পঞ্চম বর্ষ প্রথম সংখ্যা প্রবন্ধ
ঈশ্বরের করুণাহীন প্রতিচ্ছবি – ১৯৪০(অনুভব)
অরিত্র দ্বিবেদী
কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য। শুধু এইটুকু শুনলেই ছোটবেলা থেকে বারবার শুনে আসা বিভিন্ন কিংবদন্তী এবং একজন অকালমৃত বাঙালি তরুণের মুখ আপামর বাঙালির মনে পড়ে। মনে পড়ে নিজেদেরই দুঃস্থ ইতিহাস, যে ইতিহাস কষ্টের, দুঃখের, যন্ত্রণার, সংগ্রামের। মনে হয় চব্বিশ পরগনার যে কোনো বাঁশবনে অথবা হুগলীর যে কোনো পুকুরের পাড়ে, কিম্বা মেদিনীপুরের কোনো কোনো একলা মাঠে, নদীর চরায় হেঁটে আসে যে তরুণ বাঙালিটি, সেই বুঝি কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য। আশ্চর্য এই কবি, তাঁর মানস যাপন এবং সম্ভাবনা। সুকান্ত কবি হিসেবে কেমন অথবা তিনি দীর্ঘায়ু হলে কী হতে পারতেন এ নিয়ে আলোচনা বিস্তর হয়েছে, কিন্তু সেসব নয়, আজ কথা বলা যাক বরঞ্চ তাঁর প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ “ছাড়পত্র” থেকে একটিমাত্র কবিতা নিয়ে। পরবর্তীকালে এ কবিতায় সুরারোপ করেছেন সলিল চৌধুরী (সেখানে জুড়েছে ১৯৪৬ শীর্ষক কবিতাটিও)। মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়েছে এ গান বাঙালির রাগে, দুঃখে, অভিমানে, অসহায় অবস্থায়। সে অবস্থা একাধারে রাজনৈতিক এবং সামাজিক দুইই। এই কবিতাটির নাম, “অনুভব(১৯৪০)”। নীচে কবিতাটির উল্লেখ করা হল, পরবর্তীতে প্রয়োজনানুসারে লাইন ব্যবহার করা যাবে।
অনুভব(১৯৪০)
অবাক পৃথিবী! অবাক করলে তুমি
জন্মেই দেখি ক্ষুব্ধ স্বদেশভূমি।
অবাক পৃথিবী! আমরা যে পরাধীন।
অবাক, কী দ্রুত জমে ক্রোধ দিন দিন;
অবাক পৃথিবী! অবাক করলে আরো–
দেখি এই দেশে অন্ন নেইকো কারো।
অবাক পৃথিবী! অবাক যে বারবার
দেখি এই দেশে মৃত্যুরই কারবার।
হিসেবের খাতা যখনি নিয়েছি হাতে
দেখেছি লিখিত–’রক্ত খরচ’ তাতে।
এদেশে জন্মে পদাঘাতই শুধু পেলাম,
অবাক পৃথিবী! সেলাম, তোমাকে সেলাম!
প্রথমেই চোখে পড়ে “অনুভব” নামটি। এখানে কবি সরাসরি বক্তব্য রেখেছেন নিজের, তাঁর স্বল্পায়ু জীবনের দিন তাঁকে যেভাবে যেভাবে অভিজ্ঞতাপূর্ণ করে তুলেছে, তিনি সেই কথা বুঝি সরাসরি বলতে চাইছেন। অন্য আরও সম্ভাবনার কথাও মাথায় আসে, তা হল, এ অনুভব কি অন্যান্য মানুষেরও নাকি এ অনুভব তাঁদের হওয়া উচিত ছিল, অথচ হল না? নামে সাল উল্লেখ করা রয়েছে, “১৯৪০”, সামাজিকভাবে, রাজনৈতিকভাবে ভারতবর্ষ এবং বাংলা তখন উত্তাল, অস্থির, আয়াসপূর্ণ! এই কবিতার উল্লিখিত সালের হিসেব ধরলে কবির বয়স তখন মাত্র ১৪! রচনাকাল সম্পর্কে বিভিন্ন মতামত রয়েছে, তবুও কবির মানস চিত্রপটে সালটি নির্দিষ্ট কি না তা আজ আর জানা সম্ভব না হলেও সময়কালটি সম্পর্কে কোনো সন্দেহ থাকে না।
