মার্কসবাদী প্রগতিশীল লেখক শিল্পী সংঘের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। স্কুলে পড়াকালীনই ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। অগ্নিগর্ভ ছিল তখনকার রাজনৈতিক পরিস্থিতিও। স্বাধীনতা আন্দোলন, ‘৪৩-এর দুর্ভিক্ষের ভয়াবহতা। তাঁর কলম কোনওদিন প্যানপ্যানে কান্নার নয়। অসাম্য অন্যায়কে আঘাত করাকেই তিনি সাহিত্যকর্মের উদ্দেশ্য বলে ঠিক করে নিয়েছিলেন। বাংলার যে কজন কবি মানবতার পক্ষে কলম ধরেছেন, মানুষের স্বাধীনতার পক্ষে কথা বলেছেন, সুকান্ত তাঁদের মধ্যে উজ্জ্বল এক ধ্যানী। গভীর এক ধীশক্তিসম্পন্ন সৃষ্টিশীল। আমাদের বেশিরভাগেরই জীবনে কোনও সচেতন লক্ষ্য গড়ে ওঠেনা, কোনও সচেতন দায় গড়ে ওঠেনা, সুকান্ত সেখানে ব্যতিক্রম। সৃষ্টিশীল কাজকে বৃহত্তর পৃথিবীর দিকে প্রসারিত করে দিতে পারার মতো মেধা তাঁর। তাঁর বইগুলি, ‘ছাড়পত্র’, ‘মিঠেকড়া’, ‘ঘুম নেই’ খুবই জনপ্রিয় নিঃসন্দেহে। এছাড়াও আছে তাঁর নাটক, ছোটগল্প ও গান।
সলিল চৌধুরীর মতো আর এক সুরযাদুকর তুলে নিয়েছিলেন সুকান্তর বেশ কয়েকটি কবিতা – তা সকলেরই জানা। বন্ধু অরুণাচল বসুর কথাও আমরা অনেক পড়েছি। কমিউনিষ্ট পার্টির সদস্য থাকাকালীন সুকান্ত ‘আকাল’ নামে একটি সংকলন সম্পাদনাও করেন।
আমরা কি কোনওদিন ভুলতে পারবো প্রায় মিথ্ হয়ে যাওয়া তাঁর কয়েকটি পংক্তিকে?
“ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়
পূর্ণিমা চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি….”
– কিংবা
“চলে যাব, তবু আজ যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ
প্রাণপণে পৃথিবীর সরাবো জঞ্জাল
এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি…….” (ছাড়পত্র)
অথবা আঠেরো বছরের জয়গান করে লেখা –
‘এ বয়স জানে রক্তদানের পুণ্য
বাষ্পের বেগে স্টীমারের মতো চলে
প্রাণ দেওয়া নেওয়া ঝুলিটা থাকেনা শূন্য
সঁপে আত্মাকে শপথের কোলাহলে……..’
এই ‘আঠেরো বছর’ অবশ্য ক্রমশই অচেনা হয়ে এসেছে আমাদের কাছে। ‘রক্তদানের পুণ্য’ যদিবা না-ও ঘটাতে পারে জীবনে, এমন একটি ছন্দ, কাব্যিকতা ধ্বনিমাধুর্যময় টগবগে কবিতা কি লিখে উঠতে পারবে আজকের আঠেরোরা?
