স্বর ও যন্ত্র -ষড়যন্ত্র সঙ্গীত – ডা সৌম্যব্রত রায় চৌধুরী
এক অলস গরমের দুপুরের আড্ডা , প্রভাতদার ক্যান্টিনের পাখাগুলো যে চলছে তা উপরদিকে দৃষ্টিক্ষেপ করলে তবেই বোঝা যায় । হঠাৎ করেই সিগারেটের ধোঁয়ার আড়াল থেকে ভেসে এল – মনে পড়ে রুবি রায়- পুরুষালী সুরেলা গলায় সুন্দর গায়কী- জেগে উঠল ঝিমিয়ে থাকা ক্যান্টিন । লাইন দুয়েক পরেই – পাশের টেবিলে পড়ে থাকা একটি ছোট্ট থালা , গ্লাস , আঙুলের ফাঁকে ধরা কয়েন ও কাঠের টেবিলের ওপর হাতের চাপড়ের সংমিশ্রণে নিখুঁত ভাবে তালবাদ্য বাজিয়ে চলল একটি ছেলে – উপস্থিত সকলেই প্রায় হাততালিতে তাল দিতে দিতে চলে এসেছে দুই টেবিলের চারপাশে – আর গানের শেষে গোটা ঘর জুড়ে বয়ে গেল হাততালির ঝড় । পরিবেশ শান্ত হলে এগোলাম পরিচয় করতে – ফর্সা , রোগা , শান্ত ( বাঙলা সিরিয়ালের পাশের বাড়ির ভাইএর চরিত্রে মানানসই ) ছেলেটি অর্ক – সেই পুরুষালী সুরেলা কণ্ঠের অধিকারী আর রোগা উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ একমাথা ঝাঁকড়া চুল ছেলেটি হল অতীশ । চমৎকৃত হলাম শুনে যে দুজন ই নাকি গণিতে অনার্স- প্রথম বর্ষের ছাত্র অর্থাৎ আমার সহপাঠী (নবীন বরণের পর প্রায় দুই সপ্তাহ কেটে গেলেও তাদের ক্লাসে দেখা পাইনি) । আলাপচারিতার ফাঁকে কি করে যেন ফাঁস হয়ে গেল যে আমিও একটু আধটু লেখালেখি করি ও গান বাজনার চর্চা করি- ব্যস, সেই আমাদের একত্রে চলার শুরু ।
অল্প সময়ের মধ্যেই ঠিক হল যে একটা গানের দল ( যাকে চলতি কথায় ব্যান্ড বলা হয ) তৈরি করতে হবে এবং তা নিয়ে আমরা আমাদের কলেজ ও অন্যান্য কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলির ফেস্ট ও সমাবর্তন উৎসবে অংশগ্রহণ করব । যেমন ভাবা তেমনই কাজ- উদ্ভিদ বিদ্যা অনার্স থেকে এলো প্রীতম -কীবোর্ড বাজায় ও ইংরেজি অনার্স থেকে এলো সৌমিত্র অক্টাপ্যাড সহ । আমাদের অর্থাৎ গণিত বিভাগের ছাত্র সংখ্যা দলের মধ্যে বেশি ছিলো – কিন্তু সর্বসম্মত ভাবে গানের দলের নাম -গানeঠিক রাখা হল ।( দুর্জনে বলত – গণিতের ছাত্রদের ব্যান্ড গাণিতিক !! )
প্রচলিত গান দিয়েই শুরু হল আমাদের দলের পথচলা । অর্কর অসাধারণ গলার গান ও অন্যান্যরা অত্যন্ত উচ্চ মানের যন্ত্রানুসঙ্গী হওযায় গানe ঠিক- অল্প সময়ের মধ্যেই বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠল । প্রথম কিছু দিন আমন্ত্রিত ব্যান্ড হিসেবে গান গাইলেও , আস্তে আস্তে অনুষ্ঠান করে কিছু অর্থ উপার্জনও হতে থাকলো ।
অনুষ্ঠানের উদ্যোক্তাদের সাউন্ড সিস্টেম সবসময় সমান হয় না তাই মুক্তমঞ্চে অনুষ্ঠান করতে গিয়ে আমরা মাঝে মধ্যেই প্রত্যাশা মত মানের অনুষ্ঠান করতে পারছিলাম না । এই ধরনের একটি অনুষ্ঠানের শেষে ফেরার পথে আমরা সবাই একটি জরুরি বৈঠক করলাম । দুটি বিষয় সিদ্ধান্ত হল – আমরা নিজেদের সাউন্ড সিস্টেমে সমস্ত অনুষ্ঠান করবো এবং সেই সাউন্ড সিস্টেমের সাথেই সপ্তাহে একদিন রিহারসাল করবো ~ এরজন্য সন্মানদক্ষিণা যা প্রয়োজন সেটা অনুষ্ঠান আয়োজকের কাছ থেকেই নেওয়া হবে। দুই – একজন স্যাক্সোফোন বাদক ও একজন Bass গিটারিস্ট আমাদের নিতে হবে- তাতে যদি নিজেদের অর্থ কিছু কমে তাতেও আমরা সবাই রাজি হলাম।