এই কবিতাটিই বেছে নেওয়ার কারণ খানিকটা স্পষ্ট হলেও পুরোটা হয়নি। শেষোক্ত কারণটি তার ওপর কিঞ্চিত আলো রাখবে বলে বিশ্বাস রাখা যায়। এই কবিতাটি ওঁর বেশিরভাগ কবিতার মতনই এমন মানুষদের কথা বলে যাঁদেরকে দেশ, জাতি, বর্ণ, মহাদেশ, ইতিহাস নির্বিশেষে বারেবারে ‘ভিড়’ বলে অপদস্থ করা হয়েছে, যাঁদের আপাত কোনো গৌরব বা বৈভব যেন থাকতে নেই, তাঁরা গণনা-হীন, পরিচয়হীন, অথচ খেয়াল করলে বোঝা যাবে মানুষের লিখিত ইতিহাসের বেশিরভাগটাই জুড়ে রয়েছেন এঁরাই। এঁদের জীবন, কবির নিজের বেড়ে ওঠা, সময়কে চেনার চেষ্টার সঙ্গে সাযুজ্য রাখে বলে পাঠক বিশ্বাস করেন; এও আশ্চর্য নয় যে কবি অসীম সাফল্যে এইসব মহাজীবনের ছোট ছোট কালখণ্ডগুলিকে, অনুভূতিমালাকে এমন অর্জন করার মতন করে তুলে এনেছেন।
সাম্প্রতিক সময়ে এক বিশ্বখ্যাত বৈজ্ঞানিক জার্নালে প্রকাশিত এই বয়ানটির ওপর আমরা একবার চোখ রাখার চেষ্টা করব:
Astronomers Say We Might Live in a Giant Cosmic Void – 2 Billion Light-Years Wide
A new study suggests that Earth and the Milky Way may reside in a massive cosmic void – a region with far less matter than average – 2 billion light-years across.
This challenges a core assumption in cosmology: that matter is evenly spread throughout the universe.
Why does it matter? This could help explain the Hubble tension, the discrepancy between how fast the universe appears to be expanding when measured using the early universe versus nearby galaxies.
Living in an underdense region could make our local universe expand faster, without needing to tweak fundamental physics or discard dark energy.
The odds? Researchers now say it’s 100 times more likely we live in a cosmic void than in a region of average density. If confirmed, this discovery could reshape our understanding of the cosmos and our place within it.
(Source:
Royal Astronomical Society. “Earth Inside Huge Void May Explain Big Bang Expansion Rate Puzzle.”)
অর্থাৎ এই আমাদের প্রাপ্ত জীবনে কিন্তু আদতে আমরা “privileged”, যা আমরা অনুধাবন করতে পারিনি এ পর্যন্ত, এবং কী বিরাট একটা ফাঁক আমাদের ঘিরে রেখেছে বলেই আমরা টিকে রয়েছি। এইবার আপামর বাঙালির বর্তমান সামাজিক অবস্থানের দিকে আমরা যদি তাকাই, কবি যে সময়ে দাঁড়িয়ে এই কবিতাটি লিখছেন তা এই বিরাট “void”-এর বাইরের অংশ। অর্থাৎ একজন সাধারণ বাঙালি বা ভারতবাসীর জীবনও “privileged”, কারণ এই “void” এর জন্য তাদের সংগ্রাম করতে হয়নি, কবি এখানে কথা বলছেন সেই দুই বিলিয়ন লাইট ইয়ার দূরের অংশ নিয়ে যেখানে জীবন ধারণ সহজ নয়, বরঞ্চ “miracle” বা অত্যাশ্চার্য!
