পঞ্চম বর্ষ প্রথম সংখ্যা ফিচার
কলিকাতার কোঠাওয়ালীঃ ঝাড়লন্ঠনের আলোয় তওয়ায়েফ সংস্কৃতির ইতিবৃত্ত
সলিল হোর
আঠারো ও উনিশ শতকের কলকাতার সমাজ-মানসে ‘বাঈজী’ শব্দটি কেবল এক নারী চরিত্রকে বোঝায় না, বরং তা এক বিশেষ আভিজাত্য, মার্জিত বিনোদন এবং উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত-নৃত্যের এক স্বর্ণযুগের ইঙ্গিত দেয়। বেলজিয়াম কাঁচের বিশাল আয়নায় প্রতিফলিত ঝাড়লণ্ঠনের আলো, ভেলভেটের গালিচা, আর ঘুঙুরের নিক্বণে মুখরিত সেই ‘রঙমহল’ আজ ইতিহাসের পাতায় বন্দী। কিন্তু সেই ইতিহাসের পরতে পরতে জড়িয়ে আছে শিল্প, আভিজাত্য এবং এক অদ্ভুত মায়াবী জগতের হাতছানি।
শিল্প ও আভিজাত্যের রসায়ন: তওয়ায়েফ ও বাঈজী:
সাধারণ মানুষের চোখে বাঈজী, তওয়ায়েফ বা মুজরাওয়ালী শব্দগুলো সমার্থক মনে হলেও, এর গভীরে ছিল এক কঠোর সামাজিক ও শৈল্পিক স্তরবিন্যাস। তওয়ায়েফ শব্দের বুৎপত্তিগত অর্থ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সংস্কৃত ও আরবি উভয় ধারাতেই এর সংযোগ রয়েছে—মূলত একদল শিল্পী যাঁরা মন্দির প্রাঙ্গণে দেববন্দনার উদ্দেশ্যে নৃত্যগীত পরিবেশন করতেন। এঁরা কেবল ‘দেহপসারিনী’ ছিলেন না; বরং ছিলেন ‘তহজীব’ বা শিষ্টাচার এবং ‘তরয-কলাম’ বা কাব্যিক অভিব্যক্তির ধারক।
তওয়ায়েফ সমাজের কাঠামোটি ছিল একটি পিরামিডের মতো। এর একেবারে পাদদেশে থাকতেন ‘রেন্ডি’ বা ‘মিরাসাঁস’রা। এরপর ধাপে ধাপে কাঞ্জি, খানগী, ডোমনি, দেরেদার পেরিয়ে চূড়ায় আসীন হতেন ‘বাঈজী’। এই মর্যাদাপূর্ণ স্থানে পৌঁছানো সহজ ছিল না। বাঈজী হতে গেলে কেবল বংশীয় পরিচয় নয়, প্রয়োজন হতো অপ্সরাপ্রতিম রূপ, উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতে অগাধ পাণ্ডিত্য এবং চৌষট্টি কলায় পারদর্শিতা। একটি সূক্ষ্ম পার্থক্য ছিল নামের শেষে—যাঁরা নাচ ও গান উভয়ই জানতেন, তাঁরা ছিলেন ‘জান’, আর যাঁরা কেবল সঙ্গীতেই শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছিলেন, তাঁরাই ছিলেন প্রকৃত অর্থে ‘বাঈ’।
কোঠার অন্দরমহল: মায়াবী এক ভুবন:
বাঈজীদের বাসস্থান বা কর্মস্থলকে বলা হতো ‘কোঠা’। এক একজন ‘চৌধরীয়াঁ’ বা অভিজ্ঞ কর্ত্রীর অধীনে একঝাঁক শিল্পী সেখানে বাস করতেন। সাধারণ গণিকালয়ের সঙ্গে কোঠার পার্থক্য ছিল এর শৈল্পিক আবহে। কোঠার মাহফিল ঘরে একটি খাঁচাবন্দি তোতা আর দেওয়াল জোড়া আয়না থাকা ছিল আবশ্যিক। এই আয়না কেবল সাজসজ্জা নয়, বরং তা ছিল একটি আভিজাত্যের প্রতীক, যা সাধারণ বেশ্যালয় থেকে কোঠাকে আলাদা করে চিনিয়ে দিত। লাহোর, লখনৌ থেকে ঢাকা—সর্বত্রই এই কোঠা সংস্কৃতি এক সময়ে তুঙ্গে ছিল।