পার্ট ওয়ান পরীক্ষা সামনে আসছে তাই সবাই পড়তে বসে গেলাম – চোখ কান খোলা রেখে স্যাক্সোফোন ও bass গিটারিস্ট এর সন্ধানে ।
পার্ট ওয়ান পরীক্ষায় পরে আবার জমায়েত হলাম সকলে – সন্ধান পেলাম আমাদের কাঙ্খিত দুই ব্যক্তির । কলেজ পাড়ার কাছেই থাকেন ভূতোদা – বছর চল্লিশের কোঠায়- কলেজের কাছে ছোট্ট একটি বইখাতার দোকান ঢালান – অভিনয় ও গান বাজনার প্রতি প্রবল অনুরাগ তাঁর । আলাপচারিতার সময় তাঁকে দেখে কেন জানিনা আমার বারংবার মনে হলো , গোপাল ভাঁড় ও নন্টে ফন্টের সুপারিনটেনডেন্ট স্যারের সঙ্গে তাঁর অত্যাশ্চর্য মিল । তাঁর bass গিটারিস্ট হয়ে ওঠার গল্পটাও চমকপ্রদ- স্ফীত মধ্যপ্রদেশের কারণে তাঁর মাটিতে বসে তবলা বাজানো দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছিল তাই বছর ৫-৬ আগে তবলা তুলে রেখে – তালিম নেন স্প্যানিশ গিটার ও bass গিটার বাজানোর যা চেয়ারে বসে বা দাঁড়িয়ে বাজানো যায় । ভূতোদা অত্যন্ত অমায়িক ব্যক্তি সহজেই মিশে গেলেন অসমবযসীদের দলে । দ্বিতীয়জন Christopher – আমাদের থেকে বছর পাঁচেকের বড়- BSc পাশ – পার্ক সার্কাসের কাছে একটি বেসরকারি স্কুলে পড়ায় ও দুপুরের পর থেকে সংগীত চর্চায় মেতে থাকে । সেও অচিরেই আমাদের ক্রিস্টোদা হয়ে উঠল- একমাত্র ফিচেল আমি তার লালচে দাড়ি গোঁফের কারণে তাকে মাঝেমধ্যেই খ্রীষ্টদা বলে ডাকতাম আর সে আমার দিকে চোখ কুঁচকে তাকালে বলতাম – কানে ঠিক করে শুনতে অসুবিধা হচ্ছে তো – ডাক্তার দেখানো উচিত বলে স্থান ত্যাগ করতাম অল্পক্ষণের জন্য।
জমে গেল আমাদের গানeঠিক এর আসর । পরপর অনুষ্ঠানের ডাক পেতে লাগলাম আমরা। সাহসে ভর দিয়ে আমার লেখা কিছু কবিতা বা অনুচ্ছেদ নিয়ে সমবেত প্রয়াসে সুর দিয়ে কলেজের অনুষ্ঠানে আমরা গাইতে শুরু করলাম যেগুলো মুখে মুখে জনপ্রিয়তা পেল । একটি গান – ক্লান্ত দুপুরে স্নিগ্ধ বিকেলে যখন সম্পর্ক হয় জ্যামিতিক,
মনের দরজা খোলো, অতীতটাকে ভোলো, সুর মিলিয়ে বল গানeঠিক-সব সম্পর্ক নয় গাণিতিক!!!!।
তারপর খোলা হলো YouTube channel – যার মাধ্যমে আরো জনপ্রিয় হযেউঠলাম আমরা । অর্ক তো প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো FM চ্যানেলে বা ইউটিউবে সাক্ষাৎকার দেয়., কয়েকবার আমাদেরও ডাক পড়েনা তা নয় । ইতি মধ্যে অর্ক একটি বাংলা ধারাবাহিকের টাইটেল ট্র্যাক গাইবার প্রস্তাব পেল । আমরা সবাই খুব উত্তেজিত- কিন্তু অর্ক এসে জানালো প্রডাকশন হাউসের স্টুডিওতে আগে থেকে আমাদের গিয়ে মিউজিক ট্র্যাক রেকর্ডিং করে নিতে হবে তারপর অর্ক পরে গিয়ে গান গাইবে ও ফাইনাল মিউজিক ভিডিও তৈরি হবে । সেই গানটিও ভালো ভাবে রেকর্ডিং হল এবং দর্শকদের মধ্যে জনপ্রিয়তা অর্জন করল । আমাদের রিহার্সালে একদিন অর্ক আমাকে একান্তে ডাকলো- বললো, জানিস তো ট্র্যাকে গাওযার যে কি মজা স্টুডিওতে না গেলে বুঝতেই পারতাম না । আমি একটু হতচকিত দৃষ্টিতে তাকালাম দেখে ও প্রসঙ্গ বদলালো। সেদিনই রিহার্সালের সময় এক ভদ্রলোক এলেন- অর্ক তার সাথে পরিচয় করিয়ে দিল – ইনি হুলো দা – sound engineer – আমাদের আগামী কিছু স্টেজ শোতে উনি আমাদের সাউন্ড এফেক্ট আরো উন্নত করতে সাহায্য করবেন এবং আমাদের যদি মনেহয় যে ওনার যোগদানের ফলে আমরা উপকৃত হয়েছি তখন পারিশ্রমিকের কথা হবে । সেদিন হুলোদা আমাদের সাউন্ড সিস্টেমের খুঁটিনাটি নিরিক্ষন করে বিদায় নিলেন।
পরের অনুষ্ঠান ডায়মন্ড হারবারের দিকে – খোলা মাঠের মাঝে বিরাট স্টেজ তিনদিক খোলা , একপাশে জলাশয় থাকায় হালকা হাওয়ার দমক মাঝেমধ্যেই থাকে । এহেন পরিস্থিতিতে গান গাওয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে কারণ যন্ত্রানুসঙ্গের আওয়াজ সঠিকভাবে কানে আসে না । ইতিমধ্যে পান পরাগ খেতে খেতে হুলোদার আবির্ভাব- এবং একগাদা বাক্সের সম্ভার সহ। এসেই তিনি এককাধিক যন্ত্র আমাদের সাউন্ড সিস্টেমে যুক্ত করে আমাদের কানে একটি ছোট্ট যন্ত্র ( ইযারফোনের মত ) লাগিযে দিলেন । ব্যবস্থায় বেশ নতুনত্ব আর সেই সঙ্গে এই যন্ত্রে আমরা পরিষ্কার ভাবে অন্যদের গান ও যন্ত্রানুষঙ্গ শুনতে পেলাম- অত্যন্ত ভালো মানের একটা অনুষ্ঠান করলাম । ফেরার পথে আমরা সবাই এই নতুন ব্যবস্থাপনার উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করলাম । স্থির হল যে আর গোটা পাঁচেক অনুষ্ঠানের পরে আমরা মাস্টা্র্স পরীক্ষার জন্য বিরতি নেব তার পর হুলোদার সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করব । হুলোদাও এই ব্যবস্থায় সম্মত হলেন এবং পরের পাঁচটি অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন ( পারিশ্রমিক ছাড়াই ) তাও জানালেন ।আমরাও তারপর ব্যস্ত হয়ে গেলাম পরীক্ষা পাশের আরাধনায় ।
মাস চারেক পর পরীক্ষা শেষ হয়ে গেলো , সবাই মিলিত হলাম কলেজের সেই ঘরটিতে যেখানে আমরা রিহার্সাল করতাম । মাঝেমধ্যে আমাদের রিহার্সাল অবশ্য অর্কদের বাড়িতেও হতো । পারস্পরিক পরীক্ষার খবরাখবর নেওয়ার পর আমরা ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে অর্ককে জিজ্ঞাসা করলাম -আমরা কি তাদের বাড়িতে রিহার্সাল করতে পারবো যদি কলেজ কর্তৃপক্ষ আমাদের অনুমতি না দেয় তাহলে? অর্ক জানিয়ে দিল যে তার বোন নবম শ্রেণীতে পড়ে এবং তার পরিবার তার পড়াশোনার জন্যই সে অনুমতি দেবে না । এরপর অর্ক সবার অনুমতি নিয়ে কিছু বলতে চাইল। উঠে দাঁড়িয়ে সে বলল – সব মিলিয়ে প্রতি অনুষ্ঠানে আমাদের যা পারিশ্রমিক দাঁড়ায় তা অনেকেরই ধরাছোঁয়ার বাইরে এবং সেই কারনে আমাদের চাহিদা আস্তে আস্তে কমে যাচ্ছে । তাই কম বাজেটের অনুষ্ঠান সে একাই হুলোদার সহায়তায় ট্র্যাকে গাইবে – আর অনুশীলনও সে ট্র্যাকের সাথেই করবে । শুধুমাত্র নতুন কোনো গান তৈরির প্রয়োজনে ও কোনো অনুষ্ঠান যদি মিউজিসিযানদের নি য়ে হয় তাহলে সে একটি রিহার্সাল দিতে আসতে পারে । ঘরে নেমে এল শ্মশানের নিস্তব্ধতা । অর্ক তখন আরো বলল যে এক মন্ত্রীর সাথে কথা হয়েছে যে আমরা সকলে এক ঘন্টার অনুষ্ঠান করব এবং সেই মন্ত্রীমশায কলেজ কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলে এই সময়কালের জন্য কলেজের ঘর ব্যবহারের অনুমতি নিয়ে রেখেছেন । অর্কর প্রস্থানের পর আমরা সকলে মিলে একই উপলব্ধি করলাম এটাই হয়তো আমাদের একত্রে চলার শেষ অনুষ্ঠান ।
আমি একটা অন্যরকম গান মানে প্রায় -এই কি গো শেষ গান ধরনের গান লিখে দেখলাম ব্যপারটা বিশেষ জমাতে পারলাম না- আমার পরিচিত একজন প্রথিতযশা লেখিকার সাহায্য চেয়ে what’s app করলাম । এক সপ্তাহ পর কোনো উত্তর না পেয়ে ফোন করলাম – মৃদু হেসে তিনি বললেন- আজ বিকেলে আমার একটা অনুষ্ঠানে পৌরহিত্য করা আছে তার পর জানাই কেমন বলে ফোন রাখলেন। বলাই বাহুল্য সে ফোন আর এলো না । অনুষ্ঠানের দিন এগিয়ে এলো , একদিন আগে স্টেজ রিহার্সাল যুবভারতী স্টেডিয়ামে ।
সবাই উপস্থিত হলাম যথাসময়ে – কিন্তু অর্ক প্রায় প্রতি গানেই সুর তাল সব ভুল করতে লাগলো – এবং আশ্চর্য হলাম যে ট্র্যাকের সাথেও সেই একই দশা হল । শেষে অর্ক বলল তার দুদিন আগে জ্বর হয়েছিল সর্দি কাশি ছিল এবং আজ সকাল থেকেই সে কানে খুব কম শুনতে পাচ্ছে । নিয়ে গেলাম নাক গান গলার ডাক্তারবাবুর কাছে- তিনি বললেন ভাইরাল সংক্রমণ-সেরে যাবে কিন্তু দিন পাঁচেক লাগবে শ্রবণশক্তি ফিরে পেতে – স্টেরয়েড দেওয়া স্বত্বেও । আমাদের মাথায় হাত- এমন সময় হুলোদা আমাদের সবাইকে হাতের ইশারায় ডেকে নিয়ে বললেন- কাল অনুষ্ঠান হবে । কি করে ??? আমরা সমস্বরে বলে উঠলাম । উনি বললেন – কাল আমি ট্র্যাক বাজাবো মিউজিক ও গলার সেটাই আউটপুটে যাবে তোমরা সবাই বাজানো ও গাইবার অভিনয় করবে আর মনে রেখো পারিশ্রমিক পুরোটাই আমার । রাজি না হয়ে উপায় নেই তাই সবাই ঘাড় নেডে সায় দিলাম । পরের দিনের অনুষ্ঠানে কোনো বিঘ্ন হল না – স্টেজ দর্শকদের থেকে দূরে থাকার কারণে আমাদের ভুল ত্রুটি সামলে গেল । ভারাক্রান্ত হৃদয়ে সবাই ফিরছি আমরা-অর্ক গেছে ডাক্তারবাবুর কাছে । অন্ধকার গাড়িতে সবার চোখের কোল ভেজা – হঠাৎ মোবাইলে মেসেজ এলো- অর্ক লিখেছে -যন্ত্রের ষড়যন্ত্রের ফাঁদে স্বর আজ পরাজিত- কিন্তু চল সবাইকে নিয়ে আমরা প্রমাণ করি যে গানe ঠিক এর বন্ধন – আর্থিক বা গাণিতিক কিছু নয় সম্পূর্ণ আত্মিক- কাল গানeঠিক-এর জন্মদিনে কলেজে আসবি তো নতুন সুরের খোঁজে ?
বি:দ্র : এই গল্পের ঘটনাবলি ও চরিত্ররা সম্পূর্ণ কাল্পনিক, বাস্তবের কোনো ঘটনা বা চরিত্রের সঙ্গে কোনো প্রকার মিল খুঁজে পেলে তা সম্পূর্ণ কাকতালীয়