একথা ধীরে ধীরে এ লেখার মধ্যে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করা যাবে। কবির প্রথম দুটি লাইন যদি দেখি আমরা, “অবাক পৃথিবী! অবাক করলে তুমি/জন্মেই দেখি ক্ষুব্ধ স্বদেশভূমি।”, প্রথম দুটি শব্দের পরেই বিস্ময় চিহ্ন রেখেছেন সুকান্ত ভট্টাচার্য, কারণ স্পষ্ট, জীবনের যে ধাক্কা সে তিনি জন্মে পেয়েছেন তা নিশ্চিত, কিন্তু সেই অস্থির, বিপন্ন, অনটনের পৃথিবীর ধাক্কাটা উঠে এসেছে যতিচিহ্নে, পাঠক প্রথমেই এই দুই ধাক্কা পাচ্ছেন এখানে। পরে কবি এই ধাক্কাদুটিকে ঢেউয়ের মতন অনুরণনে তুলে আনছেন, স্পষ্ট করছেন, যে “স্বদেশভূমি” ক্ষুব্ধ, এখনই! এই তো সবে জন্ম হল! কেন ক্ষুব্ধ কারণ, “আমরা যা পরাধীন”। এতক্ষণ কবির “আমি” একবচনে ছিল, কিন্তু পরাধীন শব্দটি বসার সঙ্গে সঙ্গেই সেটি বহুবচনে আমরা হয়ে এল। জাতীয় অস্থিরতা গাঢ় হয়ে এল। সেজন্যই ক্রোধ বা রাগ দিনে দিনে আরও আরও জমা হতে থাকে।
এইবার পাঠক খেয়াল রাখুন, কবি কী লিখছেন। কবি লিখছেন,
“অবাক পৃথিবী! অবাক করলে আরো–
দেখি এই দেশে অন্ন নেইকো কারো।
অবাক পৃথিবী! অবাক যে বারবার
দেখি এই দেশে মৃত্যুরই কারবার।”
প্রথম লাইনে “আরো” ‘র পরের ড্যাশটি সজোরে আছড়ে ফেলে পাঠকের মানসে, দ্বিতীয় লাইনটির অশ্লীল ছবি, “দেখি এই দেশে অন্ন নেইকো কারো।” কবি এই কবিতায় দাঁড়ি বা পূর্ণযতি কেবলমাত্র এই ধাক্কার অনুরণনের তথ্যগুলিতেই রেখেছেন, আর কোথাও নেই। যা কিছু কবির চোখে আপাত অশ্লীল ঠেকেছে, আপাত অনৈতিক ঠেকেছে তিনি সেসমস্তকে তথ্য হিসেবে পাঠকের সামনে তুলে এনেছেন। নইলে এই লাইনগুলো নিজের শেষে বিস্মিত হতে চাইছিল, কিন্তু যেন কবি বোঝাতে চাইছেন জন্মাবধি বিস্মিত হতে হতে এসমস্ত হতাশা তাঁর বিস্মিত হতে পারার প্রবণতায় আঘাত করেছে।
হিসেবের খাতা যখনি নিয়েছি হাতে
দেখেছি লিখিত–’রক্ত খরচ’ তাতে।
এদেশে জন্মে পদাঘাতই শুধু পেলাম,
অবাক পৃথিবী! সেলাম, তোমাকে সেলাম!
এই শেষ চারটি লাইনেও এই ব্যবহারের অন্যথা হয়নি। কবি দ্বিতীয় লাইনের মধ্যে যে ড্যাশ চিহ্নটি ব্যবহার করেছেন তার ফলে, ‘রক্ত খরচ’ শব্দবন্ধটি যে অস্বাভাবিক গতি পেয়েছে তা রক্ত ছলকে ওঠার ছবি পাঠকের মনে এঁকে দিয়ে যায়, এবং একই সঙ্গে গত লাইনেই পড়া “মৃত্যুরই কারবার” নিজের যথার্থতা খুঁজে পায়। এই সময়ের স্থাপত্তের অনটন, তার দার্ঢ্যের অনিশ্চিত বিপন্ন ভাব এক অদ্ভুত বিষণ্ণতা জারিত করে। এ বিষণ্ণতায় হতাশা, অস্থিরতা, মুহূর্তের অনৈতিক বিচার, ঈশ্বরের করুণাহীন প্রতিচ্ছবি সমস্তটা ফুটে ওঠে। যে শিশু সদ্যোজাত সে কিছু করতে পারে, সে অসহায়, তার শারীরিক জন্মের নয়, বরঞ্চ মানসিক বা বলা ভালো মানবিক জন্মের কথা কবি তুলে এনেছেন।
আপাত তুচ্ছ, আপাত গরীমা-হীন, সহায়-হীন, অনাড়ম্বর, একভিড় মানুষদের প্রতিটি জীবন যেন একটা একটা করে তার যোগ্য দাবি রেখে গেছে এই কবিতায়, ভাষায়, ছন্দে, যতিতে, অথচ কবিতা হিসেবে দেখলে এ তো একটিই, সেই সন্দর্ভে এও বলা চলে যে এই মানুষগুলিও একত্র, কিন্তু ভিড় কদাপি নন।
এমন সমষ্টিগত আবার ভীষণ ব্যক্তিগত লাইনদুটি দিয়েই কবি শেষ করেছেন। এবং শেষে অপেক্ষা করছে একটি বিস্ময় চিহ্ন, যা হারানো অনুভূতিকে অগ্নিকাণ্ডের আয়োজন দিচ্ছে, ডাক দিচ্ছে, আর প্রতি পদে ধিক্কার জানাচ্ছে এই চূড়ান্ত অব্যবস্থাকে, অশালীন এই সময়কে।
“এদেশে জন্মে পদাঘাতই শুধু পেলাম,
অবাক পৃথিবী! সেলাম, তোমাকে সেলাম!”