কলকাতার বাবু কালচার ও মেটিয়াবুরুজের নবাব
কলকাতায় বাঈজী সংস্কৃতির প্রসার ঘটে মূলত দুটি ধারায়। একদিকে কলকাতার নব্য ধনাঢ্য ‘বাবু’ সমাজ, আর অন্যদিকে অযোধ্যার নির্বাসিত নবাব ওয়াজেদ আলী শাহ। ১৮৫৬ সালে নবাব যখন লখনৌ থেকে বিতাড়িত হয়ে কলকাতার মেটিয়াবুরুজে থিতু হলেন, তাঁর সঙ্গে সঙ্গে লখনৌয়ের সেই মায়াবী ‘আসর’ও চলে এল গঙ্গার পাড়ে। চুন্নাওয়ালী, আম্মান জান, হায়দার জানদের মতো শিল্পীরা মেটিয়াবুরুজকে এক ‘ছোটা লখনৌ’-তে পরিণত করলেন।
অন্যদিকে, কলকাতার ধনাঢ্য বাঙালি জমিদাররা বাঈ নাচের আসরকে বৈভব ও আভিজাত্য প্রদর্শনের প্রধান অস্ত্র হিসেবে গ্রহণ করলেন। মহারাজা নবকৃষ্ণ দেব বাহাদুর ছিলেন এর অন্যতম পুরোধা। দুর্গাপূজা থেকে শুরু করে বিবাহ কিংবা সামাজিক অনুষ্ঠান—বাঈজীদের মুজরা ছাড়া যেন সম্পন্নই হতো না। পাথুরিয়াঘাটার শৌরীন্দ্রমোহন ঠাকুরের মতো বিদগ্ধ মানুষরা আবার এই সংস্কৃতির মাধ্যমে উত্তর ভারতীয় উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতকে বাঙালি ড্রয়িংরুমে পৌঁছে দিতে সাহায্য করেছিলেন।
রেষারেষি, উন্মাদনা ও ইতিহাসের বিচিত্র আখ্যান:
উনিশ শতকের কলকাতার সমাজ ছিল বাঈজী-উন্মাদনায় বিভোর। বাবুদের মধ্যে কে কত বড় বাঈজীকে নিজের বাড়িতে নাচাতে পারেন, তা নিয়ে চলত চরম রেষারেষি। মতিলাল মল্লিকের বাড়িতে যদি বেগমজান নাচতেন, তবে রূপচাঁদ রায়ের বাড়িতে আসর মাতাতেন কাশ্মীরি নর্তকী। এই প্রতিযোগিতার আড়ালে কত যে কৌতুকপ্রদ আর কলঙ্কিত কাহিনী লুকিয়ে আছে, তার ইয়ত্তা নেই।
এরকমই এক বিখ্যাত কাহিনী বুন্নুজানকে নিয়ে। ১৮১৯ সালে রূপচাঁদ রায়ের বাড়িতে কাশ্মীরি বাঈজীর নাম করে আসলে বউবাজারের রতন বাঈয়ের মেয়ে বুন্নুজানকে বসিয়ে দেওয়া হয়েছিল। বুন্নুর রূপ আর শৈল্পিক বিভঙ্গে সবাই এতটাই মন্ত্রমুগ্ধ হয়েছিলেন যে, পরের দিন খবরের কাগজে তাঁকে ‘কাশ্মীর কি কলি’ বলে অভিহিত করা হয়। কেউ ধরতেই পারেনি তিনি আসলে কলকাতারই মেয়ে। পরবর্তীকালে এক বেনামী চিঠিতে সত্য ফাঁস হলেও বুন্নুর শ্রেষ্ঠত্ব ম্লান হয়নি।
আবার কলুটোলার সরকার বাড়িতে বাপ-ছেলের বিবাদ বেঁধেছিল দুই বাঈজী—সুপনজান ও নান্নিজানকে নিয়ে, যা সেই সময়ে কলকাতার সমাজে চরম আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এমনকি লর্ড ক্লাইভও একবার শোভাবাজার রাজবাড়িতে মুনিয়া জানের রূপ ও নৃত্য দেখে এতটাই বিমোহিত হয়েছিলেন যে, তাঁকে ধরতে গিয়ে মঞ্চের ওপরেই টাল সামলাতে না পেরে আছাড় খেয়েছিলেন।
