পঞ্চম বর্ষ প্রথম সংখ্যা গদ্য
প্রতিটি যাওয়াই আসলে রাজনৈতিক
দেবার্ঘ্য দাস
মৃত্যু সম্বন্ধীয় এই লেখাটি আমার লেখার কথা নয়। আমি ভেবেছিলাম ‘অবিচুয়ারি’ লিখবো। আজকাল আমাদের অগাধ যাতায়াত ভার্চুয়াল পাড়ায়। সেই পাড়ায় অলিতে গলিতে যা কিছুই চলছে তা নিয়ে ‘কিছু একটা লিখুন’ – এর দিবারাত্রির কাব্য! মৃত্যুবিষয়ক শোক ক্রমশ পেরিয়ে অনুভূতিহীন, এক পাথরের বুক আজ যতই শোকের সান্ত্বনায় খুঁজে বেড়াক এক মুঠো ছাই, পালাবার পথ নাই। চারিদিকে দ্বন্দ্ব, দ্বিধা, সন্দেহ এমনভাবে চেপে ধরে, বোঝার উপায় নেই যে গেছে সেখানে আর কোন কিছুরই জারিজুরি থাকবে না। তা জেনেও বিষাদ বিলাসী হাওয়ায় ভাসতে থাকা।
আকাশটা সেদিন ছিল অংশত মেঘলা। আর্জেন্টিনার জার্সিটা গায়ে চাপিয়ে আপনি চলে যাচ্ছিলেন দূরে। সহজ কথা ঠিক সহজ নয়, স্পষ্ট কথায় স্পষ্ট কথা বলা আজকের দুনিয়াতেও সহজ- সেইসব ব্যক্তিগত স্মৃতি আজ থাক। যৌথ খামারের স্বপ্ন দেখতেন; স্বপ্ন দেখতেন সোজা পথে সোজা কথায় সোজাসাপ্টা যাপনের। পাশের বাড়ির দাদা যেমন হয়- নিজ কাজে দুনিয়া জয় করেও সেলিব্রিটি আর গ্ল্যামার দুনিয়ায় থেকেও অবলীলায় কলোনির ‘বাবিন’ হওয়া যায়। হওয়া যায় জানলা দিয়ে আকাশ দেখা ‘টুবাই’ দা! জীবনানন্দের নির্লিপ্ত ঘোর শুধু ঝড়া পালকে নয় আপনার যাপনেও ছিল মিশে। কলোনির ইতিহাস, প্রতিবেশ, এবং আরও চেনা অচেনা দিক বিশেষ করে বিজয়গড় কলোনির লোকইতিহাসের অন্যতম নির্মাতাদের মধ্যে আপনি অন্যতম। আমরা-ওরা-রঙ-বর্ণ-শ্রেনী আপামর সবার মধ্যে আপনার অবাধ চলাচল।
নিজের ভুলকে উদযাপন করার মতো রাজা খুবই কম এসেছে পৃথিবীতে- সে তো আপনি লিখেওছিলেন ‘শেন ওয়ার্ন ‘ লেখাটিতে। না আপনি শেন ওয়ার্ন নন, রাজাও নন। কিন্তু নিজের ক্ষত, দু:খ, ভুল, আনন্দ, উচ্ছ্বাস, উন্মাদনা কোনওকিছু ধামাচাপা দিয়ে যাননি বলেই আপনি আর পাঁচজনের থেকে একটু বেশি রকমের মানুষ। প্রথম সিনেমায় যেভাবে অকপটে সুপারস্টারের স্বাদ কিরকম হয় পেয়েছিলেন এবং তা নিয়ে মাথা ব্যথা করেননি। ঠিক তেমনি নিরুত্তাপ অথচ তোলপাড় করে চলে গেলেন। রয়ে গেলেন ভাবলেশহীন। দেখিয়ে গেলেন প্রত্যেকটি ভাষ্য রাজনৈতিক। প্রতিটি যাওয়াই আসলে রাজনৈতিক। যাবার বেলায় সবাই যে যার মতন বিজ্ঞাপন আর ভুলিয়ে দেওয়ার খেলায় মুখ ঢেকেছে। গায়ে মাখতে নেই জেনেই নিরুত্তাপ ভঙ্গিতে কমরেডদের সাথে এগিয়ে গেলেন শেষ ল্যাপের দিকে… থেকে যাবে সহজ, প্রিয়াঙ্কা, মা, পেন্সিল, নোটবুক, শেষ না হওয়া পংক্তি, আর বিজয়গড়। চলে যাবার পাঁচদিন পরেও আপনার ব্যক্তিগত থেকে আমরা হয়ে গেলাম ‘সবাই’। জানি না কবে পাবো কিছু প্রশ্নের উত্তর? জানি প্রশ্ন গুলো সহজ আর উত্তরটাও জানা।
শুধু জানি, একদিন। আমি, জিজ্ঞেস করে নেব-
“show me a garden that’s bursting into life…!”

