নগেন্দ্রপ্রসাদ, শিবদাস, মতি নন্দী, ধন্যি মেয়ে…বাঙালির ফুটবল জুড়ে আবেগ আর নস্টালজিয়া – সৌভিক রায়

গোষ্ঠ পাল, বাঘা সোম, চুনী গোস্বামী নেই! পল্টু দাস, টুটু বোসেরাও ওপারের বাসিন্দা। শৈলেন মান্না, গৌতম সরকার, বিদেশ বসু, দিলীপ পালিত, সুব্রত ভট্টাচার্য, কৃশাণু-বিকাশ, পিকের ভোকাল টনিক, অমল দত্তের ডায়মন্ড ছক সবই এখন স্মৃতি। কাঠের গ্যালারি উধাও। সবুজ গালিচার ময়দানে বাঙালির আর দাপট নেই। ডার্বি আছে, মশাল-নৌকার লড়াই আছে কিন্তু উন্মাদনা নেই। শুরু হয়েছে বিশ্বকাপ। বাঙালির মনে মোচড় দিয়ে উঠেছে ফুটবল আবেগ। পাড়ার পর পাড়া সেজে উঠেছে ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, জার্মানি, ফ্রান্সের পতাকায়। আদতে জাতটার প্রথম প্রেম ফুটবল। গোধূলিবেলার ময়দান থেকে ভরা ভাদরে ভেসে যাওয়া মাঠ, মোজায় আটকে থাকা চোরকাটারা জানে ফুটবলকে কতটা ভালোবাসে বাঙালি!
এই ভালোবাসার সূত্রপাত নগেন্দ্রপ্রসাদের হাতে ধরে, থুরি পায়ের দৌলতে। খোদ বিবেকানন্দ তাঁর সুখ্যাতি করে গিয়েছেন। শিকাগো কাঁপানো স্বামী বিবেকানন্দ ১৮৯৭ সালে শোভাবাজার রাজবাড়িতে দাঁড়িয়ে এক সংবর্ধনাসভায় নগেন্দ্রপ্রসাদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, “ইংরেজদের কাছে সম্মান আদায় করিবার পদ্ধতি এই মানুষটি জানেন। ওঁর মতো মানুষ, ওই রকম মরদ চাই আমাদের দেশে…”
১৮৭৭ সাল, ফোর্ট উইলিয়ামের পাশ দিয়ে ছুটছে সর্বাধিকারী পরিবারের গাড়ি। ভিতরে হেমলতা দেবী এবং তাঁর বছর আটেকের পুত্র। তখন ‘ক্যালকাটা ফুটবল ক্লাব’-র মাঠে বল নিয়ে ঘা ঘামাচ্ছেন গোরা সেনাবাহিনীর তরুণেরা। চোখ আটকে যায় ছেলেটির। গাড়ি থামিয়ে সে বল খেলা দেখতে থাকে। হঠাৎই বল এসে যায় তাঁর সামনে। এক গোরা সৈন্য চেঁচিয়ে বলে ওঠে ‘কিক ইট’। ছেলেটি পায়ের জোরে বলটি ফেরত পাঠায়, সেই প্রথম বাঙালির পা পড়ল বলে। ছেলেটির নাম নগেন্দ্রপ্রসাদ। পরদিন হেয়ার স্কুলের বন্ধুদের নিয়ে ‘ম্যান্টন অ্যান্ড কোম্পানি’-র দোকান থেকে ফুটবল ভেবে রাগবি বল কিনে সে নেমে পড়ল মাঠে। প্রেসিডেন্সি কলেজের শিক্ষক জিএ স্ট্যাক হলেন তাঁদের ফুটবলের দ্রোণাচার্য।
এরপর ভারতীয় ফুটবলে বিপ্লবের জোয়ার আনলেন নগেন্দ্র। ভারতের প্রথম ফুটবল সংগঠন ‘বয়েজ ক্লাব’ তাঁর হাত তৈরি। প্রথম বাঙালি ক্লাব হিসাবে গড়ের মাঠে তাঁবু ফেলে নগেন্দ্রর ওয়েলিংটন ক্লাব। ১৮৮৭ সালে প্রতিষ্ঠা করেন শোভাবাজার ক্লাব। ওয়েলিংটন, ফ্রেন্ডস, প্রেসিডেন্সি ও বয়েজ ক্লাবকে একত্রিত করে শ্বশুরবাড়ি শোভাবাজার রাজবাড়ির উঠোনে শোভাবাজার ক্লাবের জন্ম। বিদ্বেষ, বৈষম্যকে দূরে ঠেলে সমস্ত শ্রেণির জন্য খুলে দিলেন ফুটবলের দরজা। বুকের রক্ত দিয়ে গড়লেন ফুটবলারদের। বৃহত্তর বাংলায় ফুটবলকে ছড়িয়ে দিতে হাওড়া স্পোর্টিং, চুঁচুড়া স্পোর্টিং গড়েছেন। ফুটবলকে নিয়ে গিয়েছেন মফঃস্বলে। জয় করেছেন গ্রাম বাংলা। এরপর ‘ট্রেডস কাপ’।