নক্ষত্ররাজি: নিকী থেকে গওহর জান:
সেই সময়ের নক্ষত্রপুঞ্জের মধ্যে উজ্জ্বলতম ছিলেন নিকী বাঈ। আঠারোশ কুড়ির দশকে রাজা রামমোহন রায়ের বাগানবাড়িতেও তিনি নৃত্য পরিবেশন করেছিলেন। ব্রিটিশ অফিসার ফ্রেডরিক উইন নিকীর সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে লিখেছিলেন যে, তাঁর অঙ্গপ্রত্যঙ্গ যেন স্বয়ং রতিদেবী নির্মাণ করেছেন। তিন রাতের মুজরোর জন্য নিকী ১২০০ টাকা নগদ এবং মূল্যবান শাল পারিশ্রমিক পেতেন, যা সেই যুগে অভাবনীয় ছিল।
তবে এই ধারার শেষ এবং সম্ভবত শ্রেষ্ঠ প্রতিনিধি ছিলেন মিস গওহর জান। ভারতের প্রথম গ্রামোফোন রেকর্ডে কণ্ঠ দেওয়া এই শিল্পীকে বলা হতো ‘ইন্ডিয়ান নাইটিঙ্গেল’। তাঁর জীবনের বর্ণাঢ্য কাহিনী, তাঁর বিপুল সম্পত্তি আর অপ্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিভা তাঁকে কিংবদন্তিতে পরিণত করেছিল। অমিয়নাথ সান্যাল তাঁর সম্পর্কে লিখেছিলেন, গওহর ছিলেন এলোমেলো হাওয়ার এক ঘূর্ণি, যিনি নিজেকে এবং শ্রোতাকে দিশেহারা করে দিয়ে যেতেন।
অবসান ও উত্তরসূরি:
কালের নিয়মে কলকাতার সেই ‘বাবু কালচার’ অস্তমিত হয়েছে, আর তার সঙ্গে হারিয়ে গেছে কোঠার সেই জৌলুসও। যে বাঈজীরা একসময় সমাজ ও শিল্পের শীর্ষে অবস্থান করতেন, সংস্কার আর আধুনিকতার চাপে তাঁরা ব্রাত্য হয়ে পড়েছেন। কিন্তু বাংলা তথা ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের বিকাশে তাঁদের অবদান অস্বীকার করার উপায় নেই। ঠুমরি, দাদরা, গজল কিংবা কাজরি—আজকের মার্গ সঙ্গীতের যে ধারায় আমরা অবগাহন করি, তার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন এই কোঠার মহিলারাই।
ঝাড়লণ্ঠনের আলো হয়তো নিভে গেছে, ভেলভেটের গালিচায় ধুলো জমেছে, কিন্তু তাঁদের পায়ের ঘুঙুরের প্রতিধ্বনি আজও যেন কলকাতার পুরনো গলিগুলোতে কান পাতলে শোনা যায়। তাঁরা হয়তো জানতেন তাঁদের এই নশ্বর অস্তিত্বের কথা, তাই তো গওহর জানের মতো শিল্পীরা অকপটে বলে গিয়েছিলেন—মরার পরেও তাঁরা ইতিহাসের পাতায় বেঁচে থাকবেন, কারণ তাঁদের জীবনের প্রতিটি পরতে ছিল শিল্পের চরম পরাকাষ্ঠা।
তথ্যসূত্র:
১. সেকাল আর একাল – রাজনারায়ণ বসু
২. হুতোম প্যাঁচার নকশা – কালীপ্রসন্ন সিংহ
৩. কলিকাতা দর্পণ (১ম ও ২ম খণ্ড) – রাধাবমণ মিত্র
৪. স্মৃতিতে অমলিন – অমিয়নাথ সান্যাল
৫. গওহর জান: দ্য স্টোরি অফ মাই লাইফ – বিক্রম সম্পত
সাময়িকী ও অন্যান্য উৎস:
১. সংবাদ প্রভাকর ও সমাচার দর্পণ
২. বেঙ্গল গেজেট ও সমসাময়িক ইংরেজি নথি

