‘মাথার উপর ছাদ থাকলেই কি বাড়ি বলা যায়?’ (“অনেকদিন পর” চলচ্চিত্রের ব্যক্তিগত পাঠ) – সংহিতা রায়
পাশাপাশি দুটো কাপ। দুটোতেই লাল চা। কাপের সামনে অনেক ক্ষণ থেকে বসে আছেন দুই প্রৌঢ়। তাঁরা বন্ধু। কার চায়ে চিনি আছে, আর কার চায়ে চিনি নেই সেই সমাধানে আসতে তাঁদের কেটে যায় ঘন্টার পর ঘন্টা। এদিকে চা জুড়িয়ে জল। তবু দ্বিতীয়বার গরম করার উপায় নেই। যেমন চেখে দেখারও উপায় নেই!
এই তাঁদের সম্পর্কের ‘পারপাস’। বন্ধুত্ব। দু ‘দিকে দুই মানুষ। মাঝখানে শুধুই সফর। সেই সফরে জুড়ে যায় নতুন নতুন মানুষ। এক গাড়িতে, এই বাড়িতে অনেক জন। একা একা মানুষ জুড়ে জুড়ে ভরে ওঠে বাড়ি।
ভাঙা সময়ের বুকে দাঁড়িয়ে অদ্ভুত এক কালেকটিভ বেঁচে থাকার গল্প বুনেছেন পরিচালক সৌরভ পালোধি। ছবির নাম ‘অনেক দিন পর’।
সুমনের গানের লাইন মনে পড়ে যায়। ‘অনেক দিন পর, বন্ধু কী খবর?’। যে মানুষ হারিয়ে গিয়েছে, অনেক দিন পর তার সঙ্গে দেখা হলে কেমন লাগে? কেমন লাগে যদি হারানো সময়ের সঙ্গে দেখা হয়ে যায়?
পুরনো সাইকেল, এসডিটি বুথ, উঠোনের মাঝখানে পায়রার বাসা। পুরনো বারান্দায় ভিজে কাপড় দোলে। কাঠের বাসের চেয়ারে পাশাপাশি দু’জন।
মল্লিকা আর তার বন্ধু। মল্লিকা মধ্যবিত্ত বাড়ির সাদামাটা মেয়ে। বাসে ‘দিলখুশ’ উঠলে মন ভাল হয়ে যায় তার। ব্যাগে টিফিন বক্সে মায়ের দেওয়া রুটি তরকারি। তারা পাশাপাশি হাঁটে। মিলেমিশে সাইকেল চালায়। মাঠের মাঝে বিশুদার চায়ের দোকান। মাচায় বসে চা খায়। গল্প করে। আবার চলে যায় দু জনের দু দিকে।
জীবন ‘পারপাস’এ চলে। সেই ‘পারপাস’ যদি চোখে দেখা না যায় তখন খুঁজে নিতে হয়।
মানুষের আপাত অসংলগ্ন আচারণের মধ্যে লুকিয়ে থাকে পারপাস। কী এক মায়া।
‘অনেকদিন পর’ মুক্তি পেয়েছে ২৬ জুন মুক্তি। পরিচালনায় সৌরভ পালোধি। মুখ্য ভূমিকায় চিত্রাঙ্গদা শতরূপা এবং বিমল গিরি। এছাড়াও দরিয়া দাস পালোধি, দেবেশ রায়চৌধুরী, বুদ্ধদেব দাস, বিপ্লব বন্দ্যোপাধ্যায়, স্বাতী মুখোপাধ্যায়, বিমল চক্রবর্তী, সেঁজুতি মুখোপাধ্যায়, প্রমুখ। প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের প্রযোজনা সংস্থা এনআইডিয়াসের প্রযোজনা।
ছবিটির সঙ্গীত করেছেন সপ্তক সানাই দাস।
ছবি মুক্তির আগে বিমান বসু থেকে শমিক ভট্টাচার্য, অরুণ মুখোপাধ্যায় থেকে শমিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছিলেন ছবির পরিচালক আর প্রযোজক। বিশেষ করে দুই রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বর সঙ্গে তাঁদের সাক্ষাৎ ঝড় তুলেছিল সামাজিক মাধ্যমে। জাগিয়েছিল কৌতূহলও।
ছবির উদ্দেশ্য সাধনে সফল সৌরভ। তাঁর এই ছবিটি তিনি উৎসর্গ করেছেন ‘বাবা মায়েদের’। সন্তান, সংসার, বন্ধুত্ব এমনকি ছেড়ে যাওয়া সম্পর্ককেও নতুন করতে আবিষ্কার করতে শেখায় ‘অনেক দিন পর’।
ছবি দেখে বারবার মনে পড়ে যায় ‘লাপাতা লেডিজ’ ছবির কথা। লো-টোন উপস্থাপনা, ক্যামেরার মোলায়েম চলন, রঙের ব্যবহার চোখকে আরাম দেয়। এ ছবিতে স্ট্রেস নেই। অতিনাটকীয় ধাক্কা নেই। নীতি-দুর্নীতির জ্ঞানের বালাই নেই। যেটা আছে, সেটা ঘরোয়া বাঙালি জীবনের অনুচ্চকিত যাপন। সম্পর্কের ‘ডিগনিটি’। যত্নের ছাপ প্রতি ফ্রেমে। তাই পর্দায় ছবির শেষ রেখাটাও দর্শকদের ‘মিস’ করে যেতে গায়ে লাগে।