ভারতীয় ফুটবলের দ্বিতীয় প্রাচীনতম ট্রফি ‘ট্রেডস কাপ’। ১৮৮৮-তে ভারতীয় ফুটবলের প্রাচীনতম ট্রফি ডুরান্ড কাপ শুরু হয়। বছর ঘুরতে না ঘুরতেই ১৮৮৯-তে ‘ভারতীয় ফুটবলের জনক’ নগেন্দ্র প্রসাদ সর্বাধিকারী ইউরোপীয় ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান ‘ট্রেডস অ্যাসোসিয়েশন’ এবং সাহেব দলগুলিকে নিয়ে শুরু করেন ট্রেডস কাপ। ইংল্যান্ডের টাইমস পত্রিকাতেও প্রকাশিত হয়েছিল এই ট্রফি শুরুর খবর। ১৩টি ক্লাবকে নিয়ে শুরু হয়েছিল ট্রফি। ১২টি ক্লাব ইউরোপের। একটি মাত্র ভারতীয় ক্লাব, নগেন্দ্রপ্রসাদ সর্বাধিকারীর নেতৃত্বে ‘শোভাবাজার’।
তিন বছরের চেষ্টার পর ১৮৯২ সালে ইস্ট সারেকে হারিয়ে নগেন্দ্র প্রসাদের নেতৃত্বে ট্রেডস কাপ ঘরে তোলে শোভাবাজার ক্লাব। শুরু হয় ভারতীয় ফুটবলের জয়যাত্রা। সেই বছরই এআর ব্রাউন, বিআর লিন্ডসে, আর ওয়াটসনকে নিয়ে ‘ইন্ডিয়ান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন’ তৈরি করলেন নগেন্দ্র প্রসাদ সর্বাধিকারী। সচিব হন, এআর ব্রাউন। সলতে পাকানো শুরু হল শিল্ডের। ইস্ট ইয়ার্কশয়ার-কে হারিয়ে মোহনবাগান সেই শিল্ড প্রথম জেতে ১৯১১ সালে। শিবদাস ভাদুড়ি-সহ অমর একাদশের জন্ম হয়। নগেন্দ্রের মশালে বারুদ ঠুসে দিলেন শিবদাসরা, সেদিন থেকে ফুটবল হয়ে উঠল বাঙালির বিপ্লবের ভাষা। স্বাধীনতার মন্ত্র। আজও যখন রবি হাঁসদারা বল নিয়ে গোলের দিকে এগিয়ে যান, অলক্ষ্যে জিতে যান নগেন্দ্রপ্রসাস। জিতে যান স্যার দুঃখীরাম মজুমদার। উমেশচন্দ্র মজুমদার ওরফে দুঃখীরাম ছিলেন ময়দানের কাঁচা সোনাকে পাকা করে তোলার জাদুকর৷ একটাই নেশা ছিল খেলোয়াড় খুঁজে বের করা৷ এরিয়ান্স ক্লাবের সূতিকাগারে জন্ম হওয়ার সেই সব তারকারা একদিন মাতিয়েছেন কলকাতা ময়দান৷ কলকাতার ময়দানের ‘সাপ্লাই লাইন’ ছিল দুঃখীরামের পাঠশালা।
আদতে বাঙালির ফুটবলের গোটাটাই আবেগ। ১৯৭৫ সালের শিল্ড ফাইনালে ইস্টবেঙ্গলের কাছে পাঁচ গোলে হারার পর মোহনবাগান ভক্ত উমাকান্ত পালোধির সুইসাইড নোট মনে পড়ে? ‘সামনের জন্মে মোহনবাগানের ভালো ফুটবলার হয়ে এই পরাজয়ের শোধ নিতে চাই৷’