সুকান্ত-র কবিতা আবার নতুন করে যতো পড়ছি, আশ্চর্য হচ্ছি যে, একশো বছর পরেও তাদের প্রাসঙ্গিকতা ক্ষুন্ন হয়নি। এ কোনও আনন্দের কথা নয়, গৌরবের কথাও নয়। সভ্যতা যখন অন্ধকার গলিতে মুখ থুবড়ে পড়ে, বোঝা যায় যে আদিম হিংস্র প্রাচীন যুগের চেয়ে বর্বরতায় কোনও অংশে কম নয় একবিংশ, তখন আমাদের সম্মিলিত লজ্জাকে পরাজিত হতে না শিখিয়ে সুকান্তর কবিতা ‘পৃথিবীকে বাসযোগ্য’ করে তোলার শপথের কথা বলে। ধর্মে ধর্মে, জাতিতে জাতিতে অন্ধ জেহাদে একদল আরেক দলকে যখন আজ ঘৃণা আর আক্রমণের লক্ষ্য করে ফেলেছে, একজন মানবতাবাদী তো দরকার, যাঁর কথা এই অন্ধতার মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে…?
‘সেদিন ছায়ায় এসো
হানো যদি কঠিন কুঠারে
তবুও তোমায় আমি হাতছানি দেব বারেবারে
ফল দেব ফুল দেব দেব আমি পাখিরও কূজন
একই মাটিতে পুষ্ট তোমাদের আপনার জন…….’
কবিতার প্রাণকেন্দ্রে শ্রেণিসচেতনতা ও রাজনীতিকে প্রতিস্থাপিত করা কোনও চাট্টিখানি কাজ নয়। দারুণ মেধাবী না হলে শিল্প আর রাজনৈতিক বোধকে একসূত্রে বেঁধে রাখা অসম্ভব। সহজ সরল ভাষা, সম্ভাবনাময় ছন্দ সুকান্তর কবিতার প্রাণ। অথচ তা ঠিক শ্লোগানের মতো নয়। যেমন এই কবিতাটা – ‘পুরনো ধাঁধাঁ’……..
‘বলতে পার ধনীর মুখে যারা যোগায় খাদ্য
ধনীর পায়ের তলায় কেন থাকতে তারা বাধ্য?
হিং টিং ছট প্রশ্ন এসব মাথার মধ্যে কামড়ায়
বড়োলোকের ঢাক তৈরী গরীবলোকের চামড়ায়।’
এ তো সভ্যতার আদি প্রশ্ন। আদিম প্রশ্ন। আধুনিক প্রশ্ন। যতোদিন না পৃথিবী বাসযোগ্য হচ্ছে ততোদিন এ প্রশ্ন থেকে যাবে।
কবিতায় ঠিক কী খুঁজি আমরা? অবক্ষয়ী আধুনিকতা কেবল আত্মগত কবিতাই লিখতে প্ররোচিত করে আমাদের। সময়-সমাজ-মানুষ-প্রকৃতি সব ভুলে শিল্পীর অস্তিত্ব হয় কি? তাৎক্ষণিকতার ঊর্ধ্বে উঠে নিখিল বৈশ্বিক জীবনকে দেখতে না শিখলে, না জানলে প্রকৃত কবিতা হয় কি? আমাদের শিল্প-সাহিত্যের মহাজনরা তো এটাই শিখিয়ে গেছেন, যে,
‘আপন হতে বাহির হয়ে বাইরে দাঁড়া
বুকের মাঝে বিশ্বলোকের পাবি সাড়া’……..
এই কবিধর্ম পালন করতে গেলে সুকান্ত ভট্টাচার্যের কবিতা প্রয়াস লক্ষ্যনীয় +
‘দৃঢ় সত্যের দিতে হবে খাঁটি দাম
হে স্বদেশ, ফের সেই কথা জানলাম-’
কবি তখনই প্রকৃত কবি হয়ে ওঠেন, যখন তিনি কেবল সাহিত্যকর্মীর পরিচয় ছাড়িয়ে একজন লোকশিক্ষকের পরিচয়প্রাপ্ত হন। তিনি পাঠকের মনে শুধুমাত্র ঘটনার ঘাত-প্রতিঘাতের প্রতিক্রিয়াই সঞ্চারিত করেন না, আরও একটু এগিয়ে, সেই প্রতিক্রিয়াকে একটা সুনির্দিষ্ট অভিমুখ দেবারও চেষ্টা করেন।
*****

