নুক্কড় নাটক : রাস্তার সন্ধানে – সংহিতা রায়

না কোনও প্রোডাকশন হাউস, না হেভিওয়েট তারকা, না স্টুডিয়ো না ব্র্যান্ডিং- কিছুই নেই। সম্বল বলতে স্বপ্ন, সাহস আর সৎ বুদ্ধি। এই সম্বল করে ধারের টাকায় ভাড়ার ক্যারাভান নিয়ে পথে নেমেছিলেন তন্ময় শেখর আর তাঁর টিম। তাঁদের ডেবিউ ছবি ‘নুক্কড় নাটক’র প্রচারে।
উত্তর ভারতের ১৫টি শহরে ঘুরেছিলেন তাঁরা। পথ নাটক ছিল প্রচারের মাধ্যম।
পরিশ্রমের ফল মেলে। ২৭ ফেব্রুয়ারি মুম্বই, ইন্দোর, ভোপাল-সহ প্রায় ৪০টি পর্দায় ছবিটি মুক্তি পেলে দর্শকদের উৎসাহী সাড়া পাওয়া যায়।
ছবি তৈরির পর এক বছরের বেশি সময় অপেক্ষা করতে হয় মুক্তির জন্য।
‘নুক্কড় নাটক’ মানে পথ নাটক।
এই কামিং-অফ-এজ ড্রামায় অভিনয় করেছেন মলশ্রী ও শিবাঙ্গ রাজপাল। মলশ্রী এ ছবির সহ-প্রযোজকও।

ছবির গল্প দুই কলেজ পড়ুয়াকে নিয়ে। ছবিতেও তাঁরা স্বনামেই অভিনয় করেছেন। মলশ্রী ও শিবাঙ্গ ইঞ্জিনিয়ারিং—এর ছাত্র। তারা কলেজের পথনাটক দলের সদস্য। মলশ্রী দলের ক্যাপ্টেন। সে যেমন সাহসী, তেমন হুজুগে। আর শিবাঙ্গ সম্পূর্ণ বিপরীত।
একদিন ক্যান্টিনের ম্যানেজার এক কর্মীকে অপমান করে। তাকে শিক্ষা দিতে মলশ্রী ক্যান্টিন থেকে সব কনফেকশনারী চুরি করে। সঙ্গী শিবাঙ্গ। ধরাও পড়ে তারা। নেমে আসে – বহিষ্কারের খাড়া।
তাদেরকে শেষ একটা সুযোগ দেয় অধক্ষ্য। তিনি বলেন সংলগ্ন বস্তি থেকে যেতে পাঁচ জন শিশুকে তারা স্কুলে ভর্তি করাতে পারে তাহলে শাস্তির হাত থেকে বেঁচে যেতে পারে তারা।
কীভাবে তা সম্ভব হয় -এই নিয়েই এগিয়েছে ছবি।
ছবির প্রচারের বিশেষ ক্যাম্পেইন পরিকল্পনা করেছিলেন তাঁরা।
তন্ময় ও মলশ্রী বুঝতে পারেন, ছবি বানানো কাজের অর্ধেক মাত্র; তারকা বা পরিচিত প্রোডাকশন হাউস ছাড়া দর্শকের কাছে পৌঁছানোই আসল চ্যালেঞ্জ।
এই ছবির গল্প আইআইটি কানপুরের প্রাক্তনী তন্ময়ের নিজের জীবন।
আগে তন্ময় যুক্তরাষ্ট্রে ডেটা সায়েন্টিস্ট হিসেবে কাজ করতেন। শর্ট ফিল্ম এবং আমেরিকান ইন্ডি সেটে হাতে-কলমে কাজের হাতেখড়ি।
বাবা আইআইটি কানপুরে পড়াতেন। তন্ময়ের বড় হয়ে ওঠা ক্যাম্পাসেই। বাবা পরে ধানবাদ আইআইটির ডিরেক্টর হন।
কয়েক বছর আগে বাড়ি গিয়ে দেখেন তাঁর মা পাশের বস্তির বাচ্চাদের পড়াচ্ছেন। তন্ময়ও সেখানে যান। ধাক্কা নেয় দুই ভারতের তীব্র বৈপরীত্য।
মলশ্রী ও শিবাঙ্গ রাজপালের চরিত্র দুটি এই দেখা থেকেই তৈরি।
মলশ্রী একজন এক্সট্রভার্ট তরুণী। সে পথনাটকের মাধ্যমে সমাজ বদলাতে চায়। আর শিবাঙ্গ ইন্ট্রোভার্ট। নিজের পরিচয় খুঁজছে।
এই ছবিতে তন্ময় ‘পারফরমেটিভ’ বা ‘কিবোর্ড’ অ্যাক্টিভিজমের দিকেও আলো ফেলেন।
তিনি বলেন, “মানুষ সামাজিক ইস্যু নিয়ে শুধু সোশ্যাল মিডিয়াতেই সরব”।
ছবির শুটিং হয়েছে আইআইটি ধানবাদে। তাঁর মায়ের সূত্রে পাওয়া যায় বস্তির লোকেশন।
অন্যান্য অভিনেতাদের মধ্যে নির্মলা হাজরা ‘ছবির আবিষ্কার’। পরিচালকের কথায়, “মলশ্রী আর আমি বস্তিতে গিয়ে পঞ্চম থেকে অষ্টম শ্রেণির ছাত্রদের সঙ্গে মিশি, ইম্প্রোভ এক্সারসাইজের মাধ্যমে ওদের সঙ্গে সহজ হই। সেখানেই নির্মলাকে পাই — ভীষণ বুদ্ধিমান”।
তারপর চলে ওয়ার্কশপ। একটা ছোট টিম নিয়ে শুটিং শেষ হয়।
ছবি খরচ এসেছে ক্রাউড ফান্ডিং-এর মাধ্যমে। আইআইটি প্রাক্তনীদের কাছেও পৌঁছান তাঁরা । ৩০-৩৫ জনের আর্থিক সাহায্যে ফান্ডিং জোগাড় হয়।
লোনের সুদ-সহ ছবির মোট বাজেট দাঁড়ায় প্রায় আড়াই কোটি টাকা।
তারকা নেই বলে ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলো আগ্রহ দেখায়নি, প্রোডাকশন হাউসের দরজাও সীমিত ছিল। এই সময় অপ্রত্যাশিতভাবে পাশে দাঁড়ান পরিচালক ইমতিয়াজ আলি। ছবিটা দেখে তাঁর ভালো লেগে যায়। কয়েকটা ওটিটি প্ল্যাটফর্মে কথাও বলেন। সোশ্যাল মিডিয়া ভিডিয়ো বার্তা দেন।
শেষমেশ টিম নিজেরাই ছবি থিয়েটারে রিলিজ করার সিদ্ধান্ত নেয়।
‘নুক্কড় নাটক’ ২৪ এপ্রিল থেকে নেটফ্লিক্সে স্ট্রিম হচ্ছে।