সিনেমা, সাহিত্যেও ফুটবলকে আগলে রেখেছে বঙ্গ সন্তানেরা। ‘আগন্তুক’-র সংলাপে এসে পড়েন পেলে। ‘জনঅরণ্য’-এ সত্যজিতের চরিত্র বলে ওঠে, অনার্স বা পাশ নয়, তিনি মোহনবাগান। বিনয় বসুর ‘সাহেব’ থেকে অরুণ রায়ের ‘এগারো’, অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়ের ‘ধন্যি মেয়ে’ থেকে এক দশক আগের ‘লড়াই’, ‘ওপেন টি বায়োস্কোপ’-র মতো ছবি, চলচ্চিত্রের কাহিনিতেও ফুটবল লড়াইয়ের প্রেরণা জুগিয়েছে। মোহনাবাগানের শিল্ড জয়ে জন্ম হয়েছে কবিতার। ফুটবল খেলোয়াড় কবিতায় পল্লীকবি জসীমউদ্দীন লিখছেন, ‘‘আমাদের মেসে ইমদাদ হক ফুটবল খেলোয়াড়,/ হাতে পায়ে মুখে শত আঘাতের ক্ষতে খ্যাতি লেখা তার।…গোল-গোল-গোল, চারিদিক হতে ওঠে কোলাহলকল,/ জীবনের পণ, মরণের পণ, সব বাঁধা, পায়ে দল…’’ আঘাতকে খ্যাতিতে পরিণত করতে পারে ময়দানই। ফুটবলের রোমান্টিসিজম ধরা দেয় তারাপদ রায়ের এক লাইনে, ‘‘চাঁদের ফুটবল গ্যালারিতে অস্পষ্ট ছায়াচ্ছন্ন মানুষেরা চেঁচিয়ে ওঠে গোল, গোল, গোল।’’ ফুটবলের মহাকাব্য লিখে গিয়েছেন মতি নন্দী। ‘স্টপার’, ‘স্ট্রাইকার’ আজও জীবনদর্শনের টেক্সট বুক।
১৯৫০-র ব্রাজিল ওয়ার্ল্ড কাপে ডাক পেয়েছিল ভারত। অধিনায়ক হতে পারতেন শৈলেন মান্না। ইতিহাসের অংশীদার হওয়ার সুযোগ পেয়েও হাতছাড়া হয়েছিল সে যাত্রায়। আদতে বাঙালি ফুটবলে কী পেয়েছে? ফুটবল ছিল খালি পায়ে স্বাধীনতার লড়াই। ময়দানে ব্রিটিশ হারিয়ে স্বাধীনতা অর্জনের স্বাদ পেয়েছিল বাংলা। সেই অর্থে ফুটবল জুগিয়েছে বিপ্লবের রসদ। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে ফুটবল ছিল স্বপ্ন উড়ানের নাম। সাত-আট-নয়ের দশকে নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্তদের বাঁচতে শিখিয়েছে ফুটবল। একটু ভালো খেলে, ময়দানের প্রথম সারির ক্লাবে নাম লেখালেই জুটেছে চাকরি। উদ্বাস্তু পারিবারগুলো রক্ষা পেয়েছে, বাবার কারখানা লক আউট হয়ে হাঁড়ি-চড়া বন্ধ হতে বসা সংসার বেঁচে গিয়েছে ফুটবল খেলোয়াড় ছেলের দৌলত। আজ ময়দানে বাঙালি প্রান্তিক শক্তি। বসু, মিত্র, রায়, ভট্টাচার্য, বন্দ্যোপাধ্যায়রা ফুটবল থেকে দূরে। হাঁসদা, টুডু, ওঁরাওরা তবু বাঁচিয়ে রেখেছেন সলতে।
ফুটবলে বাঙালির প্রতিনিধিত্ব কমছে। ভারতীয় ফুটবলে এখন উত্তরপূর্বের ছেলেদের দাপট। বিশ্বকাপ খেলার ধারেকাছেও নেই ভারত কিন্তু তাতেও কেন রাত জেগে অতিউৎসাহী হয়ে টিভির স্ক্রিনে সামনে বসে বিশ্বকাপ দেখে বাঙালি? কী উপভোগ করে? কী পায়? ফুটবল সমষ্টির খেলা। সাধারণের খেলা, শ্রমজীবীর খেলা, সমাজের বিভাজন দূর করার খেলা। পায়ের ছোঁয়া হয়তো একজনের থাকে, স্কোর বোর্ডেও হয়তো একজনেরই নাম লেখা থাকে কিন্তু বল জালে জড়িয়ে দেয় গোটা দল, গোটা দেশ, গোটা সমর্থককুল। বিশ্বকাপে ভ্রাতৃত্ববোধ, সৌহার্দ্য, সহমর্মিতা, বিপ্লব, সাম্যবাদ, আম আদমির লড়াই দেখে বাঙালি। প্রিয় দলের জয়কে নিজের জয় হিসাবে উদ্যাপন করে।
